সংগীত, আবৃত্তি, অভিনয়ের পাশাপাশি সাহিত্যেও সাগরময় ঘোষ ছিলেন বিরল প্রতিভা। অল্প বয়সে প্রবাসী, বিচিত্রা-র মতন বিখ্যাত পত্রিকায় লিখেছেন। কিন্ত দেশ পত্রিকা সম্পাদনার দায়িত্ব গ্রহণ করার পর সাগরময় ঘোষের প্রধান পরিচয় হয়ে ওঠে তিনি একজন সম্পাদক। অপরূপ সংযমে সাহিত্যচর্চা থেকে তিনি নিজেকে সরিয়ে রাখেন। একটি রচনায় তিনি তাঁর সংকল্পের কথা লিখেছিলেন, "প্রথম, নিজে কখনো কোনোদিন লেখক হব না। দ্বিতীয়, যে-পত্রিকায় সম্পাদনার কাজ করব সে পত্রিকায় স্বনামে কোনোদিন কিছু লিখব না।" সম্পাদক হিসেবে নিজেকে নিরপেক্ষ রাখার কঠিন সাধনায় তাঁর এই সিদ্ধান্ত। লেখক হতে না চাইলেও, অন্যের তাগিদায় যতটুকু লিখেছেন, ততটুকুতেই এক স্বতঃস্ফূর্ত সাহিত্য প্রতিভার পরিচয় মেলে। 'একটি পেরেকের কাহিনী', 'সম্পাদকের বৈঠকে', 'হীরের নাকছাবি', 'দণ্ডকারণ্যের বাঘ' এই চারটি বই এক মলাটের মধ্যে এনে সাগরময় ঘোষের শতবর্ষের প্রাক্কালে প্রকাশ করা হল 'রচনাসংগ্রহ'। পাঠকেরা নিশ্চিত অনুভব করবেন সম্পাদক-সত্তার অন্তরালবর্তী সাগরময়ের অনুপম সাহিত্য-সত্তাকে।
সূচী: সম্পাদকের বৈঠকে হীরের নাকছাবি একটি পেরেকের কাহিনী দণ্ডকারণ্যের বাঘ
সাগরময় ঘোষ (২২ জুন, ১৯১২ - ১৯ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৯) একজন স্বনামখ্যাত ভারতীয় বাঙালি সাহিত্যিক যিনি কলকাতা থেকে প্রকাশিত দেশ পত্রিকার সম্পাদকীয় দায়িত্ব পালন করে জীবন্ত কিংবদন্তীতে পরিণত হয়েছিলেন। ১৯৯৯ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর মৃত্যুতে লন্ডনের দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকায় প্রকাশিত শোকসংবাদে তাঁকে বাংলার ‘সাহিত্য ব্যাঘ্র’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছিল। মৃত্যুর কিছু পূর্বে ১৯৯৭ খ্রিষ্টাব্দে তিনি বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে দীর্ঘজীবী বাংলা সাপ্তাহিক দেশ পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন।
তাঁর জন্ম ব্রিটিশ ভারতের পূর্ব বঙ্গে, বর্তমান বাংলাদেশের চাঁদপুরে, ১৯১২ খ্রিষ্টাব্দের ২২শে জুন তারিখে। চাঁদপুরেই ছিল তাদের পৈতৃক ভিটা। কালক্রমে নদী ভাঙনে হারিয়ে গেছে সেই পৈতৃক ভিটা। তাঁর পিতা কালিমোহন ঘোষ ছিলেন রবীন্দ্রনাথের সাক্ষাৎ সহচর। মায়ের নাম মনোরমা দেবী। জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা শান্তিদেব ঘোষ ছিলেন রবীন্দ্র সঙ্গীতের বিশিষ্ট সাধক এবং ভারতের জাতীয় পণ্ডিত হিসেবে স্বীকৃত। সাগরময় ঘোষ শান্তিনিকেতনে পড়াশোনা করেন, তিনি রবীন্দ্রনাথের সরাসরি ছাত্র ছিলেন। শান্তিনিকেতনে অধ্যয়নকালে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের প্রভাবে সাহিত্য ও সঙ্গীত, সর্বোপরি শিল্পের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ জন্মে যা প্রয়াণাবধি তাঁর মানসপ্রতিভাকে নিয়ন্ত্রণ করেছে।
১৯৯৯ খৃষ্টাব্দের ১৯ ফেব্রুয়ারি ৮৬ বছর বয়সে সাগরময় ঘোষ মারা যান। তাঁর মৃত্যুতে বাংলা সাহিত্য হারায় এক অসামান্য সম্পাদককে।
অসাধারণ লেখনী সাগরময় ঘোষের। দেশ পত্রিকা সম্পাদনা করতে গিয়ে যে দীর্ঘকাল তিনি লেখালেখি থেকে নিজেকে সরিয়ে রেখেছিলেন সেটা রীতিমতো অন্যায় করেছেন বাংলা সাহিত্যের সাথে।
মতামত একান্তই ব্যক্তিগত। বাংলা সাহিত্যের সাথে যাঁরই এক আনার পরিচয় আছে, সাগরময় ঘোষের নাম শুনলেই এক নামে চেনেন। নামটা শুনলেই অসম্ভব মণীষা, মনন ও প্রজ্ঞার এক অনন্য সম্মিলন চোখের সামনে ভেসে ওঠে। আমাদের আগের প্রজন্মের, বা আমাদের প্রজন্মের বেড়ে ওঠার সময় এতখানি সহজলভ্য ছিল না বড় বড় লোকেদের চেহারা দেখতে পাওয়াটা। নায়ক, নায়িকা হলে, সে তিনি রাজনীতির হন বা সিনেমার, তবু সুযোগ ছিল- যদিও page ৩ নামক উপদ্রবটির আমদানি ঘটেনি ভারতীয় সংবাদজগতে, তবুও অবরে সবরে তাঁদের দর্শন পাওয়া যেত। সাগরময় ঘোষের চেহারা বলতে আমার আজ-ও চোখের সামনে ভেসে ওঠে ওনার মারা যাওয়ার পরে দেশে যখন স্মৃতিচারণ সংখ্যা বের হ'ল, তার প্রচ্ছদে হাতে আঁকা ছবি। চেষ্টা করলাম খুঁজে বের করতে পারলাম না। যাই হোক, প্রসঙ্গান্তরে চলে যাচ্ছি। যে কারনে এ লেখার অবতারণা- আমার মত অর্বাচীনের বড় চর্চা। সাগরময় ঘোষের রচনাসমগ্র পড়তে পড়তে। বলা ভাল, পড়া শেষ করে। পড়তে পড়তে একটা জিনিস বড় পীড়া দিয়েছে। গল্প বলা খুব কঠিন জিনিস। গল্প সবাই বলতে পারে না। গল্প লিখতেও জানতে হয়। কিন্তু গল্পের গল্প লেখা? সে বড় দুঃসাধ্য জিনিস। ধারাবিবরণী করেন অনেকেই। কিন্তু তবু রেডিওর যুগের প্রবীণরা অজয় বসুর নাম শুনলেই উচ্ছসিত হয়ে ওঠেন। এখনকার যুগের ক্রিকেটেও সবার কমেন্ট্রি ভালো লাগে না মোটেও। খেলা নিয়ে লেখেন তো কতজন। তবে কেন এত বছর পার করেও নেভিল কার্ডাস অমর? সাগরময় ঘোষের গল্প বলার ধরন বড় কাঠখোট্টা। যেন German woodcut এর কাজ। আক্ষরিক অর্থেই কাঠ খোট্টা। তাতে সুষম ব্যঞ্জনা আছে, আছে পরিমিতি বোধ মারাত্মক মাত্রায়। সাদা কালোর অপূর্ব balance আছে। তবু কেন জানি সেই ছবি দেখে মন ভিতর থেকে বাহ্ বলে উঠতে পারে না। হয়তো দর্শকের অক্ষমতা। হয়তো কেন, নিশ্চয়ই তাই-ই হবে। তবুও, কোথাও কিছু একটা যেন খামতি থেকে যায় মনের মধ্যে তাঁর লেখা পড়তে পড়তে। তাঁর অভিজ্ঞতার ঝুলি তো কম না, তার থেকেই টুকরো টাকরা উপুড় করে মেলে ধরেছেন আমাদের সামনে। জার্ণাল হিসাবে তার তুলনা মেলা ভার, কিন্তু সাহিত্য যেন হয়ে ওঠে না। আগেই বলেছি দর্শকের অক্ষমতা হয়তো।
দীর্ঘদিন দেশ পত্রিকা সম্পাদনা করার পর সাগরময় ঘোষের মৌলিক লেখা চারটে বই যার দুটো স্মৃতিকথা আর কিশোরদের জন্য দুটি উপন্যাস। এইটুকুই ব্যস আর কিছু নেই। অথচ সম্পাদক সাগরময় কীভাবে লেখক তৈরি করেছেন বা খুঁজে ধরে বেঁধে এনেছেন সেটা বাকিরা তাঁদের স্মৃতি কথায় বারবার উল্লেখ করেছেন।
শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুর পর যেভাবে সত্যজিৎ রায়কে দেশ পত্রিকায় ফেলুদা উপন্যাস লিখতে রাজি করেছিলেন সেটা একটা ওয়েব সিরিজের রহস্য কাহিনী হতে পারে।
প্রচণ্ড মুচমুচে গদ্য, প্রয়োজনে অনিঃশেষ হাস্যরস আবার বাক্যের মোচড়ে চোখে জল এনে দেওয়া সব মিলিয়ে স্বাদু গদ্য পড়তে চাইলে অবশ্যই সংগ্রহ করুন।
সঙ্গে দু মিনিট নীরবতা সেই সব সম্পাদকের জন্য যাঁরা নিজের লেখা ছাপানোর জন্য নিজেই পত্রিকার সম্পাদক আর প্রকাশক বনে যান!
১৯৪০ থেকে ১৯৯৭ সাল, দীর্ঘ ৫৭ বছর সম্পাদনা করেছেন 'দেশ' সাপ্তাহিক সাহিত্য পত্রিকা। তার সময়কাল ছিল বাংলা সাহিত্যের স্বর্ণ যুগ। বাংলা সাহিত্যের চিরায়ত লেখাগুলোর প্রায় সবই সেই সময়ের। সেই সব তুখোড় তুখোড় লেখকদের লেখা সম্পাদনা করেছেন যিনি, তিনিই সাগরময় ঘোষ।
১৯৯৯ সালে তার মৃত্যুতে লন্ডনের 'দ্য গার্ডিয়ান' পত্রিকা তাকে বাংলা সাহিত্যের 'সাহিত্য ব্যাঘ্র' বলে আখ্যায়িত করে।
সম্পাদক হিসেবে কাজ শুরু করার সময় তিনি সংকল্প করেছিলেন কোনদিনও লেখক হবেন না, আর যে পত্রিকার সম্পদক, সেখানে স্বনামে কোনদিনও কিছু লিখবেন না। তিনি কথা রেখেছিলেন।
তিনি লেখক হয়েছিলেন কিনা জানি না। তবে 'তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়' এর প্ররোচনায় লিখেছিলেন কিছুটা।
তার লেখার সবটাই বলা চলে স্মৃতিকথা। দীর্ঘ সম্পাদনা জীবনে যে সব সাহিত্যিকদের সাথে পরিচয়, উঠা-বসা আর আড্ডা সেই সব টুকরো টুকরো কাহিনী তিনি প্রথম লেখা শুরু করেন 'জলসা' পত্রিকায়। পরে এইসব লেখা গুলি গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়।
তার আড্ডা কথায়, তৎকালীন সময়ের এমন কোন তুখোড় লেখক নেই, যার সম্পর্কে কথা আসেনি। কথা বলতে, নিতান্তপক্ষে ঘরোয়া কথা। সাহিত্য আড্ডা হলেও, তাদের আড্ডা ছিল শতভাগ বাঙ্গালিয়ানা আড্ডা। তাই, লেখক কথা নয় বরং ব্যক্তিকথাই আলোচিত হত বেশি। উঠে আসত ব্যক্তিগত বিভিন্ন তথ্য।
টুকরো টুকরো স্মৃতি, বিভিন্ন অভিজ্ঞতা, লেখককে আবিষ্কার, লেখকের সাথে খুনসুঁটির গল্প - 'সম্পাদকের বৈঠকে' আর 'হীরের নাকছাবি'। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা - 'দণ্ডকারণ্যের বাঘ' আর সত্য ঘটনা অবলম্বনে 'একটি পেরেকের কাহিনী'...