শকুন রাধাকৃষ্ণ মোবাইল সোনা সুখীরাম নতুন রান্না এক টুকরো সুন্দর আর্সেনিক ভূমি ঝড়ের পাতা গ্রামপ্রধানের ছেলে চক্ষুদান রাক্ষসায়ন গণেশ মানুষ কিংবা কোলবালিশ যন্ত্রপাতি মানুষ ও বেগুন অনন্তবালা রেখে আসা পূর্বজন্মের ভাই দুলালচাঁদ ভাবের গান ডাক্তার যৌবন বারিধি একটি সামাজিক পালার নামকরণের সমস্যা নারী হওয়া মেয়েমানুষ অথবা কলাগাছ যে মেয়েটি মোহময়ী হতে চেয়েছিল ডিপ ফ্রিজ ধর্ম দীন—ইলাহি তাল্লাক দর্পচূর্ণ পালা কার্তিক জার্সি গোরুর উলটো বাচ্চা নৈশপর্ব উদ্বাসন কাব্য ভগীরথ পুরোহিত দর্পণ মধুদার বাড়ি যাব শোকগাথা গন্ধকাঁথা ডলার মানুষ রতন কল ঢোঁড়া উপাখ্যান পেপসি আনে গাঁয়ের আলো কালীবাবু ও কালু সোভিয়েত রাশিয়ার পতনের পরে রামযতনের বাগান ১১ই সেপ্টেম্বর ডাকিনিতন্ত্র
স্বপ্নময় চক্রবর্তীর জন্ম ২৪ আগস্ট, ১৯৫১ সালে উত্তর কলকাতায়। রসায়নে বিএসসি (সম্মান), বাংলায় এমএ, সাংবাদিকতায় ডিপ্লোমা করেছেন। লেখকজীবন শুরু করেন সত্তর দশকে। প্রথম দিকে কবিতা লিখলেও থিতু হয়েছেন গল্প ও উপন্যাসে। তাঁর লেখা গল্পের সংখ্যা প্রায় ৩৫০। প্রথম উপন্যাস ‘চতুষ্পাঠী’ প্রকাশিত হয় ১৯৯২ সালে শারদীয় আনন্দবাজার পত্রিকায়। পাঠক মহলে সাড়া ফেলেন স্বপ্নময় চক্রবর্তী। বিশ্লেষণধর্মী প্রবন্ধ এবং কলাম কিংবা রম্যরচনাতেও সিদ্ধহস্ত। তাঁর রচিত ‘হলদে গোলাপ' উপন্যাসটি ২০১৫ সালে আনন্দ পুরস্কারে সম্মানিত হয়। ‘অবন্তীনগর' উপন্যাসের জন্য ২০০৫ সালে বঙ্কিম পুরস্কার পান তিনি। এ ছাড়া মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় পুরস্কার, সর্বভারতীয় কথা পুরস্কার, তারাশঙ্কর স্মৃতি পুরস্কার, গল্পমেলা, ভারতব্যাস পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেছেন। সাহিত্যের বাইরে তিনি গণবিজ্ঞান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত।
কেমন একটা ঘোরের মধ্যেই শেষ করে ফেললাম স্বপ্নময় চক্রবর্তী এর পঞ্চাশটি গল্প। লেখক ছোট গল্প লিখেছেন প্রায় ২০০ এর কাছাকাছি, তার মধ্যে এখানে তুলে ধরেছেন ৫০ টি গল্প। ১৯৭০ থেকে ২০০৫ এই সময়কাল এর মধ্যে লেখক সুন্দর ভাবে নিজের বক্তব্য তুলে ধরেছেন।
পটভূমি - নিজের কিছু পছন্দের গল্প এর সারমর্ম তা লিখে রাখলাম সূচিপত্র অনুযায়ী। ৩. মোবাইল সোনা - মা বৃদ্ধাশ্রমে, সবসময় ছেলের সাথে দেখা হয়না, ছেলে এসে মা কে কিনে দিয়ে গেলো একটা মোবাইল ফোন, মাঝে মাঝে কথা বলার জন্য, মা সেই মোবাইল ফোন এর জন্য বানালেন কাথা, বালিশ নাম রাখলেন মোবাইল সোনা। ৪. সুখীরাম - সুখীরাম, পৌরুষহীনতার জন্য তার বৌ দুলি ঘর ছেড়ে চলে গেছে, রংকিনী মন্দির এ মানত করে, পাঠা বলির, সুখীরাম যায় রংকিনী মন্দির, নিয়ে যায় পাঠা, কিন্তু বলি তা দিতে পারে না। ৬. এক টুকরো সুন্দর - প্রিয়লাল বাবুর ছোট ছেলে অনিরুদ্ধ ও তার বৌ অনুরাধা ছোট সংসার। প্রিয়লাল বাবুর বৌ সুধা দেবী গত হয়েছেন, তার জন্মতিথিতে প্রিয়লাল বাবু সিদ্ধান্ত নেন সিগারেটে ছেড়ে দেওয়ার। ৮. ঝড়ের পাতা - সোলেমন মুসলিম আর আদু হিন্দু, বিয়ে হয়, বিয়ের পর সোলেমান যায় ইরাক। ইরাক এ সে খেজুর কারখানায় কাজ করে, প্রায় চিঠি লেখে মাঝে মাঝে টেপে রেকর্ড করে পাঠায় তার গলার আওয়াজ আদুর জন্য। আমেরিকা ইরাক আক্রমণ করে, বোম্ব ব্লাস্ট এ সোলেমান এর ডান হাত টি কাটা পরে। ১২. গণেশ - বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার জন্য চাই কিছু মানুষ, গোপীবল্লভ, মহাদেব এর ছেলে গণেশ কে নিয়ে যায় কলকাতায়, বিনিময়ে মহাদেব এর পরিবার পায় টাকা, গণেশ যখন ফিরে আসে সত্যিই গণেশ এর মতো সুর আর ভুরি। ২১. ডাক্তার - ডক্টর শিবতোষ পালোধি প্রাইভেট প্রাক্টিশনার কলকাতা, নিজেদের গ্রামে ফিরেছেন, নিজের গত বাবা এর স্মৃতি তে একটি দাতব্য চিকিৎসালয় শুরু করার জন্য। ডাক্তার রত্না সরকার, সরকারি ডাক্তার, গ্রামের স্বাস্থ্য পরিষেবা কেন্দ্রে কর্মরত, তার সাথেই ডাক্তার পালোধি যোগাযোগ করেন। ২৪. নারী হওয়া - ভারত বাংলাদেশ বর্ডার এলাকায় মাল পাচার করার জন্য মুটে শ্রমিকদের বলা হয় জন। সেই এলাকার এক মেয়ে পুঁতে আর তার মাসি কালিদাসীর গল্প বলেছেন লেখক। পুঁতে এর বড়ো হওয়া প্রথম পিরিয় বিয়ে প্রসব বেদনা হাসপাতাল যেতে গিয়ে মর্মান্তিক পরিণতি দারুন ভাবে ফুটে উঠেছে ২০০২ সালের এই গল্পে। ২৬. যে মেয়েটি মোহময়ী হতে চেয়েছিল - এই গল্পটি সন্মন্ধে শুধু এটুকুই বলা যায় যে সাইজ ম্যাটার, আর বিকৃত মানুষিকতার লোক আমাদের আসে পাশে প্রচুর আছে তাদের মধ্যেও কিছু ভালো মানুষ আছেন যাদের বিবেক এখনও সারা দেয়। ২৯. দীন—ইলাহি - ১৯৯০ সাল হিন্দু মুসুলমান জাতিভেদ, মুসুলমান সরকারি চাকুরে, হিন্দু কে বিয়ে করে কিন্তু কলকাতায় থাকার ঘর পাওয়া নিয়ে ধর্মের কতখানি প্রশ্রয় সুন্দর ভাবে তুলে ধরেছেন। ৩৪. নৈশপর্ব - বয়স ৭০ পেরিয়েছে তো কী হয়েছে, আমরা কী অথর্ব হয়ে গেছি নাকি? ফ্লাট কলোনী তে চোর ধরার জন্য নাইট গার্ড এর ডিউটি তে ষাটোর্ধ তিন বন্ধু খুঁজে পেলেন বাধাহীন আড্ডার হারিয়ে যাওয়া সুখ. ৩৮. মধুদার বাড়ি যাব - চঞ্চল সরখেল ফুটবলার। মোহনবাগান এর হয়ে স্ট্রাইকার পসিশন এ খেলে। ছোটবেলার কোচ মধু দা আজ ক্যান্সার আক্রান্ত তাকে অনেকদিন দেখতে যায়না আজকের নামকরা ফুটবলের। তার সাথে দেখা করা এবং কিছু রূঢ় বাস্তবের সম্মুখীন হয় চঞ্চল। ৩৯. শোকগাথা - আচমকা ফ্লাট এসোসিয়েশন এর সাংস্কৃতিক অধক্ষ কে শোকপাঠ করতে বলা হয় এমন একজন ব্যক্তির যাকে তিনিই চেনেন না, তার সম্পর্কে জানেন ও না। এই পরিস্থিতি সাংস্কৃতিক ধক্ষ কিভাবে সামাল দেবেন। ৪৩. কল - ১৯৮১ সালে বড় জমিদার বাবু দেড় ছেলে মেয়েরা কলে ইঁদুর ধরে রাখতো এইসব ছিল তাদের কাছে মজার বিষয়, আর গরিব চাকর বা মাহিন্দার এরাও ফেঁসে থাকতো বাবু দেড় কলে। ৪৬. কালীবাবু ও কালু - ১৯৯৫ সালের হিসেবে ভারত এর ৮৯% মানুষ এর নিজের পাকা বাড়ি ছিল না, যাদের ছিল তাদের মধ্যে ৭৪% এর নিজেদের জলকল নেই, কালিপদ এমনি একজন কমরেড যে নিজের জন্য একটা ফ্লাট কিংবা নিজের বাড়ি করতে পারেননি। ৪৮. রামযতনের বাগান - মানুষ এর জীবনে এমন কিছু সময় বা পরিস্থিতি আসে সেখানে তার নিজের নীতি আদর্শ কে ভুলে গিয়ে, যেটা অনৈতিক যা অসৎ সেটাকেই বেঁচে নিতে হয়। একসময় কমিউনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ডাবু দা নিজের বৌ এর স্কুল এর চাকরি তার জন্য কী ঘুষ দেবে? একজন সত্যি পদপ্রার্থীকে সরিয়ে নিজের বৌ এর চাকরি তা করবে। ৫০. ডাকিনিতন্ত্র - সরসিজ পান্ডা ফিজিক্স এম.এসসি, স্কুল সার্ভিস পরীক্ষা দিয়ে, স্কুল মাস্টার এর চাকরি পায় লোধাশুলির এক স্কুলে। স্কুল এর ডি গ্রেড স্টাফ সোনারাম মুর্মু, তার গ্রাম এর বাড়িতে তার নিজের বৌদিকে ঘোষণা করা হয় ডাইনি। ৫০০০ টাকা জরিমানা ধার্য হয়।
পাঠ প্রতিক্রিয়া - প্রত্যেকটি গল্প এক একটা আলাদা স্বাদ এর, একঘেয়েমি আসবে না। এখানে যেমন প্রত্যন্ত গ্রাম বাংলার সাধারণ খেটে খাওয়া গরিব গ্রামবাসীদের গল্প বলা হয়েছে তেমন ই কলকাতায ফ্ল্যাট বাসি সরকারি কর্মচারী জীবন এর কথাও বলা হয়েছে। আমাদের জীবন এ যন্ত্রের প্রভাব কতখানি সেটাও অনেকগুলি গল্পে আলোচনা করা হয়েছে। ঝাড়খন্ড এর বর্ডার সংলগ্ন গ্রাম গুলির খুব সুন্দর বিবরণ পাওয়া যায় অনেকগুলো গল্পে, লেখক এর এই সব গ্রাম গুলোর যে নিজস্ব ভাষা তার উপর খুব ভালো দখল আছে সেটা পরিচয় পাওয়া যায়। উপরে লেখা গল্প গুলি ছাড়াও নুতুন রান্না, আর্সেনিক ভূমি, মানুষ ও বেগুন, দুলালচাঁদ এই গল্প গুলিও খুব ভালো লেগেছে।