অখণ্ড ভারতীয় জাতীয়তাবাদকে মিথ্যা প্রমাণিত করে পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদের উত্থান। কিন্তু '৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদের অসারতার মাধ্যমে পূর্ণ প্রতিষ্ঠা পায় বাঙালি জাতীয়তাবাদ। হঠাৎ জিয়ার আমলে মুসলিম জাতীয়তাবাদের জগাখিচুরি মিশিয়ে উদ্ভব ঘটে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের। এই হঠাৎ আবির্ভূত বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের তাত্ত্বিক মোকাবিলা করে আবদুল গাফফার চৌধুরী বইটি লিখেছিলেন। ছোট্ট অথচ তথ্যসমৃদ্ধ এবং কার্যকরী।
তোতাপাখির মতো দলীয় মতাদর্শের সাফাই গাওয়ার জন্য অনেকেই হয়তো গাফফার চৌধুরীকে পছন্দ করেন না। কিন্তু এই বইটি সত্যিই ভালো। যুক্তি দিয়ে লেখা। অনেক আগে পড়েছিলাম তখন বেশ ভালো লেগেছিল।
আমরা বাংলাদেশী না বাঙালি? আমাদের জাতীয়তাবাদ ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’ না ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’? সাংবাদিক আবদুল গাফফার চৌধুরী তাঁর ‘আমরা বাংলাদেশী না বাঙালি?’ নামক গ্রন্থে এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছেন। প্রথমেই প্রশ্ন আসে, বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ তত্ত্বের উদ্ভাবক কে? এ নিয়ে নানা মুনির নানা মত। এ প্রসঙ্গে নাম আসে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াউর রহমান, প্রয়াত সাংবাদিক ও সাহিত্যিক আবুল মনসুর আহমদ, প্রয়াত সাংবাদিক ও রাজনীতিক খোন্দকার আবদুল হামিদ। লেখকের মতে, এই তত্ত্বের আনুষ্ঠানিক প্রবক্তা ও পিতা কলকাতার অখণ্ড ভারতপন্থী বিখ্যাত সাংবাদিক ও সাহিত্যিক শ্রী সন্তোষ কুমার ঘোষ।
অখণ্ড বৃটিশ ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্বের ইতিহাস বিশ্লেষণ করে লেখক দেখিয়েছেন, ভারতের রাজনীতিতে উত্তর ভারতের হিন্দু ও মুসলিম অবাঙালী নেতাদের মধ্যে যতই শত্রুতা ও বিরোধ থাকুক না কেন, উপমহাদেশের রাজনীতিতে বাঙালীদের প্রাধান্য বিস্তার করতে না দেয়ার ব্যাপারে তাঁরা ছিল একাট্টা। লেখক বলেন, “গান্ধী কংগ্রেসের সর্বভারতীয় নেতৃত্বে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস ও নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর প্রতিষ্ঠালাভের সম্ভাবনাকে মেনে নিতে পারেন নি, বরং অংকুরেই বিনাশের চেষ্টা করেছেন। জিন্না মুসলিম লীগের সর্বভারতীয় নেতৃত্বে শুধু নয়, অবিভক্ত বাংলার রাজনীতিতেও ফজলুল হক ও শহীদ সোহরাওয়ার্দীর জনপ্রিয়তা ও প্রতিষ্ঠাকে সহ্য করতে পারেন নি। অবিভক্ত ভারতেও আর্থিক খুঁটির জোর ছিল অবাঙালী ব্যবসায়ীদের। কংগ্রেসের টাকা জোগাতেন টাটা, বিড়লা, ডালমিয়া প্রমুখ। মুসলিম লীগের টাকা জোগাতেন ইস্পাহানী, আদমজী, আহমদ ভাই, পাগড়ীওয়ালা প্রমুখ। কংগ্রেস ও লীগের রাজনীতি এরাই নিয়ন্ত্রণ করতেন। তাই বাংলার মুসলিম ও হিন্দু নেতারা বিদ্যায়, ব্যক্তিত্বে ও যোগ্যতায় যতই উন্নত হোন না কেন অবাঙালী বিগ বিজনেসের অর্থানুকুল্য তারা পান নি, ফলে সর্ব উপমহাদেশীয় রাজনীতিতে অবাঙালী প্রাধান্যের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তারা পেরে উঠেন নি।”
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরেও ভারত-পাকিস্তানের নেতৃত্ব ও তাদের বাঙালি দোসররা আমাদের ‘বাঙালি’ পরিচয় নিয়ে ভীত ছিল। একদিকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ভারতের বাঙালিরা উৎফুল্ল ছিল, অন্যদিকে ভারতের একটি মহলের ভীতি ছিল, বাংলাদেশ অসাম্প্রদায়িক দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেলে পশ্চিমবঙ্গের লোকেরা স্বাধীন বাংলাদেশে যোগ দিতে পারে এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় অন্যান্য জাতিও স্বাধীনতার জন্য আন্দোলন শুরু করতে পারে। সেজন্য ভারতের নেতৃত্বের বড় একটা অংশ চাইছিল যাতে বাংলাদেশ একটি মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে ওঠে, বাংলাদেশের বাঙালিরা মুসলিম বাঙালি হিসেবে ভিন্ন পরিচিতি পায়, এতে ভারতে হিন্দু বাঙালিরা স্বাধীন বাংলাদেশে যোগ দিতে ভয় পাবে এবং বৃহত্তর ভারতীয় জাতীয়তাকে অধিকতর ভাল আশ্রয়স্থল হিসেবে মেনে নিবে। সে চিন্তা থেকেই হয়তো শ্রী সন্তোষ কুমার ঘোষের ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’ তত্ত্বের আবিষ্কার। এই তত্ত্বকেই পরে লুফে নিয়েছিলেন অন্যরা, কারণ তারা এতে পেয়েছিলেন ‘দ্বিজাতিতত্ত্বের স্বাদ’। অন্যদিকে তৎকালীন পূর্ব বাংলার বাঙালি মুসলমানদের মন দীর্ঘদিন যাবত দ্বিধায় ভুগছিল, আগে মুসলিম নাকি আগে বাঙালি! 'বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ' তত্ত্বের বিশ্বাসীরা এ সুযোগকেই কাজে লাগান।
কোন জাতির জাতীয়তা এক দিনে গড়ে ওঠে না, হাজার বছরের ঐতিহ্য-সংস্কৃতির মেলবন্ধনে মানুষ এক সুনির্দিষ্ট জাতি হিসেবে পরিচিতি পায়। সেই পরিচিতি শুধু একটি নাম নয়, সেই পরিচিত জাতির শেকড়, জাতির রক্তের প্রবাহ। রাজনৈতিক বা ধর্মীয় মতাদর্শের জটিল সমীকরণ বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে আমাদের জাতি-পরিচয় পরিবর্তন কখনোই কাম্য নয়। লেখক সুন্দরভাবে ও যৌক্তিকভাবে ইতিহাসের আলোকে আমাদের জাতীয়তাবাদ ইস্যুর মূল সমস্যাগুলি তুলে ধরেছেন। তিনি দেখিয়েছেন ‘বাঙালী জাতীয়তাবাদ’ এর ধারণার সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরেও পাকিস্তানের ভূত যাদের মনে আসন গেড়েছিল, তারাই আমাদের ‘বাঙালি’ পরিচয়ের মঝে হিন্দুত্বের গন্ধ খুঁজে পেয়েছেন, ফলে তাদের আদর্শ ছিল ‘বাংলাদেশী’ পরিচয়। কারণ, ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’ এর ধারণার পেছনে লুক্কায়িত ছিল ইসলামী ভাবধারা; ফলে, এটি যে বাঙালির ঐতিহ্যবাহী অসাম্প্রদায়িক ভাবমূর্তিকে বিনষ্ট করতে পারে সেই বিষয়টিও লেখক যৌক্তিকভাবে ব্যাখ্যা করেছেন।
বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ বলে কোন বিষয়ের অস্তিত্ব বাঙলা ও বাঙালির ইতিহাসে ছিল না। যারা অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশকে সহ্য করতে পারে না এবং বাঙালি জাতিকে দুর্বল জাতিপরিচয়ে দেখতে চায়, তারাই বাংলাদেশী জাতীয়তার জনক। আবহমান কাল ধরেই এ জাতি বাঙালি নামে পরিচিত। বাঙালি জাতীয়তাবাদ আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতির পরিচায়ক। আমাদের জাতীয়তাবাদ বিসর্জন দেয়া মানে নিজেদের আত্মপরিচয়কে অস্বীকার করা। পাক-ভারতের রাজনৈতিক চক্রান্তে পা দিয়ে এবং ধর্মীয় মৌলবাদী চেতনার রাজনৈতিক আদর্শের উদ্দেশ্য সাধনের জন্য ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’ আমদানি করা হয়েছে। এটি কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আমরা চিরকালই ‘বাঙালি’ ছিলাম, আমদের চিরকালই ‘বাঙালি’ থাকাই উচিত। প্রসঙ্গত আরেকটি প্রশ্ন এসে যায়, বাঙালি বললে অস্পষ্টতা থেকে যায়, কারণ পশ্চিমবঙ্গেও বাঙালি আছেন; লেখক এ প্রসঙ্গে স্পষ্টভাবেই বলেছেন, যেহেতু পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরা স্বেচ্ছায় বাংলাকে বিভক্ত করে বৃহত্তর ভারতীয় জাতীয়তা বেছে নিয়েছেন, সেহেতু বাঙালি পরিচয়ের একক দাবী তারা করতে পারেন না, তারা এখন ভারতীয়, বড়জোর তারা 'ভারতীয় বাঙালি' বা 'বাংলাভাষাভাষী ভারতীয়' হিসেবে পরিচিত হতে পারেন। লেখক তাঁর যুক্তিপূর্ণ বিশ্লেষণের মাধ্যেমে ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ যে আমাদের সত্যিকার চেতনা, তা তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন।
তবে, লেখক তাঁর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিমা এই বইয়েও এড়াতে পারেননি। প্রায়শই তিনি মূল বিষয়ের আলোচনা থেকে সরে গিয়ে পারিপার্শ্বিক অন্য বিষয়ে অধিক আলোচনায় হারিয়ে গেছেন। জাতীয়তাবাদ ইস্যু নিয়ে অধিকতর বিস্তারিত আলোচনা করা যেত। এছাড়া লেখক বাঙালির জাতীয়তা অক্ষুণ্ণ রাখার ব্যাপারে সচেতন থাকলেও, বাংলাদেশে বসবাসকারী উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর জাতীয়তার বিষয়ে যথেষ্ট উদারতার পরিচয় দিতে ব্যর্থ হয়েছেন। এ ব্যাপারে তাঁর অভিমত হলো, বাংলাদেশে সকল ধর্ম, বর্ণ ও সম্প্রদায়ের লোক বাঙালি নাগরিক ��রিচয়ে চিহ্নিত হলে ক্ষতি নেই। কিন্তু তিনি এক্ষেত্রে এটা ভাবেন নি যে, বাংলাদেশের আদিবাসী সম্প্রদায়গুলোরও নিজস্ব জাতীয়তার বোধ রয়েছে।