বহুদিন ধরে ছুটা নিবন্ধ পড়তে পড়তে, অনেক দিন পর একটা সম্পূর্ন প্রবন্ধের বই শেষ করা।চমৎকার বই। একজন সত্যিকারের একাডেমিশিয়ান যা বোঝায়, জেমসন তাই! একটা পিওর ক্রিটিক পান করার অভিজ্ঞতা। ফ্রাসোঁয়া লিওতার এর হ্যাংওভার কাটছে। ভালো ব্যাপারটা।
ক্যাপিটালিস্ট দর্শনকে যেমন সংহত রূপ দিয়েছিলেন - জন মেনার্ড কিনস বা কমিউনিজমকে মার্ক্স- এঙ্গেলস, পোষ্টমডার্নিজমের ক্ষেত্রে আমরা জানি, এরকম কোন কুতুব তাতে নেই। বরং যাদের নাম উচ্চারিত হয়, ফ্রাসোঁয়া লিওতার, ফুকো, দেরীদা, বদ্রিয়াঁ এরা সবাই পোষ্টমডার্ন সময়ের একেক লক্ষনের ব্যাখ্যাকার মাত্র। বাট, তার কোন সুনির্দিষ্ট, সংহত ভাষ্য নেই।সুতরাং পক্ষও নাই।
কিন্তু, Let me clear – জেমসনের কাছে পোষ্টমডার্ন টার্মটি কোন পদ্ধতির নয়। যেমন: সকল গ্রান্ড ন্যারেটিভ, মেটান্যারেটিভ কে বর্জন করা বা সব কিছুকে বিচ্ছিন্ন ভাবে বিচার করা। কোন লক্ষন প্রকাশেরও নয়। কেন না দেখতে পাচ্ছি, পোষ্টমডার্ন শব্দটি গত দেড়শ বছর একেক সময়ে এককে অর্থে ব্���বহৃত হচ্ছে। ১৮৭০ সালেই সবচেয়ে পুরোনো। যখন জন চ্যাপম্যান নিও ইম্প্রেশনিস্ট ক্লোদ মনে আর রেনোয়ার ছবি দেখে এই টার্ম টি ব্যবহার করেছিলেন। বোধকরি, তার কাছে মনে হয়েছিলো তারা “আধুনিক” ইম্প্রেশনিজমকে অতিক্রম করে এগিয়ে গেছে। ৪৭ এ ব্যবহার করেছিল টয়েনবি, খুব বাজে ছিলো সেটা। ১৯৬৪ সালে লেসলি ফিডলার, যেখানে এলিট রুচিকে প্রত্যাখান করার আচরনের মধ্যে তিনি এই টার্ম টি খুঁজে পেয়েছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন তৎকালীন সময়ের হিপ্পি , ফ্লাওয়ার চিলড্রেন আর ব্ল্যাক এক্টিভিস্ট দের নতুন একটিভিজম আর নন্দনতত্ত্বের কথা। লিও স্টাইনবার্গও ব্যবহার করেছিলেন প্রায় একই অর্থে। এমনকি ৭১ এও দেখতে পাচ্ছি, রডলফ পেনভিটস পোষ্টমডার্ন টার্ম টি ব্যবহার করছেন, ইউরোপিয়ান এনলাইটমেন্ট থেকে ফ্রি হওয়া মানুষের কথায়। এইগুলোর সাথে এখনকার পোষ্ট মডার্ন এর ধারণা, লক্ষন ও ভাষ্যের সম্পর্ক ক্ষীন। জেমসনের কাছে পোষ্টমডার্নিজম এক ধরনের পর্যায়কালের ধারণা।
বোঝা যাচ্ছে, আর্নস্ট মান্ডলের যে “কোন্ড্রাটিভ সাইকলস” এবং এর ভিত্তিতে ইতিহাসের যে পর্যায়কালকে বিভক্তিকরণ, জেমসন সেই তাত্ত্বিক কাজকে এজাম্পশন ধরে এগিয়েছেন। সুতরাং জেমসন জানাচ্ছেন – মডার্নিটির স্তরে কালচার একধরনের স্বায়ত্ব অর্জন করেছিলো। ফলে মডার্নিটি ক্যাপিটাল প্রসঙ্গে এক ধরনের বিষয়ী দূরত্ব রাখতে পারত। কিন্তু এই “লেট ক্যাপিটালিজম” এর পর্যায়ে এসে, সংস্কৃতি উৎপাদন, সংস্কৃতি বিপনন, বাজার নিয়ন্ত্রণ, তার সাথে সাথে নিজে নিয়ন্ত্রিত হওয়া এবং সব মিলিয়ে ইন্ডিভিজুয়ালের “নিজস্বতা” প্রমান করার যে উন্মাদনা তা আসলে কালচারকে ক্যাপিটালের সাথে একীভূতকরণ করে। জেমসন ভাস্কর্য, স্থাপত্য, টেলিভিশন, ভিডিও, চলচ্চিত্র অনেক কিছুর উদাহরন দিয়েছেন। এর মধ্যে বলা যেতে পারে, ভিডিও দর্শনের কথা। টেলিভিশন দর্শনে স্মৃতির কোন ভূমিকা নেই। অথচ, টেক্সট যে ইমেজ উৎপাদন করে তার বেসিস স্মৃতি। অথচ টেলিভিশনের ভিডিও যেহেতু অর্থ উৎপাদন করে, তাই তা একটি “টেক্সট”। এর অবচেতনে ভূমিকা কি তা বলতে আমরা মুখোমুখি হচ্ছি একটা তাত্ত্বিক সংকটের দিকে।
যে কোন সময়ের ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে একাধিক তত্ত্বের ছোট বড় স্রোত পাশাপাশি চলে, তার মধ্যে একটি প্রধান হয়ে উঠে। ফ্রেডারিক জেমসন ব্যবহার করছেন, “Cultural dominat” কথাটি। সুতরাং “ কালচারাল ডমিনেন্ট” এর সূত্র ধরে পোষ্টমডার্নিজমের উদ্ভব আর বিকাশ যদি চিহ্নিত করতে যাই , তাহলে ক্যাপিটাল ও কালচারের ক্যাপিটালের দাস হওয়ার প্রসঙ্গ চলে আসবে। জেমসন মনে করছেন, পোষ্ট মডার্নিজম মডার্নিটির ক্ষয়িত হয়ে যাওয়া উপাদান আর লেট ক্যাপিটালিজমের কালচার কে বহন করে। এবং তা পন্যায়নের প্রতিরোধের শেষ পরিসরগুলো শেষ পর্যন্ত দখল করে নিচ্ছে। প্রতিরোধের শেষ পরিসরগুলো হলো, জেমসনের ভাষায় – তৃতীয় বিশ্ব, অবচেতন আর নন্দনতত্ত্ব।
তৃতীয় বিশ্বের কথা যখন এসেছেই, তখন বলতে চাই যে- পোষ্টমডার্নিজম নামের গালভরা নাম আমাদের সংকট আদৌ ব্যাখ্যা করতে পারে কিনা। অনেকে যখন বলে, এটা এই সময়ের চূড়ান্ত তত্ত্ব , তখন কি মনে হয় না – পোষ্ট মডার্নিজমও একটা “গ্র্যান্ড ন্যারেটিভ” হয়ে উঠছে? এটার মধ্যে কেমন জানি একটা কলোনিয়াল হ্যাংওভার দেখতে পাই। আর, সাহিত্য, সমাজবিজ্ঞান ও শিল্পে যে বিভিন্ন “ইজম” এর প্রচার ও আস্ফালন, এই প্রচার ও ছাপ্পার আড়ালে একটা প্রশ্ন অনুচ্চারিত থেকে যায় – একটা “ইজম” একটা “নাম” একটা রচনার সাথে কি যোগ করে? আদৌ কি তার উপভোগ্যতা বাড়ায়? একটা "লেভেল" সেই রচনার সময়, পটভূমিকা ও থিমকে শুধু চিহ্নিত করে দেয়? আর কিছু “বাদ” থেকে যায় না? বাদ থাকলে সেটা কতটুকু সফল? ইজম সম্পর্কে অনভিজ্ঞ পাঠক সাহিত্যটি পাঠ করার সময় কি প্রত্যাশা করবেন? নাকি করবেন না? জেমসন কালচার, আইডলজি, ভিডিও, আর্কিটেকচার, থিয়োরী নিয়ে অধ্যায় ভিত্তিক আলোচনা করলেও সাহিত্য নিয়ে নীরব।