অরেব্বাস এ তো জব্বর কাহিনি। এসব কিছুই জানতাম না গুরু। শুধু ওই চটি বইই পড়েছি। আর আমার দুর্ভাগ্য। তোদেরও দুর্ভাগ্য এতকাল হয়ে গেল নিজেদের ইতিহাসটা ঠিকঠাক জানতে পারলি না। আসলে দোষ তোদের নয়, ব্যাটা ফিরিঙ্গিগুলো নিজেদের সুবিধামতো ইতিহাস তৈরি করে গেছে এখানে, আর সেগুলোই এখনও চিবিয়ে মরছিস তোরা। যাক গে যাক আজ অনেক বকেছি। এবার কাজের কথা শোন। যে কারনে আমার আসা। বাংলায় সব আছে বাপ। ডাক্তার, মোক্তার, জোতদার, শুধু একটা ভাল বিদূষক নেই। বড্ড অভাব। খুব দরকার। তাই এলুম তোর কাছে। তোর হবে, লেগে যা। ঐতিহ্যটা নষ্ট করিসনি।
বিনোদ ঘোষাল-এর জন্ম ২৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৬ হুগলি জেলার কোন্নগরে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্যে স্নাতক। মফস্সলের মাঠঘাট, পুকুর জঙ্গল আর বন্ধুদের সঙ্গে বড় হয়ে ওঠা। ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকা আর অভিনয়ের দিকে ঝোঁক। গ্রুপ থিয়েটারের কর্মী হিসেবেও কাজ করেছেন দীর্ঘদিন। কর্মজীবন বিচিত্র। কখনও চায়ের গোডাউনের সুপারভাইজার, শিল্পপতির বাড়ির বাজারসরকার, কেয়ারটেকার বা বড়বাজারের গদিতে বসে হিসাবরক্ষক। কখনও প্রাইভেট টিউটর। বর্তমানে একটি সংবাদপত্রের সম্পাদকীয় বিভাগে কর্মরত। নিয়মিত লেখালেখি করেন বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়। ২০০৩ সালে দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর প্রথম গল্প। বৃহত্তর পাঠকের নজর কেড়েছিল। বাংলা ভাষায় প্রথম সাহিত্য অকাদেমি যুব পুরস্কার প্রাপক। ২০১৪ সালে পেয়েছেন পশ্চিমবঙ্গ বাংলা অকাদেমির সোমেন চন্দ স্মৃতি পুরস্কার। তাঁর একাধিক ছোটগল্পের নাট্যরূপ মঞ্চস্থ হয়েছে।
মিত্র ও ঘোষ থেকে সদ্য প্রকাশিত হওয়া "গোপাল ভাঁড় Y2K" বইটি হাতে পেতেই কাল সারাদিন ধরে এই সরেস ভাঁড়টি একদম চেটেপুটে খেলাম, আর খেয়ে এতো তৃপ্তি পেয়েছি যে বলে বোঝাতে পারবো না। এই লেখাটি প্রকাশ পাবার আগে লেখক ব্যক্তিগত ভাবে আমাকে জানিয়েছিলেন যে - "এবার একটা নতুন উপন্যাস লিখেছি, পড়ে দেখ আশা করি ভাল লাগবে। আর এই লেখাটা এক্কেবারে মন খুলে যা যা লিখতে চেয়েছিলাম তাই লিখেছি "। আর বইটা পড়ে মনে হল এতদিন ওনার কাছ থেকে যে ধরণের লেখা আমরা পেয়ে এসেছি তার থেকে সম্পূর্ণ ১৮০ডিগ্রি ঘুরে একটা দুর্দান্ত কমিক রিলিফে ভরপুর ব্যঙ্গধর্মী লেখা আমরা পেলাম এই নতুন উপন্যাসে। অথচ তার মধ্যেও জীবনবোধ এবং মূল্যবোধের আদর্শ বা শিকড়কে উনি ত্যাগ করেন নি। অর্থাৎ এই বইটি পাঠকদের শুধুমাত্র ভরপুর বিনোদনই উপহার দেবে না ; সাথে দেবে জীবনবোধ এবং মূল্যবোধের সুশিক্ষাও।
বইয়ের নাম যখন "গোপাল ভাঁড় Y2K" তখন যেকোন পাঠকই বুঝতে পারছেন এতে গোপাল ভাঁড় সম্পর্কিত নিশ্চই কোন বিষয় বা তথ্য আছে যা আবার এই Y2K অর্থাৎ একবিংশ শতাব্দীর সাথে জড়িত। আপনারা একেবারে সঠিক ধরেছেন। এই কাহিনীর শুরু থেকে শেষ অব্ধি রয়েছে গোপাল ভাঁড়ের অদৃশ্য অথচ জোরালো উপস্থিতি।
কিন্তু গোপাল ভাঁড়কে কেন বেছে নিলেন লেখক ?
আসলে গোপাল ভাঁড় সমন্ধে বাঙালির মনে একটা ভুল ধারণা দীৰ্ঘ দিন বাসা বেঁধে ছিল। যেকোন হাস্য-রসাত্মক চটি বইয়ের কভারে বেঁটে - মোটা - টেকো এইভাবেই গোপাল ভাঁড়কে দেখা যেত। আর আপামর বাঙালি তাকে জেনে এসেছে একজন "ভাঁড়" বা কমেডিয়ান হিসাবে, যে নানারকম মজার মজার কান্ড ঘটিয়ে লোকজনকে হাসাবে বা নিজে হাসির খোরাক হবে । আদপেও কিন্তু তা নয়। গোপাল ভাঁড় আসলে কে ছিলেন , তার আসল নাম এবং বংশপরিচয় কি ছিল, কিভাবে সে রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের প্রিয় সভাসদ হয়ে উঠলেন এসব ভারী সুন্দর ভাবে গল্পের মাধ্যমে গোপালের মুখ দিয়ে লেখক বলিয়েছেন। সাথে ভাঁড় এবং বিদূষকের মধ্যে পার্থক্যটি ও ভারী নিপুন ভাবে বিশ্লেষণ করেছেন এই কাহিনীতে।
কেন তিনি আবার ফিরে এলেন ৩০০ বছর পর ? গোপাল ভাঁড় কি একবিংশ শতাব্দী অর্থাৎ Y2K কে তেও প্রাসঙ্গিক ?
কেন তিনি আবার ফিরে এলেন এবং Y2K কেতেও গোপাল ভাঁড় প্রাসঙ্গিক কিনা তা জানতে হলে পড়ে ফেলতেই হবে এই বইটি । তবে এটুকু বলতে পারি ৩০০ বছর পর গোপাল ফিরে এসেছে এক বিশেষ উদেশ্য নিয়ে। আর এই কাজের জন্য তিনি বেছে নিয়েছেন নেপাল সাঁপুই নামক এক-ছাপোষা ব্যক্তিকে - যে এই কাহিনীর আরেক মুখ্য চরিত্র। এই নেপাল সাঁপুই একমাত্র গোপালকে তার আসল রূপে দেখতে পায় এবং শুনতে পায় তার নির্দেশাবলী। কিন্তু কিছুতেই বুঝে উঠতে পারে না কেন তাকেই বেছে নেওয়া হল ? আর গোপাল ভাঁড় সবসময় তাকে দিয়ে খুব বড়ো একটা কাজ করানোর কথা বলে। নেপাল কি পারবে এই গুরুদ্বায়িত্ব পালন করতে ?
গোপাল ভাঁড়ের সাথে নেপাল সাঁপুইয়ের কথপোকথনগুলি দারুন উপভোগ্য। নেপাল কোনো কাজ ঠিক ভাবে উতরে দিতে পারলে তার গুরু গোপাল তাকে বলছে "সাবাশ বেটা - এই তো চাই", আবার কখনো তা না পারলে তাকে শুনতে হচ্ছে "আহাম্মক ! আর কাকে বলে। এই কাজটাও তোর দ্বারা হল না "। গোপাল - নেপালের এইরূপ কথপোকথনগুলি পাঠকদের যে দারুন ভাবে জমিয়ে রাখবে একথা হলফ করে বলতে পারি।
তাই আর দেরি না করে হাতে তুলে নিন মুখরোচকের এই প্যাকেজটি। টক-ঝাল-নোনতা-মিষ্টিতে ভরপুর এই লেখাটি পড়তে পড়তে সময় যে কখন ফুড়ুৎ করে কেটে যাবে তা আপনি নিজেও টের পাবেন না। মুখরোচক খাবার সময় যেমন হাত নিজের অজান্তেই বার বার চলে যায় প্যাকেটের ভিতর, ঠিক তেমনি ভাবেই এই বইয়ের পাতাগুলি একের পর এক উল্টোতে উল্টোতে কখন পুরো কাহিনীটি শেষ করে ফেলবেন তা আপনি নিজেও টের পাবেন না। মুখরোচক শেষ করার পরও অনেকক্ষন ধরে জিভে যেমন লেগে থাকে তার অতুলনীয় স্বাদ ; ঠিক তেমনি ভাবেই এই বইপাঠ শেষ করার পর আপনাদের মনের কোণে লেগে থাকবে ভালো-লাগার এক অপূর্ব অনুভূতি।
গোপাল ভাড়ঁ Y2K... বিনোদ ঘোষাল ক্লাস 2-3 থেকেই গোপাল ভাড়ঁ এর গল্প শুনে এসেছি.. এমনকি তার সাথে বীরবল, তেনালী রমন এদের কার্টুন ও দেখে এসেছি টিভি তে। আর যেহেতু এদের গল্প গুলো একই রকম লাগতো.. তাই তখন থেকেই ভাবতাম এদের জীবন কি একই রকম? নাকি এদের প্রত্যেকের সাথেই প্রায় কম বেশি একই রকম ঘটনা ঘটেছে? এইরকম অনেক প্রশ্ন-ই মাথায় চেপে বসেছিল। কিন্তু উত্তর কোথাও পাচ্ছিলাম না। এইভাবেই চলছিল বছরের পর বছর.. হঠাৎই ইশ্বর এর পাঠানো দূত এর মতোই উদয় হলেন লেখক বিনোদ ঘোষাল ... আর আমায় বললেন, "আর চিন্তা নেই বৎস! তূমি তোমার সব প্রশ্নের জবাব পেয়ে যাবে।" আর আমার দিকে এগিয়ে দিলেন 'গোপাল ভাড়ঁ Y2K' বইটি। আমি ও বইটি হাতে তুলে নিতেই উনি "তথাস্তু" বলে চলে গেলেন। আমি ও আর বিলম্ব না করে পড়তে শুরু করে দিলাম। আমার প্রশ্নের উত্তর একে একে পেলাম তো বটেই, তার সাথে আরও যা যানলাম ও পেলাম তা হল..
~ গোপাল ভাড়ঁ এর জীবনের নানা কাহিনী... যার থেকে আমাদের অনেক ভুল ধারণা ভেঙে যাবে, অনেক অজানা সত্যের সন্ধান পাব আমরা.. যা আমার মত 'গোপাল ভক্ত' পাঠকদের কাছে এক বিরাট প্রাপ্তি।
~History repeats itself.... ইতিহাস বার বার ফিরে ফিরে আসে।.. কথাটা যে সত্যিই বাস্তব তা আরও একবার বুঝিয়ে দিলেন লেখক.. এই গল্পটির মাধ্যমে। নেপাল, রাজেশ মেহেরা, বিন্নিজি, অরুণ, নরেশ, অজিত - এই সমস্ত চরিত্রের মানুষেরা বর্তমানে যেমন আছে, তেমনি ৩০০ বছর আগেও ছিল। যদি কিছু পাল্টে থাকে তাহলে সেটা হল- নাম-ধাম, পোশাক আর পটভূমি.. বাদবাকি সবই এক।
~ বর্তমান সমাজে গোপাল ভাড়ঁ এর মতো বিদূষকরা আর নেই বললেই চলে। প্রভাবশালী ব্যক্তিদের পা চাটা লোক আছে, তাদের সুরে সুর মেলানোর লোকও আছে। কিন্তু সাহস করে তাদের ভুল কে ভুল বলার লোক নেই। আর এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে বিদূষকরা। কারণ একমাত্র তারাই নির্ভয়ে সত্যিটা বলতে পারে।
~ নেপাল চরিত্রটির মধ্যে দিয়ে লেখক এইটাই বোঝাতে চেয়েছেন যে নেপালের মতো অল্প শিক্ষিত বিস্কুট কারখানার ছাপোষা শ্রমিক যদি বিদূষক হয়ে উঠতে পারে, ঠিক কে ঠিক ভুল কে ভুল বলতে পারে, তাহলে আমরা শিক্ষিত হয়েও কেন সেই সাহস দেখাতে পারবো না? কেনই বা সর্বদা মাথা নত করে দেব ক্ষমতাবান দের কাছে? কেনই বা চুপ করে থাকব অন্যায় হচ্ছে দেখেও? তাই চুপ করে না থেকে আমরাও গোপালের মতো, নেপালের মতো সত্যি টা বলতে শিখি আসুন! সবশেষে লেখক কে ধন্যবাদ জানাই এইরকম গল্প আমাদের উপহার দেবার জন্য।