"সোয়াচান পাখি " কিংবা " আমার গায়ে যত দুঃখ সয়" উকিল মুন্সীর এই গানগুলো প্রয়াত বারী সিদ্দিকীর কল্যাণে লোকের মুখেমুখে ফেরে কিংবা হুমায়ূন আহমেদের "মধ্যাহ্ন" উপন্যাসের মাধ্যমে উকিল মুন্সীকে পাঠক চিনতে শেখেন অন্যভাবে। আগ্রহ জন্মায় এই কৃতী মানুষটিকে নিয়ে আরো জানবার।
ওয়াহিদ সুজন উপন্যাসের উকিল মুন্সীকে নয়, আসল উকিল মুন্সীর সন্ধানে বেরিয়েছিলেন। অনেকটা ভ্রমণ-কাহিনী ধাঁচের এই বই ভ্রমণ-সাহিত্য নয়। আবার, গবেষণাগ্রন্থও বলা যায় না।মোটামুটি তিনটি প্রবন্ধ নিয়ে বইটি। বাজারে প্রচলিত মিথের সত্যতা বনাম সত্যিকারের উকিল মুন্সী যার প্রকৃত নাম আব্দুল হক আকন্দ কে পাঠকের কাছে প্রামাণ্যভাবে উপস্থাপন করেন। যাতে ভেঙে যায় এই সাধক ও কবিকে নিয়ে অনেকের রচিত তথ্য বিনে মিথ্যা বোনা তথ্য! অথচ মাত্র ১০৮ পৃষ্ঠা বইটির! আর প্রচ্ছদটাও খুব সুন্দর। বইটির প্রেক্ষাপটে সুন্দর এই ভূমিকা লিখেছেন ফরহাদ মজহার।
" আমি আগে না জানিয়া সখিরে, কইরে পিরীতি আমার দুঃখে দুঃখে জীবন গেল, সুখ হইল না এক রতি। " ( পৃষ্ঠা ২১)
সংবাদকর্মী ওয়াহিদ সুজন বিরহী উকিলের এই গানটি দিয়ে শুরু করছেন বইটি। যাতে প্রথমেই পাঠক উকিলের ভাবজগতের সন্ধান পায়। ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে উকিলের চিহ্নের খোঁজে যাত্রা শুরু করেন। কিন্তু এই চিহ্ন কি? চিহ্ন স্রেফ উকিলের কবর দেখা না। তাঁর গানের মর্ম বোঝার চেষ্টাও চিহ্নের সামিল।
বাড়ির সন্ধানে লেখক -
" একজন মুরুব্বিকে জিজ্ঞেস করলাম উকিল মুন্সীর বাড়ি কোথায়? জানালেন কাছেই। আরও জানালেন - এই গ্রামের কলম মেম্বার উকিল মুন্সীর নাতনি জামাই। তিনি উকিল মুন্সীর যাবতীয় তথ্য জানাতে পারবেন। " ( পৃষ্ঠা ২৬)
নেত্রকোনায় গিয়েই জানা গেলে উকিলের মেয়ের সাথে দেখা হবে। মোটামুটি আক্কেলগুড়ুম অবস্থা। কারণ "মধ্যাহ্ন" উপন্যাসে তো জানা গিয়েছিল উকিল নিঃসন্তান। এবং সেও তো ব্রিটিশ আমলের কথা। মেয়ে থাকলেও তো তার এতদিন বেচেঁ থাকার কথা নয়। কথাসাহিত্যকে বাস্তব ধরে ওয়াদুদ সুজন আরো গোলমেলে অবস্থায় পড়েন। যখন জানতে পারেন, উকিল মুন্সীর চারজন ছেলে-মেয়ে ছিল এবং তাঁর স্ত্রী বিখ্যাত লাবুশের মা মারা গেছেন দেশস্বাধীন হওয়ার পর! আবার গ্রামের আরেকজন প্রবীণ জানালেন, তিনি মুক্তিযুদ্ধের পাঁচ-ছয় বছর আগে মারা গেছেন উকিল মুন্সী। এ যেন এক গোলকধাঁধা।
এই অবস্থা থেকে উদ্ধার ঘটল উকিল মুন্সীর পুত্রবধূ রহিমা সাথে খাতুনের সাক্ষাতের পর। লেখক এ পর্যায়ে লিখেছেন,
" সম্ভবত ১৯৮০-৮১ সালের দিকে উকিল মুন্সীকে অনেক শোক পোহাতে হয়। সে সময় তার স্ত্রী মারা যান। উকিল মুন্সীর স্ত্রীর মৃত্যুর মাত্র কয়েকমাস পর বড় ছেলে আবদুস সাত্তার মারা যান। রহিমা খাতুনের জবানে জানা যায় এই শোক উকিলকে বেশ দুর্বল করে দেয়। মোটামুটি আট মাসের ভেতরই স্ত্রী আর ছেলের পর উকিলও মারা যান। " (পৃষ্ঠা ২৮)
উকিলের মৃত্যু বিভ্রাট নিয়ে তথ্য আরে আছে।
"সোয়াচান পাখি " গানটির প্রেক্ষাপট সম্পর্কে বারী সিদ্দিকী জানিয়েছিল মৃত বউয়ের শিয়রের পাশে বসে উকিল মুন্সী গানটি রচনা করেন। এদিকে উকিলের পুত্রবধূ দাবি করেছেন,
" এইসব বানানে কথা। উকিল মুন্সী এই গান বেঁধেছিলেন তার পীর মুর্শিদকে নিয়ে। " ( পৃষ্ঠা ২৯)
সুনামগঞ্জের রচির পীর হযরত মোজাফফর এর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছিলেন উকিল। তাঁরই প্রতি নিবেদিত হয়ে রচনা করেছেন একেরপর এক বিচ্ছেদী গান। "আষাঢ় মাইস্যা ভাসা পানি রে। " গানটাও তেমনি প্রক্ষাপটে রচিত।
মিথ বনাম বাস্তবতার ফারাক বুঝতে, খুঁজতে ওয়াহিদ সুজন ক্রমাগত নেত্রকোনা ঘুরেছেন। কথা বলেছেন অনেকের সাথে। ছেলেবেলায় পিতার মৃত্যু, মায়ের আবার বিয়ে ব্যক্তিজীবনকে ভিন্নদিকে নিয়ে গিয়েছিল উকিলের। ভবঘুড়ে সেই জীবনে রীতিমত ঝড় তুলেছিল "লাবুর মা"। এই অবিবাহিত ষোড়শী ছিল গ্রামের "আতরাফ" লবু হোসেনের মেয়ে। অভিজাত পরিবারের ছেলে উকিল মুন্সীর সাথে বিয়ে মেনে নিতে চায় না পরিবার। বিচ্ছেদে পাগলপ্রায় হয়ে যান উকিল মুন্সী।বিয়ে হয়। পরিবারও মেনে নেয়। একইসাথে চলে মসজিদে ইমামতি ও সঙ্গীত সাধনা। এমনও হয়েছে গানের মজলিশ ছেড়ে জানাজার নামাজে যেতে হয়েছে উকিলকে। পঞ্চাশের দশকে মওলানা মঞ্জুরুল হকের গানবিরোধী সমাবেশে মুনাজাত পরিচালনা করিয়েছিলেন মুন্সী!
বহুবিচিত্র শতবর্ষী এক জীবনকে যাপন করেছেন উকিল মুন্সী। সেই উকিলকে, তাঁর দর্শন আর গানকে জানতে সদাউৎসাহ দেখিয়েছেন ওয়াহিদ সুজন। এনেছেন প্রাসঙ্গিকতার স্বার্থে উকিলের সমসাময়িক অন্যান্য শিল্পীর কথা। ভাববাদের নিরিখে কিছুটা ব্যাখা, বিশ্লেষণের চেষ্টা করেছেন - এই সব প্রশংসনীয়। তবে এত চেষ্টাও পাঠক হিসেবে আমাকে কতকটা বিচ্ছিন্নতায় ভুগিয়েছে কারণ ওয়াহিদ সুজন যেন ধারাবাহিকতা রাখতে পারছিলেন না। কোন কথার প্রসঙ্গে কার কথা আসছে তা বুঝতে বেগ পেতে হয়েছে কিছুটা। মানে, লেখাটা সাজাতে পারলেন না পুরোপুরি। প্রথমে শুরু হল ভ্রমণকাহিনি হিসেবে তা থেকে সরতে সরতে কোথায় যেন চলে গেলেন লেখক! পড়াশোনা করেছেন এই বিষয় নিয়ে। তবুও তথ্যগুলো গোছাতে পারেন নি ।
হোক অগোছালো।তবুও উকিল মুন্সী ওরফে আব্দুল হক আকন্দকে বাস্তবতার নিরিখে পাঠকের সামনে আনবার প্রচেষ্টার জন্য ওয়াহিদ সুজনকে ধন্যবাদ দেয়া যেতেই পারে। আর বিশেষ কৃতজ্ঞতা কথাসাহিত্য থেকে ইতিহাস শেখার প্রচেষ্টাকে আরো একবার ঐতিহাসিক ভুল প্রমাণ করার জন্য।