যা মানুষের ক্ষেত্রে অবিচার, ট্যাবু; তা-ই দেবতার ক্ষেত্রে অত্যন্ত স্বাভাবিক। এই দর্শন থেকে দেবতাদের জগতের কাম ও যৌনতা তুলে ধরেছেন লেখক। কখনো সাধনা ভঙ্গ করার জন্য, কখনো শাপে, বরে কিংবা স্রেফ চাহিদা পূরণের জন্যে গ্রীক কিংবা নর্স পুরাণের দেবতাদের চেয়েও হাজারগুণে অদ্ভুত, বিচিত্র উপায়ে উন্মুখ হয়েছেন তারা।
তবে বইয়ের অধ্যায় সাজানোতে সমস্যা আছে। শুরুতে দেব-দেবতার কিছু উদাহরণ দিয়ে লেখক চলে এসেছেন বাস্তবের মর্ত্যলোকে। প্রাচীন ভারতীয় সমাজে অজাচার (incest) ও ব্যভিচারের চর্চা নিয়ে অনেক কিছু বলেছেন। তারপর আবার চলে গেছেন অপ্সরা, বিদ্যাধরী আর মুনিদের গল্পে। সব শেষে তার মনে হয়েছে, এহহে! বেদের ইতিহাস আর দেবলোকের পরিচিতি নিয়ে কিছু বলা লাগতো মনে হয়! যে তথ্য দিয়ে বই শুরু করা উচিত ছিল, সেসব দিয়েছেন শেষে গিয়ে, দায়সারা ভঙ্গিতে।
তিন প্রধান দেবতার মাঝে ব্রহ্মা ও কৃষ্ণ সবচেয়ে সচল; কাউকেই ছাড়েননি তারা, সম্ভোগে তৃপ্তি খুঁজেছেন। ব্যতিক্রম হচ্ছেন শিব। বাংলায় তিনিই বোধহয় সবচেয়ে জনপ্রিয় দেবতা ছিলেন। মহাযোগী, মহা সংযমী। মেয়েদের আশীর্বাদ করা হতো- শিবের মত বর হোক। ধান ভানতেও শিবের গীত গাইত বাংলার মানুষ।
আমার কাছে দেবলোকের চেয়ে মর্ত্যলোকের ট্যাবু কাহিনিই চাঞ্চল্যকর লেগেছে বেশি। এখানে জানলাম প্রাচীনকালে উত্তর ভারতের পূর্ব ও মধ্যাঞ্চলে ভাই-বোনের মধ্যে বিবাহ সামাজিকভাবে স্বীকৃত প্রথা ছিল। জানলাম, আসামের আদিবাসি সমাজে বিধবা শাশুড়ি কিংবা বিমাতাকে বিয়ে করা নাকি এখনো স্বীকৃত। তারপর প্রাচীন ব্রাক্ষণসমাজের বিভিন্ন রীতি- অতিথি সৎকারের জন্য স্ত্রীকে সমর্পণ করা, জ্যৈষ্ঠ ভ্রাতার বিধবা স্ত্রীকে বিবাহ ব্যতীত গ্রহণ করা, ঋণ মেটাতে স্ত্রী কন্যাকে পাওনাদারের কাছে সমর্পণ করা ইত্যাদি ইত্যাদি তো আছেই।
তবে বিকৃত প্রথার দিক থেকে বিবেচনা করলে লেখকের পছন্দের টপিক সম্ভবতঃ তন্ত্রসাধনা। তিনি আনন্দের সাথে জানাচ্ছেন, এই সাধনায় তিনটি মার্গ আছে, পশ্বাচার – ভেতরের পশুকে জয়, বীরাচার – ভয়কে জয়, আর দিব্যাচার - প্রকৃত সাধন।
পশ্বাচারের মূল বিষয় পাঁচ ম-তে প্রকাশ্য – মদ, মাংস, মৎস্য, মুদ্রা, মৈথুন। তিনি বলছেন, যেহেতু ভোগ না করলে ত্যাগ করা যায় না, তাই পুনঃপুনঃ ভোগের মাধ্যমে এই পাঁচ জিনিসের প্রতি বিতৃষ্ণা তৈরি করে তারপর ত্যাগ করাই তন্ত্রসাধকের কাজ। যেমন, মৈথুন বলতে বোঝায় কোনো বিবাহিত নারীর সাথে সঙ্গম। কোনো বিবাহিত রমণী যদি না রাজি হয়? শাস্ত্রে সমাধান আছে:
“অন্যা যদি ন গচ্ছেতু, নিজকন্যা নিজানুজা
অগ্রজা মাতুলানি বা মাতা বা তৎ সপত্নিকা
পূর্বাভাবে পরা পূজ্যা মদংশা যোযিতো মতাঃ
একা চেৎ কুলশাস্ত্রজ্ঞ পূজার্হা তত্র ভৈরব।”
অর্থাৎ, সেক্ষেত্রে নিজের কন্যা, নিজের কনিষ্ঠা বা জ্যৈষ্ঠা ভগিনী, মাতুলানি, মাতা বা বিমাতাকে নিয়ে কুলপূজা করবে।
কুলপূজা কিভাবে করে? লেখক শালীনতার স্বার্থে আর বাংলা করেননি, সংস্কৃত শ্লোক তুলে দিয়েছেন:
“আলিঙ্গনং চুম্বনঞ্চ স্তনয়োর্মদনস্তথা
দর্শনং স্পর্শণং যোনের্বিকাশো লিঙ্গঘর্ষনম
প্রবেশ স্থাপনং শক্তের্ণব পুষ্পানিপুজনে।”
এসব তো তাও একই প্রজাতির মধ্যে আছে। কিন্তু কিছু তথ্য হজম করা শক্ত। লেখক এক জায়গায় বলছেন, প্রাচীন ভারতে অশ্বমেধযজ্ঞের প্রধান একটি অংশ ছিল: যজ্ঞস্থানে সবার সামনে উক্ত অশ্বের সাথে রাজমহিষী মিলিত হবেন (কিংবা অশ্বের রেতঃস্খলন করে দেবেন?)। এই ঘোড়া যেহেতু বহিঃজগতে রাজার ডিরেক্ট অবতার হিসেবে বিবেচিত হবে, তাই রাজার ‘প্রিভিলেজ’ তাকেও ভোগ করতে দেওয়া হচ্ছে।
তো, ইয়ে মানে এই আরকি। ঋষি-মুনিদের নিয়ে কিছু কথা আছে। কামসূত্র সহ অন্যান্য মিলন-পুস্তক কেন কিভাবে এলো, মন্দিরে কেন সঙ্গমচিত্র বা মিথুনমূর্তি থাকে – এসবের বর্ণনা পাবেন।
সব মিলিয়ে অত্যন্ত শিক্ষামূলক বই।