আলতাফ পারভেজের জন্ম ২১শে ফেব্রুয়ারি ১৯৬৬। দর্শনশাস্ত্রে প্রথম স্থান অধিকার করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর অধ্যয়ন শেষ করেন। ছাত্রত্ব ও ছাত্র রাজনীতির পর সাংবাদিকতার মাধ্যমে পেশাগত জীবন শুরু। পরে গবেষণা ও শিক্ষকতায় সংশ্লিষ্টতা। প্রকাশিত গ্রন্থ ছয়টি। যার মধ্যে আছে—‘কারাজীবন, কারাব্যবস্থা, কারা বিদ্রোহ : অনুসন্ধান ও পর্যালোচনা’, ‘অসমাপ্ত মুক্তিযুদ্ধ, কর্নের তাহের ও জাসদ রাজনীতি’, ‘বাংলাদেশের নারীর ভূ-সম্পদের লড়াই’, 'মুজিব বাহিনী থেকে গণবাহিনী ইতিহাসের পুনর্পাঠ'।
‘বাংলাদেশ চাচ্ছে আন্তর্জাতিক নদীগুলোর উজানে পানি বৃদ্ধির খবর বাংলাদেশ যেন অন্তত ৫৫-৬০ ঘন্টা আগেই পায়। ভারত এত আগে সতর্কীকরণ বার্তা প্রেরণের অনাগ্রহী। যদিও নেপালের সঙ্গে সে অনুরূপ চুক্তি করে রেখেছে। নেপালের অভ্যন্তরে অন্তত ৪২টি স্থানে ১৯৮৯ সাল থেকে নদীর পানির হ্রাস-বৃদ্ধি নজরদারি করা হচ্ছে।‘ (পৃ. ৯৭)
জরুরি একটা বই। সমানভাবে জরুরি শুরুতে হাসনাত কাইয়ূমের দীর্ঘ ভূমিকাটি। ভারত-বাংলাদেশের ৫৪টা যৌথনদীর ওপরই ভারত নানান বাঁধ-বৃত্র (barrage) নির্মাণ করে রেখেছে। তার থেকে আলোচিত ৩-৪ টা নদী নিয়েই বইয়ের আলোচনা। বাংলাদেশের প্রাণ-প্রকৃতি-অর্থনীতি কীভাবে বিনষ্ট হচ্ছে, তার সংক্ষিপ্ত বিবরণের পাশাপাশি ভারতের কৃষক-আদিবাসীরাও কেমন করে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, হবে [বইটি ২০১৫ সালে লিখিত] এবং তাদের বাঁধ-বিরোধী আন্দোলন সংক্ষেপে বিবৃত হয়েছে। বিভিন্ন খবর-নিবন্ধ-বইয়ের পাশাপাশি দুই-একটি গবেষণাপত্রও উদ্ধৃত হয়েছে। মজার ব্যাপার, ভারতই যে যৌথনদীর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাথে অসহযোগিতা করছে, তা না—চীনও করছে।
‘...কিন্তু কৃষিতে পানির উৎপাদনশীলতা বিশ্বের যে কোন অঞ্চলের চেয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় কম।‘—এখানে ‘পানির উৎপাদনশীলতা‘ বলতে লেখক কী বোঝাতে চেয়েছেন? আবার একটু বাদেই ‘আবহাওয়ার পরিবর্তন দক্ষিণ এশিয়ায় পানির বিবাদ বাড়িয়ে তুলতে পারে‘—এখানে বোধ করি আবহাওয়ার স্থলে ‘জলবায়ু পরিবর্তন‘ হবে। ‘আন্তর্জাতিক পানি আইন ও প্রথার আলোকে বাংলাদেশ-ভারত পানি বিবাদ‘ পরিচ্ছেদে দুই জায়গায় উইকিপিডিয়াকে তথ্যসূত্র হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে উইকিপিডিয়ার সংশ্লিষ্ট নিবন্ধে উল্লিখিত তথ্যসূত্র ব্যবহার করা যেত।
পেহেলগামে সন্ত্রাসী হামলার জেরে পাকিস্তানের সঙ্গে থাকা সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিত করেছে ভারত। সিন্ধুসহ ছয়টি নদীর পানি বন্টন চুক্তি নিয়ে আলোচনা শুরু হয় ১৯৫০ সালে। বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় ওয়াশিংটনে এই বৈঠকের সূচনা। টানা দশ বছর আলাপ-আলোচনা করার পর ১৯৬০ সালে ছয়টি নদীর পানি ভাগাভাগি করতে একমত হয় ভারত ও পাকিস্তান। বিশ্বব্যাংকের মীমাংসায় সই হয় সিন্ধু পানি চুক্তি। অপরদিকে, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গঙ্গা নদীর পানি নিয়েও পূর্ব পাকিস্তানে অসন্তোষ ছিল। প্রথমে ভারতের সঙ্গে আলোচনায় গঙ্গার পানি বন্টন নিয়ে আলাপ হলেও পরে আর গুরুত্ব পায়নি পূর্ববঙ্গবাসীর পরম আরাধ্য গঙ্গার পানি। ষাটের দশকেই আইয়ুব পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য পানির ন্যায্য হিস্যা চেয়ে চুক্তি করছেন। এই চুক্তির মাধ্যমে প্রাপ্ত পানি দিয়ে পাকিস্তানের ৯৪ ভাগ কৃষি জমি সেচের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। তাই সিন্ধু চুক্তি স্থগিতে ঘোষণায় পাকিস্তান এত কড়া প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে। যাহোক, আইয়ুব পশ্চিম পাকিস্তান পানি পাচ্ছে না তা নিয়ে চিন্তিত ছিলেন। পূর্ব পাকিস্তানের স্বার্থ দেখার প্রয়োজনবোধ করেননি। আবার নেহেরুর ভারত পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে ফারাক্কা বাঁধ তৈরির প্রস্তুতি নিয়ে পূর্ব পাকিস্তানকে 'পানিতে মারার' আয়োজন সম্পন্ন করছেন। অথচ বিশ্বব্যাংকের চাপে পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে সিন্ধুর পানি ভাগাভাগি করে নিতে সই-সাবুদে অমত নেই। মোটকথা, ভারত ও পাকিস্তান দুই পক্ষই বাংলাদেশকে বঞ্চিত করার নীতির প্রশ্নে একমত।
একাত্তরের পর ভারতের 'কৃতজ্ঞতার ফাঁদে' আটকে পড়ে সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশ। নয় মাস ভারতের সহযোগিতায় বাংলাদেশ শত্রুমুক্ত হয়। এদিকে ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ শেষ করে ভারত। ১৯৭৫ সালের ২১ এপ্রিল একচল্লিশ দিনের জন্য পরীক্ষামূলকভাবে চালু হয় ফারাক্কা বাঁধ। শেখ মুজিবের সরকারের পক্ষে বাঁধা দেওয়ার তাকত ছিল না। বরং তিনি বাঁধের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের একটি প্রতিনিধিদল পাঠান। এ যেন নিজ দেশের জানাজা পড়ার ব্যবস্থা নিজেই করে দেওয়া!
ভারতের সেই একচল্লিশ দিন গত পঞ্চাশ বছরেও শেষ হয়নি। গত পঞ্চাশ বছর ধরে 'পরীক্ষামূলকভাবে' বাঁধ চালু রয়েছে। বাংলাদেশের সবগুলো সরকারের নতজানু পররাষ্ট্রনীতি ও বৃহৎ প্রতিবেশী ভারতের প্রতারণায় মনে হয়, বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গকে শ্মশানভূমি না বানিয়ে ভারত থামবে না।
ভারতের সঙ্গে চীনের ব্রহ্মপুত্র নদের পানি নিয়ে বিরোধ রয়েছে। এই নদ নিয়ে ভারতের যুক্তি অধিকারভিত্তিক নীতি ( Right-based approach) ; যেখানে পানির ন্যায্য হিস্যা প্রাপ্তি ভাটির দেশের অধিকার। অন্যদিকে, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের নীতি হলো চাহিদাভিত্তিক ( Necessity-based) ; যতটুকু ন্যূনতম দরকার, ততটুকু পানি ভাটিতে অবস্থিত বাংলাদেশকে দেওয়া হবে কি না, তা নিয়েই ভারত আলোচনা চালাতে চায়। ভাটি অঞ্চলে অবস্থিত বাংলাদেশের পানি পাওয়াকে অধিকার হিসেবে মানে না ভারত। এমনকি পানি বন্টন নিয়ে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার বাইরে বিশ্বসম্প্রদায় তথা তৃতীয় পক্ষকে যুক্ত করতে চায় না নয়াদিল্লি।
তিস্তায় গজলডোবা, গঙ্গায় ফারাক্কার পর মণিপুরে টিপাইমুখ বাঁধ তৈরি করে বাংলাদেশের নদীগুলোকে মেরে ফেলার সব রকমের প্রস্তুতি ভারতের রয়েছে। কিন্তু তা মোকাবিলার মতো কূটনৈতিক প্রজ্ঞা ও রাজনৈতিক সততা আমাদের নেই। তার পরিণাম কী হতে পারে ইতোমধ্যেই উত্তরবঙ্গের মানুষ টের পাচ্ছে।
'বাংলাদেশ-ভারত পানিযুদ্ধ' অত্যন্ত দরকারি একটা বই। তরফদার প্রকাশনীর মাত্র এক শ দশ পাতার বইটির তথ্যবহুল ও প্রাসঙ্গিক একটি ভূমিকা লিখেছেন হাসনাত কাইয়ূম। পানি নিয়ে বিরোধে ভারতের অপকৌশল, পানি বন্টনে আওয়ামী লীগসহ বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর দেউলিয়াত্ব ও আমাদের করণীয় সম্পর্কে সংক্ষেপে জানতে বইটা সহায়ক। তবে বরাবরের মতো আলতাফ পারভেজের গদ্য সুখপাঠ্য নয়। খানিকটা যেন আড়ষ্ট।
ভারত বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশে বয়ে যাওয়া নদীর পানি নিজের দেশে টেনে সরিয়ে নিচ্ছে। বাংলাদেশের অকল্পনীয় ক্ষতির সম্ভাবনা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ সরকার এসব প্রকল্পের সামান্যতম বিরোধীতা করে নি। সেসব প্রকল্পগুলোর বর্ণনা। বইটা কোনো হরর বইয়ের চেয়ে কম ভীতিকর না। বইটা অনেকদিন মার্কেট আউট ছিল। সরকার পতনের পর দ্বিতীয় মুদ্রণ বাজারে আসলো। কেন মার্কেট আউট ছিল পড়ে বুঝতে পারলাম।