প্রায় ২৩ শ' বছর আগে লেখা চাণক্য ওরফে কৌটিল্যের 'অর্থশাস্ত্র' গ্রন্থটির অনুবাদ করেছেন মানিক মোহাম্মদ রাজ্জাক। তিনি কৌটিল্য সম্পর্কিত বেশকিছু বইকে প্রামাণ্য ধরে তাঁর গ্রন্থটি অনুবাদ করেন। অনুবাদ মোটামুটি পাঠযোগ্য।
চাণক্য পন্ডিত রচিত এই মূল্যবান গ্রন্থটির নাম কেন 'অর্থশাস্ত্র' তার ভাবছিলাম। প্রায় আড়াই হাজার বছর আগের এই বইকে সেই সময় তো বটেই আজকের যুগেও অনেকক্ষেত্রেই যথেষ্ট আধুনিক মনে হচ্ছিল। অর্থশাস্ত্র নামটি অত্যন্ত ভুল! কৌটিল্য তাঁর বইতে কী নিয়ে আলোচনা করেন নি তাই বলা মুশকিল। সামাজিক রীতিনীতি, ব্যবসায়-বাণিজ্য, পারিবারিক জীবনযাপন, ধর্মশিক্ষা, দর্শন, নৈতিকতা,বিদ্যার্জন,বিভিন্ন অপরাধের বিস্তারিত বর্ণনা এবং এর শাস্তি, সরকারি বিভাগ, দুর্নীতি, দুর্নীতি কীভাবে করা হয়, কারা করে, চিকিৎসাবিদ্যা, তন্ত্রমন্ত্র ইত্যাদি।কৌটিল্য তাঁর গ্রন্থে সবচেয়ে বেশি আলোচনা করেছেন অর্থনীতি নিয়ে নয় ; রাজার রাজ্যশাসনের প্রকৃতি নিয়ে। কৌটিল্য রাজাকে বিশদ উপদেশ দিয়েছেন শত্রুকে শায়েস্তা করবার উপায় নিয়ে। এইক্ষেত্রে তিনি রীতির ধার ধারেন নি।
একটি দেশ এবং দেশের জনগণ কেমন তা ঐ রাষ্ট্রের প্রণীত আইনকানুন থেকে জানা যায়। 'অর্থশাস্ত্র' পড়তে গিয়ে একটা সম্যক ধারণা পেলাম মৌর্য সাম্রাজ্য নিয়ে৷
আপনার, আমার ধারণা যতদিন যাচ্ছে মানুষ সম্ভবত ততই হিংস্র আর নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। হচ্ছে অপরাধপ্রবণ। কথাটা হয়তো পুরোটা সত্য না। 'অর্থশাস্ত্র' পড়ুন। দেখবেন এই বইতে কতশত অপরাধের শাস্তির কথা লেখা আছে৷ তারমানে এই অপরাধগুলো তৎকালীন সমাজেও ছিল। যুগের পরিবর্তনে অপরাধমনস্কতা হয়তো কিছুটা আধুনিক হয়েছে। কিন্তু অপরাধ ঘুরেফিরে সেগুলোই। যা আজ থেকে ২৩ শ' বছর আগে কৌটিল্যের সমাজে ছিল।
কিছু কিছু মজার আইন ছিল। যেমনঃ সন্ধ্যার পর নিজের বাড়ির দেওয়ালে উঠলে ৫০ পণ (তৎকালীন মুদ্রা) জরিমানা।
চরম বর্ণবাদী সমাজ ছিল। যেমনঃ ব্রাহ্মণ নারীকে ধর্ষণ করলে একরকম জরিমানা, আবার শুদ্র কিংবা চন্ডাল রমণীকে নির্যাতনের শাস্তি অনেক কম। ব্রাহ্মণকে নীচুজাতের কেউ ছুঁয়ে দিলে, ব্রাহ্মণের শরীরের যে অঙ্গে স্পর্শ করেছেন,অব্রাহ্মণের সেই অঙ্গ কর্তন করা হবে। ব্রাহ্মণকে মৃত্যুদন্ড দেওয়া যাবে না।
সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য হলো প্রাচীন মৌর্য সাম্রাজ্যে সতীদাহ বাধ্যতামূলক ছিল না। তার প্রমাণ এই আইনটি,
' স্বামীর মৃত্যুর পর কোনো নারী যদি ধর্মীয় অনুশাসন মেনে বিধবার জীবনযাপনে আগ্রহী হয়, সেক্ষেত্রে তিনি স্বীয় ভূষণ এবং উপভোগের পর অবশিষ্ট যে সম্পদ থাকবে তার অধিকারী হবেন। '
যুগধর্ম বিচারে অত্যন্ত আধুনিক মনে হয়েছে যে রীতিগুলো - ১. পতিতাবৃত্তি নারীর পেশা হলেও কোনোভাবেই তাকে জোর করা যাবে না। এর অন্যথা হলে কঠোর শাস্তির বিধান চাণক্য রেখেছেন। 'No' means no - এর প্রবক্তা নারীবাদীরা নন, চাণক্য!
২. বাবা-মা জীবিত অবস্থায় তাদের ভরণপোষণের ভার সন্তানের। ব্যতয় হলে দন্ড বিধান।
৩. রমণীর পাত্রকে পছন্দ না হলে বিয়ে হবে না।
আরো একটা বিধির উল্লেখ কৌটিল্য করেছেন। তা হলো, মেয়েদের ১২ বছর এবং ছেলেদের ১৬ বছর হলো বিবাহের উপযুক্ত সময় ( আমার ২২ চলছে, কিন্তু বিয়ে হচ্ছে না। বি.দ্র.আমি কিন্তু তেতুল হুজুরের সমর্থক নই) ।
কৌটিল্য তাঁর গ্রন্থের সিংহভাগ অংশ খরচ করেছেন বিভিন্ন কূটবুদ্ধি দিয়ে। রাষ্ট্রশাসনে তিনি ক্ষমতা ধরা রাখাকেই মুখ্য মনে করতেন।তাই শত্রু, ভিন্নমত নিধনের জন্য যা যা করণীয় সবকিছুকেই হালাল বলে উল্লেখ করেছেন চাণক্য। মানুষের মনস্তত্ত্ব নিয়ে কৌটিল্যের বিশ্লেষণ অবাক করে দেওয়ার মতো৷ আধুনিক মনোবিজ্ঞান তার অনেককথাই এখন বলছে কিংবা স্বীকার করে নিচ্ছে!
খুবই সময়োপযোগী গ্রন্থ। আপনার রাষ্ট্রব্যবস্থার সরূপ এবং ক্ষমতার লালসা কতখানি উগ্র করতে পারে একজন শাসককে তা জানতেও বইটি পড়তে পারেন। 'অর্থশাস্ত্র' প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তির মহামূল্যবান গ্রন্থ। সাধু-অসাধু সকলের জন্য আকার-ইঙ্গিতে রয়েছে দিঙনির্দেশনা।
চাণক্য ,বিষ্ণুগুপ্ত বা কৌটিল্য ছিলেন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ চিত্তের,প্রজ্ঞায় অসাধারণ,দুঃসাহসিক মানসিকতাসম্পন্ন এবং একাধারে তিনি ছিলেন রাজনীতিবিদ,অর্থনীতিবিদ,স্থপতি,সমরবিদ,কূটনীতিক,জ্যোর্তিবিদ,বৈদিকশাস্ত্রে সুপণ্ডিত,গণিতজ্ঞ,ধার্মিক,চিকিৎসক,সমাজবিজ্ঞানী এবং দক্ষ প্রশাসক।কূটিলতা বা নেতিবাচক কলাকৌশলের ক্ষেত্র চাণক্য বা কৌটিল্যের নাম অহরহ ব্যবহার করা হয়ে থাকে।তাকে প্রাচ্যের ম্যাকিয়াভ্যালিও বলা হয়। বইটি ১৫টি অধিকরণ বা পুস্তক এবং ১৫০টি অধ্যায়ে বিন্যাসিত।এসমস্ত অধিকরণে রয়েছে ১৮০টি প্রকরণ বা বিষয়।শ্লোকের সংখ্যা প্রায় ছয় হাজার। অর্থশাস্ত্র নাম হলেও বইটিতে যুক্তিবিদ্যা,ত্রয়ী বা ধর্মবিদ্যা,বার্তা বা কৃষি উৎপাদন,বাণিজ্যবিষয়ক বিদ্যা,দণ্ডনীতি,রাজ্য পরিচালনার অনুশাসনিক বিদ্যা ইত্যাদি নানান বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে।যৌক্তিক শাসন ব্যবস্থার পাশাপাশি দুষ্টের দমনের ক্ষেত্রেও নানা নির্মম পথ দেখানো হয়েছে।নৈতিক মূল্যবোধের কথা আলোচিত হলেও শত্রু নিধনের বেলায় সব মূল্যবোধ,নৈতিকতা এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধ উপেক্ষা করতে বলা হয়েছে। কৌটিল্যের নির্দেশিত সমাজ ছিলো বর্ণভিত্তিক। প্রায় আড়াই হাজার বছর আগের উপমহাদেশের পারিবারিক,সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় জীবনধারা,আমলাতন্ত্র,বিচার ব্যবস্থা,রাজধর্ম ইত্যাদি বিষয়ের সাথে সাথে আমাদের আধুনিক সমাজের পার্থক্য সামঞ্জস্য দেখতে হলে অর্থশাস্ত্রের দিকে চোখ বুলানো যেতে পারে। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র বা স্বয়ং কৌটিল্য-কে নিয়ে অনেক বিতর্ক প্রচলিত আছে।অনেকে মনে করেন এই নামের কোনো ব্যক্তির কোনো অস্তিত্বই ছিলো না।কিন্তু বিভিন্ন প্রাচীন পুঁথি হতে এই গ্রন্থ সংকলিত হয়েছে সেখানে চাণক্য বা কৌটিল্যের কথা উদ্ধৃত আছে এবং সেভাবেই গ্রন্থটি আজও সকলের কাছে প্রাচীন গ্রন্থ বলে সমাদৃত হয়ে আসছে।