বর্ষাকাল ছাড়া আর একটা সময়েও ভূতের গল্প পড়তে হেব্বি লাগে, যখন অলস সন্ধ্যা গড়িয়ে নিঝঝুম রাত হয়, বিশেষত তখন যদি খোলা জানলা দিয়ে শনশনিয়ে ঢোকে শীতালি হাওয়া। যেমন আজ হল। খুনখারাপি, কল্পবিজ্ঞান, বা সুররিয়াল/অ্যাবসার্ডিস্ট লেখার বদলে আজ মনটা তাই ছটফটিয়ে উঠল একেবারে আদি ও অকৃত্রিম ভূতের গল্প পড়তে চেয়ে। ১৭জন ‘নামি’ লেখকের ‘অপ্রকাশিত’ ভূতের গল্পের এই সংকলনটি শুরু করার আগেই একটা আশঙ্কা ছিল। সূচিপত্র যখনই তথাকথিত ‘নাম’-সর্বস্ব হয়, তখনই অধিকাংশ গল্প ব্ল্যাংক-ফায়ার হিসেবে প্রমাণিত হয়, এমনটাই এযাবৎ দেখেছি। বইটা পড়তে বেশি সময় লাগল না। কিন্তু কেমন হল সেই পড়ার অভিজ্ঞতা? (১) বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়-এর “সোনা-করা যাদুকর”: ভূতের গল্প তো নয়ই, একে আদৌ গল্প বলা যায় কি না, সেই নিয়েই সন্দেহ আছে। (২) বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র-র “হানাবাড়ির খপ্পরে”: আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে পড়তে মন্দ লাগত না, কিন্তু এখন...? (৩) প্রেমেন্দ্র মিত্র-র “ভূতেদের বিশ্বাস নেই”: এমনিতেও ভূত-শিকারি মেজকর্তার গল্প পড়তে আমার খুব একটা ভালো লাগে না, আর এই গল্পটি তো নেহাতই কথা-সর্বস্ব, তাই মোটেই ভালো লাগেনি। (৪) মনোজ বসু-র “সন্ন্যাসী রাজার গড়”: কনসেপ্টটা ভালো ছিল, যদিও লে ফানু এই নিয়ে যে ক্লাসিকটি লিখে গেছেন (ম্যাডাম ক্রাউল’স গোস্ট) তার ধারেকাছে আসবে না এই কথা-সর্বস্ব গল্পটা। (৫) শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়-এর “ঘরোয়া ভূত”: যাচ্ছেতাই। (৬) নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়-এর “লোকান্তরের হাতছানি”: আহামরি কিছু নয়, কিন্তু লেখকের নিজস্ব লিখনশৈলী লেখাটা পড়তে বাধ্য করে। (৭) প্রমথনাথ বিশী-র “মারাত্মক ঘড়ি”: এই বিশেষ ট্রোপটি অতি-ব্যবহৃত হতে-হতে এখন পাঠের অনুপযোগী হয়ে গেছ। তাছাড়া, ব্লাসফেমাস শোনালেও, কিছুদিন আগে ‘জয়ঢাক’ ওয়েবজিন-এ চুমকি চট্টোপাধ্যায়-এর একই থিম নিয়ে লেখা “শুদ্ধ ভক্তের ঘড়ি” আমার পড়তে বেশি ভালো লেগেছিল। (৮) গজেন্দ্রকুমার মিত্র-র “অজন্তার আত্মা”: ভূতের নয়, একটা সরলরৈখিক গল্পর ছলে ইতিহাসের কিছু কথা। (৯) আশাপূর্ণা দেবী-র “প্ল্যানচেট”: এই ক্লাসিক গল্পটা কোন যুক্তিতে অগ্রন্থিত বলা হল সেটাই বুঝতে পারছিনা, কারণ কম্পক্ষে তিনটে বইয়ে এই গল্পটা আমি পড়ে ফেলেছি ইতিমধ্যেই। (১০) সুমথনাথ ঘোষ-এর “অপদেবতা”: বোরিং, এবং এর চেয়ে অনেক-অনেক বেশি ভালো গল্প প্রতি মাসে “কিশোর ভারতী”, আর তিন মাস পর-পর ‘জয়ঢাক’ ও ‘ম্যাজিক ল্যাম্প’-এ পড়তে পাই। (১১) হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়-এর “ফাঁসির আসামি”: এটা আদৌ ভূতের গল্প নয়, বরং বীভৎস রসের চলনসই গল্প। (১২) বিমল মিত্র-র “জ্যান্ত ভূতের গল্প”: এখন এই প্লটটাও একেবারে একঘেয়ে হয়ে গেছে, তবে চল্লিশ বছর আগে ভালো লাগত হয়তো। (১৩) শচীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়-এর “দুই বেচারা”: ভূতের গল্প যখন সিরিয়াসলি কালের কবলে পড়ে এবং সম্পূর্ণ রদ্দি বলে মনে হয়, তখন সেটা পড়ার পর ভয় নয়, করুণা হয় লেখকের জন্য, যেমন এটা পড়তে গিয়ে হল। (১৪) নীহাররঞ্জন গুপ্ত-র “অশরীরী আতঙ্ক”: একটা সংক্ষিপ্ত প্লটকে ফেনিয়ে-ফেনিয়ে অসহ্য রকমের বড়ো করেও শেষে রহস্যটা লৌকিক রাখবেন না অলৌকিক, এটা বোধহয় লেখক বুঝে উঠতে পারেননি। প্রসঙ্গত, এই হ্যাজানো লেখাগুলো লোকে সেই সময়ে কীভাবে গিলত? (১৫) নারায়ণ সান্যাল-এর “একটি বিজ্ঞানসম্মত ভৌতিক গল্প”: আঃ, অবশেষে একটা না-ভূতের, অথচ মিতকথনের সৌরভে সতেজ গল্প পড়ার সুযোগ পেলাম। কী ভালো যে লাগল, বলে বোঝানো যাচ্ছে না। (১৬) সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ-এর “প্রতিমা”: ভয়ের নয়, বরং রোমাঞ্চ এবং অসমাপ্ত রোমান্সের এক বেদনাবিধুর আখ্যান এই গল্পটা পড়তে সত্যিই ভালো লাগল। (১৭) সমরেশ মজুমদার-এর “ইহকাল পরকাল”: অনেক দিন পর এই লেখকের একটা পড়ার মতো গল্প পড়লাম, বোধহয় বছর বিশেক আগে লেখা বলেই। তবে গল্পটা পড়ে মনে হল, এটা কি আদৌ ভূতের গল্প ছিল, নাকি বংপেন-এর দ্বারা প্রতিষ্ঠিত সফিস্টিকেটেড অদ্ভুতুড়ে ঘরানার কোনো পূর্বপুরুষ?
সামগ্রিকভাবে এটাই বলার যে বইটায় পড়ার মতো গোটা পাঁচেক গল্প আছে, বাকিগুলো না পড়লে কোনো ক্ষতি হবে না। এও বলার, যে ভূতের গল্প লেখায় এই তথাকথিত ‘নামি’লেখকদের বলে-বলে গোল দিতে পারবেন এই সময়ের লেখকেরা।