মূলকথা [প্রশ্নের কারণ] - অজানাকে জানার স্পৃহা মানুষের চিরন্তন। বাক্যস্ফুরণ আরম্ভ হইলেই শিশু প্রশ্ন করিতে থাকে এটা কি? ওটা কি? বয়োবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে স্কুলে,কলেজে ও কাজে-কর্মে অনুরূপ প্রশ্ন চলিতে থাকে এটা কি,ওটা কি,এরূপ কেন হইল,ওরূপ কেন হইল না ইত্যাদি। এই রকম ‘কি’ ও ‘কেন’র অনুসন্ধান করিতে করিতেই মানুষ আজ গড়িয়া তুলিয়াছে বিজ্ঞানের অটল সৌধ। প্রশ্নকর্তা সকল সময়ই জানিতে চায় সত্য কি? তাই সত্যকে জানিতে পারিলে তাহার আর কোন প্রশ্নই থাকে না। কিন্তু কোন সময় কোন কারণে কোন বিষয়ের সত্যতায় সন্দেহ জাগিলে উহা সম্পর্কে পুনরায় প্রশ্ন উঠিতে থাকে। কোন বিষয় বা কোন ঘটনা একাধিকরূপে সত্য হইতে পারে না। একটি ঘটনা যখন দুই রকম বর্ণিত হয়, তখন হয়ত উহার কোন একটি সত্য অপরটি মিথ্যা অথবা উভয়ই সমরূপ মিথ্যা; উভয়ই যুগপৎ সত্য হইতে পারে না হয়ত সত্য অজ্ঞাতই থাকিয়া যায়। একব্যক্তি যাহাকে “সোনা” বলিল অপর ব্যক্তি তাহাকে বলিল “পিতল”। এ ক্ষেত্রে বস্তুটি কি দুই রূপেই সত্য হইবে? কেহ বলিল যে অমুক ঘটনা ১৫ই বৈশাখ ১২টায় ঘটিয়াছে; আবার কেহ বলিল যে,উহা ১৬ই চৈত্র ৩টায়। এস্থলে উভয় বক্তাই কি সত্যবাদী? এমতাবস্থায় উহাদের কোন ব্যক্তির কথায়ই শ্রোতার বিশ্বাস জন্মিতে পারে না। হয়ত কোন একজন ব্যক্তি উহাদের একজনের কথায় বিশ্বাস স্থাপন করিল,অনুরূপ অন্য একব্যক্তি অপরজনের কথা সত্য বলিয়া স্বীকার করিল,অপরজন তাহা মিথ্যা বলিয়া ভাবিল। এইরূপে উহার সত্যাসত্য নিরূপণে ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে ঘটিল মতানৈক্য। আর এইরূপ মতানৈক্য হেতু ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে ঘটিয়া থাকে নানারূপ ঝগড়া-কলহ, বিবাদ-বিসম্বাদ ও দাঙ্গা-হাঙ্গামা। এই রকম বিষয় বিশেষ ব্যক্তিগত মতানৈক্যর ন্যায় সমাজ বা রাষ্ট্রগত মতানৈক্যও আবহমানকাল হইতে চলিয়া আসিতেছে; যাহার পরিণতি সাম্প্রদায়িক কলহ ও যুদ্ধবিগ্রহ- রূপে আজ আমরা চোখের উপরই দেখিতে পাইতেছি। জগতে এমন অনেক বিষয় আছে, যে সব বিষয়ে দর্শন,বিজ্ঞান ও ধর্ম এক কথা বলে না। আবার ধর্মজগতেও মতানৈক্যের অন্ত নাই যেখানে একইকালে দুইটি মত সত্য হইতে পারে না,সেখানে শতাধিক ধর্মে প্রচলিত শতাধিক মত সত্য হইবে কিরূপে? যদি বলা হয় যে,সত্য হইবে একটি; তখন প্রশ্ন হইবে কোনটি এবং কেন? অর্থাৎ সত্যতা বিচারের মাপকাঠি (Criterion for truth) কি? সত্যতা প্রমাণের উপায় (Test for truth) কি এবং সত্যের রূপ (Nature of truth) কি? আমরা ঐ সকল দুরূহ দার্শনিক তত্ত্বের অনুন্ধানে প্রবিষ্ট হইব না,শুধু ধর্ম-জগতের মতানৈক্যের বিষয় সামান্য কিছু আলোচনা করিব ।
Aroj Ali Matubbar (Bengali: আরজ আলী মাতুব্বর) was a self-taught philosopher and apostate, of Bangladesh. He was born in British India on 17 December 1900 (Bengali year 1307) in the village of Lamchari in Charbaria union, about 11 km from Barisal town, currently in Bangladesh.
His original name was Aroj Ali, and he only acquired the name 'Matubbar' (meaning 'local landlord') later. He was born to a poor farming family. He studied for only a few months at the village maqtab, however this brief dabble in institutional education centered only on the Quran and other Islam studies. He gathered most of his knowledge on varied subjects, including science and philosophy, through his own readings and research.
Matubbar was little known to the elite educated society of the country during his lifetime. His first book, published in 1973, was rich with secular thought but caught little attention. It is only in the final years of life that he came to be known to the enlightened society of the country. His writings were collected and published. People in general started to take an interest in his books, which, although reflecting an untrained mind, posed a number of intriguing questions. He soon rose to eminence, albeit after his death in 1985.
অনেক প্রশ্ন বর্তমানে অজানা নয়৷ অনেক যুক্তি বর্তমানে ধোপে ঠিকবে না। কিন্তু একজন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাবিহীন হয়েও লেখক যে অনুসন্ধিৎসু মনের পরিচয় দিয়েছেন সেই সত্তরের দশকে, তা আজ একবিংশ শতাব্দীর বেশিরভাগ উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যেও বিরল।
এই বইটি লেখার কারণে লেখককে করতে হয়েছিলো হাজতবাস। কেন? তিনি কতগুলো প্রশ্ন করেছিলেন? উত্তর তিনি দেন নি কিছুরই সরাসরিভাবে। তবে তার প্রশ্নের ভূমিকাতেই উত্তর খুঁজে নেবার প্রয়োজনীয় তথ্য তিনি পাঠকের জন্য দিয়ে রেখেছেন। প্রশ্নগুলো তেমন অদ্ভুত কিছু নয়, এমনও নয় যে সে প্রশ্ন আর কারও মাথায় কখনও আসবে না বা আসে নি। ব্যাপারটা হচ্ছে আমরা ছোটবেলা থেকেই একটা সিস্টেমের মধ্যে বড় হয়েছি, পড়েছি কিছু বই পরীক্ষায় পাস করার জন্য। এর বাইরের বই পড়েও আমাদের বেশিরভাগ মানুষের মগজাস্ত্রের ধার খুব একটা বাড়ে নি, আমরা তাই বিশ্বাস করে আসছি যা আমাদের শেখানো হয়েছে পরিবার আর সমাজ থেকে। সেগুলো নিয়ে আমরা প্রশ্ন তুলি না, কারণ এগুলো নিয়ে তর্ক করতে নেই। একই মানুষ যেখানে অন্য যেকোন বিষয়ে যুক্তিবাদী সেখানে ধর্মের কোন বিষয়ে তার মনে কোন যুক্তি কাজ করে না। অন্যের ধর্ম হলে ব্যাপারটা গাঁজাখুড়ি বলে উড়িয়ে দিতে মানুষের সমস্যা হয় না, ধর্মের বাইরের গল্প হলে তা হয়ে যায় রূপকথা কিন্তু একই ধরণের তথ্য নিজের ধর্মগ্রন্থে খুঁজে পেলে মানুষ সেটা নিয়ে মাথা ঘামাতে চায় না, তখন সে আগে থেকেই সিদ্ধান্ত নিয়ে বসে থাকে এ নিয়ে তর্ক চলবে না, করতে হবে শুধু বিশ্বাস। আরজ আলী স্বশিক্ষিত ছিলেন বলেই বোধহয় আউট অব বক্স চিন্তা করার শক্তি তার ছিলো, যা আমাদের বেশিরভাগেরই নেই। তিনি সব ধর্মেরই বিভিন্ন অবিশ্বাস্য তথ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। উত্তর এখানে উহ্য, পাঠক নিজে উত্তর ভেবে নেবেন। হয়তো বিশ্বাসীদের এই বই হজম করতে কষ্ট হবে, খোঁড়া যুক্তি দিয়ে মনকে সায় দেবার চেষ্টা হয়তো করবেন, তবু কিছু মানুষ হয়তো তারপরও বদলাবেন, বদলাবে তাদের চিন্তাভাবনা। এই গুগল আর তথ্য প্রযুক্তির যুগে এমন ধরণের লেখা হয়তো অনেকেই লিখছেন। কিন্তু অজপাড়া গাঁয়ে থাকা স্বশিক্ষিত মানুষটি অসংখ্য বই থেকে তথ্য নিয়ে অসম্ভব পরিশ্রম করে যে বইটি লিখে গেছেন তার যথাযথ মূল্য নির্ধারণ করার ক্ষমতা হয়তো অনেকেরই হবে না, তারা বরং চেষ্টা করতেই থাকবে খোঁড়া সব যুক্তি দিয়ে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে থাকা নিয়ে।
প্রথম সংস্করণের ভূমিকাতেই মাতুব্বর সাহেব স্বীকার করে নিয়েছেন যে, তিনি ধর্মজগতের বাহিরে ভেসে যাচ্ছিলেন। ধর্মের চিন্তা-সমালোচনা করছেন ধর্মজগতের বাহিরে গিয়ে! জিনিসটা অনেকটা এরকম হয়ে গেল যে, ঘরের কোনো জিনিস খুঁজছেন ঘরের বাহিরে গিয়ে! আগে তো হারানো জিনিসের খোঁজ করতে হবে নিজের ঘরে, পরে তো বাহিরে। হয়তোবা তিনি এই কথার মাধ্যমে নিজের নিরপেক্ষতাকে বুঝাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ভেতরে পড়তে গিয়ে আমি কোনো নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি খুঁজে পেলাম না। কারণ উনি ধরেই নিয়েছেন যে ধর্ম-বিজ্ঞান-দর্শন নাকি জগতের অনেক বিষয়ে একই কথা বলে না; কিন্তু বিজ্ঞান যেটা বলে সেটাই ঠিক। কিন্তু ধর্ম-দর্শন-বিজ্ঞান, তিনটাকে কেন একই কথা বলতে হবে? তিনটা তিনরকমের বিষয় এবং একটা আরেকটার ওপর অনির্ভরশীল। তার ওপর বৈজ্ঞানিক বিষয়গুলো সতত পরিবর্তনশীল। আবার অন্যদিকে বিজ্ঞান ও দর্শনের মধ্যেও বেশ বড় রকমের হেরফের আছে।
এটা ঠিক যে, ধর্মের মধ্যে অনেক মতভেদ আছে। কিন্তু সেটা কেন? এর উদাহরণ তার লেখাতেই বিদ্যমান। এই যে তিনি বললেন, মুসলমানের কাছে কবুতরের বিষ্ঠা পাক, অমুসলমান মাত্রই নাপাক- এই কথা তিনি কোথায় পেয়েছেন? (বইজুড়ে এরকম অসংখ্য আজগুবি কথা লেখা) ঠিক তেমনি (অন্য ধর্মের কথা জানি না, মুসলমানদের কথাই বলি) আমাদের মধ্যেও অনেকে এমন অনেক কথা বলে বা বিশ্বাস করে যেটার দলিল-প্রমাণ কুরআন-হাদিসে কোথাও নাই। আর দলিল নাই মানেই সেটা বাতিল। এখন ব্যক্তিগতভাবে কেউ যদি মনগড়া কিছু বিশ্বাস করে তবে সে দোষ কি ধর্মের? এভাবেই অনেক মতভেদ চলে এসেছে। এর সবগুলোই তাদের অহংকার থেকে, ভিন্নমতের প্রতি অশ্রদ্ধা থেকে। এই অসহিষ্ণুতার কারণেই আজকের এই অবস্থা। আজকের পৃথিবীতে মানুষের মধ্যে যত কেঁচাল আছে তার সকল কিছুর পেছনেই কোনো না কোনো আদর্শ খুঁজে পাওয়া যাবে। সে কথা থাক পড়ে, সেটা আবার বিস্তারিত আলোচনার বিষয়।
এদিকে আবার প্রশ্নের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মাতুব্বর সাহেব লোকমুখে প্রচলিত সব কথায় ‘ইমান’ খুঁজতে গিয়েছেন। কিন্তু ধর্মের সামলোচনা যদি করা হয় লোকমুখে শোনা কথা দিয়ে, এটা তো যুতসই হলো না কোনোভাবে। আবার শেষে উপসংহারে গিয়ে বলছেন, ধর্মের বিরোধিতা করা নাকি তার উদ্দেশ্য ছিল না, বরং উদ্দেশ্য ছিল যেন এর মাধ্যমে ধর্ম কুসংস্কারমুক্ত হয়। যদি তাই হতো তবে কেন উনি বিষয়বস্তু সংক্রান্ত দলিল-প্রমাণগুলো সামনে নিয়ে আসলেন না? তাতে বরং কুসংস্কার আরো সহজে দূর হতো। কিন্তু ওনার লেখার ভেতরে প্রশ্নের বদলে সংশয় বেশি প্রকাশ পেয়েছে। আমরা জানি, কুসংস্কারের মূলে রয়েছে অশিক্ষা; এবং ঐ সময়ের বেশিরভাগ মানুষই ছিল অশিক্ষিত। অথচ মাতুব্বর সাহেব যথেষ্ট শিক্ষিত হওয়া সত্ত্বেও ধর্মীয় বিষয়গুলোকে যথাযথভাবে অধ্যয়ন না করেই এই টপিকে লিখতে বসে গিয়েছেন!
তার লেখায় তিনি যতগুলো প্রশ্ন তুলেছেন তার অধিকাংশেই বিজ্ঞানকে স্ট্যান্ডার্ড ধরেছেন। ওদিকে তিনি নিজেই একবার স্বীকার করেছেন যে, বিজ্ঞান সতত পরিবর্তনশীল। তাহলে পরিবর্তনশীল কোনো কিছু সত্যের মাপকাঠি হয় কীভাবে? সুতরাং, তার এই লেখাগুলো পড়ে শুধু তারাই বিভ্রান্ত হবেন যাদের ‘ধর্ম’ বিষয়ে ন্যূনতম পড়াশোনা নেই। আর বাকিদের কথা ভিন্ন। মাতুব্বর সাহেবের নিজেরও ধর্ম বিষয়ে জ্ঞান ছিল (বিশেষ করে ইসলামের বিষয়ে) ভাসা ভাসা। যেমন: উনি বলেছেন, মকরম নাকি ফেরেশতা ছিল! (?) আবার ‘ফেরেশতা’ শয়তান সম্পর্কে তার ‘অগাধ’ জ্ঞান থাকলেও ‘নফস’ সম্পর্কে কিছুই লেখেননি। নাহলে আমি আশা করেছিলাম তিনি এই প্রশ্নটাও তুলবেন, “রমজান মাসে শয়তানকে বন্দি করে রাখলে মানুষের মনে কুমন্ত্রণা দেয় কে?” অথবা “মানুষকে শয়তান বিভ্রান্ত করলে, শয়তানকে বিভ্রান্ত করল কে?” মেরাজ নিয়ে হাস্যকর সব প্রশ্ন করেছেন! এরকম আরো অনেক কিছুই চোখের সামনে পড়েছে। তাতে বুঝলাম যে, ধর্ম বিষয়ে তার পড়াশোনা যথেষ্ট ছিল না। বেশিরভাগেই ছিল লোকমুখে শোনা কথা বা কুসংস্কার।
মাতুব্বর সাহেব বার বার করে সবকিছুকে সময়ের ফ্রেমের ভিতরে চিন্তা করছেন। যেমন: তকদির, ঈশ্বরের অনাদি-অনন্ত হওয়া, সৃষ্টির পূর্বের যুগ ইত্যাদি। শুধু তকদির নিয়েই একটু বলি। আমার তকদির নির্ধারিত। কিন্তু এই তকদির নিয়ে কোনো প্রশ্ন তুলতে আমি সক্ষম না। কারণ, আমি সময়ের ফ্রেমে বসবাস করি, এবং আমি এটাতে বন্দি। এর বাহিরে গিয়ে চিন্তা করা তো মানুষের পক্ষে সম্ভব না। কিন্তু সময়ের স্রষ্টা তো এর উর্ধ্বে। তাহলে তকদিরের ধারণা কি আমাদের মাথায় আদৌ ঢোকার কথা যদি না স্রষ্টা আমাদেরকে সেরকম সামর্থ্যবান করেন? মাতুব্বর সাহেব যেমন নাকি নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে গিয়ে ধর্মজগতের বাহিরে চলে যেতে চেয়েছেন, ঠিক ত��মনি আমারও তো সময়ের ফ্রেমের বাহিরে গিয়ে তকদিরের কন্সেপ্টটাকে নতুন করে চিন্তা করা লাগে। কিন্তু সেটা কি সম্ভব? অথবা আপনি চাইলে সময়ের উর্ধ্বে যাবার বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব আবিষ্কার হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারেন।
ইসলামের বিষয়ে যেসব প্রশ্ন তিনি তুলেছেন সেগুলোর জবাব কুরআন-হাদিস বা ইসলামী দর্শন ঘাটলেই পাওয়া যায়। ইন্টারনেটের যুগে এটা এখন আরও সহজ হয়ে গিয়েছে। হতে পারে তার সময়ে এগুলো ধরিয়ে দেবার মত কেউ ছিল না; আর তবলীগের মুরুব্বী মাত্রই তো আল্লাহর অলী না। যেমন: (তিনি এ যুগের কোনো লোক হলে) আজকের দিনের কোনো পোর্টেবল স্টোরেজ ডিভাইস অথবা সোশ্যাল মিডিয়ার বিভিন্ন আইডি/একাউন্ট ইত্যাদি সম্পর্কে তার ধারণা থাকলে মৃত্যুর পর মানুষ কীভাবে পুনরুজ্জীবিত হবে তা নিয়ে কোনো সন্দেহ ‘হয়তোবা’ রাখতেন না। অবশ্য সবসময়ই পরকালের সাথে বস্তুজগতের মিল থাকাটা কি আবশ্যক?
আর কিছু জিনিসকে একেবারে নিজের মত করে সংজ্ঞায়িত করেছেন। যেমন: প্রাণ ও মন, দয়া ইত্যাদি। অতঃপর তার শিশুসুলভ সব প্রশ্ন।
অসংখ্য প্রশ্ন তার। এভাবে জবাব লিখতে থাকলে শেষ আর হবে না। প্রশ্ন করাটা খুবই সহজ। কিন্তু প্রশ্নের চেয়ে উত্তরটাই বড় হয় সবসময়। কিন্তু আপনি কখনোই বস্তুজগতের সাথে পরজগতের হিসাব পাই টু পাই মেলাতে পারবেন না। কেননা সেই ক্ষমতা আমাদেরকে দেয়া নেই। এই অবাস্তব হিসাব মেলাতে গিয়েই মাতুব্বর সাহেব ভুলটা করেছেন। এর ওপর ধর্মতত্ত্ব নিয়ে তেমন জানাশোনাও ছিল না তার। সংশয়ের লুপে পড়ে গিয়েছিলেন তিনি। এভাবে ‘সত্যের সন্ধান’-এর বদলে সংশয়ের সন্ধান বেশি হয়ে গিয়েছে। এসব কোনো কিছুই কোনো প্রশ্ন বা সন্দেহের কাতারে পড়ে না যদি একটা জায়গায় প্রশ্ন করা হয়, এমন কি কোনো কিছু থাকতে পারে না যেটা স্রষ্টা আমাদের জ্ঞানের পরিধির বাহিরে রেখেছেন? এই জিনিসটাকে ‘সংশয়’ মনে না করে নিজেদের জন্য ‘পরীক্ষা’ হিসেবেও তো নেয়া যেতো। আমার যত আগ্রহ, যতকিছু অজানা সবকিছুই তো জানতে পারব, তবে সেটা পরকালে। সেদিন সবকিছুর মীমাংসা হবে। আর জান্নাতে তো স্রষ্টাকে স্বচক্ষেই দেখাই যাবে।
“আর ইয়াহুদিরা বলে, ‘নাসারাদের কোনো ভিত্তি নেই’ এবং এবং নাসারারা বলে, ‘ইয়াহুদিদের কোনো ভিত্তি নেই’। অথচ তারা কিতাব পড়ে। এভাবে যারা কিছুই জানেনা তারাও একই কথা বলে। কাজেই যে বিষয়ে তারা মতভেদ করতো কেয়ামতের দিন আল্লাহ্ তাদের মধ্যে (সে বিষয়ে) মীমাংসা করবেন।” (২:১১৩)
মানুষ হলো সৃষ্ট। স্রষ্টা (যিনি সকল কিছুর ওপর ক্ষমতাবান) কোনোভাবে তার সৃষ্টের কাছে কোনো কিছুর কৈফিয়ত দিতে বাধ্য নন। মানুষের জ্ঞানের পরিধি ততটুকুই, যতটুকু তিনি মানুষের মস্তিষ্কে দিয়েছেন। এই সীমাবদ্ধতা নিয়ে স্রষ্টার কোনো বিষয়ে প্রশ্ন তোলা কি মানুষের জন্য সাজে?
অজানাকে জানতে মানুষ স্বভাবতই অনেক আগ্রহী। সেই আগ্রহ মেটাতে গিয়ে মানুষ কখনও দ্বিধায় পরে যায় আবার কখনও সন্তুষ্টি নিয়ে ফিরে আসে। এই দ্বিধা আর সন্তুষ্টি নির্ভর করে তার জানার পরিধির উপর। একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে জ্ঞানের মাপকাঠিতে একজন বিশ্বনন্দিত হতে পারে আবার ঐ একই ব্যাক্তি আরেকটি বিষয়ে জ্ঞানের মাপকাঠিতে প্রাথমিক স্তরের নিচে নেমে যেতে পারে। আমাদের সাধারন পাঠকদের সমস্যা হল আমরা অনেকেই স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে পড়ার সময় এ বিষয়টি মনে রাখিনা। ফলে লেখা যেদিকে আমাদের নিতে চায় আমরা সেদিকেই চলে যাই। মাত্র দু একটি বই পড়েই দেখা যায় অনেকের বিশ্বাসে চীর ধরে গেছে, বিশেষত কোন লেখক আমাদের প্রিয় হয়ে উঠলে তখন তার অনেক ভুলই আমাদের চোখে পরেনা কারন তখন আমরা লেখার স্রোতে ডুবে যাই। অন্যদিকে বিশেষ করে আজকের জুগে যে বিষয় নিয়ে আমরা সাধারণত সবচেয়ে কম জ্ঞান রাখি তার একটি হল ধর্ম। তাই দেখাযায় একদিকে পরিস্কার জ্ঞান না থাকা আরেক দিকে লেখকের প্রশ্নবানে ডুবে যাওয়া একজনের বিশ্বাস নড়বরে করে দেয়। কিন্তু যারা এ বিষয়ে আর একটু গভীর জ্ঞান রাখে তারা খুব সহজেই সে ভুল গুলো চট করে ধরে ফেলতে পারে। "সত্যের সন্ধানে" বইটি পড়ে যাদের প্রশ্ন জন্মেছে তারা লেখক আরিফ আজাদের "আরজ আলী সমীপে" বইটি পড়লে দেখবেন সত্যের সন্ধানের মত বই গুলোর দাবী কতটা সাধারন মানের। লেখক আরজ আলী বেঁচে থাকলে হয়তো "আরজ আলী সমীপে" বইটি তার জ্ঞানের পরিধি আরও বাড়িয়ে দিত।
একজন স্বশিক্ষিত ভদ্রলোক লিখবেন, এটা বোধ করা যায়। অসংখ্য প্রশ্ন রেখে গেছেন, কোনটা বাঞ্চনীয়, কোনটা না। কিন্তু চিন্তার খোরাক অপরিসীম। ব্রাভো। এই যুগে এই বই প্রকাশ পেলে কাঁধের উপরের জিনিসটা ধূলায় গড়াগড়ি খেত সম্ভবত।
একটা লোক কোনোরকম প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়া এত প্রজ্ঞা আর জ্ঞানের অধিকারী হইতে পারে আরজ আলীর কাজগুলা না পড়লে বিশ্বাস করা সম্ভব হইতো না। প্রথমে হাতে নিলে বইটারে সিলি মনে হইতে পারে; আমারও মনে হইছিলো। কিন্তু ৩-৪ পাতা উল্টায়ে পড়ার পর শৈশবে আমার ধর্মরে অবুঝ আমার উপর চাপ দেওয়ার পর যেসব প্রশ্ন সচরাচর মনে আসতো ঠিক ঐ প্রশ্নগুলাই তার বইয়ে দেখলাম। প্রশ্ন বলা যায় না যদিও, প্রশ্নের ছলে তিনি ব্যাখ্যা দিয়ে দিছেন আরকি। যখন আমরা নিজের ধর্মরে শ্রেষ্ঠ বলি, নিজের ধর্মগ্রন্থরে সবচাইতে গ্রহনযোগ্য বলি, তখন সেইটা কোন যুক্তিতে বলি? যেইখানে আমাদের পড়ার দৌড় কেবল নিজ ধর্মের বিষয়বস্তুতেই সীমাবদ্ধ? আরজ আলীও এইসব প্রশ্ন নিয়া ঘাটাঘাটি করছিলো হয়তো আর আমার মনে হয় নাই তিনি বই আকারে বের করার জন্য এইসব খুঁজছেন, কেবল প্রশ্নের গ্রহনযোগ্য উত্তর খুঁজতেই লিখে রাখছিলেন সম্ভবত। আর এই প্রশ্নগুলা নিয়াই এই 'সত্যের সন্ধান' বইটা। যথেষ্ট রেফারেন্স সহকারে লিখা; তথ্যবহুল এবং সহজপাঠ্য।
ওনার লেখা এত মজার! মজার ব্যাপার হল তাঁর লেখা দেখে কখনোই মনে হয়না যে তিনি আসলে কোন ধরনের মজা করতে চাচ্ছেন। আমার ধারণা আসলেই উনি কোন মজা করতে চান নি। উনি জাস্ট নির্দোষ ভালমানুষের মত কতগুলা প্রশ্ন করে গেছেন। কিন্তু লেখার পরতে পরতে হাস্যরস!
উপরন্তু সাধু ভাষা! যেটা দেখলে দশ হাত দূরে ছিটকে যাই সবসময়। কিন্তু তাঁর বলার(পড়ুন লেখার) ধরণ কিচ্ছুটি টের পেতে দেয়নি। শুরুতে ওনার লেখনীর সাথে পরিচিত হতে একটু সময় লাগে। এরপর ঐ কথা বলার ধরনই পাঠককে টেনে নিয়ে যাবে!
বলা বাহুল্য, তাঁর কিছু কিছু যুক্তি একটু দুর্বল লেগেছে, সবগুলোর সাথে আমি একমতও নই, কিন্তু ৮৫-৯০ ভাগই নতুন চিন্তার দ্বার খুলে দিয়েছে। সাথে এভাবে জগতের প্রতিটা ঘটনার পিছনের কারণ খোঁজার জন্য প্রত্যন্ত অঞ্চলের সম্পূর্ণ স্বশিক্ষিত একজন মানুষের যে চিন্তা, সেটার প্রতি একটা সম্মান তৈরি হয়ছে।
আরজ আলী মাতুব্বর অনেক জ্ঞানী মানুষ। নিজ উদ্যোগে এতোটা জ্ঞান অর্জন করা সচরাচর দেখা যায়না। কিন্তু এই বইয়ে অনেক উদাহরন তিনি দিয়েছেন গ্রামগঞ্জে প্রচলিত কাল্পনিক গল্প/পুরান অনুসারে যার সাথে অথেনটিক ইতিহাসের কোন সম্পর্ক নেই। সবচে হাস্যকর হলো বোরাকের বর্ণনা। "পশু, পাখী ও মানব এই তিন জাতীয় প্রাণীর মিশ্ররুপের জানোয়ার। অর্থাৎ তাহার ঘোড়ার দেহ, পাখীর মত পাখা এবং রমণীসদৃশ মুখমন্ডল।" এই টাইপের উদ্ভট কথাবার্তা ইসলামের কোন বর্ণনাতেই পাওয়া যায়না। ওনার অনেক প্রশ্নের উত্তরই বর্তমানে অনেক সহজেই পাওয়া যায় অথবা প্রমাণ করা যায় যা উনি জীবিত থাকলে নিশ্চিতভাবেই বুঝতে পারতেন এবং উনার অনেক ভুল ধারনা ভেঙ্গে যেতো।
বইটি আস্তিক-নাস্তিক সবার পড়ার মতো। লেখক অনেকগুলো মূল্যবান যুক্তি তুলে ধরেছেন যেগুলো সেসময়ের গতানুগতিক নাস্তিকরা এড়িয়ে গেছেন। বইটির তথ্যের কিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও যুক্তির ক্ষেত্রে বইটি কালোত্তীর্ণ। রিচার্ড ডকিন্স অথবা বার্ট্রান্ড রাসেল খ্রিস্ট ধর্মের বিরুদ্ধে যতটা বলেছেন, আরজ আলী তারচেয়ে অনেক গভীর যুক্তি দিয়েছেন ইসলাম আর হিন্দু ধর্মের বিপক্ষে।
খুবই দূর্বলসব প্রশ্ন দিয়ে সাজানো বই। উদার মনে একটু কুরআন হাদীস অধ্যয়ন করলেই এসবের উত্তর পাওয়া যায়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ইসলামী দর্শন থেকে উত্তর পাওয়া যায়। যাইহোক, লেখক এত কষ্ট করেননি।
মানুষ যখন থেকে বুঝতে শেখে তখন থেকেই তার মধ্যে অজানাকে জানার আগ্রহ দেখা দেয়। প্রতিটা ঘটনায় তার ভেরতরে প্রশ্ন জাগে 'কী?' 'কেন?' 'কিভাবে?' এসব প্রশ্ন সৃষ্টিকর্তার ব্যাপারেও থেমে নেই। এই বইটিতে সৃষ্টিকর্তা ও তার ধর্ম সম্পর্কে মনের ভেতর উদিত হওয়া আরজ সাহেবের কিছু প্রশ্ন আছে, যেগুলো আপনাকে হয়তো নতুন করে মুক্তভাবে চিন্তা করতে শেখাবে।
এই বইটি ছয়টি প্রস্তাবের (প্রশ্ন এবং যুক্তির) ডালপালায় পাঠকদের বয়ে নিয়ে একটি কুসংস্কারমুক্ত সমাজে পতিত করতে সক্ষম।আবার সত্যের স্বর্গরাজ্যে নিয়ে যেতে পারে যেটা অনেকটা ধর্মরাজ্যের বিপরীত।