জীবন শুরু করেছিলেন সাইকেল পিওন হিসেবে। তারপর নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে তিনি হয়েছিলেন আনন্দ পাবলিশার্সের প্রকাশক। বাদল বসুর জীবন ছিল সব দিক থেকেই বর্ণময়। সেই বর্ণময় জীবনে তিনি পেয়েছিলেন সত্যজিৎ রায় থেকে রবিশঙ্কর, নীরদচন্দ্র চৌধুরী, অমর্ত্য সেন, শিবরাম চক্রবর্তী, গৌরকিশোর ঘোষ, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সমরেশ বসু, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, শঙ্খ ঘোষ, গুন্টার গ্রাস, সলমন রুশদির মতো বিভিন্ন মানুষের সান্নিধ্য। গিয়েছিলেন ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলা থেকে শুরু করে বিশ্বের নানা বইমেলায়। মিশেছেন নানা ধরনের মানুষের সঙ্গে। সাক্ষী থেকেছেন প্রচুর ঘটনার। সেই সব অভিজ্ঞতাই তিনি টানটান গদ্যে লিখে গিয়েছেন এই আত্মজীবনীমূলক লেখায়। যে লেখা পড়লে শুধু সেই মানুষজনদের নিজস্ব জগৎকে চেনা যায় না, সেই সঙ্গে চেনা যায় এক বিশেষ সময়কে। দেশ পত্রিকায় ধারাবাহিক হিসেবে প্রকাশিত হওয়ার সময়ই এই লেখা আলোড়ন ফেলে দিয়েছিল। এবার গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হল বাদল বসুর সেই লেখা।
বাদল বসুর জন্ম ২৮ জুলাই ১৯৩৭ সালে, ঝাড়গ্রামের দহিজুড়িতে। ছোটবেলা গ্রামের বাড়িতে কাটালেও পরে চলে আসেন কলকাতায়। শুরু হয় জীবন সংগ্রাম। প্রথম জীবনে ঘি বিক্রি করেছেন, চালের দোকানে বসেছেন। তারপর ছাপাখানায় কাজ। ধাপেধাপে আনন্দ পাবলিশার্সের প্রকাশক। সেই সূত্রে বিভিন্ন বিখ্যাত মানুষের সান্নিধ্যে আসা, বিশ্বের বিভিন্ন বইমেলায় অংশগ্রহণ করা এবং প্রকাশক হিসেবে বহু ভাল-ভাল বাংলা বই প্রকাশ করা। বাংলা ছাপাখানার বিবর্তনও তিনি দেখেছেন চোখের সামনে। নিজেও তার অংশীদার ছিলেন। বাদল বসু ছিলেন এক যুগের সাক্ষী। যে যুগ নিয়ে বাঙালির প্রচুর গর্ব। সেই সব অভিজ্ঞতার কথাই তিনি শুনিয়েছেন তাঁর আত্মজীবনীমূলক লেখা ‘পিওন থেকে প্রকাশক’-এ।প্রয়াণ ৯ অক্টোবর, ২০১৫।
ইউনিভার্সিটিতে আমাদের এক খচ্চর কিসিমের ব্যাচমেট ছিল। বাপ-মা শখ করে কবিগুরুর নামে তার নামটি রাখলেও গুরুদেবের ঋষিসুলভ স্থৈর্য্য বা গভীরতার কোন লক্ষণ তার মাঝে আমরা কোনদিনই দেখিনি। সার্বক্ষণিক চাতুরি, বড় বড় কথা আর ছ্যাবলামির কারণে পরের দিকে আমরা তাকে এড়িয়েই চলতাম। এরকম লোকজন লেখাপড়ায় বিশেষ সুবিধার না হলেও সাধারণত করে খেতে পারে, এর বেলাতেও ব্যতিক্রম হয়নি। তবে ইউনিভার্সিটিতে যে ছেলে স্ট্রাকচারাল ডিজাইনের বেসিক বুঝতেও কলম-পেন্সিল ভেঙে ফেলত, সে যখন হঠাৎ করেই ডিজাইনার হিসেবে পেশাগত জীবন শুরু করে দালানকোঠা বানাতে শুরু করলো, আমরা খানিক শঙ্কিত না হয়ে পারিনি। তারপর আবার ভেবেছি, হতেও পারে, পরিশ্রমে বিদ্যালাভ তো নতুন কিছু নয়।
কিন্তু দেখা গেল, ফেসবুকে নিজের ডিজাইন করা বিল্ডিংয়ের ছবি দিয়েই সে ক্ষ্যান্ত দিচ্ছে না, ক'দিন পরে বড় বড় ডিজাইনারের সাথে দাঁড়িয়ে ছবি দেয়া শুরু করলো। ডিজাইনাররা বোধ করি, কেউ ভদ্রতার খাতিরে, আবার কেউবা তার এনে দেয়া কাজ করেন বলেই সেসব ছবি তুলতে দিতে আপত্তি করেননি। ঘটনা এখানেই শেষ হলো না, বছর গড়াতেই দেখা গেল, সেই ব্যাচমেটটি প্রতি মাসে একটা করে স্ট্যাটাস প্রসব করছে যার মূল বক্তব্য হলো, সে অমুক-তমুককে অমুক-তমুক জায়গায় চাকরির ব্যবস্থা করে দিচ্ছে, এর উপকার করছে, তার উপকার করছে, তবে অমুক তার উপকারের প্রতিদান দেয়নি, কিংবা তমুক বন্ধু কেন তার মত উপকার করছে না, ইত্যাদি। এ ধরণের নির্লজ্জ আত্মপ্রচারের পর তার জাতবংশ নিয়েও যে কেউ কেউ টান দিচ্ছে না তা নয়, কিন্তু সে নির্বিকার।
সংক্ষেপে, এটাই হলো আনন্দ পাবলিশার্সের বাদল বসু'র 'পিওন থেকে প্রকাশক'-এর বিষয়বস্তু। গুডরিডসে খুব ভাল ভাল রিভিউ দেখে অনেক আশা নিয়ে শুরু করেছিলাম, কিন্তু প্রতি অধ্যায়েই আমাদের সেই খচ্চর আত্মপ্রচারপ্রিয় কুচুটে সহপাঠীর কথা মনে করানো ছাড়া বইটি আর কিছু করতে পারেনি। তিনি পিওন থেকে প্রকাশক হয়েছেন সেটা কোন সমস্যা নয়, সমস্যা হলো তার নিচু মানসিকতায়। বেশিরভাগ লেখককে নিয়ে ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণে তিনি টেনে এনেছেন কাকে কবে কত টাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন বা ধার দিয়েছিলেন বা কি সুবিধে করে দিয়েছিলেন সেসব বিষয়। শুধু তাই নয়, টাকা ধার চেয়ে বা অগ্রিম চেয়ে বা কোন একটা অসুবিধেয় পড়ে লেখা লেখকদের চিঠিগুলোকেও হাজির করেছেন বইয়ের প্রায় সব অধ্যায়ে। এসব লেখকের অসংখ্য চিঠিপত্রের মাঝে শুধু টাকাপয়সা সংক্রান্ত বা ধার চাওয়া সংক্রান্ত চিঠিগুলোকেই কেন তিনি বইয়ে অন্তর্ভুক্ত করলেন সেটা তিনিই ভাল বলতে পারবেন। অন্তত এপার বাংলায় ব্যাপারটাকে রীতিমত কুরুচিকর বলেই প্রতীয়মান হয়, ওপার বাংলার মনোভাব কি সেটা বলতে পারবো না। এ সুযোগে নানা লেখকের কুৎসাও গেয়েছেন, কে কবে 'মহান' আনন্দবাজার গোষ্ঠীর কাছে বা তার কাছে উপকার পেয়েছেন কিন্তু পরে তাদের দোষারোপ করে গেছেন এসব বিষয়-আশয়। লেখকদের লেখা নিয়ে কিছু আলোচনা আছে, কিন্তু টাকাপয়সার ব্যবস্থা সংক্রান্ত স্মৃতিচারণ তার চেয়ে অনেক বেশি বলে সেটা চোখে পড়ে কম।
আর বাংলাদেশ নিয়ে তার চিন্তাভাবনা বেশ ইন্টারেস্টিং। পুরো বইয়ে ৫-৬ বার বাংলাদেশের কথা আছে, সেগুলো পড়লে মনে হবে বাংলাদেশ কোন একটি অজপাড়াগাঁ যেখানে শুধু কলকাতার লেখকদের বই পাইরেসি করা হয় (পাইরেসির অভিযোগটা সর্বৈব সত্য যদিও), সেখানে আর কেউ লেখালেখি করেন না, তবে ওখানকার সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদ নামের একজন। বাংলাদেশে আদৌ কেউ বই লিখেন কিনা, সেখানকার লেখকদের ধরণধারণ, কোন ভাল লেখক আছেন কিনা, কিছুই নেই, শুধু পাইরেসি। বাংলাদেশে আনন্দ পাবলিশার্সের শাখা খুলতে বাধা পেয়েছিলেন সেটা নিয়ে হা-বিতং আলাপ আছে, কিন্তু কলকাতার বাজারে বাংলাদেশি বই কেন ঢুকতে দেন না তেনারা সেটা নিয়ে কোন কথাবার্তা নেই। টিপিক্যাল দাদাগিরি মনোভাব। আর আছে আনন্দবাজার সংস্থার প্রতি বিপুল আনুগত্য আর মুগ্ধতা। ওখানকার সবই ভাল, সবই মহান।
সব মিলিয়ে, এক বেনিয়ার সুযোগসন্ধানী আলাপচারিতা, এটাই এই বইয়ের সারমর্ম। নিচু থেকে উপরে অনেকেই ওঠেন, তবে মানসিকতা যে সবার নর্দমা ছাড়িয়ে দালানে উঠতে পারে না, এই আত্মজীবনী সেটার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
বাদল বসুর নাম বললে অনেকেই হয়তো চিনবে না। মানুষের আর কি দোষ মাসখানেক আগেও এই নাম বললে আমিই তো ভ্রু-কুঁচকে প্রশ্নকর্তাকে উলটো জিজ্ঞাসা করে বসতাম, এই ভদ্রলোক যেন কে?
যা হোক! যেহেতু আমি এখন তার পরিচয় জানি সেহেতু মানুষজনকে অন্ধকারে না রেখে আলোর পথে আনবার জন্য একটা দায়িত্ব অনুভব করছি। এই ভদ্রলোক বিখ্যাত আনন্দ পাবলিশার্সের প্রকাশক (ছিলেন)। আর সেই সময়টা ছিল বাংলা সাহিত্যের রমরমা যুগ।
প্রিয় লেখকদের বই কতো সহজেই পড়ে ফেলি। অথচ লেখক কিন্তু পাণ্ডুলিপি লিখেই খালাস। এরপর সেই পাণ্ডুলিপির সম্পাদনা, পরিমার্জন, প্রচ্ছদ, বাঁধাই মোটকথা ভক্ত পাঠকের হাতে প্রিয় লেখকের বই দুই মলাটে বন্দী করে তুলে দেবার জন্য যার অবদান সবচেয়ে বেশি তিনি অবশ্যই প্রকাশক। একজন প্রকাশকের দায়িত্ব আরও ব্যাপক। কেবল বই প্রকাশ করেই সেই দায়িত্ব শেষ করা যায় না। ব্যবসার ব্যাপারটাও মাথায় রাখতে হয়। বই প্রকাশের পর বইয়ের বিক্রি-বাট্টা কেমন হচ্ছে, কবে কখন কোন বইয়ের পুনর্মুদ্রণ বা সংস্করণ লাগবে, সামনে কোন উপলক্ষ আসছে তার প্রস্তুতি কেমন হবে, লেখকদের সাথে লিঁয়াজো মেন্টেন করা, নতুন বইয়ের মার্কেটিং ব্লা ব্লা ব্লা উফ! একটু দম নেই। এতো কাজের পরও প্রকাশকরা কিন্তু চিরটাকাল আড়ালেই থেকে যান। (এই যেমন আমি, সুনীলের আত্মজীবনী, রিসেন্ট পড়া বিজয়া রায়ের বই বা এরকম টুকটাক জায়গায় বাদল বসুর নামটা পড়ার পরেও মনে রাখতে পারিনি। বিরাট আফসোস!) ঝাড়গ্রামের প্রত্যন্ত গ্রাম দহিজুড়ি। সেই দহিজুড়ি গ্রামের নিতান্তই সাধারণ একটা পরিবারের সাধারণ ছেলে বাদল বসু। কাজ শুরু করেছিলেন সাইকেল পিওন হিসেবে আর ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছেন প্রকাশক। আনন্দ পাবলিশার্স তখন এবং এখনও সমানভাবে বই পড়ুয়া পাঠকদের অন্যতম একটা আস্থার নাম। বাদল বসু খুব কাছ থেকে দেখেছেন বড় বড় কবি-সাহিত্যিকদের। সুনীল, শীর্ষেন্দু, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, শঙখ ঘোষ প্রভৃতিরা ছিলেন তার বন্ধুস্থানীয়। নিজের দায়িত্ব পালন করেছেন নিষ্ঠার সাথে। বড় বড় লেখকদের সাথে ছিল তার উঠাবসা। কাজের সূত্রে ঘুরেছেন দেশ-বিদেশ। গেছেন বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন বইমেলায়। শুধুমাত্র বিখ্যাত লেখকদের বই নয়, সবসময় চেয়েছেন ভালো মানের বই বের করতে। লেখক-প্রকাশক সম্পর্ক সাধারণত কিছুটা টক-মিষ্টি টাইপের হয় যার অন্যতম কারণ রয়্যালিটি নিয়ে লেখকদের সাথে প্রকাশকের নিত্য খিটিমিটি। লেখক ছাড়া প্রকাশকের চলবে না আবার প্রকাশক না থাকলেও চলবে না লেখকদের। বাদল বসুর সেদিকে ছিল সবসময় প্রখর দৃষ্টি। কাজেই রয়্যালিটির টাকা নিয়ে যখন বিশফ লেফ্রয় রোডের বাড়িতে সত্যজিৎ রায়ের মুখোমুখি হন, তখন বেশ অবাকই হন এই কিংবদন্তি। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন সময় বিভিন্ন লেখকদের অগ্রিম টাকা পাইয়ে দেয়া কিংবা লোনের ব্যবস্থা করে দেওয়া ছাড়াও মিটিয়েছেন লেখকদের নানান রকম আজগুবি আব্দারও। পুরোটা বই জুড়ে রয়েছে বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত কিংবা অবিখ্যাত বইগুলো ছাপানোর সময়কার নানান মজার মজার কাহিনি আর লেখকদের গল্প। পুরোটা বই অসম্ভব ভালো। সহজ ভাবে, সুন্দর, প্রাঞ্জল বাংলায় লিপিবদ্ধ করেছেন তার কর্মজীবনের নানান ঘটনা দুর্ঘটনাকে। কিছু কিছু ব্যাপারে তার আফসোসও উঠে এসেছে বইয়ে। সবচেয়ে বেশি খারাপ লেগেছে বই পাইরেসি সংক্রান্ত অভিযোগ আর কষ্টের ব্যাপারটাতে। নীলক্ষেত প্রিন্ট আমাদের জন্য গরীব পাঠকদের জন্য উপকারী বটে কিন্তু তাদের দিক থেকে ভাবলে তো অবশ্যই অপরাধ এবং বেশ বড় মাপের অপরাধ। একই কথা অবশ্য বর্তমানের পিডিএফ-এর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। (আমি জানি আমিও অপরাধী কিন্তু কি করার? স্বপ্ন দেখি অনেক অনেক হার্ডকপির মালিক হবার)
তো এই আর কি... বাঙালি যেই শতক নিয়ে গর্ব করে সেই যুগের বিখ্যাত প্রকাশনী আনন্দ পাবলিশার্সের প্রকাশক। একদম শূন্য থেকে শুরু করা এবং পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠা পাওয়া এমনই বর্ণময় জীবনের সাক্ষী এই আত্মজীবনী বই -'পিওন থেকে প্রকাশক'।
আসলে প্রকাশক কিংবা সম্পাদকদের আরো বেশি বেশি করে লেখা উচিত :/
বইটির প্রতি আগ্রহী ছিলাম কারন এটি একজন প্রকাশকের স্মৃতিকথা। তাও আবার কি না কলকাতার আনন্দ পাবলিশার্সের প্রকাশক। এটা ত আশা করতেই পারি তাতে থাকবে লেখকদের নিয়ে ভুরি ভুরি লেখা।
বাদলবাবু হতাশ করেননি। অনেক অনেক লেখক, প্রিয় লেখকদের নিয়ে লিখেছেন তিনি। ভালো লেগেছে পড়তে। এ যেন প্রিয় লেখকদের অন্য আলোয় দেখা।
দুঃখের বিষয় বাদলবাবু শুধু বাংলাদেশের পাইরেট বইয়ের বাজার দেখেছেন। নিজস্ব প্রকাশনির খোঁজ পাননি। কয়েকবার করেই বইটিতে এসেছে কলকাতার বইয়ের পাইরেটকপির কথা। পড়তে খারাপ লাগলেও উনাকে দোষ দিচ্ছি না। ঘটনা ত আসলে সত্যি। আজকাল ত পাইরেট কপির গালভরা নাম 'প্রিমিয়াম কপি' দিয়ে বিজ্ঞাপন দিয়ে ঢাক ঢোলপিটিয়ে বিক্রি হচ্ছে দেদারসে।
বইয়ের ছাপা নিয়ে ছোট্ট একটা অভিযোগ আছে। চাইলে পৃষ্ঠা সংখ্যা কমিয়ে কাগজের ব্যবহার সীমিত করা যেতো। প্রতি পৃষ্ঠার চারপাশে এতখানি না ছাড়লেও হতো।
আমার অন্যতম পছন্দের প্রকাশন সংস্থা আনন্দ পাবলিশার্স। আনন্দের বই হাতে নিলে আমার মধ্যে এক অনাবিল আনন্দেরই সৃষ্টি হয়৷ নানান ধরনের বই বের করে ওরা। ছোট বইগুলো তো দারুণ রকম মায়াকাড়া। এছাড়াও আনন্দের অনেক বই একই সাথে জনপ্রিয় এবং রুচিশীল৷ গল্প-উপন্যাস-কবিতা-গবেষবাগ্রন্থ-প্রবন্ধ-থ্রিলার-ইতিহাসগ্রন্থ-শিল্প নিয়ে গ্রন্থ সবেতেই আনন্দ এগিয়ে। সেই আনন্দ পাবলিশার্স এর প্রকাশক বাদল বসুর এই বইটির কথা যখন জানলাম তখন থেকেই পড়বার এক উদগ্র বাসনা কাজ করছিল। বাতিঘরে ধরনা দিয়ে দীর্ঘদিন অপেক্ষার পর বইটি হাতে পেয়েছিলাম। আবার একটু ছুটির সুযোগে দেড়দিনেই শেষ করে ফেললাম ৬১৬ পৃষ্ঠার বইটি। এর পেছনে অবশ্য আমার পড়ার দ্রুততা ছাড়াও বইটির ফন্টের বড় সাইজ এবং অধিক স্পেসের ব্যবহার সাহায্য করেছে। এছাড়াও বাদল বসুর গদ্যও বেশ ঝরঝরে। অনুলিখনে ছিলেন সিজার বাগচী। মূল লেখাটি দেশ পত্রিকায় নিয়মিত প্রকাশিত হয়েছে, পরে প্রকাশিত হয়েছে বই হিসেবে৷ লেখক-প্রকাশকের সম্পর্ক টক-ঝাল-মিষ্টি। দুপক্ষেরই দুপক্ষকে দরকার, তাই অনেক সময়ই কেজো সম্পর্কের বাইরে আর তেমন সম্পর্ক গড়ে উঠে না৷ কিন্তু বাদল বসুর ক্ষেত্রে বিষয়টা ব্যতিক্রম৷ প্রকাশনার খাতিরে পরিচয় হলেও অনেক কবি-সাহিত্যিকদের সাথেই তাঁর গড়ে উঠেছিল নিবিড় সম্পর্ক, কেউ কেউ পরিণত হয়েছিলেন ঘনিষ্ঠ বন্ধুতে। দিব্যেন্দু পালিত, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায় এঁদের কথা বারবার এসেছে। উঠে এসেছে অনেক অন্তরঙ্গ কথোপকথন। আবার সত্যজিৎ রায়ের সম্পর্কে লেখকের মুগ্ধতা ছিল অনেক বেশি, সত্যজিৎ রায়ের সব বই আনন্দ থেকে বেরিয়েছে এ নিয়ে গর্ব করেছেন তিনি একাধিকবার। নিশ্চয়ই এটা আনন্দের জন্য একটা সম্মানের ব্যাপার। নীরদ সি চৌধুরী সম্পর্কেও বেশ মজার অভিজ্ঞতা বর্ণন আছে। উপসংহার সমেত ৭৩টি অনুচ্ছেদে বিভক্ত বইটিতে আনন্দ প্রকাশন থেকে প্রকাশিত সকল বিখ্যাত লেখকদের নিয়ে আছে প্রকাশকের কম বেশি কথা। এই তথ্যগুলো সে কারণেই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ওই সাহিত্যিকদের আত্মজীবনী কিংবা তাঁদের পাঠ আলোচনা থেকে এই টুকরো স্মৃতিগুলো অনেকটা আলাদা, একটু বেশি সজীব। বাংলাদেশী সাহিত্যিকদের মধ্যে বেলাল চৌধুরী, তসলিমা নাসরিন এবং হুমায়ূন আহমেদের কথা আছে৷ আনন্দ পাবলিশার্স বাংলাদেশের বই প্রকাশের জন্য বাংলাদেশেও একটি শাখা খুলতে চেয়েছিল। তবে বাংলাদেশী প্রকাশকদের আপত্তির জোরে সেটি সম্ভব হয়নি৷ আনন্দের প্রচুর বই বাংলাদেশে লোকাল প্রিন্টে দেদারসে বিক্রি হয়৷ সেটা নিয়ে অনেক জায়গায় আক্ষেপ এবং ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন লেখক। জয় গোস্বামী, বাণী বসু, সুকুমারী ভট্টাচার্য এবং তসলিমা নাসরীনকে নিয়ে কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতাও বয়ান করেছেন। তবে বেশির ভাগ সাহিত্যিককেই তিনি খুব শ্রদ্ধার চোখেই দেখতেন, লেখার মধ্য দিয়ে তেমনই প্রকাশ পেয়েছে। শরৎচন্দ্রের সাহিত্যসমগ্র দুইখণ্ডে বের করে আনন্দ পাবলিশার্স প্রকাশনা জগতে লাভের এক রেকর্ড সৃষ্টি করেছিল, তৎকালীন পত্রিকাতেও বাংলা বইয়ের এত পাঠকসংখ্যা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ হয়েছে। অনেক চিঠি হুবহু ছাপা হয়েছে বইটিতে, বইটির একটা উল্লেখযোগ্য দিক সেটা। কিশলয় ঠাকুর এর বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এর জীবন নিয়ে রচিত 'পথের বাঁকে', রানী চন্দের 'পথেঘাটে', 'জেনানাফটক' প্রভৃতি কয়েকটা নাম না শোনা আগ্রহোদ্দীপক বিষয়বস্তুর বইয়ের নাম জানতে পারাটাও একটা বড় পাওয়া। লেখার স্টাইল ভালো, কিন্তু কিছুটা গৎবাঁধা। লেখকের নিজস্ব জীবন নিয়ে তাতে কমই লেখা আছে। দহিজুড়ি-ঝাড়গ্রামে বেড়ে ওঠা লেখকের ছেলেবেলায় পড়ালেখার প্রতি টান ছিল কম। মুদি দোকানে বসেছেন, চাল বিক্রি করেছেন৷ কাকার সহায়তায় একই সাথে গৌরাঙ্গ প্রেস এবং আনন্দ পাবলিশার্স এ কাজ করেছেন। সাইকেল পিওন থেকে ধাপে ধাপে প্রকাশক হয়েছেন৷ সংগ্রাম পেরিয়েই পরবর্তীতে পেয়েছেন বহু জ্ঞানী গুণী মানুষের সংস্পর্শ। ২০১৫ সালে মারা যান কর্কটরোগাক্রান্ত হয়ে৷ নানান অভিজ্ঞতার মোড়কে জড়ানো এক স্মৃতিকথা পড়তে পেরে নিজেকে তাই সমৃদ্ধ মনে হচ্ছে।
১৯৮৫ সেটা। শরৎচন্দ্রের সমস্ত লেখাজোখার কপিরাইট তখন এম সি সরকার প্রকাশনা সংস্থার হাতে। শরৎ সমগ্র বিক্রি হত তেরো খন্ডে। কপিরাইটের মেয়াদ আর মোটে তিন বছর – ’৮৮ তক। মানে বছর তিনেক পর থেকেই প্রকাশকগন নিজ নিজ মর্জিমাফিক শরৎ রচনাবলী প্রকাশের সুযোগ পাচ্ছেন।
তো এই যখন অবস্থা, তখনই একদিন ‘আনন্দ’ প্রকাশক বাদল বসু ঠিক করলেন লেখাগুলো দু-খন্ডে ছাপার। হ্যাঁ – ’৮৫ তেই, এম সি সরকার থেকে কপিরাইট কিনে নিয়ে। যে কপিরাইটের ভ্যালিডিটি আর তিন বছর মাত্র! কিনতে খরচ পড়েছিল চল্লিশ লাখ টাকা!
মারা যাওয়ার সাতচল্লিশ বছর পরেও এক বাঙালি লেখকের জনপ্রিয়তা কোন পর্যায়ে গিয়েছিল – আদতে সেই গল্পই করেছেন বাদল বসু ধুন্ধুমার চেতন ভগত বিক্রিবাটার যুগের কাছে। বইটা আসলে এ ধরনের ট্রিভিয়াতেই ভরা। ঘুরিয়ে বললে – বন্ধুটন্ধুদের কাছে ট্রিভিয়া শুনিয়ে কলার তুলতে চাইলে সমআয়তন পুষ্ট ব��� বাজারে হয়ত হাতেগোনাই। (গোত্রবিচারে দেখলে সাগরময় ঘোষের 'সম্পাদকের বৈঠকে' ছাড়া অন্য কিছু মাথাতেও আসছে না এই মুহূর্তে!)
পুরোটাই স্রেফ অভিজ্ঞতার ঝুলি। সহজ সাদামাটা বুলি। গদ্যের কারুকার্য, ভাষার মারপ্যাঁচ – ওসব কিচ্ছু নেই। আর খুব সম্ভব সেটাই বইটার ইউ-এস-পি।
সিনেমা-টিনেমা নিয়ে উৎসাহ একটা পর্যায় পার করলে, নিজের তাগিদে আমরা যেমন ‘দা মেকিং অফ অমুক’ দেখতে বসি না – সেই গোছের। ‘মেকিং অফ....’ মানে যেমন, পর্দায় যে গল্পটা দর্শকদের দেখানো হয় সেটা বানানোর গল্প। তেমনি এ লেখাও আসলে বইয়ের পাতায় আমরা যে গল্পগুলো পড়ি সেগুলো বানানোর গল্প। ‘পিওন’ থেকে ‘প্রকাশক’ হয়ে ওঠা বাদল বসুর চোখ দিয়ে সাহিত্যজগতের দিকপালদের অনেকখানি কাছ থেকে দেখার গল্প।
বেশ কিছু জায়গায়, বলা ভালো – বেশিরভাগ জায়গাতেই মনে হয়েছে, জাঁকালো কন্ট্রোভার্সি পয়দা করা যেত। বইটা আরো খানিক মুখরোচক হতে পারত। ডিপ্লোম্যাট প্রকাশক সত্ত্বার মতোই লেখক হিসেবেও ভদ্রলোক সেসব সামলে নিয়েছেন। একাধিক জায়গাতেই মনে হয়েছে – দুর এ প্রসঙ্গ নেহাতই ঘরোয়া। না পাড়লেই বরং গদ্যটা polished হত! বইটা শেষ করে বুঝতে পারি সেগুলোর হয়ত দরকার ছিল। বইটা আরেকটু বিশ্বাসযোগ্য ঠেকে তাতে – এই আর কি!
আনন্দ পাবলিশার্সের সাধারণ কর্মচারী থেকে ক্রমে প্রকাশক হিসেবে জীবনের অনেকটা সময় বাদল বসু কাটিয়েছেন বাংলা সাহিত্যের মানুষদের সাথে। সেই দীর্ঘকালের অভিজ্ঞতা বেশ ঝরঝরে ভাষাতেই লিখেছেন, পড়তে ভালোই লাগে। কয়েকটা বিষয় এই রিভিউতে উল্লেখ করতে ইচ্ছে হলো-
১) আনন্দবাজারের বানানরীতি নিয়ে তসলিমা নাসরীনের অসন্তোষকে তিনি উড়িয়ে দিয়েছেন, অথচ মোস্তফা কামালকে মুস্তাফা কামাল নিজেই লিখেছেন একই বাক্যে। একই ভাষাভাষী কারও নাম ইচ্ছা করে বিকৃত করে এঁরা কী সুখ পান বুঝলাম না। বাদল বসুকে আবার বাংলাদেশে বদল বোস লিখলে নির্ঘাত খেপবেন। ২) শরৎচন্দ্রের বইয়ের কপিরাইট ৮৮ সালে উন্মুক্ত হবে, ৮৫ সালে ৪০ লক্ষ টাকা দিয়ে কপিরাইট কিনে নিল আনন্দ পাবলিশার্স। শরৎ সমগ্র এক খণ্ডে নব্বই আর দুই খণ্ডে ১০০, এইভাবে ছাড়ার পর এক লক্ষ কপি বিক্রি হলো। অর্থাৎ এই অল্পদিনেই প্রায় এক কোটি টাকার বই বিক্রি হয়েছে! ৩) বাংলাদেশে ২০০০ সালে গ্লোব গ্রুপের সাথে যৌথ উদ্যোগে আনন্দ পাবলিশার্স বাংলাদেশ লিমিটেড খোলা হয়েছিল। কিন্তু লেখক প্রকাশকদের আন্দোলনের মাথায় অল্পদিনেই সেটা বন্ধ করে দেওয়া হলো। এই কাহিনী পড়ে কষ্ট লাগলো বেশ। বাংলাদেশে ভারতীয় বইয়ের পাইরেসি নিয়ে তাঁদের অসন্তোষ বারবার জানিয়েছেন বইতে, সে কোম্পানিটা থাকলে এদেশেই ছাপা যেত বইগুলো। এখনকার মত দুই গুণ দাম দিয়ে বই কিনতে না পারার আফসোসটা কমতো অবশ্যই।
তবে বাংলাদেশের প্রকাশনী সংস্থাগুলোকে কি তাঁরা কলকাতায় ব্যবসা করতে দেবেন? সম্ভবত না।
স্বনামধন্য আনন্দ পাবলিশার্সে যোগ দিয়েছিলেন ছাপাখানার চাকুরে হিসেবে আর অবসর নিয়েছিলেন আনন্দ গ্রুপের পক্ষ থেকে প্রকাশক হিসেবে।
দীর্ঘ বর্ণময় জীবন বাদল বসুর। রবীন্দ্রোত্তর যুগের পশ্চিমবাংলার সাহিত্য জগতের প্রায় সকল রথী, মহারথীদের সান্নিধ্য পেয়েছেন কর্মসূত্রে (বাংলাদেশের তসলিম নাসরিনের কথাও আছে)।
সাহিত্যিকদের কাছ থেকে দীর্ঘকাল থেকে দেখে আসার স্মৃতিচারণই "পিওন থেকে প্রকাশক "
বেশ বড়সড় কলেবরের বই। তবে লেখার গতি আছে। পড়তে গিয়ে একবারও মনে হয়নি এতো লিখিয়ে নয়, প্রকাশক। বরং বাদল বসুর গদ্যতে জাতলিখিয়ের একটা ভাব আছে। এ বোধকরি লিখিয়েদের সান্নিধ্যের ফল।
আগেই বলেছি পশ্চিমবাংলার প্রায় সকল সাহিত্যিক ই এই বইতে উপস্থিত। তাই বিশেষকরে কারো কথা উল্লেখ করছি না।
প্রিয়সব সাহিত্যিকদের নিয়ে কতশত আগ্রহজাগানীয়া ঘটনায় ভর্তি এ বই। সাহিত্যজীবন আর ব্যক্তিজীবনে একজন লিখিয়ের মাঝে কতটা ফারাক তা এবই পড়লে বোঝা যায়।
জ্ঞানী ও অভিজ্ঞ বাদল বসু এক জায়গায় শেখ হাসিনাকে "বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট " লিখলেন (!) তারমতো ব্যক্তিত্ব প্রধানমন্ত্রী আর রাষ্ট্রপতি বোঝেন না, তা মানতে বা হজম করতে বেশ কষ্ট হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল অনেকটা ইচ্ছাকৃত কাজ এটি (কেননা নিজ দেশের বেলায় তিনি ইন্দিরা গাঁধীকে তো প্রেসিডেন্ট বলেন নি) ।
বাংলা প্রকাশনা জগতেই শুধু নয়, সাহিত্যের সামগ্রিক বিবর্তনের ইতিহাসেও আনন্দ পাবলিশার্স-এর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলা চলে। সেই ইতিহাস ছড়িয়ে আছে নানা বইয়ে, স্মৃতিচিত্রণে, অ্যানেকডোটে। এই বই সেই ইতিহাস ধরে রাখার ক্ষেত্রে অসম্ভব মূল্যবান একটি দলিল। সিজার বাগচীর অনুলিখনে এই বইয়ে যাঁর স্মৃতিতে বন্দি হয়ে থাকা অজস্র তথ্য ও ঘটনা স্থান পেয়েছে, তিনি আনন্দ পাবলিশার্স-এর একটি স্তম্ভ ছিলেন— এ-কথা বললে অত্যুক্তি হয় না। লেখাগুলো 'বইয়ের দেশ'-এ ধারাবাহিক আকারে প্রকাশিত হওয়ার সময়ই পাঠকমহলে ও সোশ্যাল মিডিয়ায় যথেষ্ট আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। এতে অকপটে এমন অনেক কথাই বলা হয়েছিল যেগুলো সচরাচর সুশীল সমাজ তথা বিদগ্ধজন এড়িয়ে চলেন। বিশেষ কিছু লেখক-লেখিকার আচরণই হোক বা বাংলাদেশে বৈধভাবে আনন্দ-র বই প্রকাশ নিয়ে সমস্যা— এই বইয়ের লেখাগুলোতে যে-রকম চাঁচাছোলা ভঙ্গিতে নিজের মনোভাব বাদলবাবু ব্যক্ত করেছেন তা দেখে বেশ শ্রদ্ধাই হয়। বহু অ্যানেকডোট আছে এই বইয়ে। তাদের অনেকগুলো নিয়েই অন্য পক্ষের মতামত জানতে পারলে বেশ হত; তবে তার তো উপায় নেই। তাই একপাক্ষিক কথাগুলোই জানতে হয়। বাংলা প্রকাশনা তথা সাহিত্যের আধুনিক যুগের ইতিহাসে আগ্রহী পাঠকেরা বইটি পড়লে আনন্দও পাবেন, অনেক কিছ জানতেও পারবেন। অলমিতি।
বহুদিনের আগ্রহ ছিল বইটা পড়ার। অবশেষে পড়া হল। তবে বইটা যত ভালবাসতে চেয়েছিলাম ততটা ঠিক পেরে উঠলাম না। সমস্যা হল এই জাতীয় বই পড়ে প্রচণ্ড আনন্দ পেয়েছিলাম সাগরময় ঘোষ-এর কারণে। তার সম্পাদকের বৈঠক, ও হীরের নাকছাবি বইদুটো তাই আমার আকাঙ্ক্ষাকে আচ্ছন্ন করে ফেলেচ্ছে। সুতরাং, ওই পর্যায়ের কিছু না পেলে সঙ্গত কারণেই হতাশ হই।
বাদল বসু অব্যর্থভাবেই সাগরময় ঘোষ নন। তার সাহিত্য জগত দেখা এবং তা নিয়ে লেখার আঙ্গিক সম্পূর্ণ আলাদা। তিনি সাহিত্য জগত দেখেছেন প্রকাশকের চোখ থেকে এবং লিখেছেনও সেভাবেই। তাই সাহিত্যিকরা বিচার্য হয়েছে দেনা-পাওনা'র কাঠামোয়, চাহিদার নিক্তিতে আর আন্তরিকতার মাপকাঠিতে। হ্যাঁ, সেখানে কিছু কিছু আড্ডা বা তথ্যের বাতাসও আছে, যা আচমকা কিঞ্চিৎ স্পর্শ করে যায়, তবে তা বড়সর আবেগে আবিষ্ট করেনি।
কোনো কোনো সময় লেখকের কাছে অন্য কোন সাহিত্যিকের কোনো আঙ্গিক হয়তো ভীষণ ভাল লেগেছ���, তিনি সরাসরি কিছু লেখা, বাক্য, শব্দ উদ্ধৃত করেছেন; তবে পাঠক হিসাবে আমাকে তা অতখানি আবেগ দেয়নি। মনে হয়নি যে এতে আলোচ্য সাহিত্যিকের প্রশংসিত রসবোধ কিংবা সাহিত্যবোধ ঠিক অতখানি তীব্রভাবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে যা বাদল বসুর চোখে হয়েছিল কথাগুলো লেখার সময়। সম্ভবত, ব্যক্তিগত আরও অনেক কিছুই তাকে সাহিত্যিকদের সম্পর্কে পূর্বেই প্রভাবিত করে রেখেছিল, এবং ওইকথাগুলো ভাল লাগার পেছনে সেইসব অভিজ্ঞতার ভূমিকা অনেক বেশি।
তবে হ্যাঁ, এসব আনুসাঙ্গিক আর হিসাব নিকাশ সংক্রান্ত বেশ অনেক কথা উহ্য রাখতে পারলে এই বইতে প্রচুর সাহিত্যিকের সংস্পর্শে আ���ার সুযোগ পাঠক পাবে। সেই দিকগুলো ভাল লাগতে পারে। আমারও লেগেছে কিছুকিছু, নাহলে বইটা হয়তো শেষ পর্যন্ত পড়া হতো না। বইয়ের অনেক যায়গায় চলে এসেছে সুনীল, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুকুমার সেন, সত্যজিৎ রায়, এর মতো সাহিত্যিকদের সঙ্গে বইটির লেখকের আন্তরিক কিছু সাক্ষাত বা অভিজ্ঞতার কথা। প্রকাশক হিসাবে বাদল বসুর কিছু কিছু কাজের নিদর্শনও পাওয়া গেছে। অনেক প্রকাশকের তুলনায় তিনি অনেকাংশেই বেশি বৈশ্বিক ছিলেন। ঘুরেছেন পৃথিবীর বেশ কিছু দেশ, সেসব দেশে করেছেন বাংলা বইমেলা। প্রবাসী লেখকদের সঙ্গে কাজের সূত্রে যোগাযোগ রেখেছেন, তাদের টুকিটাকি সাহায্য করেছেন সময়ে অসময়ে।
লেখক বাংলাদেশে আনন্দ পাবলিশার্সের বই নকল করে ছাপানো এবং সেসব নকল বই বিক্রয় নিয়ে বেশ সরব ছিলেন। সঙ্গত কারণেই ছিলেন। এ কথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে, অন্যের লেখা চুরি করে বিক্রয়ের যে অভ্যাসটি বাংলাদেশে বন্ধের কোনো জোরালো ব্যবস্থা করা হয়নি, তা পরবর্তীতে দেশিয় প্রকাশনাকেও যথেষ্ট খতিগ্রস্থ করেছে এবং করছে। এক্ষেত্রে লেখকের আক্ষেপ আমার অন্তত যৌক্তিক মনে হয়েছে, কেননা, আনন্দ পাবলিশার্সের বইয়ের একটি বড় অংশের ক্রেতা হতে পারতো বাংলাদেশ। এখনো একটা বড় অংশের ক্রেতা, বরাবরই ছিল, কিন্তু সংখ্যাটা প্রকাশকের দিক থেকে দেখলে আরও অনেক অনেক বেশি বড় হতে পারতো। তাই আক্ষেপটা নানান সময়ে ফিরে এসেছে বইয়ের পাতায়।
যাই হোক, সার্বিক বিচারে বইটিকে পাঁচে তিন দেওয়া গেল। যা আশা করে পড়েছিলাম, তা পেলে পাঁচে পাঁচ দিতেও দ্বিধা ছিল না। কিন্তু, দিতে পারলাম না। যদি বইটি থেকে পাঠক কিছু পাবার আগ্রহ রেখে থাকেন তবে তা হতে পারে বর্তমানে কালের বেশ কিছু পরিচিত, কিংবা কালের স্রোতে বিস্মৃত হয়ে যাওয়া সাহিত্যিকদের সম্পর্কে আরেকটু জ্ঞান লাভ। তাদের কাজের সম্পর্কে এবং কাজের পদ্ধতি সম্পর্কে আরেকটু জানার সুযোগ প্রাপ্তি। এর বেশি আশা নিয়ে বইটি পড়তে গেলে সম্ভবত আশাহত হবেন, সুতরাং তেমনটা না করার পরামর্শ থাকবে।
যারা বাংলায় বইটই পড়েন, তাদের জন্য অবশ্যপাঠ্য হল বাদল বসুর এই আত্মজীবনী। আনন্দ পাবলিশার্স-এর প্রকাশক হিসেবে বাদলবাবু শরৎচন্দ্র থেকে শ্রীজাত এক আশ্চর্য রেঞ্জের লেখক/কবি/প্রবন্ধকারের বই বার করেছেন। এই বইয়ে আছে সেই সব অভিজ্ঞতার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ। সুন্দর ছাপা, লে আউট (প্রকাশকের বই বলে কথা!) এবং তার সাথে ঝরঝরে লেখা - প্রায় ৬০০ পাতার বই দু-তিনদিনে নেমে গেল!
দারুণ বই। আনন্দ পাবলিশার্সের কর্ণধার হিসেবে পশ্চিমবঙ্গে বাংলা ভাষার কম বেশি সব বিখ্যাত লেখকের বই প্রকাশ করেছেন। জানলাম তারই কিছু পেছনের গল্প। এক নিঃশ্বাসে শেষ হয়ে গেল যেন।
পিওন থেকে প্রকাশক ~ বাদল বসু আনন্দ পাবলিশার্স ১০০০ টাকা
জীবন শুরু করেছিলেন সাইকেল পিওন হিসেবে। তারপর তিনি নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে তিনি হয়েছিলেন আনন্দ পাবলিশার্সের প্রকাশক। বাদল বসুর জীবন ছিল সব দিক থেকেই বর্ণময়। সেই বর্ণময় জীবনে তিনি পেয়েছিলেন সত্যজিৎ রায় থেকে রবিশঙ্কর, নীরদচন্দ্র চৌধুরী, অমর্ত্য সেন, শিবরাম চক্রবর্তী, গৌরকিশোর ঘোষ, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শঙ্খ ঘোষ, গুন্টার গ্রাস, সলমন রুশদির মতো বিভিন্ন মানুষের সান্নিধ্যে। সেই সমস্ত মানুষদের সাথে পরিচয়ের সূত্রপাত থেকে শুরু করে আনন্দ পাবলিশার্সের অনেক ভেতর খবর এই বইতে আছে। যেমন শিবরাম চক্রবর্তী কেমন ছিলেন, ওনার বই "ঈশ্বর পৃথিবী ভালোবাসা" কেন আনন্দ হঠাৎ করে প্রকাশ করা বন্ধ করে দিয়েছিল। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের জনপ্রিয়তা কেমন ছিল।, তসলিমা নাসরিন আর সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কথা, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের লেখার উৎস কী ছিল, লেখক সত্তা ছাড়াও শীর্ষেন্দুর রয়েছে এক আধ্যাত্মিক সত্তা, বুদ্ধদেব বসু প্রুফ দেখতেন কেমন করে, রমাপদ চৌধুরী গল্পসমগ্র প্রকাশের কথা, বিমল কর গল্প লেখার পর সেই কলমটি তাঁর কোনও ভক্তপাঠককে দিয়ে দিতেন, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আর বিমল করের মধ্যে একটা ঠান্ডা লড়াই ছিল। সমরেশ বসু "বিবর" প্রকাশ করার পর, মামলা দায়ের হয়, বইটি নাকি অশ্লীল। একই অভিযোগ "প্রজাপতি" নামে তাও মামলা হয়। মামলার শুনানির দিন আদালত কক্ষে মানুষের ঢল নেমেছিল। সমরেশ বসুর পক্ষে প্রধান সাক্ষী ছিলেন বুদ্ধদেব বসু। শোনা গিয়েছিল বিপক্ষে সাক্ষী দিতে আসবেন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, কিন্তু শেষপর্যন্ত আনেননি। শেষ পর্যন্ত দোষী সাব্যস্ত হল, বিবর - এর জন্য ২০০ টাকা জরিমানা আর প্রজাপতির মামলা চলতে থাকল। হাইকোর্টও লেখকের পরাজয় হল, প্রজাপতি-র প্রকাশনা বন্ধ হল। আনন্দ পাবলিশার্স, দেশ পত্রিকার দপ্তর তল্লাশি হল। শেষ পর্যন্ত ১৭ বছর পর সুপ্রিম কোর্টের রায়ে প্রজাতির নির্দোষ প্রমাণিত হল। তারপর ১৯৬৫ সালে প্রজাপতি-র দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হল। সমরেশ বসুর "দেখি নাই ফিরে" লেখকের কাহিনী, ওনার পারিবারিক ঝামেলা, উইল নিয়ে মামলা করে ওনার দ্বিতীয় স্ত্রী উপর তাঁর বড়মেয়ে। এমনকি ওনার মৃত্যুর পরেও ওনার মৃতদেহ নিয়ে শুরু হল রাজনীতি। সত্যজিৎ রায় তার বইয়ের সমস্ত কিছু নিজেই দেখতেন। প্রচ্ছদ থেকে শুরু করে বইয়ের মাপ, বাঁধাই, লে আউট, অলংকার সব। শেষের দিকে ওনার শরীর খারাপ হওয়ার পর সমীর সরকার ওনার বইয়ের ইলাস্ট্রেটর ছিলেন। কিন্তু "শকুন্তলার কন্ঠহার" উপন্যাসে ভুল করে ফেলদার ডান হাতে ঘড়ি পরিয়ে দিলেন। সত্যজিৎ বাবু দেখে অসন্তুষ্ট হলেন। সত্যজিৎ রায় এতই ক্ষুণ্ণ হয়েছিলেন যে, এরপর আর কখনো তিনি সমীর সরকারকে দিয়ে নিজের গল্পের ইলাস্ট্রেশন করাননি। এখন বেশ কয়েক দশক ধরে তাঁর সমান রয়্যালটি অন্য কোন সাহিত্যিক আনন্দ পাবলিশার্স থেকে পান না। প্রশান্তকুমার পালের "রবিজীবনী" লেখার ইতিহাস। নবম খন্ড প্রকাশকের পর ক্যান্সারে মারা যান। অসমাপ্ত থেকে যায় মহৎকীর্তি। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সাথে জয় গোস্বামীর সম্পর্ক, মান অভিমান। সত্যজিৎ রায়ের যখন হার্টের অসুখ ধরা পড়ল, ডাক্তাররা সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা নিষেধ করলেন। নির্মাল্য আচার্য বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ব্যাপারটা বলেন। এরপর পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পক্ষ থেকে সত্যজিৎ রায়ের বাড়িতে লিফট বসানো হয়।
প্রকাশকদের নানা ধরনের অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। কখনও খারাপ, কখনও ভাল। যে-অভিজ্ঞতাই হোক প্রকাশকদের নির্লিপ্ত থাকতে হয়। মুস্কিল হল, লেখকরা মর্মস্পর্শী ভাষায় নিজেদের অভিজ্ঞতা জানাতে পারেন। প্রকাশকদের সেই ক্ষমতা বা উপায় থাকে না - আর এই বইটা হল সেই প্রকাশকদের আত্ম কথা। এইরকম আরও অনেক প্রকাশক, লেখকদের ভেতরের খবর এই বইতে আছে। তাই প্রকাশনীর জগৎটা কেমন, লেখক প্রকাশকের সম্পর্ক কেমন এই সব জানার ইচ্ছা থাকে তাহলে এই বইটা অবশ্যই পাঠ্য।
অবনীন্দ্রনাথ, অতুল বসুর মতো বিখ্যাত শিল্পী ছিলেন হেমেন মজুমদার। আনন্দ পাবলিশার্স থেকে ১৯৯১ সালে বের হয় তার বই "ছবির চশমা"। এমন অদ্ভুত নামের পিছনের ব্যাখ্যাও বইয়ের শুরুতে লিখে দিয়েছিলেন শিল্পী, - "কলাবিদ্যার পরীক্ষায় চাই অসাধারণ দৃষ্টিশক্তি। দৃষ্টিহীনতায় চশমার ব্যবহার করা হয়। তাই "ছবির চশমা"।
বাদল বসু-র(দ্বিজেন্দ্রনাথ বসু) "পি��ন থেকে প্রকাশক” বইয়ের কথা বলতে যেয়ে "ছবির চশমা"র অবান্তর প্রসঙ্গ টানার কারন মূলত সাগরময় ঘোষ। সাগরময় ঘোষের "হিরের নাকছবি" অথবা "সম্পাদকের বৈঠকে" পড়ার সুবাদে যে প্রবল তৃষ্ণা এবং আগ্রহ, সেই সমপরিমান আগ্রহ বাদল বসুর বইটাতে থাকা অস্বাভাবিক কিছু না। তবে এটা মাথায় রাখাই উত্তম, সাগরময় ঘোষের দেখার চশমা এবং বাদল বসুর দেখার চশমা আলাদা। পাঠকও পড়তে পড়তে চশমার পাওয়ার ঠিক করে নিবে।
তুলনামূলক চিত্রে না যাই। লেখা অযথাই বড় হবে। আত্মজীবনীর ছকে হয়তো পড়বে না পিওন থেকে প্রকাশক। স্মৃতিকথা হিসেবেই বেশি মানানসই। নিজের কথা খুব সামান্যই এসেছে। বাদল বসুর লেখা ঝরঝরে - তরতরিয়ে পড়ে ফেলা যায়। ৬০০+ পৃষ্ঠার বইটা পড়তে তাই সময় লাগলো না বেশি। কোথাও বিরক্তি আসারও কারন দেখিনি। আনন্দ পাবলিশার্স এর প্রকাশক বাদল বসু। তাই বলতে গেলে বৃহৎ এই স্মৃতিকথায় অধিকাংশ লেখক/লেখিকা বা প্রকাশনার সাথে সংশ্লিষ্ট মানুষদের কথা এসেছে। নামগুলো বলে ভারী করা নিষ্প্রয়োজন।
বাদল বসু-র "পিওন থেকে প্রকাশক" মোটাদাগে একজন প্রকাশকের অভিজ্ঞতারই বয়ান। সাথে অজস্র লেখক-লেখিকার জানা-অজানা কথা, গল্প। বিশেষ বলেই উল্লেখ করা যে, নীরদ সি চৌধুরী, বাণী বসু, শক্তির পদ্যসমগ্র, রানী চন্দের প্রসঙ্গ আলাদা করে উজ্জ্বল নতুন করে আলো ফেলার স্বরূপ। পাশাপাশি প্রকাশনা জগতের কিছু কাজের নমুনা, টার্ম পাঠক হিসেবে আমার জানাকে অনেকটা আলোকিত করেছে। তৃষ্ণাও বাড়িয়েছে।
বাদল বসুর কাছে বিভিন্ন সময়ে নানা লেখক-লেখিকার পাঠানো অজস্র চিঠির নমুনাও লিপিবদ্ধ আছে বইয়ে। সুখপাঠ্য। তবে লেখক হয়তো আরও একটু ভাবনা-চিন্তার করেই সেগুলো যাচাই বাছাই করতে পারতেন। জীবনটা তো কোন হিসেবের ডায়েরী না, যেখানে সব দেনা-পাওনার হিসেব লিখে রেখে পরবর্তী সময়ে সেগুলো বোল্ড করে তুলে ধরা লাগবে। হ্যাঁ, একাধারে যেমন সেগুলো ঐ সময়ের লেখক-লেখিকাদের একটা সাম্যক অবস্থারও বর্ণনা দেয়, ঠিক তেমিন বাদল বসুকেও হয়তো এমন একটা জায়গায় দাঁড় করিয়ে দেয় যেটা তর্কাতিত ভাবে সিদ্ধ না। এই জায়গাটায় বেহিসেবী হওয়াটা কিছুটা খচখচে অনুভূতি এনে দেয়।
একটা দারুন বই অন্য অনেক বইয়ের রেফারেন্স এনে দেয়। সেই সূত্রে বাদল বসুর "পিওন থেকে প্রকাশক" হিরের খনি বলা চলে। যদিও তার অনেককিছুই আগে জানা এই জনরায় প্রচুর আগ্রহ থাকার কারনে। যতটা নতুন পেয়েছি তার পাল্লাও বেশ ভারী।
সহজ ও ঝরঝরে গদ্যে লেখা বাদল বসুর "পিওন থেকে প্রকাশক" পূর্বেই বলেছি। আনন্দ পাবলিশার্সের টপ নচ প্রডাকশনে ৬০০+ পৃষ্ঠার রয়্যাল সাইজের বই হয়েও বেশ হালকা। তবে এত হালকার সমষ্টিতে মোটেও হালকা এবং ওজনহীন নয় পিওন থেকে প্রকাশক। গুরুত্বপূর্ন এবং অসম্ভব উপভোগ্য।
সময়টা ২০১৬ সাল, Bookstreet এর একটি বিজ্ঞাপনে দেখতে পেলাম "পিওন থেকে প্রকাশক" বইটি। Memoirs এর প্রতি দুর্বলতা আমার সবসময়। তার সাথে যুক্ত হয়েছিল বইটির নাম। প্রচ্ছদ টাও দারুন ছিল একজন সাইকেলে করে চলছে। সেই ব্যক্তিই বিখ্যাত প্রকাশক আনন্দ পাবলিশার্সের বাদল বসু। সে সময় ছাত্র থাকার দরুন আনন্দ পাবলিশার্সের এত দামি বই কেনা বাংলাদেশ থেকে আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। এখনো যে আছে তাও বলছি না। এক বন্ধু কলকাতায় গেলে তাকে দিয়ে আনিয়ে নিয়েছিলাম ২০১৭ সালে।
দহিজুরি গ্রামের বাদল বসু কিভাবে পিওন থেকে প্রকাশক হলেন সে কথাই লেখক শুরুর দিকে বলেছেন তবে সে লেখা বেশি দীর্ঘ নয় খুবই সামান্য। লেখক তার এই সুদীর্ঘ পথচলার বর্ণনা করতে গিয়ে কিভাবে তার সাথে পরিচয় হয়েছে সেই সময়ের বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয় সাহিত্যিকদের এবং তাদের সাথে কাজ করার অভিজ্ঞতা, খুনসুটি ও মনমালিন্য এসব বিষয় তার লেখনীতে লেখক তুলে ধরেছেন।
লেখক তালিকাটাও বেশ দীর্ঘ। প্রায় সকল রকম গুণ নিয়ে জন্ম নেয়া সত্যজিৎ রায়, শরৎ রচনাবলি প্রকাশের চ্যালেঞ্জ, ভাষাচার্য সুকুমার সেনের ডিটেকটিভ গল্প,উপন্যাসের প্রতি ভালোবাসা , নিরোদ চন্দ্র, জয় গোস্বামী, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, বাণী বসু, বিজয়া রায়, শঙ্খ ঘোষ, মহশ্বেতা দেবী, নবনীতা দেব সেন, লীলা মজুমদার, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, সমরেশ বসু, সমরেশ মজুমদার, বিমল বসু, বিমল কর, প্রেমেন্দ্র মিত্র, গৌড় কিশোর ঘোষ, রমাপদ চৌধুরী, বুদ্ধদেব বসু, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, মতি নন্দী, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, পরিতোষ সেন, শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়, হালের শ্রীজাত সহ আরো অনেকের সাথে ব্যক্তিগত জীবনের অনেক স্মৃতি তিনি রোমন্থন করেছেন। যারা বিখ্যাত ব্যক্তিদের চিঠি পড়তে ভালোবাসেন তাদের ভালো লাগতে পারে বইটি প্রচুর বিখ্যাত ব্যক্তির চিঠি সংযুক্ত করা আছে বইটিতে দিন, তারিখ সমেত। বইটিতে আত্মপক্ষ সমালোচনা নাই বললেই চলে এবং আনন্দ পাবলিশার্স কে একটু বেশিই গ্লোরিফাই করা হয়েছে বলে মনে হয়েছে।
একজন বাংলাদেশি হিসেবে বইটি পড়তে কিছু কিছু যায়গায় আমার যথেষ্টই খারাপ লেগেছে যতবারই বাংলাদেশের কথা লেখা হয়েছে ততবারি পাইরেসি, অকৃতজ্ঞতা এসব কথা লেখক লিখেছেন। ভবিষ্যতে যারা এই বই পড়বে বাংলাদেশিদের সম্পর্কে কি ধরনের ধারণা রাখবে আল্লাহ মালুম। মনে করতে পারে বাংলাদেশের সব মানুষ চোর, বাটপার, অকৃতজ্ঞ। তিনি বাংলাদেশে ভারতীয় লেখকদের বই পাইরেসির বন্ধের ব্যপারে কিছু উদ্যোগ নিয়েছিলেন তবে সেগুলো তেমন ফ্রুটফুল উদ্যোগ ছিল না। দুই দেশের প্রকাশক ও লেখকদের মধ্যে যদি মিউচুয়াল আন্ডারস্ট্যান্ডিং এর মাধ্যমে সমাধান করা যেত তাহলে হয়তো পাইরেসি বন্ধ করা যেত। লেখকরাও তাদের প্রাপ্য সম্মান ও সম্মানী পেতেন সাথে আমরাও সুন্দর ঝরঝরে বই পেতাম।
যাই হোক হ্যাপি রিডিং। আমি রিভিউ লিখতে পারি না এসব কিছু অগোছালো কথা লিখে গেলাম। ভুল,ভ্রান্তি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। #2023 #Memoir #biography
🌿📜এই বই সম্পর্কে যতোই বলিনা কেন কম বলা হবে। প্রকাশক বাদল বসু ভীষণ সুন্দর ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন লেখকদের চরিত্র সম্পর্কে... এই বই পড়ে যে সমস্ত লেখকদের সম্পর্কে জানতে পেরেছে সেই সব লেখকদের লেখা বই পড়ার ইচ্ছে ততওই বাড়ছে....
🌿📜সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, থেকে শুরু করে সত্যজিৎ রায়, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, বুদ্ধদেব বসু, তসলিমা নাসরিন, রবিশঙ্কর, নীরদচন্দ্র চৌধুরী, অমর্ত্য সেন, শিবরাম চক্রবর্তী, গৌরকিশোর ঘোষ, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, শঙ্খ ঘোষ, গুন্টার গ্রাস, সলমন রুশদ, এছাড়াও আরো কতো নামিদামি লেখক লেখিকা সম্পর্কে জানতে পারলাম।
🌿📜অবশ্যই collection এ রাখার মতো একটি বই। আমার প্রিয় বই এর তালিকায় add হলো এই বই! এই বই এর বাঁধাই থেকে শুরু করে পেজ পেজ কোয়ালিটি, Front Just wowww! রয়েল সাইজের বই, হাতে নিলেই একটা premium feel পাওয়া যায়....
🌿📜আনন্দ পাবলিশার্সের প্রাক্তন-প্রকাশক বাদল বসু (দ্বিজেন্দ্রনাথ বসু)-র 'পিওন থেকে প্রকাশক' রচনাটি ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হচ্ছিল 'দেশ' পত্রিকায়। লেখাটি শেষ করলেও 'দেশ' পত্রিকায় তার সম্পূর্ণ প্রকাশ তিনি দেখে যেতে পারেননি। বর্তমান গ্রন্থে সেই পূর্ণাঙ্গ রচনাটিই।
বাংলা সাহিত্য চর্চার একটা ইতিহাস পড়ে শেষ করলাম। বাদল বসু ছিলেন বিখ্যাত প্রকাশক সংস্থা আনন্দ পাবলিশার্স এর কর্ণধার, তার স্মৃতিচারণা মূলক বইটিকে একটি দলিল বলা যেতেই পারে। তাঁর ব্যক্তিজীবনের কথা অল্পই আলোচনা করেছেন তিনি, প্রকাশনা জীবনের বিভিন্ন ঘটনার পর্দা উন্মোচিত করেছেন বাদল বাবু। কলকাতাতে সাহিত্যচর্চার আসর, বিভিন্ন সাহিত্যিক, ব্যক্তিত্ব, লেখক,কবি ইত্যাদি সবার ছোটখাটো ঘটনাগুলি, যেগুলি কখনোই হয়ত পাঠক সমাজে প্রকাশ পেত না, সেগুলি বৈঠকি চালে লিখেছেন তিনি। সত্যজিৎ রায় থেকে শুরু করে শ্রীজাত অব্দি প্রায় প্রত্যেককে নিয়েই একটি অধ্যায় তিনি লিখেছেন। খুবই উপভোগ্য লেখনী, তবে দু-এক জায়গায় কিছু লেখকের ব্যক্তিগত ঘটনার ব্যাপার হয়ত পাঠকের অস্বস্তির কারণ হতে পারে। তবুও মোটের উপর কলেজ স্ট্রিটের লেখকদের ব্যাপারে এবং ইতিহাসের ব্যাপারে জানতে বইটি অন্যতম সেরা।
বাংলা ভাষার বই যারা পড়েন তাদের মধ্যে আনন্দ পাবলিশার্সকে চিনেন না এমন মানুষের সংখ্যা খুবই কম হবে। সেই প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের প্রকাশক ছিলেন বাদল বসু। তার জীবনের পাশাপাশি এসেছে সাহিত্য ও সাহিত্যিকদের কথা, বই প্রকাশের বিভিন্ন দিক।
বাংলাদেশের বই বাজার সম্পর্কে লেখা অংশগুলো পড়ে খারাপ লাগলো।
বাদল বসুর এই লেখাটি "দেশ" পত্রিকায় ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হচ্ছিল তখনই পড়ছিলাম। পরে উনি মারা যাওয়ার পর এই লেখা বই আকারে প্রকাশ পায়, তখন আবারও পড়ি। বেশ সুখপাঠ্য, পছন্দের একটি বই।
বাদল বসু-র লেখা “পিওন থেকে প্রকাশক” বইটি পড়ে শেষ করতে আমার লাগল, সব মিলিয়ে ৩ দিন। আশা করি আর বলে দিতে হবে না যে বইটি আমাকে কতটা টেনেছে। লেখালিখির জগতে লেখক যতটা নামডাক পান, তার সিকিভাগ ও প্রকাশক বা সেই শিল্পী যিনি প্রচ্ছদ এঁকেছেন তার কপালে লেখা থাকে না। এমনকি, যদি জিজ্ঞেস করা হয় যে একজন প্রকাশকের কি কাজ, সেটিও হয়ত অনেক পাঠক ঠিক করে বলতে পারবেন না। সেই দলে আমিও পড়ি। কিন্ত আমার চিরকাল-ই জানতে ইচ্ছে করত যে সত্যি করেই এই প্রকাশক মশাই এর কাজটা কি হয়? কি কি বিষয়ে দেখতে হয় ওনাকে?
বাদল বসু-র লেখা সুপাঠ্য এই বইটি পড়ে সেইসব প্রশ্নের অনেক উত্তর আমি পেয়ে গেলাম। ছোট করে বলতে বললে, বলতে হয় একজন প্রকাশক-কে সব কিছুই দেখতে হয়। বাঁধানো থেকে সম্পাদনার কাজ থেকে মার্কেটিং, এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে টাকা লেখক-কে পয়সার জোগান করে দেওয়া বা কারোর জন্যে ৬ লাখের মধ্যে ফ্ল্যাট খুজে দেওয়া। লেখক বইতে নিজের সহকর্মীদের যেমন অজথা গুনগান করেননি, তেমনই যেখানে সমালোচনা দরকার, সেগুলিও উনি মুক্ত হস্তে মৃদু ভাষায় করেছেন। সমালোচনাগুলিও কিন্ত কখনোই তাদের লেখা নিয়ে নয়, বরং তাদের কিছু কিছু প্রফেশনাল এটিকেট নিয়ে। এবং এখানেই ওনার মহত্ব যে বারংবার উনি বলে গেছেন যে উনি নিজে কবি, লেখক বা শিল্পী নন যে উনি এর ওর কাজের সমালোচনা করবেন।
উনি লেখক নন ঠিক-ই, কিন্ত লিখলেও উনি যে বেশ ভালো লিখতেন, সেটি এই বই পড়লেই বোঝা যায়। ভারী শব্দের ফুলজুরি নেই, লম্বা লম্বা বাক্য নেই। তার জায়গায়, সাধারন শব্দ, ছোট সেন্টেন্স ব্যাবহার করে উনি বইটিকে সহজপাঠ্য ও উপভোগ্য করে তুলেছেন।
সব শেষে বলতে পারি, যারা ব্যাতিক্রমী একটি জীবনি পড়তে চান, যেখানে এমন একটি মানুষ নিজের জীবনের কথা শোনাবেন, যে মানুষটি নিজে চিরকাল আড়ালে থেকে আমাদের হাতে তুলে দিয়েছেন একের পর এক বই, তারা এই বইটী কিনে ঠকবেন না।