একুশ শতকের শেষ প্রান্তে, যখন ৯০.৮ শতাংশ মানুষের জন্ম হয় মানব প্রজনন কারখানায়, যখন নারী পুরুষের প্রেমে পড়ে না, পুরুষ নারীর প্রেমে পড়ে না, যখন প্রেম, সখ্য, সংসর্গ হয় পুরুষে-পুরুষে আর নারীতে-নারীতে, এটা সেই সময়ের গল্প। এ গল্পে আছেন সুগত মণ্ডল নামে এক প্রাচীনপন্থী সমাজবিজ্ঞানী, যিনি বলতে চান মানুষের জন্মক্ষেত্র হিসেবে কারখানা অপেক্ষা নারীগর্ভ উত্তম; যিনি গবেষণা করে দেখিয়েছেন গর্ভজাত নারীপুরুষেরা কারখানাজাতদের চেয়ে উৎকৃষ্ট। এই তত্ত্ব প্রচারের জন্য তার বিরুদ্ধে শুরু হয় বিক্ষোভ-প্রতিবাদ, তাকে হত্যা করার জন্য পাঠানাে হয় কিলার রােবট। আরাে আছে বায়ােকেমিক্যাল চিপের এক কম্পিউটার, যে নিজেকে মহামতি সক্রেটিসের মতাে। প্রজ্ঞাবান বলে দাবি করে এবং মানুষের কাছে মানুষের মতাে সম্মান চায়। এই কাহিনির কেন্দ্রবিন্দুতে আছে তমাল নামের এক কারখানাজাত যুবক আর শীলা নামের এক গর্ভজাত যুবতী। একজন সমকামী পুরুষ, অন্যজন সমকামী নারী। কিন্তু দৈবক্রমে তমাল শীলার প্রেমে পড়ে যায়। শীলা তমালের প্রেমকে নিষিদ্ধ, অস্বাভাবিক, পাগলামীপূর্ণ বলে প্রত্যাখ্যান করতে চায় কিন্তু পারে না। তার অজান্তে তমাল তার হৃদয় হরণ করে। লেসবিয়ান প্রবণতা লুপ্ত হয় শীলার। তার স্বপ্নে হানা দেয় পুরুষ। স্বপ্নের মধ্যে সে ছুটে যায় তমালের কাছে। কিন্তু এমন নিষিদ্ধ সম্পর্ক কি এরকম সমাজে সহজে স্থাপিত হতে পারে? শুরু হয় অসহ্য টানাপড়েন।
Mashiul Alam was born in northern Bangladesh in 1966. He graduated in journalism from the Peoples’ Friendship University of Russia in Moscow in 1993. He works at Prothom Alo, the leading Bengali daily in Bangladesh. He is the author of a dozen books including Second Night with Tanushree (a novel), Ghora Masud (a novella), Mangsher Karbar (The Meat Market, short stories), and Pakistan (short stories).
এই মানুষটা একটা জেম। বইটার শুরুর চ্যাপ্টারগুলোর কথোপকথন অধিকাংশই ইংরেজির বাংলা টান্সলিটারেশন হলেও পড়তে মন্দ লাগছিল না। একই কাজ অন্য কোনো লেখক করলে হয়তো ঘোর আপত্তি করতাম, কিন্তু কেন জানি এটাতে সমালোচনা করতে পারছি না। এডাল্ট সাই ফাই এটা। এমন সময়ের পৃথিবী যখন হোমোসেক্সুয়ালিটিই মেজরিটি, হেটারোরা মাইনো। হেটারোদের কীর্তিকলাপ বরং ঘৃণার চোখে দেখা হয়।
গল্পটা দুই নারী পুরুষকে নিয়ে৷ যারা আলাদা আলাদা ভাবে গে এবং লেসবিয়ান হলেও আদতে হোমোকনফিউজড এক জোড়া। অস্থির পৃথিবীতে ফ্যাক্টরিবর্ন আর গর্ভবর্ন দের মাঝে ধিকিধিকি জ্বলতে থাকা বৈষম্য ঠিকই দেশব্যাপী দাবানল হয়ে ছড়িয়ে পরে। মানসিক ভারসাম্যহীন হোমোকনফিউজড পুরুষ, হেটারোসেক্সুয়ালিটি আবিষ্কার করা এক তরুণী আর অদ্ভুত দার্শনিক বায়োকেমিক্যাল চিপের কম্পিউটারের গল্পে আপনাকে স্বাগতম।
বই : লাভ স্টোরি ২০৯৯ (ডিসটোপিয়ান সাইফাই রোমান্স, সায়েন্স ফিকশন, মানসিক ভাবে পরিপক্বদের জন্য) লেখক : মশিউল আলম প্রকাশনী : পাঞ্জেরী পাবলিকেশন লি.
কর্পোরেট যুগে একচেটিয়াভাবে নিয়ন্ত্রিত বৈজ্ঞানিক গবেষণার ওপর ভিত্তি করে, অসামাজিক ও অসুস্থ কর্মকাণ্ডগুলোকে স্বাভাবিক করে তুললেও বা নিয়মমাফিক করে ফেললেও, প্রকৃত সহজাত প্রবৃত্তি এবং ন্যায়স্বভাব মানবচিত্তের কোথাও-না-কোথাও অবগাহিত থাকবেই। একুশ শতকের শেষ প্রান্তে এসে যখন নব্বই শতাংশেরও বেশি মানুষের জন্ম হয় মানব প্রজনন কারখানায়, এবং নারী-পুরুষের প্রেম হয়ে পড়েছে বিরল ঘটনা, এই অদ্ভুত কিন্তু বুদ্ধিদীপ্ত জগৎ নির্মাণ করেছেন মশিউল আলম ওনার 'লাভ স্টোরি ২০৯৯' উপন্যাসে। গল্পের প্রেক্ষাপটে হোমোসে*ক্সুয়ালিটি হয়ে উঠেছে সংখ্যাগরিষ্ঠের পরিচয়, আর হেটারোসে*ক্সুয়ালিটি সংখ্যালঘুর। এই বিপরীত পৃথিবীর গল্পটা তমাল ও শীলা এই দুটো প্রধান চরিত্রের মধ্য দিয়ে বলা হয়েছে, যারা দুজন আলাদাভাবে সম*কামী হলেও একসময় পরস্পরের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। সহজ-সরল গদ্যে লেখা এই কাহিনিটা নিছক কল্পকাহিনি নয়, একটা কল্পিত আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতায় আন্তঃমানবিকের নানা দিক উঠে এসেছে যুক্তির সিঁড়ি বেয়ে। উপন্যাসে কারখানাজাত ও গর্ভজাত মানুষের মধ্যে সামাজিক বৈষম্যের যে রূপক, সেটা ভাবনার খোরাক জোগানোর পাশাপাশি মুগ্ধ করার মতোও। বায়োকেমিক্যাল চিপের কম্পিউটার, যে নিজেকে সক্রেটিসের মতো প্রজ্ঞাবান বলে দাবি করে এবং মানুষের কাছে মানুষের মতো মর্যাদা চায়, এই চরিত্রটাকে উপন্যাসের অন্যতম আকর্ষণীয় উপাদান বলা যায়।
বাস্তবসম্মত করে তোলার জন্য বইটার শুরুর অধ্যায়গুলোতে বাংলিশ কথাবার্তা বেশি ব্যবহার করা হয়েছে — যেমন 'হো আর ইউ' ধরনের বাংলিশ। এখনকার সমাজে নিজেকে চটপটে ও আধুনিক পরিচয় দিতে ইংরেজি ভাষাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করার চল দিন দিন বাড়ছে। এই সম্ভাবনাটাকে কেন্দ্রে রেখে ২০৯৯ সালের যুগটাকে আধুনিক অনুভব করানোর জন্য লেখক বাংলিশ ভাষার আশ্রয় নিয়েছে। (আগেকার মানুষের মধ্যে ইংরেজি ভাষার গর্বটা দেখেছি শুধুমাত্র দক্ষতার ভিত্তিতে, কিন্তু বর্তমানে ইংরেজি ভাষা ব্যবহারের গর্বটা যেন ক্রমশ অহংকারে রূপ নিচ্ছে। ভাবলে মাইকেল মধুসূদন দত্তের 'বঙ্গভাষা' কবিতার কথা মনে পড়ে। নিজের ভাষার ভিত মজবুত না করে অন্য ভাষা শেখার চেষ্টা নিষ্ফল — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।)
অনেক গল্প-উপন্যাসে প্রাপ্তবয়স্ক ভাষার ব্যবহার থাকে মূলত পাঠকের মনে কামনা জাগিয়ে টেনে রাখার উদ্দেশ্যে। তবে 'লাভ স্টোরি ২০৯৯'-এ প্রতিটা এমন শব্দ ও বাক্য ঘটনার প্রয়োজনে সভ্য ও পরিশীলিতভাবে ব্যবহার করেছে, যা পাঠকে বিব্রত নয় বরং ভাবিত করে।
সামগ্রিকভাবে বলতে গেলে, বাংলা সাহিত্যে এই ধরনের ডিস্টোপিয়ান বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি বিরল, এবং সেই বিচারে মশিউল আলমের এই প্রচেষ্টা সাহসী ও ব্যতিক্রমী। যৌ*নতার রাজনীতি, প্রযুক্তিনির্ভর মানব প্রজনন এবং শ্রেণিবৈষম্যকে একসূত্রে গেঁথে যে গল্প তিনি লিখেছেন, তা ভাবনার উপকরণ হিসেবে যথেষ্ট সমৃদ্ধ। ২০১৩ সালে এমন একটা উপন্যাস ভাবনার জায়গায় আনাটাই প্রশংসনীয়। সত্যি বলতে, উপন্যাসের ঘটনাগুলো খুব চমকপ্রদ নয়, কিন্তু গুছিয়ে লেখার দক্ষতা আর ব্যতিক্রমধর্মী বিষয়বস্তুর কারণে পড়তে বসলে উঠতে মন চায় না।
📌 মশিউল আলমের লেখা সর্বপ্রথম যে বইটা পড়েছিলাম, সেটা হলো 'প্রিসিলা'। বর্তমানে বেশিরভাগ লেখক পুরোনো বিষয়বস্তুর ওপর ভর করে ভেতরের ঘটনাগুলো বদলে দিয়ে উপন্যাস বা গল্পে অভিনবত্ব ফোটায়। তবে 'প্রিসিলা' বইটার বিষয়বস্তুই সম্পূর্ণ অভিনব, ধারণাটা কেমন উদ্ভট ধরনের! কিন্তু সাহিত্যের শৈল্পিক পরিসরে উদ্ভট ব্যাপারটাই আবেগের জায়গা করে নিয়েছে। আমি বলবো 'লাভ স্টোরি ২০৯৯' পড়া শেষ করে তারপর 'প্রিসিলা' পড়লে আনন্দটা বেশি মিলবে। 'প্রিসিলা' বইটা তুলনামূলক আরো ভালো।