সম্পাদনা - Shamita Das Dasgupta, Ishani Roychaudhuri Hazra, Keya Mukhopadhyay ও Sujan DasGupta
কনান ডয়েলের গোয়েন্দা শার্লক হোমস, চেস্টারটনের ফাদার ব্রাউন, ডরোথি সেয়ার্সের লর্ড পিটার উইমসি, বা অ্যাগাথা ক্রিস্টির এরক্যুল পোয়ারো'র সঙ্গে বাঙালি পাঠক অপরিচিত নন। কিন্তু এই গুটিকতক লেখককে বাদ দিলে ইংরেজি গোয়েন্দা গল্পের স্বর্ণযুগের বহু দিকপালের লেখা বাংলায় তেমন চোখে পড়ে না। এই সংকলনের উদ্দেশ্য দুটো। প্রথমত, এটি হল অনুবাদ – ভাষান্তর, রূপান্তর, বা 'ছায়া অবলম্বনে' নয়। গল্পগুলিতে লেখকের রচনাশৈলী যতটা সম্ভব অক্ষুণ্ণ রাখা হয়েছে। সেই বিচারে অন্যান্য অনেক অনুবাদের থেকে বইটি যথেষ্ট পৃথক। দ্বিতীয়ত, ইংরেজি গোয়েন্দা কাহিনির বিবর্তনের খানিকটা নির্যাস, শুরু থেকে স্বর্ণযুগ, পাঠকদের সামনে তুলে ধরা হয়েছে। মোট বারোটি গল্প আমরা বাছাই করেছি। চেষ্টা করেছি সেসব লেখককে বেছে নিতে, যাঁরা বাঙালি পাঠক সমাজে প্রায় অপরিচিত, কিন্তু বিদেশী পাঠক জগতে জনপ্রিয় ছিলেন। ভূমিকায় গোয়েন্দা সাহিত্যের ইতিহাস এবং বিকাশের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছে যা সিরিয়াস পাঠকের ভাল লাগবে। সঙ্গে থাকছে, কিছু ‘অরিজিনাল’ ছবি
সূচি –
মূল গল্প / অনুবাদ গল্প - লেখক/অনুবাদক
দ্য মার্ডারস ইন দ্য রু মর্গ / মর্গ সরণির হত্যাকাণ্ড - এডগার অ্যালেন পো / শমীতা দাশ দাসগুপ্ত
বিদেশি রহস্যকাহিনি বাংলায় অনূদিত হওয়ার রেওয়াজ অনেকদিনের। তবে হ্যাঁ, মাঝেমধ্যে সেগুলো অনুবাদ হিসেবে স্বীকৃত না হয়ে বরং 'বিদেশি কাহিনির ছায়া অবলম্বনে' আকারে পেশ হয়। কখনও বা 'না বলিয়া পরের দ্রব্য গ্রহণ' স্টাইলেও হ্যারিসন হারাধন আর ক্যাথরিন কেতকী হয়ে আমাদের সামনে চলে ফিরে বেড়ান, এমনকি খুন হন! আলোচ্য সংকলনে তা হয়নি। সেখানে অনুবাদকেরা নিষ্ঠা ভরে অনুবাদ করেছেন এক ডজন গোয়েন্দা গল্প। এই গল্পগুলোর প্রোটাগনিস্ট তথা গোয়েন্দাদের 'স্বর্ণযুগের বিদেশি রহস্যভেদী' বলা হয়েছে। কেন তাঁদের কাণ্ডকারখানা যে সময়ে ঘটেছে তাকে 'স্বর্ণযুগ' বলা হয়েছে, সেটি জানা যায় বইটির ভূমিকা থেকে। সুজন দাশগুপ্ত রচিত এই ভূমিকাটি এবং বইয়ের শেষাংশে লেখক-পরিচিতি এই বইয়ের সবচেয়ে মূল্যবান অংশ বলে আমার মনে হয়েছে। এবার আসি গল্পগুলোর, বা আরও ভালোভাবে বললে তাদের অনুবাদের কথায়।
এই বইয়ের গল্পগুলো মোট চারজন অনুবাদকের দ্বারা অনূদিত হয়েছে। কেয়া মুখোপাধ্যায়ের অনুবাদে পেয়েছি নিম্নলিখিত তিনটি গল্প: ১. দ্য লিটল স্টিল কয়েল ২. দ্য মিস্টিরিয়াস ভিজিটর ৩. দ্য অ্যাবমিনেবল হিস্ট্রি অফ দ্য ম্যান উইথ কপার ফিংগার্স এই গল্পগুলোর অনুবাদ মোটামুটি সহজ। গল্পের নামগুলো আক্ষরিক অনুবাদের পাল্লায় পড়লেও বাকিটা পড়তে গেলে বাংলাই পড়ছি বলে মনে হয়। সুজন দাশগুপ্ত'র দ্বারা অনূদিত হয়েছে তিনটি গল্প: ১) দ্য স্টার আউটসাইড দ্য কাফে রয়াল ২) সিলভার ব্লেজ ৩) জেনুইন টাবার্ড অনুবাদ হিসেবে এরা সেরা। নামগুলো যথারীতি আক্ষরিক অনুবাদের ফলে বিকট হয়েছে। তাছাড়া হোমসের গল্পগুলোর মধ্যে 'সিলভার ব্লেজ' শিশুপাঠ্য ও অতি-পঠিত। তার বদলে থর ব্রিজের খুনখারাপি পেলে ভালো হত। ঈশানী রায়চৌধুরী অনুবাদের জন্য প্রসিদ্ধ। যে তিনটি গল্প তাঁর অনুবাদে আমাদের সামনে এসেছে তারা হল: (১) দ্য অরাকল অফ দ্য ডগ (২) দ্য ফ্লাইং কর্পস (৩) সলভড বাই ইন্সপেকশন গল্পগুলোর অনুবাদে লেখক যথাসাধ্য সরসতা রাখলেও সেগুলো মূল গল্পের অনুসরণে অতিকথন ও আক্ষরিক অনুবাদের ফলে স্রেফ ছড়িয়ে গেছে। হাস্যরসের বদলে গল্পগুলো পড়তে গেলে দাঁত খিঁচুনি হওয়াই স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। এবার আসি এই বইয়ের সবচেয়ে বাজে গল্পগুলোর কথায়। প্রায় পৈশাচিক রকম অনুবাদ পেয়েছি এই তিনটি গল্পে। আক্ষরিকতার ব্যাপারে গুগল ট্র্যান্সলেটকে লজ্জায় ফেলা তো বটেই, হয়তো আত্মহত্যাই করতে বাধ্য করবে এরা। দুর্ভাগ্যের বিষয়, শ্রদ্ধেয় সাহিত্যিক শমীতা দাশ দাশগুপ্ত'র হাতেই এই বরবাদ টাইপের অনুবাদগুলো ঘটেছে। এই আকারে আমরা পেয়েছি: ১. দ্য মার্ডারস ইন দ্য রু মর্গ ২. দ্য মিস্টিরিয়াস ডেথ অন দ্য আন্ডারগ্রাউন্ড রেলওয়ে ৩. দ্য ডুমডর্ফ মিস্ট্রি কেন আমি এত হাহাকার করছি সেটা বোঝানোর জন্য এক চিলতে 'অনুবাদের' নমুনা তুলে দিচ্ছি~ "যে সব মানসিক বিশিষ্টতা নিয়ে সাধারণত আমরা আলোচনা করি, তা অনেক সময়েই বিশ্লেষণ করা যায় না। শুধু সেই সব বৈশিষ্ট্যের পরিণাম দেখেই আমরা তারিফ করি। তবে এই ধরনের বৈশিষ্ট্যগুলির আধিকারিক যখন অপরিমিত সেই উপাদানগুলি ভোগ করে, তখন তা প্রভূত আনন্দ জোগায়।" এটা যদি বাংলা হয়, তাহলে আমার বানানো ম্যাগিও আরসালানের বিরিয়ানি। মোদ্দা কথা হল, বামফ্রন্টের ভয়ানক শিক্ষারীতির প্রকোপে ইংরেজি যদি একান্তই না শিখে থাকেন তাহলে আলাদা ব্যাপার। নইলে এই গল্পগুলো দয়া করে, আই রিপিট দয়া করে, মূল ভাষাতেই পড়ুন। এই সংকলনটির পেছনে আড়াইশো টাকা ব্যয় করাটা সিরিয়াসলি চাপের ব্যাপার হবে।