“চৈতন্য অবতারর আবির্ভাব কোনও অলৌকিক ঘটনা ণয়, একান্ত ভাবেই বৃহত্তর সামাজিক স্বার্থে গড়ে তোলা সুচিন্তিত ও জটিল পরিকল্পনার কালজয়ী ফসল।” – ব্যাক কভার থেকে
বাংলায় চৈতন্যদেব, তাঁর প্রভাব, তাঁর মৃত্যুরহস্য— এ-সব নিয়ে অজস্র বই আছে। কিন্তু সম্পূর্ণ নির্মোহ দৃষ্টিতে তাঁর জীবনকে দেখেছেন খুব কম গবেষক। যাঁরা চেষ্টা করেছেন, তাঁদেরও নানা বাধা ও নিষেধাজ্ঞার সম্মুখীন হতে হয়েছে। অথচ মানুষটি বিশ্বম্ভর আচার্য থেকে কীভাবে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু হয়ে উঠলেন— তা না বুঝলে বাংলার ইতিহাসই বোঝা হয় না! সেই ইতিহাসে নথিবদ্ধ প্রতিটি তথ্যের সঙ্গে নানা তত্ত্বের তুলনা করলে আমরা যে ছবিটি পাই তা একইসঙ্গে অত্যন্ত স্বাভাবিক, আবার অবিশ্বাস্য! ঠিক এই কাজটাই করেছেন তুহিন মুখোপাধ্যায় তাঁর এই মহাগ্রন্থে। তাঁর প্রতিটি সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত হইনি আমি। তবু বলব, একেবারে প্রাইমারি রিসোর্স (অর্থাৎ ডকুমেন্টেড তথ্যাবলি এবং পদকর্তাদেরই লিখে যাওয়া নানা কথা) ঘেঁটে ফুটিয়ে তোলা শ্রীচৈতন্যের এই 'মানুষী' ছবিটি অদ্বিতীয়। এতে স্পষ্টভাবে দেখানো হয়েছে, কেন ও কীভাবে এক দুরন্ত, সুদর্শন, মেধাবী কিশোরকে 'অবতার' করে তোলা হয়েছিল। এই বই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, মানুষটি যে সমাজবিপ্লব শুরু করেছিলেন তার কী পরিণতি হল। রক্তমাংসের মানুষ আর অবতারের সংঘাতে কীভাবে ক্ষতবিক্ষত ও দীর্ণ অস্তিত্ব হয়েছিলেন সেই যুগপুরুষ তাও এই বই একেবারে অনাড়ষ্ট ভঙ্গিতে, অথচ পূর্ণ সম্মানের সঙ্গে পেশ করেছে আমাদের সামনে। তারপরেই এই বই পাঠকের মনে একটা নতুন প্রশ্নের জন্ম দেয়— যুগাবতার নয়, মানুষ শ্রীচৈতন্যের অন্তিম পরিণতি কী হয়েছিল? গত শতাব্দীর সবচেয়ে মরমি স্রষ্টাদের একজন আমাদের পরামর্শ দিয়েছিলেন, "ভাবুন। ভাবা প্র্যাকটিস করুন।" সে কথা শিরোধার্য করে, নিজের মতো করে শ্রীচৈতন্যকে চিনতে চাইলে আপনাকে এই বইটি পড়তেই হবে। সে পাঠ শুভ হোক।