Mir Abdus Shukur Al Mahmud (best known as Al Mahmud) was a Bangladeshi poet, novelist, and short-story writer. He was considered one of the greatest Bengali poets to have emerged in the 20th century. His work in Bengali poetry is dominated by his frequent use of regional dialects. In the 1950s he was among those Bengali poets who were outspoken in their writing on such subjects as the events of the Bengali Language Movement, nationalism, political and economical repression, and the struggle against the West Pakistani government.
Notable awards: Bangla Academy Award (1968) Ekushey Padak (1987)
"কবিতা তো ছেচল্লিশে বেড়ে ওঠা অসুখী কিশোর ইস্কুল পালানো সভা, স্বাধীনতা, মিছিল, নিশান" - কবিতা এমন, আল মাহমুদ
এই অসুখী কিশোরটার ব্যাপারে আমার আগ্রহ ছিল এই কবিতা পড়ে। এতোদিন পর তার সাথে সত্যিকারের আলাপ হল। ইসলাম প্রচারক একটা দলের সাথে আনুমানিক ১৫০০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে আল মাহমুদের পূর্ব পুরুষগণ বাংলাদেশের ভাটি অঞ্চলে প্রবেশ করেন আর তার অনেক অনেক পরে প্রতিপিতামহ মুনশী নোয়াব আলী ব্রাক্ষণবাড়িয়ার পরিবারটির গোড়াপত্তন করেন। কাহিনী মোটামুটি এখন থেকেই শুরু। শুরু দিকে দেখতে পাই আল মাহমুদের ছোটবেলার দিনগুলো, নানা-নানী, দাদা-দাদীর স্নেহের ছায়া। বেশি বেশি করে কবি বলেছেন দাদীর কথা আর এটাই দাবী করেন যে দাদীর মৃত্যুর পরই যেন শৈশবের খোলস ফেটে একদিন কৈশোরে প্রবেশ করেছিলেন। আছে মহরমের উৎসব, কিরিচ খেলার কথা, আছে দাদার সাথে লাঠি খেলার স্মৃতি। বাড়ির পরিবেশে বেশ ইসলামিক অনুশাসন চললেও আল মাহমুদের বাবা ছিলেন গান ভক্ত মানুষ। বাবার সাথে সেই শৈশবে আলাউদ্দীন খাঁ'র সরোদও শুনেছিলেন ছোট্ট আল মাহমুদ।
স্কুল জীবনের গল্প শুরু হলে দেখতে পাই, স্কুলে হিন্দু-মুসলিম ছাত্রদের মধ্যে খুব একটা যে মিতালি ছিল তা বলা যায় না, তবে এই বৈরী পরিবেশেও রহমত নামের একটা বন্ধু জুটে যায়। আর আরেকটা বন্ধু মেলে - বই। বয়োসন্ধির অস্থিরতা আর বাচালতার পরিবর্তে তিনি হয়ে উঠতে থাকলেন আরও বেশি গম্ভীর, আর ভীষণ রকমের পড়ুয়া। ততোদিনে শুরু হয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ- স্কুলে ঠিক মত ক্লাস হত না, সীমাহীন স্বাধীনতা। "চাঁদের পাহাড়" আর মার্কো পোলোর ভ্রমণ কাহিনী পড়ে সময় কাটানোর এই দিনগুলোর বর্ণনার মধ্যেই আরও নরম, কোমল ভাবে উঠে আসেন সাদু বুবু। এসেছে নূর আলী দরবেশের কথা। তবে নূর আলী দরবেশ শেষ যেদিন বসন্ত মহামারী নিয়ে বাড়ি এসেছিলেন সে দৃশ্যের বর্ণনা এতো করুন!
লালমোহন পাঠাগারের মধ্যে দিয়ে মার্কসীয় ধারার দিকে কিছুটা ঝুকে পড়া, খানিকটা রাজনৈতিক সচেতনতা হয়ত সে সময়ই তৈরী হচ্ছিল। অবশ্য এ কথাও স্বীকার করে নিয়েছেন যে পরবর্তী জীবনে হয়ত সে সময়ের আদর্শের একেবারে বিপরীতে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। আর একদিন "ঠান্ডা রক্তের কবি হয় নাকি?" এই প্রশ্নের জবাবে বন্ধু শিশির দিয়েছিল তাঁকে জীবনানন্দের সন্ধান। আর এখান থেকেই এই বইয়ের বেশ খানিকটা জুড়ে দেখি আল মাহমুদের কবি হয়ে ওঠার দিনগুলো। কী যে অসাধারণ ভাবে ভেঙ্গে ভেঙ্গে বলেছেন! অংককে ভয় পেতেন কিন্তু এখানেও যে অংক! আমি নিশ্চিত যারা কবিতা লেখেন এই অংশগুলোর সাথে নিজেদের খুব ভালো রিলেট করতে পারবেন।
একদিন কলকাতা পালিয়ে গেলেন দুই চোরাচালানির সাথে। পৌঁছে যেন ভয়ে আর আনন্দে বুকটা লাফাচ্ছে। লিখেছেনঃ "বইয়ের গায়ে প্রকাশকের যে ঠিকানা থাকতো ঝামাপুকুর লেন, ভাবলাম কোথায় সে ঝামাপুকুর লেনের দেব সাহিত্যকুটির? আমি কি যেতে পারব সেখানে?" দিন দশেক পরে কলকাতা থেকে ফিরে বকা-ঝকা বেশি খেতে হয়নি কিন্তু চাচা-চাচীর সাথে পাঠিয়ে দেয়া হল চাচার কর্মস্থলে। সেখানেও নানান অভিজ্ঞতা। চাচীর কাছেই একদিন প্রথম জেনেছিলেন, তাঁর সব সম্পর্কই আন্তরিকতাহীন, অগভীর, তাঁর নেই কোন মাতৃঋণ। এই কথার অর্থ বুঝতে পারার মত বয়স হয়ত তখনও হয়নি তবু খুব আলোড়ন তুলেছিল এই কথা গুলো সে কথা বাকি বইতে বলেছেন একাধিকবার। আবার কিছুদিন ফুপা-ফুফুর কাছে চা বাগানে, সেখান থেকে আবার চাচা-চাচীর কাছে সীতাকুন্ঠে।
আর এই বইয়ের শেষ দৃশ্যের পর্দা পড়ল এখানেইঃ "ঢাকাগামী মেল ট্রেনটা তখন আউটার সিগন্যালের কাছে সিটি দিচ্ছে। যে ট্রেন আমাকে আত্মীয়তা ও মানুষের প্রতি নির্ভরতার শেষ স্টেশন থেকে চিরকালের জন্য তুলে নিয়ে নিরুদ্দেশের দিকে পাড়ি জমালো।"
আল মাহমুদের কবিতা তো সব সময়ই প্রিয়, এই বইটাও অনেকদিন থেকে উইশলিস্টে ছিল। এই বইটা খুব কড়া ভাবে ক্রিটিক করার মত কোন জায়গায় রাখেনা কারন এতোটা মায়া মায়া করে লেখা আর এতটা কোমল এর বর্ণনা। আল মাহমুদের কবিতা পছন্দ হলে তো এই বই ভালো লাগবে, যাদের কবিতার সাথে দূর-দূরান্তে কোন সম্পর্ক নেই, তাদেরও কোনভাবে খারাপ লাগার কথা নয়!
দারুণ এক আত্মজীবনী! লেখকের দুর্দান্ত লেখনশৈলীতে চোখের সামনে ভেসে উঠেছে তার শৈশব, কৈশরের সকল দুরন্তপনা, কবি হওয়ার পথে যাত্রা, প্রেম, উন্মাদনা, নিঃসঙ্গতা, যাযাবরের মত জীবনযাপন। মনে দাগ কেটে যাওয়ার মত একটা বই।
বড় লেখকদের এই এক গুণ, তাঁরা অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য ভঙিতে মিথ্যা কথা লিখতে পারেন৷ পাঠকের সে সাধ্যি নেই কোনটা সত্য আর কোনটা আদৌ ঘটেইনি তা খুঁজে বের করে। মীর আবদুশ শাকুর আল মাহমুদের আত্মজৈবনিক উপন্যাস 'যেভাবে বেড়ে উঠি' পড়ে আমার এখন সেই পর্ব চলছে। বাস্তবতা এবং সাহিত্যের ফারাক এখনো ধরতে পারিনি৷ বিস্ময়বোধটা কাটেনি।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মোড়াইলের সম্ভ্রান্ত মোল্লাবাড়ির সন্তান আল মাহমুদ। ক্ষয়িষ্ণু এক মুসলমান পরিবারে নিজের বেড়ে ওঠার আখ্যান এই উপন্যাস।জীবনপথের শুরু থেকেই বিচিত্র পথের পথিকের নাম আল মাহমুদ।
শৈশবের স্মৃতি নয়। কৈশোরের দুরন্তপনাও নয়। এই উপন্যাসের আলোকোজ্জ্বল দিকটি সম্ভবত আল মাহমুদের ব্যক্তিগত জীবনের অনালোকিত অঞ্চল। যেখানে খুব করে আছেন স্কুল ফাঁকি দেওয়া মাহমুদ। পড়াশোনা শিকোয় তুলে গল্পের বইয়ের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকা মাহমুদ। বইয়ের সন্ধানে এক গড়ে ওঠা এক সম্পর্ক কথা দীর্ঘদিন মনে রাখব। আল মাহমুদ নিজে কখনো ভুলতে পারেন নি শোভাকে। কাকে বেশি ভালো লেগেছে? আল মাহমুদকে নাকী তাঁরই সখা শোভাকে? না, শোভাকে ভুলতে পারব না। সত্যাসত্য জানিনা। আল মাহমুদের সৃষ্ট চরিত্র হলেও বিস্মৃত হতে চাইনে শোভাকে।
নূর আলী ফকির। যিনি খোদার ভয়ে গাছ হয়ে যেতে চাইতেন - তাঁকেও পাঠকের মনে গেঁথে দিতে চেয়েছেন কবি। অত্যন্ত সফল। প্রতিটি মুক্তপ্রাণ মানুষের মাঝেই হয়তো নূর আলী লুকিয়ে আছেন। ঠিক সেখানটাতেই কালির দাগ এঁকেছেন আল মাহমুদ। তাইতো এতটা সজীব, কাছেরজন মনে হচ্ছিল নূর আলী ফকিরকে।
বিশাখা, রাফিনা-এঁরা কী কলমসৃষ্ট মানবী? নাকী মৃন্ময়ী? নাহ, বাস্তব আর ফিকশন বড্ড এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে।
আল মাহমুদ চমৎকার গদ্য লিখেন৷ খুবই হৃদয়স্পর্শী। যেন দু'নয়ন মেলে অপলক দেখছি কবির অতীত। নিষ্পলক দৃষ্টিতে বায়োস্কোপের নেশার মতো জমে উঠেছে আল মাহমুদের 'বেড়ে ওঠা'। তাতে লীন হয়েছেন মানুষ আল মাহমুদ, কবি আল মাহমুদ, চোখের আড়াল হলেই আপনজনকে বিস্মরণ হওয়ার অদ্ভুত ক্ষমতাসম্পন্ন আল মাহমুদ কিংবা উপন্যাসের জগতের এক চরিত্র আল মাহমুদ।
আর্ট আর ক্রাফট একে অপরের শত্রু। গতদিন যাযাবর এর লেখায় পড়ছিলাম, একজন ব্রহ্মা তো আরেকজন বিশ্বকর্মা। আল মাহমুদ আর হিন্দি সিনেমার কবি জাভেদ আখতার, দুইজনেই বলছেন ক্রাফট শেখার গুরুত্বের কথা। ঐ খানেই হয়ত কবির সাথে শ্রমিকের মিল।
পাঠ্য বইয়ে থাকা কয়েকটা কবিতা ছাড়া আর কোন ভাবেই আল মাহমুদের সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়নি। পরিচয় টা তীব্র না হলেও,নামটা তো চেনা ছিল,ফলে কয়েকটা কবিতার বই আর উপন্যাস আমি সংগ্রহ করে রেখেছিলাম;তাতে হাত দেয়া টা হয়নি। সেদিন বইয়ের দোকানে দেখলাম "যেভাবে বেড়ে উঠি" একটু উঁকি দিচ্ছে,নামটা পছন্দ হওয়ার দরুন, তার লজ্জা ভেঙে টেনে নিলাম। তারপর বাসায় আনলাম,কিছুদিনের মধ্যে পড়েও ফেললাম।
যেভাবে বেড়ে উঠি,লেখকের শৈশব থেকে কৈশোর/যৌবন অব্দি বেড়ে ওঠার গল্প আমাদের শুনিয়েছেন। নামজাদা বংশে লেখকের জন্ম। ফুলের মত চমৎকার একটা শৈশব ছিল লেখকের। তারপর নানান কারণে পরিবারে ভাঙন,ফলে সোনার শৈশব হয়ে গেল মাটি কৈশোর বা যৌবনে গিয়ে। কত গল্প; কখনো ভাঙার, কখনো বা গড়ার।
লেখার ধার কেমন হবে সেটা লেখকের উপর নির্ভর করে পুরোপুরি। আল মাহমুদ শব্দ ব্যবহারে খুবই চৌকস। লেখক অবশ্য সেটা নিজেও স্বীকার করেছে যে, কবিরা শব্দের গোপন জানে,শব্দের মর্মে পৌঁছাতে পারে। আল মাহমুদের গদ্য পড়তে গিয়ে,আমার মনে হয়েছে কথাটা ঠিক, কবিরা আসলেই শব্দের নাড়ি নক্ষত্র সবচে ভালো জানে,যেমন মা জানে তার বাচ্চার অনুচ্চারিত, অব্যক্ত কথার মানে। একে লেখকের শৈশবের গল্প চমৎকার,তার উপর লেখকের মুনশিয়ানায় সেটা আরো অসাধারণ হয়ে গিয়েছে।
তবে কয়েকটা জিনিস আমার খুব চোখে লেগেছে, যেমন একটা জায়গায় লেখক তার বোনের মেধার পরিচয় দিতে গিয়ে বলছেন, " তার মেধা ছিল ছেলে মানুষের মতই উদ্ভাবনাময় "। তাছাড়া আরো কিছু জিনিস জেনে আমার মনে হয়েছে, লেখক "সেকেলে" চিন্তা বহন করতেন আর ভীষণ রক্ষণশীল ছিলেন। যেটা বোধ হয় কবি মানসে বেমানান। কি জানি,হয়ত আমার চিন্তার ভুল। তা যাই হোক,বইটা সুখ পাঠ্য।
চমৎকার। হামবড়াই নেই, নিজেকে জোর করে নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা নেই। চল্লিশ, পঞ্চাশ দশকের গ্রামবাংলা আর মফস্বলের চিত্র এঁকেছেন নিপুণ হাতে। কবি হয়ে ওঠার প্রস্তুতি-পর্বটাও জানা হয়ে গেল।
এই বইটা পড়তে গিয়ে আমার মন খারাপ হয়েছে অনেকবার। ছোট্ট একটা বই, তবু অনেকটা সময় নিয়ে পড়তে হলো তাই। কোন এক বিচিত্র কারণে আল মাহমুদের আত্মজৈবনিক এই বইটা আমাকে দিয়েছে একটা উত্তম উপন্যাসের স্বাদ। মনোলগের মধ্যে তো চিরকালই এক অদ্ভুত মাদকতা আছে, আর সেই মাদকতার সাথে যদি যোগ দেয় অপূর্ব সুন্দর বর্ণনা, নৈসর্গিক ভাষা তাহলে মনে হয় এ এক স্বর্গীয় পাঠ। চরের পাশে নৌকায় রাত্রি যাপন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় স্কুল পালানো, সাদু বুবুর বিয়ে, নূর আলীর মৃত্যু যেন আমার মন'কে দখল করে নিয়েছে চিরস্থায়ীভাবে। এই বইয়ের প্রতিটা বাক্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে বিষাদ, যে বিষাদের সামনে দাঁড়ালে অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ সব ম্লান হয়ে যায়... মনে হয় দূরে, বহুদূর থেকে ভেসে আসছে কুহেলীর ডাক।
"যেভাবে বেড়ে উঠি" কবি আল মাহমুদের আত্মজীবনীমূলক একটি অনন্য সাহিত্যকর্ম, যেখানে তার শৈশব, কৈশোর এবং কবি হয়ে ওঠার সংগ্রাম ও অনুভূতিগুলি গভীরভাবে চিত্রিত হয়েছে। বইটিতে কবি গ্রামীণ জীবনের সরলতা এবং শহরের জটিলতার মধ্যে বেড়ে ওঠার গল্প বর্ণনা করেছেন। গ্রামীণ পরিবেশের বৈশিষ্ট্যগুলো, যেমন তিত ফুলের গন্ধ, সরষে ফুল, এবং চা-বাগানের স্মৃতি, পাঠককে নিয়ে যায় কবির শৈশবের দিনগুলোর সজীব চিত্রে।
এই বইয়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল বাস্তবতা ও কল্পনার মিশ্রণ। কবি তার পরিবারের সদস্যদের জীবনধারা এবং সামাজিক ব্যবস্থার টানাপোড়েনকে অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সঙ্গে তুলে ধরেছেন। বিশেষ করে তার চাচীর চরিত্রটি গ্রামীণ সহজ সরল জীবনের প্রতিচ্ছবি হিসেবে উঠে এসেছে, যেখানে গ্রাম্য বিচার-সালিশী এবং হাঁস-মুরগি পালনের গল্প ফুটে উঠেছে। অন্যদিকে, শহরের জীবন, ব্যবসা-বাণিজ্যের জটিলতা এবং আধুনিকতার প্রতি আগ্রহও সমানভাবে প্রকাশ পায়।
বইটি কবির মানসিক উত্থান, প্রেম, নিঃসঙ্গতা, এবং যাযাবরের মতো জীবনযাপনের উন্মাদনাকে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত করে, যা পাঠকের মনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে। আল মাহমুদের লেখনশৈলীর সহজ-সরলতা এবং গভীরতা বইটিকে একটি মূল্যবান আত্মজীবনী হিসেবে তুলে ধরেছে।
পড়ে শেষ করলাম আল মাহমুদ‘র আত্মজীবনী মুলক উপন্যাস ৷‘যেভাবে বেড়ে উঠি ’৷
কবিদের ভাষা নাকি সর্বাধিক সরস ৷ যত রকমের রচনা হতে পারে সেখানে কবিদের রচনা মাত্র রসে ভরা, যা বলা বাহুল্য ৷ আর সে বিচারে ব্যক্তি আল মাহমুদ কবিতায়ও যিনি পুর্ণতার দাবি রাখেন তেমন অন্যান্য রচনায়ও তা ফুটে উঠেছে চমৎকার ভাবে ৷ তার কবিতার ভাষা যেমন সুন্দর সরস আর ভাষা যাদুর পুর্ণ অবয়ব দৃশ্যমান, তেমই অন্যান্য রচনায়ও সেই ভাষা যাদুর এক নির্মল বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে ৷ যার পরিপুর্ণ উপযোগী এই বই ৷
সহজ সরল সুন্দর গদ্যে লেখা ৷ কোন ক্লান্তি ছাড়াই পাঠক এই বই পাঠে নিমগ্ন হতে পারবেন ৷ বইয়ে ফুটে উঠেছে লেখকের সময়কার বিভিন্ন দিক ৷ তার ব্যক্তিগত ৷ পারিবারিক ৷ সামাজিক ৷ এবং রাজনৈতিক ৷ পাশাপাশি সে সকল ক্ষেত্রে তার নিজস্ব কার্যক্রম এবং ব্যক্তিত্বের প্রয়োগ ও অন্যান্য বিষয়াসয় ৷
এক বইয়ে এক লেখকের জীবনি সমাপ্ত করা কঠিন ৷ তাই এটা লেখকের জীবনির অংশবিশেষ বলা যায় ৷ তার আরো এ জাতীয় আত্মজীবনী মুলক রচনা যার প্রতিটি একটা অপরটা ছাড়া লেখক সম্পর্কে পুর্ণ অবগতি অসম্ভব বলা যায় ৷
আত্মজীবনি লেখা সত্যিই কঠিন কাজ ৷ জীবনের ভালো মন্দ এক কথায় এপিঠ-ওপিঠ নির্দ্ধিধায় সবটা নিরঙ্কুশ ভাবে বলে যাওয়া ৷ তবুও তিনি নিঃসংকোচে বলে গিয়েছেন শুরু থেকে শেষ অবদি এমনটাই পাঠ থেকে অনুমান করা যায় ৷
বইটি নিয়ে করুণ অভিজ্ঞতার কথাটি এ পর্যায়ে বলি ৷ প্রথমে বইটি যেখানে দেখি, কেনার ইচ্ছে হয় ৷ কিন্তু পকেট সমর্থন না করায় প্রথমবারে কেনা সম্ভব হয়নি ৷ দ্বীতিয় বারে খোঁজ নিতে গিয়ে দেখলাম ফুরিয়ে গেছে ৷ উদাসচিত্তে ফিরে এসেছিলাম প্রথমবারের মতই ৷ তৃতীয়বারে মেলায় ১৬ ৷ প্রথমার স্টলে জিজ্ঞেস করলাম ৷ যেভাবে বেড়ে উঠি, আল মাহমুদ ৷ বইটা দিন ৷ লোকটা চেয়ে রইলো এক মিনিট ৷ না ভাই এ নামের কোন বই প্রথমা থেকে বের হয়নি ৷ আমি যেনো আসমান থেকে পড়লাম ৷
শেষমেশ বইটি আজিজ সুপারে প্রথমার দোকান থেকে গত বছর শেষের দিকে সংগ্রহ করা গেলো ৷
দ্রঃ পরীক্ষার কঠিন মুহুর্ত ঘনিয়ে এসেছে ৷ দরসি কিতাবাদি ছাড়া অন্য বই থেকে অনেক দিন দূরে থাকতে হবে ৷ ভেবে কষ্ট পাচ্ছি ৷ আবার সহজ সময় ফিরে আসুক ৷ বইয়ের পাতায় মুখ লুকিয়ে বাঁচতে চাই ৷
বইঃ যেভাবে বেড়ে উঠি ৷ লেখকঃ আল মাহমুদ ৷ প্রকাশনীঃ প্রথমা ৷ মূল্যঃ ৩০০ ৷
আল মাহমুদ লিখেছিলেন_ "কবিতা তো ছেচল্লিশে বেড়ে ওঠা অসুখী কিশোর ইস্কুল পালানো সভা, স্বাধীনতা, মিছিল, নিশান"
সেই কিশোরের শৈশব-কৈশোরের যাপিত জীবন নিয়ে লেখা "যেভাবে বেড়ে উঠি"। কেমন ছিল চল্লিশ, পঞ্চাশ দশকের বাংলার গ্রাম আর মফস্বল_সেখানকার প্রক��তি, সমাজ, সাহিত্য আর রাজনীতি ? লেখক তার একটি সুন্দর চিত্র একেছেন এই বইয়ের ক্যানভাস জুড়ে। কী সাবলীল লেখনী আর সুমিষ্ট গদ্য! পড়তে আরাম লাগে। কবি বলেই হইতো শব্দের এতো চমৎকার প্রয়োগ। আর যে মানুষ গুলো কে কেন্দ্র করে কবি জীবন এগিয়েছে তারাও ভীষণ আকর্ষনীয় ও রহস্যময়, যেন গল্প উপন্যাসের কোনো কল্পিত চরিত্র।
কবির কৈশোর একই সাথে দুরন্ত আবার ভীষণ নির্জন। পড়তে গিয়ে তাকে কিছুটা মার্ক টোয়েনের টম সয়্যার বা হাকেলবেরিফিন আর বাকিটা ক্যাচার ইন দ্য রাই এর হোল্ডন কলফিল্ড মনে হয়, এডভেঞ্চারাস আর প্রথা বিরোধী এক নওল কিশোর। খুব এক্সপেরিমেন্টাল একটা কৈশোর বলা চলে, কখনো সুফি ফকির সাধকদের সানিধ্য, কখনো আবার নাস্তিকতা আর বাম রাজনীতির সাথে সম্পৃক্তা। ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় হয়েছেন আবার পুলিশের ভয়ে কলকাতা পালিয়েছেন চোরা কারবারিদের সাথে। ফিরে এসে মোড়াইলের বাড়িতে আর থিতু হননি। শুরু হয় তার দাউদকান্দি, তেলিয়াপাড়া আর সীতাকুণ্ডের অস্থায়ী এলোমেলো বাস। তারপর আচমকা এক সকালে সব পিছুটান রেখে উঠে পড়েন এক অনিশ্চিত যাত্রার মেল ট্রেনে..এভাবেই শেষ হয় সেই কিশোরের "যেভাবে বেড়ে উঠি'র" আয়োজন।
আল-মাহমুদ -কবিতা এবং চেহারায় নরম সরম মানুষটির শৈশব আর কৈশোর যে টম সয়্যার আর হাকেলবেরিফিনের মতো এতো এ্যাডভেঞ্চারময় ছিল-তা এই বই না পড়লে জানা হতো না। আল-মাহমুদ যে স্মৃতি কথা লিখেছেন তাতে মনে হয়েছে তিনি মূলত এ্যাডভেঞ্চার প্রেমী ছিলেন। সেকারণে যখন যেটা সামনে এসেছে সেটাকেই পরখ করে দেখেছেন। তাই তাকে দেখা যায় কখনো সুফি ফকির সাধকদের সাথে শীতের রাতে মাঠে মাঠে ঘুরতে, কখনো নাস্তিক, বাম রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত, কখনো ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়, কখনো চোরা কারাবারিদের সাথে ভ্রমণ আবার কখনো মৌলবি, মক্তব আর মসজিদ। তবে পরিবারের কারণেই শৈশব থেকে ধর্মীয় শিক্ষার শিকড় তাকে বেশ ভালোভাবেই আঁকড়ে ছিল সেটা তার লেখা থেকেই বুঝা যায়। শেষ জীবনেও হয়তো সেটা প্রভাব রেখে গেছে। এই বইয়ে যে সময়ের কথা বলা হয়েছে সেটা তার স্কুল জীবনের কথা। এমন ভবঘুরে জীবন ছিল বলে এবং লেখাপড়ায় আগ্রহ ছিলনা বলে স্কুল জীবন সম্ভবত বিলম্বিত হয়েছে। সম্ভবত বলছি কারণ এতো দীর্ঘ সময়ের বর্ণনা কিন্তু ম্যাট্রিকুলেশন পাশের কথা আসেনি, বার বার স্কুলে ভর্তি হওয়ার কথা এসেছে। বই শেষও হয়েছে স্কুল জীবনেই-যখন তিনি ঘরবাড়ি আত্মীয়স্বজন ছেড়ে একেবারে বের হয়ে গেছেন ঢাকার উদ্দেশ্যে। এই সময়ের সবকটি পর্বে নারীদের বেশ সরব উপস্থিতি ছিল তার জীবনে। বন্ধুত্বপূর্ন, প্রেমময় উপস্থিতি। যদিও এইসব জায়গায় তার স্মৃতিচারণ খুব নিরপেক্ষ মনে হয়নি। মনে হয়েছে নিজেকে কিছুটা আড়াল করে লেখা। সে যাক, তিনি যতোটুকু জানাতে চেয়েছেন, ততটুকুও জানিয়েছেন। ভালো লেগেছে তার এ্যাডভেঞ্চারের কাহিনীতে তিনি নিজেকে হিরো হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাননি, বর্ণনা বা স্মৃতিচারণও ‘আমিময়’নয়, যদিও পুরো বইয়েই প্রবলভাবে ‘তিনি’ উপস্থিত।