চৈতন্যের অন্তর্ধানের কারণ ও নেপথ্যে বিভিন্ন ঘটনার টানাপোড়েন, স্থান-কাল, অন্তর্ধানে ... তিনি কোন পথে কোথায় পৌঁছেছিলেন এবং কবে-কোথায়-কিভাবে তাঁর মৃত্যু হয় – এসব ... গ্রন্থের আলোচ্য বিষয়।
দীর্ঘ পাঁচ বছরের পরিশ্রমে লেখক তথ্য, যুক্তি ও বাস্তব সম্ভাবনার নিরিখে এ সম্পর্কে প্রচলিত প্রতিটি অভিমতের চুলচেরা ও নির্মোহ বিশ্লেষনের মাধ্যমে সম্পূর্ণ নতুন কিছু সম্ভাবনার ... হয়েছেন যা বদলে দিতে পারে প্রচলিত ধারণাগুলিকে।
গ্রন্থাগারের গন্ডী ছাড়িয়ে সন্ধানী লেখক ছুটে গেছেন ওড়িশার দুর্গম পাহাড়-জঙ্গলে, ... চেষ্টা করেছেন চৈতন্য, স্বরূপ ও গদাধরের সম্ভাব্য গোপন সমাধিস্থল। চৈতন্যের দেহাবশেষ বর্তমানে কোথায় থাকতে পারে সে আভাসও তিনি দিয়েছেন।
‘চৈতন্যের শেষ প্রহর’ গ্রন্থটি চৈতন্যের অন্ত্ররধানকে কেন্দ্র করে রচিত গবেষণাগন্ধী ... গ্রন্থগুলির থেকে মৌলিকভাবেই আলাদা। এটি আদ্যন্ত একটি গবেষনাগ্রন্থ
সূচিপত্র –
প্রথম অধ্যায় – একটি অমীমাংসিত রহস্য দ্বিতীয় অধ্যায় – নীলাচলে জগন্নাথ মূর্তিতে লীন হওয়া তৃতীয় অধ্যায় – জগন্নাথ মন্দিরের মধ্যে নৃত্যরত অবস্থায় পতনজনিত আঘাতে মৃত্যু চতুর্থ অধ্যায় – পায়ে ইঁটের আঘাত বিষিয়ে গিয়ে মৃত্যু পঞ্চম অধ্যায় – ছদ্মবেশে নীলাচল ত্যাগ ষষ্ঠ অধ্যায় - সমুদ্রের জলে ডুবে মৃত্যু সপ্তম অধ্যায় - নীলাচলে নিত্যানন্দের কোলে মাথা রেখে মৃত্যু অষ্টম অধ্যায় – গুপ্তহত্যা নবম অধ্যায় – এত কুয়াশা কেন? দশম অধ্যায় – চৈতন্যের শেষ প্রহর একাদশ অধ্যায় – গোপন সমাধির সন্ধানে
শ্রীচৈতন্যের অন্তিম পরিণতি আজও সংশয়, বিতর্ক এবং বাদ-প্রতিবাদের কুয়াশায় আচ্ছন্ন। কিছুদিন পর-পর এই নিয়ে নতুন বই প্রকাশিত হয়। এমন অধিকাংশ বইয়েই আপ্তবাক্যের মতো করে কিছু পূর্ব-নির্ধারিত সিদ্ধান্ত বা ভাবনাকে সম্পূর্ণ তথ্যের মাত্র একাংশের মোড়কে পরিবেশন করা হয়। কিন্তু 'গবেষণা'-র নামে এই ধরনের 'গুল্প' পরিবেশনের ঐতিহ্যটি ভেঙে দিয়েছিলেন তুহিন মুখোপাধ্যায়। তাঁর 'লোকায়ত শ্রীচৈতন্য' (গাঙচিল) পড়তে গিয়েই দেখেছিলাম, কী অপরিসীম যত্নের সঙ্গে তিনি তথ্যকে তত্ত্ব আর কিংবদন্তি থেকে আলাদা করেন। সেই একই পদ্ধতি বা মেথডলজি মেনে তিনি চৈতন্যের জীবনের সবচেয়ে বড়ো তথা বিতর্কিত প্রশ্নটির উত্তর খুঁজেছেন আলোচ্য বইয়ে। 'সবিনয় নিবেদন' অংশে লেখক সরাসরি জানিয়েছেন, "... এ-গ্রন্থ রচনার সময় বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হয়েছে যাতে গবেষণাগ্রন্থের বদলে এটিও পূর্বতন অনেক গবেষণাগন্ধী রোমহষর্ক কাহিনির সমগোত্র না হয়।" তারপর একে-একে এসেছে এগারোটি অধ্যায়। তারা হল~ ১. একটি অমীমাংসিত রহস্য ২. নীলাচলে জগন্নাথ মূর্তিতে লীন হওয়া ৩. জগন্নাথ মন্দিরের মধ্যে নৃত্যরত অবস্থায় পতনজনিত আঘাতে মৃত্যু ৪. পায়ে ইঁটের আঘাত বিষিয়ে গিয়ে মৃত্যু ৫. ছদ্মবেশে নীলাচল ত্যাগ ৬. সমুদ্রের জলে ডুবে মৃত্যু ৭. নীলাচলে নিত্যানন্দের কোলে মাথা রেখে মৃত্যু ৮. গুপ্তহত্যা ৯. এত কুয়াশা কেন? ১০. চৈতন্যের শেষ প্রহর ১১. গোপন সমাধির সন্ধানে এই বিন্যাস থেকে স্পষ্ট হবে যে লেখক চৈতন্যের অন্তর্ধান ও মৃত্যু সম্বন্ধে প্রচলিত সবক'টি ধারণাকেই বিশ্লেষণ করেছেন। মালীবুড়ো তো বটেই, চৈতন্যের পরিণতি বোঝার ক্ষেত্রে যাঁর কাজ প্রায় কিংবদন্তি হয়ে গেছে সেই জয়দেব মুখোপাধ্যায়ও এতটা নির্মোহ ও নিরপেক্ষভাবে সবক'টি দিক খুঁটিয়ে তথা খতিয়ে দেখেননি। এই বইয়ের সবচেয়ে বড়ো গুণ তথা প্রভাব এই মেথডলজির ক্ষেত্রেই দেখা গেছে। লেখক যে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন সেটি যৌক্তিক। তবে সেটিই একমাত্র সম্ভাব্য ব্যাখ্যা নয়। কিন্তু আপনি যদি লেখকের সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত নাও হন, তাহলেও ঠিক এইভাবেই প্রতিটি সম্ভাবনা বিচার করে আপনাকে নিজের তদন্ত চালাতে হবে। সম্প্রতি এই ধারায় রচিত ফিকশন এবং নন-ফিকশন— দু'জায়গাতেই এই পদ্ধতি দেখা গেছে। চৈতন্য অন্তর্ধান রহস্যের ক্ষেত্রে নির্মোহ গবেষণার এই পথ ও পদ্ধতি প্রতিষ্ঠাই এই বইয়ের সবচেয়ে বড়ো দিক। আমরা লেখকের কাছে ঋণী হয়ে থাকব এ-জন্যই। আর হ্যাঁ, সম্পূর্ণভাবে তথ্যানুগ নন-ফিকশন হলেও লেখাটি স্বচ্ছন্দ, সজীব এবং গোয়েন্দা গল্পের মতো করেই লেখা। তাই বইটি পড়তেও আপনার ভালো লাগবে। তারপর যদি এই পাঁচ শতাব্দী প্রাচীন কোল্ড কেসের মীমাংসা করতে আপনি নিজেই উদ্যোগী হন— তাহলেই বোধহয় লেখক সবচেয়ে খুশি হবেন। একজন গবেষক তো এটাই চান— তাই না?
চৈতন্য দেবের শেষ জীবনের রহস্য সম্পর্কে আকর্ষিত হই এই বিষয়ের প্রাথমিক বই জয়দেব মুখার্জির "কাহা গেলে তোমা পাই" পড়ে , তারপর এই বিষয়ে খোঁজ আরম্ভ করি, যা কিনা কোনোদিন শেষ হবে না। কিন্তু এই বিষয়ে একনাগাড়ে ৩ ৪ টি বই পড়ে একটি বিশেষ ঘরানার গন্ধ পেয়েছি বারবার।এই ঘরানার বৈশিষ্ট্য হল- পুরো তদন্ত পদ্ধতি ভক্তিরসে ভিজে জব জব করছে। সে তুলনায় এই সিরিজের অন্তিম সংযোজন তুহিন বাবুর এই বই টি নির্মেদ , টানটান ও অতিরিক্ত রসবিহীন। একটানে শেষ করার মত বই। এবং আমার মতে এই বইটির থেকে সবেচেয়ে বড় পাওনা, যা একজন পাঠক পাবেন বলে আমি মনে করি তা হল, চৈতন্য দেবের মৃত্যুরহস্যের একটি সাম্ভাব্য সমাধান, যদিও সেটি তর্ক সাপেক্ষ্য।তবে নিঃসন্দেহে একটা কথা বলতে পারি যা, যে বা যারা ভবিষ্যতে এই বিষয় নিয়ে ভাবতে চাইবেন, তাদেরকে জয়দেব মুখার্জি, মালিবুড়োর সাথে তুহিন মুখোপাধ্যায় কেও পড়তে হবে।
ভারতবর্ষের ইতিহাসে শ্রীচৈতন্য ও ভক্তি আন্দোলনের প্রভাব সম্পর্কে সকলেই কমবেশি পরিচিত।। কিন্তু শ্রীচৈতন্য এর জীবনের অন্তিম সময় নিয়ে প্রচুর ধোঁয়াশা রয়েছে।। প্রচুর লেখক, প্রচুর গবেষণাধর্মী বই, প্রচুর তথ্য অনুসন্ধান হয়েছে কিন্তু কোন সঠিক সিদ্ধান্তে কেউ পৌঁছতে পারেনি।। এহেন একটি বিষয় নিয়ে পড়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলাম, সুলেখক ঋজু গাঙ্গুলী দুখানি বই সাজেস্ট করেন, তার মধ্যে তুহিন মুখোপাধ্যায়ের "চৈতন্যের শেষ প্রহর" বইটি প্রথম।। আলোচ্য বইটিতে লেখক চেষ্টা করেছেন চৈতন্যের অন্তিম সময়ের বিষয়ে বিশদ আলোচনার উপর আলোকপাত করার।।
✨✨ সবিনয় নিবেদন অংশে লেখক সরাসরি জানিয়েছেন - "এ গ্রন্থ রচনার সময় তাকে বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হয়েছে যাতে গবেষণা গ্রন্থের বদলে এটিও পূর্বতন অনেক গবেষণাগন্ধী রোমহর্ষক কাহিনীর সমগোত্রীয় না হয়।।"
তারপর একে একে লিখেছেন পরবর্তী অধ্যায় গুলো।।শ্রীচৈতন্যের অন্তর্ধান-এর বিষয়ে মূলত যে সকল আলোচনাগুলি জানা যায় তা হল -
১. একটি অমীমাংসিত রহস্য।। ২. নীলাচলে জগন্নাথ মূর্তিতে লীন হওয়া।। ৩. জগন্নাথ মন্দিরের মধ্যে নৃত্যরত অবস্থায় পতনজনিত আঘাতে মৃত্যু।। ৪. পায়ে ইটের আঘাত বিষিয়ে গিয়ে মৃত্যু।। ৫. ছদ্মবেশে নীলাচল ত্যাগ।। ৬. সমুদ্রের জলে ডুবে মৃত্যু।। ৭. নীলাচলে নিত্যানন্দের কোলে মাথা রেখে মৃত্যু।। ৮. গুপ্তহত্যা।। ৯. এত কুয়াশা কেনো।। ১০. চৈতন্যের শেষ প্রহর।। ১১. গোপন সমাধির সন্ধানে।।
লেখক অত্যন্ত যত্ন নিয়ে তথ্য, ব্যাখ্যা ও যুক্তির নির্মোহ বিশ্লেষণ দ্বারা প্রচলিত ধারণাগুলিকে করাঘাত করছে।। উপরে লিখিত মোট ৭ টি ধারণাকে লেখক যুক্তি ও তথ্য দিয়ে বিশ্লেষণ করেছেন এবং কেনো কিভাবে ওই ৭ টি ধারণা ঘটা অসম্ভব তার আলোচনা করেছেন আলাদা আলাদা ক্রমে।।
🎭🎭 পাঠ প্রতিক্রিয়া -
এই বইয়ের সবথেকে বড় গুণ হল বইটি লেখার কৌশলে, সেই টু দি পয়েন্ট উত্তর দেওয়া যাকে বলে।। প্রত্যেকটি পয়েন্ট তুলে সেই নিয়ে তথ্য, কোটেশন, ইতিহাস, রাজনীতি, দৈনন্দিন জীবনকাল সবকিছুর নিরিখে সেই বিষয়গুলি আলোচনা করে নিজের মতটি লেখক প্রকাশ করেছেন।। তবে লেখক যে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন সেটি যে একমাত্র সম্ভাব্য ব্যাখ্যা তাও কিন্তু না।। আপনি সেই সিদ্ধান্তের সাথে একমত নাও হতে পারেন।। আর বইটি তথ্য সমৃদ্ধ নন ফিকশন হলেও বইয়ের লেখনী আপনাকে আকৃষ্ট করে রাখবে, ছেড়ে রেখে উঠতে পারবেন না।। লেখনীর শেষে শ্রী চৈতন্যের সমাধির সন্ধান নির্দেশ করার প্রচেষ্টাও করেছেন লেখক।। চৈতন্যদেবের অন্তর্ধানকে কেন্দ্র করে লেখা এই গ্রন্থ গবেষণাধর্মী গ্রন্থ রূপেই বিবেচনা করা প্রয়োজন।। যারা এখনো এই প্রাচীন একটি অমীমাংসিত বিষয় নিয়ে পড়াশুনা করতে আগ্রহী তারা অবশ্যই এই বইটি দিয়ে শুরু করুন, নির্ভেজাল তথ্য যুক্তি ও অনুসন্ধান এর উপর ভিত্তি করে এই গবেষণাধর্মী লেখাটা অবশ্যই মাস্ট মাস্ট রিড।।