ASCHORYO MANUSH A COLLECTION OF BENGALI STORIES BY BINOD GHOSAL
প্রচ্ছদ - পার্থপ্রতিম দাস
এই সময়ের অন্যতম জনপ্রিয় কথা সাহিত্যিক বিনোদ ঘোষালের ছোটোগল্প মানেই নতুন কিছু পাওয়া। প্রথম থেকেই বিনোদ গল্প লেখায় অন্যপথে হেঁটেছেন। মধ্যবিত্ত থেকে সাবঅল্টার্ন জীবনের ভেতর খুব অনায়াসে ঢুকে পড়েন তিনি। মানুষের ধূসর চেহারাগুলোয় আলো ফেলে দেখিয়ে দেন এই যে আমি এমন। তার কাছে মানুষের থেকে আশ্চর্য এই পৃথিবীতে আর কিছু নেই। এই বইয়ের প্রতি গল্পেই নানা আঙ্গিকে মানুষের সেই আশ্চর্যময়তাকে খুঁজেছেন তিনি পরম মমতা নিয়ে। প্রিয় পাঠক, লেখকের সঙ্গে আপনিও আবিষ্কার করুন তাকে।
সূচি-
হুলো মাছি ড্রাকুলা চোর শিখার সঙ্গে একটা দুপুর দক্ষিণামিদম এসির দাম কত আজ শালুকের জন্মদিন অভিনয়ের পরে আলাদিনের প্রদীপ ও আশ্চর্য মানুষ নদীর মাঝখানে দুজন প্রভু জিশু ও ডায়মন্ড হারবার আশ্চর্য মানুষ
বিনোদ ঘোষাল-এর জন্ম ২৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৬ হুগলি জেলার কোন্নগরে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্যে স্নাতক। মফস্সলের মাঠঘাট, পুকুর জঙ্গল আর বন্ধুদের সঙ্গে বড় হয়ে ওঠা। ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকা আর অভিনয়ের দিকে ঝোঁক। গ্রুপ থিয়েটারের কর্মী হিসেবেও কাজ করেছেন দীর্ঘদিন। কর্মজীবন বিচিত্র। কখনও চায়ের গোডাউনের সুপারভাইজার, শিল্পপতির বাড়ির বাজারসরকার, কেয়ারটেকার বা বড়বাজারের গদিতে বসে হিসাবরক্ষক। কখনও প্রাইভেট টিউটর। বর্তমানে একটি সংবাদপত্রের সম্পাদকীয় বিভাগে কর্মরত। নিয়মিত লেখালেখি করেন বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়। ২০০৩ সালে দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর প্রথম গল্প। বৃহত্তর পাঠকের নজর কেড়েছিল। বাংলা ভাষায় প্রথম সাহিত্য অকাদেমি যুব পুরস্কার প্রাপক। ২০১৪ সালে পেয়েছেন পশ্চিমবঙ্গ বাংলা অকাদেমির সোমেন চন্দ স্মৃতি পুরস্কার। তাঁর একাধিক ছোটগল্পের নাট্যরূপ মঞ্চস্থ হয়েছে।
ছোটগল্প। সাহিত্য সলিলের এক অদ্ভুত ধারা, যেখানে গা না ভেজালে সাহিত্যিকের জাত চেনা যায় না। কিংবদন্তীসম সাহিত্যিক শ্রী রমাপদ চৌধুরী তাঁর ‘গল্প সমগ্র’র ভূমিকায় লিখেছেন, যুদ্ধের প্রতিটি খুঁটিনাটি বিবরণ লিখছেন ঔপন্যাসিক এবং যুদ্ধান্তে ফিরে আসছেন বিজয়ী সেনাবাহিনীর সঙ্গে। তিনি ছোটগল্প – লেখককে দেখতে পাবেন পথের ধারে, একটি গাছের ছায়ায় বসে আছেন উদাস দৃষ্টি মেলে; ‘এ কোন্ উন্নাসিক লেখক? –মনে মনে ভাববেন ঔপন্যাসিক। কোনো মিনারের চূড়ায় উঠল না, দেখল না যুদ্ধের ইতিবৃত্ত, শোভাযাত্রার সঙ্গ নিলো না, এ কেমনধারা সাহিত্যিক! ... ছোটগল্পের লেখক বলবেন হয়তো, না বন্ধু, এসব কিছুই আমি দেখিনি। কিছুই আমার দেখার নেই। শুধু একটি দৃশ্যই আমি দেখেছি। পথের ওপারের কোনো গবাক্ষের দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করবেন তিনি, সেখানে একটি নারীর শঙ্কাকাতর চোখ সমগ্র শোভাযাত্রা তন্ন তন্ন করে খুঁজে ব্যর্থ হয়েছে, চোখের কোণে যার হতাশার অশ্রুবিন্দু ফুটে উঠেছে – কে যেন ফেরেনি, কে একজন ফেরেনি।’ যা দাঁড়ায় তাতে এটাই বুঝি ছোটগল্পের মত কঠিন ধারা আর নেই। অল্প কথায় গল্প সারতে হবে, কিন্তু তুলে আনতে হবে মহাজীবনকে।
সমকালে যে কয়েকজন লেখক অকাতরে ছোটোগল্পে প্রাণ বিলিয়ে চলেছেন, তাঁদের মধ্যে বিনোদ ঘোষাল অন্যতম একজন। সারাদিন বসে শেষ করলাম ওনার সাম্প্রতিকতম গল্প –সংকলন ‘আশ্চর্য মানুষ’। লেখক বলছেন যে এটা পড়লে মন বিষিয়ে উঠবেই। আমার মতে আসলে বিষময় সমাজে এধরণের বই হল এন্টিডোট (বিষের প্রতিষেধক)। প্রতিটা গল্পই সমাজ থেকে নেওয়া, জীবন থেকে নেওয়া। গল্পের বাবা-কাকা-দাদা-নায়কেরা আমাদের আশেপাশে ঘোরা চরিত্র কিংবা আমরা নিজেরাই।
বিনোদ ঘোষালের গল্প পাঠে আমার লয়-তান-ছন্দ বরাবরই বেশ ভালো, কারণ পত্রিকায় বের হলেই আমি সেটা পড়ে ফেলি। এখানকার কিছু গল্প আগেই পড়া ছিল। কয়েকটা নতুন। মোট ১৩ টি গল্প আছে। হুলো (প্রতিদিন কাগজের ‘ছুটি’), মাছি (সম্ভবত গৃহশোভা শারদীয়া ১৪২২), ড্রাকুলা, চোর, শিখার সঙ্গে একটা দুপুর, দক্ষিণামিদম, এসির দাম কত, আজ শালুকের জন্মদিন (সম্ভবত গৃহশোভা শারদীয়া ১৪২৩), অভিনয়ের পরে, আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ ও আশ্চর্য মানুষ, নদীর মাঝে দুজন, প্রভু জিশু ও ডায়মন্ড হারবার (প্রতিদিন কাগজের ‘ছুটি’) এবং আশ্চর্য মানুষ। জাদুবাস্তবতা, পরকীয়া এবং তদসম্পর্কিত অপরাধবোধ, সামাজিক তথা পারিবারিক চাহিদায় ক্লিষ্ট আটপৌরে জীবন, নস্টালজিয়ায় নষ্ট জিয়া, কামুক ব্যক্তির দার্শনিকতা, বিকিয়ে যাওয়া মনুষ্যত্ব, দেওয়ালে পিঠ থেকে বেড়ালরূপী মানুষের বাঘ হয়ে ওঠা, সংসারে সং সেজে অভিনয়, পতিতাজীবন কী নেই!
হুলো, চোর, আজ শালুকের জন্মদিন, আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ ও আশ্চর্য মানুষ, আশ্চর্য মানুষ এই কয়েকটি গল্প গড়ে উঠেছে জাদুবাস্তবের উপর ভিত্তি করে। আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ ও আশ্চর্য মানুষ – গল্পটি বাদে বাকি সবকটি গল্পই বুনুনির দিকে প্রবল শক্তিশালী। তির্যক মন্তব্যে সমাজের ব্যাধিগুলিকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে লেখক পুরো মাত্রায় সক্ষম হয়েছেন। ‘হুলো’ পড়লে আমাদের রাজনৈতিক দীনতা নগ্নভাবে চোখের সামনে ভেসে ওঠে। ‘আশ্চর্য মানুষ’ যেহেতু সংকলনের নাম, তাই এই গল্পটি নিয়ে কয়েকটি শব্দ খরচ করা সমীচীন মনে করছি। অপার মোহের জগতে এক নিঃস্পৃহ মানুষ, যাকে সংসারে কেউ পাত্তা দেয় না অথচ তাঁর টাকাতেই সংসার চলে, তিনি বিলীন হয়ে যাচ্ছেন পুরানো জিনিস কিনে জমাবার নেশায়। তিনি এক আশ্চর্য মানুষই বটে। অদ্ভুত জাদুবাস্তব!
‘মাছি’, ‘ড্রাকুলা’ চলনসই। তবে ‘ড্রাকুলা’ গল্পের প্লট মন কাড়লেও লেখককে এর নামকরণের সার্থকতা বিচারে আমার সঙ্গে তর্কযুদ্ধে আহ্বান করছি।
শিখার সঙ্গে একটা দুপুর, দক্ষিণামিদম, এসির দাম কত - এই তিনটি গল্প পড়ে আমি অবাক হয়েছি। আমার ধারণা ছিল স্বপ্নময় ছাড়া বাস্তব নিয়ে অমন নিষ্ঠুর গল্প সমকালে কোনও লেখক লিখতে পারেন না কিন্তু এখন বুঝতে পারছি অমন লেখক আছেন, বরং বলা ভালো আমি তাঁদের লেখার সঙ্গে পরিচিত হইনি। পাঠক বন্ধুদের অনুরোধ করব শুধু এই তিনটি গল্পের জন্যই বইটি পড়া যায়। ‘দক্ষিণামিদম’ সম্পর্কে আমার অভিব্যক্তি বোঝাতে ‘স্পেলবাউণ্ড’ শব্দটি ব্যবহার করা যেতে পারে। বিনোদ ঘোষালের লেখনী যে কত শক্তিশালী তা এই গল্পগুলিই প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট। শুনতে অদ্ভুত লাগলেও ‘এসির দাম কত’ গল্পটি ঝাঁঝালো রেচক তরলের মতই, যাকে আমরা কেউই পছন্দ করি না অথচ নস্যাৎ করার উপায় নেই। কাল্ট, ক্লাসিক!
'অভিনয়ের পরে' গল্পে আমাদের পারিবারিক অবক্ষয় ধরা পড়ে, দুটি ভুল কীভাবে জীবনে একটা ঠিক আনে তারই কথন এই গল্পটি। ‘নদীর মাঝে দুজন’ গল্পের নায়ক-নায়িকাদের আমি রোজ আমার চারপাশে দেখি, এই ফেসবুকীয় জমানায় অতৃপ্ত শরীর – মনের গৃহবধূ, হতাশায় ভোগা যুবক, পরকীয়া, পারিবারিক সমস্যার মাঝে কাম –প্রেম এ যে চারিদিকে ছড়িয়ে। ‘প্রভু জিশু ও ডায়মন্ড হারবার’ আমার পড়া বেশ প্রিয় গল্প। যে জীবন বারোভোগ্যা...সেই জীবনের গল্প, মায়ামেদুর মনখারাপ ছড়িয়ে যায়।
বইয়ের প্রচ্ছদ দুর্দান্ত! নজর কাড়ে। মুদ্রণ প্রমাদ নেই বললেই চলে। তবে ‘এসির দাম কত’ গল্পটিতে এয়ার কণ্ডিশণ্ড বোঝাতে ‘শীততাপ’ শব্দটির ব্যবহার করা হয়েছে, এই শব্দের বাংলা ‘শীতাতপ’ বলেই জানি। গল্পের নামের সঙ্গে শব্দটি তাৎপর্য রাখে বলেই আলাদা করে এর উল্লেখ করা দরকার আছে বলে মনে করি।
অবশেষে বলব এই গল্প –সংকলন আসলে প্যাণ্ডোরার বাক্সের মত, না খুলে থাকতে পারবেন না, খুলেও অস্বস্তি। পারলে পড়ে দেখুন এবং জীবনের প্রকৃত রূপের সম্মুখীন হন।
🎋🍁সদ্য পড়ে শেষ করলাম সাহিত্যিক বিনোদ ঘোষালের লেখা ‘আশ্চর্য মানুষ’ বইটি। লেখকের লেখা বেশ কয়েকটি বই পড়েছি, তবে গল্প সংকলন পড়া হয়নি। এই প্রথম পড়ছি experience ভীষন ভালো। এই বই তে ১৩ টি গল্প রয়েছে , বেশ কয়েকটি গল্প নিয়ে আলোচনা করার চেষ্টা করছি। সত্যিই এই বই তে বেশ কয়েকটি আশ্চর্য মানুষ দেখলাম বটে, যা মনে থাকবে সারাজীবন।🍁🎋
📘হুলো : এই বই এর প্রথম গল্প। হুলো একটা চরিত্রের নাম, এই চরিত্র টা বেশ interesting! সে থাকে প্ল্যাটফর্মে। সে ভিক্ষা ও করে না, কারও কাছে কখনো হাতও পাতে না। এবার প্রশ্ন তাহলে তার চলে কিভাবে? হঠাৎ একদিন হুলো মূত্র ত্যাগ করতে গিয়ে এক কেলেঙ্কারি কান্ড ঘটিয়ে বসে, তারপর ই গোটা দেশ জুড়ে হইচই পড়ে যায়......... এই সব প্রশ্নের উত্তর মিলবে গল্পের মধ্যে।
📘ড্রাকুলা : ড্রাকুলা নাম টা পড়েই রক্তচোষা ভূত বলে মনে হচ্ছে তো? এই গল্পের মেন চরিত্রের নাম ‘ড্রাকুলা সুকুমার’ সেই নামের একটি কারণও রয়েছে। যেহেতু সুকুমার বাড়ি বাড়ি গিয়ে ব্লাড টেস্টের জন্য ব্লাড কালেক্ট করে এবং সেটা সিরিঞ্জ দিয়ে চুষেই সংগ্রহ করে তাই রক্তচোষা ড্রাকুলার সঙ্গে তার হেব্বি মিল। সুতরাং নামটা তার জীবনে সেঁটে গেছে। বেশ ভালোই কাটছিল তার জীবন, হঠাৎ করে কি এমন ঘটলো? যার ফলে তাকে আত্মহত্যা করতে হচ্ছে? গল্প টা পড়লেই জানা যাবে কি হয়েছিল তার জীবনে,শেষ পর্যন্ত কি সুকুমার আত্মহত্যা করতে পেরেছিলো?
📘এসির দাম কত : গল্পের মেন চরিত্রে তনুশ্রী। তার জীবনের গল্প, একটা ভুল সিদ্ধান্ত একটা মেয়ের জীবন কতোটা বদলে দিতে পারে সেটাই দেখানো হয়েছে এই গল্পে। নিজের সমস্ত কিছু বিসার্যন দিয়ে, নিজেকে সংসারে জন্য উৎসর্গ করে তনুশ্রী........
📘 অভিনয়ের পরে : বিপ্লব আর ঈশানী বিচ্ছেদ হতে হতেও রয়ে গেলো। ঠিক কি কারণে ওদের বিচ্ছেদ হচ্ছিলো?? আর বিচ্ছেদ হতে হতেও কিভাবে রয়ে গেলে? সব উওর এই গল্পে দেখানো হয়েছে........
📘 আশ্চর্য মানুষ: মেন চরিত্রে সুখেন ও তার পরিবার। সুখেন পুরানো জিনিসের মধ্যে নিজের জগৎ খুঁজে পায়, কারণ তার পরিবার তাকে পাগল ভাবে। একটা সময় তাকে বাতিলের দলে ফেলে দেয়। এমন সময় এক আশ্চর্য মানুষের সাথে দেখা হয় যার ঝোলায় রয়েছে অদ্ভুত এক দুনিয়া........
বিনোদ ঘোষালের সাহিত্য যতই পড়ছি, ততই অভিভূত হচ্ছি । অনবদ্য বিষয়বস্তু, লেখনশৈলী ও অন্তর্নিহিত অর্থ দিয়ে সাজানো এই বই এর প্রতিটি গল্প । অপেক্ষায় থাকলাম এরকম আরো গল্পসম্ভারের ।