৩.৫/৫ শঙ্খ ঘোষের কাছে তো ফিরতেই হয়। তাই ফিরলাম। লেখক আজীবন বিনীত, আজীবন ঋজু। তাঁর নম্র অথচ জোরালো চিন্তাভাবনা বরাবরই আমাকে আন্দোলিত করে।মানুষের শুভবোধের প্রতি তাঁর আস্থা ছিলো আজীবন।কিন্তু বিনা প্রশ্নে মেনে নিতেন না কিছু। কবি রফিক আজাদ বর্ণিত "প্রোথিত বৃক্ষের মতো বদ্ধমূল" ছিলেন না শঙ্খ ঘোষ। সময় ও পরিস্থিতির সাথে নিজেকে নবায়ন করতেন তিনি। নিজের বিশ্বাসে স্থিত হয়ে কীভাবে ভিন্ন ভাবধারার প্রতি আন্তরিক সম্মান জানানো যায় তা "জার্নাল" এর নিভৃত ভাবনাগুচ্ছে ধরা পড়েছে কিছুটা। স্মৃতিগদ্য, কবিকথন বা একান্ত ভাবনা ; সবখানেই তিনি অকপট।
অপ্রচলিত শব্দ প্রায় ব্যবহারই করেন না যেন শঙ্খ ঘোষ। অথচ সেই মায়ের মতো আটপৌরে অক্ষর সাজিয়েই তিনি প্রকাশ করতে পারেন জটিলতম ভাবনাগুলো। বিষয় রাজনীতি হোক, অনুভূতির ব্যবচ্ছেদ, কিংবা সাহিত্য আলাপ বা স্মৃতিকথন; শঙ্খ ঘোষের কথা ঠিক যেন কালের সীমানায় আটকে থাকে না, চিরকালের হয়ে যায়।
কিছু কিছু ক্ষেত্রে ভুক্তিগুলো চিন্তাকে বিস্তারিত করে না, বরং উস্কে দেয়। সেটার কারণ অবশ্য ভূমিকাতেই বলেছেন কবি, টুকরো লেখাগুলো তিনি তৈরি করেছিলেন প্রকাশের কোনো ইচ্ছে ছাড়াই। অথচ সেই উদেশ্যহীনতাই এই লেখাগুলোকে অকৃত্রিম করে তোলে।
বইটা আরও আগে পড়া উচিত ছিল। অনেক সময় নিয়ে পড়ে শেষ করছি। প্রতিদিন ৩-৪ টা করে অধ্যায় পড়লে মন শান্ত হয়ে যায়। বইটা সবার পড়া উচিত।
টুকরো টুকরো এই লেখাগুলো আমার চিন্তা আর চেতনাকে অনেকখানি সমৃদ্ধ করেছে। ইদানিং শঙ্খ ঘোষের বই বেশি পড়ছি। আমার আপাতত গুরু লেখক।
কিছুদিন আগে আমার একটা লেখায় বলেছিলাম;
আমরা সুখে আছি তার অর্থ হলো অন্যরা দুঃখে আছে। আমরা ধনী তার অর্থ হল অন্যরা গরীব। অর্থাৎ আমাদের সমস্ত ভোগ-বিলাস আর আনন্দ সবই স্বার্থপরতা। আমরা অন্যকে পরাজিত, অসহায় আর ব্যর্থ করে আজ সফল হয়েছি। কিংবা আমরা পরাজিত, অসহায় আর ব্যর্থ হয়ে অন্যদের জয়ী অর্থাৎ সফল করেছি।
আমার অগোছালো বিচ্ছিন্ন মনের কথাগুলো কত্ত সুন্দরভাবে লেখক তার 'জার্নাল' বইয়ের 'বর্ষা' অধ্যায়ে এভাবে বলেছেন:
"আমাদের সমস্ত নৈসর্গিক আনন্দই তো স্বার্থপরতা। কারো না কারো পক্ষে সেটা আঘাতময় হয়ে নামছেই। তাই বলে কি আনন্দও পাচ্ছি না আমরা? সেটা কি এজন্যই যে মূলত আমরা আত্মকেন্দ্রী?" .
'লেখকের শেখা' অধ্যায়ে লেখক যেমন বলেছেন:
"হঠাৎ এই বইটি পড়ে বেশ ভয় তৈরি হলো মনে। লেখায় বেশ যত্ন আছে, পরিশ্রম আছে, কিন্তু বিশ্বাসযোগ্যতা নেই। রচনাগুলিকে ধরে ধরে যেভাবে বিচার করেছেন ইনি, প্রয়োগ করেছেন যে মান, সেটাই বেশ সন্দেহজনক লাগে। কিন্তু এতে আমার ভয়ের কারণ কী? পাঠক হিসেবে এই লেখাকে মনে মনে প্রত্যাখ্যান করলেই তো মিটে যায় সব। মেটে বটে, কিন্তু একটা সমস্যা তবুও এড়ানো যায় না। সমস্যাটা এই : আমরাও এইরকমই লিখি না তো? এইরকম ভাবেই পাঠকের বিরক্তি আর অবিশ্বাস তৈরি করি না তো?"
আমারও সমসাময়িক লেখকদের কিছু বই পড়ে এমন মনে হয়। তখন আমিও শঙ্খ ঘোষের মতো মনে মনে প্রত্যাখান করে মনের কাছে নিজেকে মুক্ত রাখি। .
'বিশ্বাস-অবিশ্বাস' অধ্যায়ে লেখক যেমন বলেছেন:
"অতিজীবনে বা পারলৌকিক জীবনে বিশ্বাস আছে যাঁদের, তাঁরা বরং ভাবলেও ভাবতে পারেন যে পার্থিব এই সময়টা বয়ে গেলেও তো কত কিছু আরো বাকি পড়ে আছে দূরে। অনেক পরিমাণে তাই সরে যেতে পারে দায়িত্ব, সরে যেতে পারে ভালোবাসাও, তাঁদের কারো কারো জীবন থেকে। অথবা অনেকসময়ে সেই দায় বা ভালোবাসা থেকে যায় হয়তো একটা ভয়ের অনুষঙ্গ হিসেবে, নীতির অনুষঙ্গ হিসেবে। কিন্তু যার ঈশ্বর নেই, যার লক্ষ্যে কোনো অতিজীবন নেই, সে যে ভালোবাসে বা দায় বহন করে, এ তো তার নিজেরই গরজ। আর কোথাও কিছু নেই বলেই তো এই সর্বস্ব সমর্পণ। ভয়ংকর শূন্যের মধ্যে আঁকড়ে থাকা এই ভালোবাসা কি সুন্দর নয়? তাই অবিশ্বাস মানেই অপ্রেম নয়। বরং অবিশ্বাস জন্ম দিতে পারে সবচেয়ে বড় ভালোবাসার।"
আমার মতে, বিশ্বাস-অবিশ্বাসীরা পরস্পর দ্বন্ধযুদ্ধ না করে হাতে হাত রেখে একে-অপরকে ভালোবেসে সমাজে বাস করা উচিত। তবেই তো আমাদের সমাজে শান্তি বিরাজ করবে। নতুন কিছু সৃষ্টির প্রেরণায় দুঃখের পথে সুখের সূচনা হবে।
ভূমিকার মধ্যে কবি নিজেই লিখেছেন, যেহেতু দিনলিপি, সেহেতু এই বইয়ের লেখাগুলো মূলতঃ হালকা চালেই লেখা হয়েছিলো; আকারেও ক্ষুদ্র হওয়ায় পাঠকের চিন্তাস্রোতকে খুব বেশিদূর ভাসিয়ে নিয়ে যাবে না এই লেখাগুলো, এও কবির নিজেরই স্বীকারোক্তি। কবির সাথে একমত পোষণ করার পরও এই ধরণের লেখার গুরুত্বকে অস্বীকার করতে পারি না কেবলমাত্র একটাই কারণে। তা হলো এই, প্রকাশের কথা মাথায় না ভেবে যেসব লেখা হয়, সেসবের মাধ্যমেই লেখকের ব্যক্তিমানসের সাথে যোগাযোগ সর্ব্বোচ্চ হতে পারে বলে আমার বিশ্বাস। এই বিশ্বাস পোক্ত হওয়া শুরু করে রবীন্দ্রনাথের ছিন্নপত্র পড়তে গিয়ে। ছিন্নপত্রের বেশিরভাগ চিঠি গুরুদেব লিখেছিলেন তার ভ্রাতৃজায়া ইন্দিরা দেবীকে উদ্দেশ্য করে; ভবিষ্যতে এই চিঠিগুচ্ছ কখনো প্রকাশ করবেন এরকম উদ্দেশ্য কবিগুরুর না থাকাতেই ছিন্নপত্রে আমরা পেলাম এক অন্য স্বতঃস্ফূর্ত রবীন্দ্রনাথকে। বলা যায়, ছিন্নপত্রের মাধ্যমেই আমরা জানতে পারলাম ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথের ভেতরের আবেগ-অনুভূতিদের। এতে আরও সহজ হলো তার প্রকাশিত অন্যান্য লেখার সাথে তার ব্যক্তিগত চিন্তা-আবেগ-অনুভূতিকে মেলানো। রবীন্দ্রনাথের যে সামগ্রিক জীবন-দর্শন, তার আরও পরিস্রুত একটা রূপ এভাবে আমাদের সামনে হলো পরিস্ফুটিত।
শঙ্খ ঘোষও এই দিনলিপি ধরণের লেখাগুলো যখন লিখছিলেন, তখন এসব প্রকাশ করার চিন্তা তার মাথায় ছিলো না। এ কারণেই সম্পূর্ণ নির্ভার হয়ে নিজের একান্ত ব্যক্তিগত অনুভূতি, যেসব অনুভূতিকে এমনকি কবিতাতেও আমাদের পাওয়া সম্ভব হয় না, সেসব অনায়াসে লিখে যেতে পেরেছিলেন। বিচ্ছিন্ন মুহূর্তের বিভিন্ন ব্যক্তিগত অনুভূতির পাশাপাশি এইসব দিনলিপিতে ছড়িয়ে আছে বিভিন্ন লেখক-কবিদের সম্পর্কে তার চিন্তা উদ্রেককারী মূল্যায়ন। ব্যক্তিগত অনুভূতি হোক বা লেখক-কবিদের নিয়ে আলোচনাই হোক, সব লেখাতেই বৌদ্ধিক সততার এক উৎকৃষ্ট নিদর্শন দেখতে পাই। খুব সহজেই বোঝা যায়, কোন আদর্শ সামনে রেখে কোনকিছুর বিচার করতে আসেননি তিনি, বরং তার যখন যেটা মনে হয়েছে সেটাকেই একের পর এক শব্দায়িত করে গিয়েছেন কবি এখানে।
এই বৌদ্ধিক সততাকে আজকের দিনের কপট ও অসৎ সমালোচনার অপসংস্কৃতির প্রেক্ষাপটে খুব জরুরী দরকার বলে মনে হয়। আমাদের আজকালকার সাহিত্য সমালোচনা পড়লে মনে হয়, কারও নতুন কিছু বলবার নেই এখানে, যেনো সবকিছু সম্পর্কে শেষ কথা ইতিমধ্যেই বলা হয়ে গিয়েছে, আর এই শেষ কথার বিরুদ্ধ বা সমান্তরাল অন্য কোন কথার উচ্চারণ যেনো ধর্মভ্রষ্টের পূর্বলক্ষণ। এরকম সারবস্তুহী��� অলংকারসর্বস্ব সমালোচনার দীর্ঘকালীন অপ-ঐতিহ্য আমাদের নিয়ে এসেছে এক বৌদ্ধিক ভয়েডে, যেখানে নতুন কোন উচ্চারণের সুযোগ বা সম্ভাবনাকেও সুদূর পরাহত মনে হয়। মৌলিকত্ব শুধু সৃজনশীল সাহিত্যেরই নয়, সমালোচনা সাহিত্যেরও যে খুব মৌলিক একটা উপাদান, তা বোধহয় আজকাল আর কারও মনে আসেনা।
জীবনানন্দের উপন্যাস, কাফকা, রিলকে, এমনকি রবীন্দ্রনাথ- এসব নিয়ে শঙ্খ ঘোষের টুকরো অনুভূতির মধ্যেও মৌলিকত্ব আবিষ্কার করে তাই খুব আনন্দ পেয়েছি। যদিও কবির স্বীকারোক্তির প্রতিধ্বনিত করেই কোন লেখাই ঠিক যেনো পরিপূর্ণতার দিকে অগ্রসর হতে পারেনি।
শুধু চিন্তাকে উসকে দেয়াই এই বইয়ের কাজ, তাকে প্রসারিত করা নয়- এটুকু ভেবে যদি বইটি পড়তে বসা যায়, তাহলে বেশ সুন্দর একটি সময় যাবে, এটুকু ভরসা দেয়াই যায়।
"অবসাদের কোনো মাথামুণ্ডু নেই। কেন যে কখন ঘা খায় মন, কোথা থেকে আসে এতো স্তূপাকার ভেঙে পড়া, এতো নিস্তেজ অকর্মণ্য অর্থহীনতার বোধ, যেন একটা কবরের মধ্যে ঘুমিয়ে থাকা।"
এভাবেও অনুভূতি প্রকাশ করা যায়? বইয়ের কল্যাণে শঙ্খ ঘোষের ভাবনার জগতে ঘুরে আসার সুযোগ হলো।
বিভিন্ন অধীত বিষয় এবং কবির প্রিয়, নিকটের শিল্পীদের নিয়ে টুকরো অথচ সুসংহত লেখাগুলো ধীরলয়ে পড়ে গেলাম। শান্তিনিকেতনে, রাত্রির অবসরে লেখা এই জার্নাল। একান্ত নির্ভৃতে বসে লেখা এই ডায়েরির লাইনগুলোও যেন নির্জন এক চিন্তাজগতেই নিয়ে যায় পাঠককে। বইয়ের শেষদিকে যুক্ত হওয়া প্রবন্ধ কয়েকটির মধ্যে 'কাফকার স্বপ্ন' শিরোনামের লেখাটি কাফকাফে নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করলো। বইটির মাধ্যমে বেশ কয়েকজন নতুন লেখক এবং বইয়ের কথাও জানা হলো। প্রিয় কবি শঙ্খ ঘোষ তাঁর জার্নালে আগ্রহ নিয়ে যেসব বই কিংবা লেখককে নিয়ে লিখলেন, সেগুলো নিয়ে সময় সুযোগমতো পড়ার ইচ্ছে থাকলো।
পাঠক হিসাবে আমার কাছে জার্নাল জাতীয় লেখা পছন্দনীয় নয়। অন্য মানুষের ব্যক্তিগত দিনলিপি, সেখানে বিচ্ছিন্ন কিছু বিষয়ে ব্যক্তিগত অনুভবের প্রকাশ - এমন লেখা পড়তে নেয়া এক প্রকার জুয়া খেলা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় এমনসব জার্নাল এক বস্তা তুষ-কুড়া'র মধ্যে এক মুঠের চেয়ে কম চালের মতো ব্যাপার। এমনিতেই পড়ার সময় পাই কম, সেখানে এমন ঝুঁকি নেয়ার কোন মানে নেই। তাই এই বইটা রোমেল ভাই (কবি রোমেল চৌধুরী) বহু আগে উপহার দিলেও পড়া হয়নি। এই দফা বইটা পড়তে নিয়ে মনে হলো বইটা নিয়ে জার্নালসংক্রান্ত আমার প্রাকধারণার পাশাপাশি রোমেল ভাইয়ের প্রজ্ঞার বিষয়টি আমার বিবেচনায় নেয়া উচিত ছিল। এই বছরে এখন পর্যন্ত আমার পড়া সবচে' সেরা বই এটি।
বাংলা সাহিত্য, বিশ্ব সাহিত্য, লেখালেখি, রবীন্দ্রনাথ, শান্তিনিকেতন, জীবনদর্শন, কিছু গুণী মানুষকে নিয়ে টুকরো টুকরো লেখার এই সংকলনে কিছু বিষয়ে শ্রদ্ধাষ্পদ শঙ্খ ঘোষের দূরদৃষ্টিতা, চিন্তার গভীরতা, অনুভবের মানবিকতা, সহমর্মীতার মাত্রায় পাঠককে বিস্মিত করবে, আপ্লুত করবে, গভীর ভাবনায় ভাবাবে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে চল্লিশ বছর আগে করা এই বিশ্লেষণগুলো এখন তো বটেই, আরও চল্লিশ-ষাট-একশ' বছর পরেও একইভাবে প্রাসঙ্গিক থাকবে স্থান-কাল-পাত্রের সীমানা পেরিয়ে। শঙ্খ ঘোষের এই সক্ষমতায় আসলে অবাক হওয়া উচিত নয়। প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় ২০১৮ সালে তাঁর লিখিত একটি কবিতা উল্লেখ করছি।
মুক্ত গণতন্ত্র ----------------- সবাই শুধু মিথ্যে রটায় পথগুলি সব দেদার খোলা যার খুশি আয় বিরুদ্ধতায় যথার্থ এই বীরভূমি উত্তাল ঢেউ পেরিয়ে এসে পেয়েছি শেষ তীরভূমি দেখ খুলে তোর তিন নয়ন রাস্তা জুড়ে খড়্গ হাতে দাঁড়িয়ে আছে উন্নয়ন সবাই আমায় কর তোয়াজ ছড়িয়ে যাবে দিগ্বিদিকে মুক্ত গণতন্ত্র আজ
এই কবিতাটি ঠিক এই সময়ে সারা দুনিয়ার ডজন ডজন দেশের জন্য সত্য। আরও চল্লিশ-পঞ্চাশ বছর আগেও সত্য ছিল, আরও চল্লিশ-পঞ্চাশ বছর পরেও সত্য থাকবে।
কোন উদ্ধৃতি দেবার চেষ্টা করলাম না। কারণ, সেটা করতে গেলে আমাকে এক-দেড়শ' পৃষ্ঠা টাইপ করতে হবে।