জীবন একটা গল্প, গল্পই জীবন। জীবনের ভাঁজে গল্প জমে থাকে যেমন, তেমনই গল্পের সঙ্গে জীবন। সমাজের নিম্ন শ্রেণির মানুষের বাস্তব চিত্র এই উপন্যাসে দারুণভাবে ফুটে উঠে। সাহসী, কর্মি, এবং শ্রমিকদের আস্থাভাজন মানুষ হিসেবে- যশোদা এক অতুলনীয় ব্যক্তিত্ব। শ্রমিকরা তাঁকে খুব মান্য করে, শ্রদ্ধা করে। সে-ও শ্রমিকদের ভালোবাসে। বিপদে পাশে দাঁড়ায়, চাকরির ব্যবস্থা করে, রান্না করে খাওয়ায়, বাড়ি ভাড়া পর্যন্ত দিয়ে দেয়। শ্রমিকরা যশোদার পরামর্শে নিজেদের অধিকারের জন্য ধর্মঘট করে। ফলে, যশোদা হয় কারখানা মালিক সত্যপ্রিয়'র চোখের বালি। শ্রমিকদের নিকট যশোদা ছিল অত্যন্ত প্রিয়ভাজন; কিন্তু সত্যপ্রিয়'র কূটকৌশল আর চতুরতার ধূমজালে তাদের শ্রদ্ধা, ভালোবাসা রূপ নেয় ঘৃণা আক্রোশে। একদিন যে ছিল তাদের নয়নের মণি সে হয়ে যায় দুচোখের বিষ। তারপর? তারপর পাঠক আপনিই পাঠোদ্ধার করুন গল্পের ভগ্নাবশেষ।
Manik Bandopadhyay (Bengali: মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়) was an Indian Bengali novelist and is considered one of the leading lights of modern Bangla fiction. During a short lifespan of forty-eight years, plagued simultaneously by illness and financial crisis, he produced 36 novels and 177 short-stories. His important works include Padma Nadir Majhi (The Boatman on The River Padma, 1936) and Putul Nacher Itikatha (The Puppet's Tale, 1936), Shahartali (The Suburbia, 1941) and Chatushkone (The Quadrilateral, 1948).
যাদের জন্য আমরা আমাদের সর্বোচ্চ দিয়ে করি এবং আগলে রাখতে চাই দিনশেষে তারাই আমাদেরকে দোষের বোঝা চাপিয়ে দিয়ে দূরে সরে যায় এবং এই বিষয়টি আমরা যশোদার ক্ষেত্রে দেখতে পাই।যশোদার চিন্তাভাবনা, নীতি -নৈতিকতা আমাকে যথেষ্ট অনুপ্রাণিত করে।সত্যপ্রিয়ের মতো মুখোশধারী ও নীতি-নৈতিকতা বিবর্জিত ব্যাক্তিদের কারণে পুরো সমাজ ভুক্তভোগী হয়।
মানিকের এমনকি তথাকথিত দ্বিতীয় শ্রেণীর উপন্যাসও মুগ্ধ করে গেলো সমানভাবে। ভাবি, মানব প্রকৃতিকে এতটা চিনে ফেলার পরও দিনের পর দিন মানুষের মধ্যে থাকা তার পক্ষে সম্ভব হয়েছিলো কীভাবে?
কোন বিরক্তি জন্মায়নি? বা বিবমিষা?
'শহরতলি' পড়তে গিয়ে মনে আসছিলো আজকের গাজীপুর বা সাভারের কথা। এইসব রাজধানীর পাশে হঠাৎ গজিয়ে ওঠা কলকারখানার বৃহৎ জঞ্জালে এখন বাস করে কোটির উপর মানুষ। ব্যাপক শিল্পায়নে অর্থনীতির চাকা ঘুরছে প্রবল বেগে, কিন্তু এদের জীবন উত্তরবংগের মরে যাওয়া নদীদের মতোই গতিহীন নিরাসক্ত একঘেঁয়ে। ভবিষ্যতে হয়তো কোন এক সময় আমাদের দেশের বেশির ভাগ মানুষের অবস্থার উন্নতি হবে, কিন্তু প্রশ্ন জাগে, এই উন্নতি আরেকটু ধীর গতিতে হলে কি খুব বেশি কিছু যায় আসতো? একটা প্রজন্মের আত্মোৎসর্গ কি ভবিষ্যতের ফল লাভের তুলনায় এতোটাই ফেলনা?
মানিক এখনও, অথবা হয়তো এখনই আরও বেশি, প্রাসংগিক রয়ে গেলেন।
গল্পের মূল চরিত্র যশোদা। যার নেই কোনো স্বামী সংসার সন্তানাদি। মোটাসোটা একজন মহিলা, তার শারীরিক গঠন নিয়ে কখনো চিন্তিত না । যে তার বাড়িতে কিছু দিনমজুর কর্মঠ ব্যক্তিদের ভাড়া দিয়ে তাদেরকেই পরিবারের সদস্য মেনে জীবন যাপন করে। যশোদা একা হলেও ওর সকল ভাড়াটিয়া ওর পরিবারের মতোই হওয়ার কারণে তাদের সকল দুঃখ-কষ্ট বিপদ-আপদ এই সে পাশে থাকে। এমনকি গ্রাম থেকে যখন শহরে নতুন কোন মানুষ আসে তাদের কাজ খুঁজে দেওয়ার ভারও যশোদা নিজের কাঁধে নিয়ে নেয়।
গল্পের শুরুটা একটু ধীরগতির হলেও ধীরে ধীরে গল্পটি প্রাণ পায়। কিভাবে যশোদা সকলের কথা ভেবে যায়, এমনকি ভাড়াটে সকলে যশোদার উপর অনেকটা নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। যশোদা ও সেইভার সানন্দে গ্রহণ করে সব সময়। আর সেই দায়িত্ব নেয়া নিয়েই যশোদার জীবনে নানা রকম সমস্যা সম্মুখীন হতে হয়।
মানিক বন্দোপ্যাধায় এর অন্যতম সেরা কাজ আমার কাছে মনে হয়েছে।কিন্তু পদ্মা নদীর মাঝি বা পুতুলনাচের ইতিকথার মতো জনপ্রিয় হতে পারেনি।শহরের এক্সটেনশন হচ্ছে শহরতলি। বিভিন্ন খেটে খাওয়া মানুষের জীবন নিয়ে লেখা এই উপন্যাসে খুব সুন্দর ভাবে তুলে ধরেছে দ্রুত নগরায়ন এবং তার ফলে এক গোষ্ঠীর স্বার্থপরতার ইতিহাসকে,শ্রমিক-মজুরদের জীবন নিয়ে খেলে ইচ্ছে মতো ছাটাই করিয়ে।পশ্চিমবঙ্গ এর সরকার কর্তৃক মুদ্রণ পড়ছিলাম।এই উপন্যাস কি অসমাপ্ত রাখা হয়েছিল না বাকি লেখা পশ্চিমবঙ্গ এর তৎকালীন বাম সরকার প্রকাশ করতে দেয়নি বুঝলাম না।খানিকটা অসমাপ্ত রেখেই শেষ করতে হয়েছে।
যশোদা তার দুটি বাড়ির একটি বাড়িতে যাদের পরিবার আছে তাদের ভাড়া দিয়েছে, আর অন্যটিতে তার নিজের সংসার পেতেছে । অবশ্য সেই সংসারে নিজ পরিবারের সদস্যের চাইতে ভাড়াটে হিসেবে কুলি মজুরের সংখ্যাই বেশী । গ্রাম থেকে যারা ভাগ্যের অনুসন্ধানে সহরে আসে তাদের বিশাল একটা অংশ যশোদার কাছে আশ্রয় নেয় । তার কারণ শুধু যশোদার দুটি বাড়ি আছে বলে নয় বরং সকলেই জানে এখানে ততদিন থাকার অনুমতি পাওয়া যায় যতদিন না জীবিকার কিছু একটা উপায় হচ্ছে তাছাড়াও যশোদার অনেক পরিচিত লোক থাকায় তার মাধ্যমেই একটা যাহোক রোজগারের ব্যবস্থা করা সম্ভব । যশোদাকে সবাই পছন্দ করে , ভয় পায় এবং সম্মান করে । সে সংসারের এমন এক দলের মানুষ যারা খুব সহজেই অন্যের উপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে । যাই হোক সেই যশোদার এতো বড় বাড়ি একদিন ‘’বললে স্পয়লার দেওয়া হয়ে যাবে’’ কারণে শূন্য হয়ে গেলো ।কাছের সকলেই ভুল বুঝে তাকে ত্যাগ করলো । বিশাল তিনটি চুলা যেগুলোতে বাড়ির ভাড়াটেদের জন্য রান্নাবান্না করা হতো সেগুলোর উপরে আর হাড়ি চাপে না । যশোদা বাড়ি বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নেয় । বসতভিটা যে আস্তে আস্তে শরীরের ই একটা প্রত্যঙ্গ হয়ে যায় সেটা বাড়ির মালিক খুব ভালো মতো টের পায় তখন, যখন বাড়ি ত্যাগ করার সময় আসে । গৃহত্যাগ করার দিন প্রথা অনুযায়ী মাটির চুলা লাথি দিয়ে ভেঙে ফেলার সময় যখন শক্ত কিছুর আঘাতে যশোদার পা টি এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে রক্ত পড়তে থাকে তখন সেই রক্তের দিকে তাকিয়ে সে বুঝতে পারে এই জগতে কৃতজ্ঞ কেউ নাই ।
শহরতলি উপন্যাসের প্রধান চরিত্র দুইজন - যশোধা এবং সত্যপ্রিয়। যশোধা সম্ভবত বাংলা সাহিত্যের শক্তিমান নারী চরিত্রের অন্যতম। হাতীর মতো তার দেহ। খেতে পারে চারজনের সমান। বাজে ইঙ্গিত করায় ঘাড় ধরে রাস্তায় মুখ ঘষে দিতে পারে কিংবা যার দরজা বন্ধ করে ঘুমানোর দরকার পরে না, কারন তার কাছে কে আসবে? আশে পাশের শ্রমিক শ্রেণির সাথে তার বেশ ভালো সম্পর্ক। যে কোন আন্দোলনে সে তাদের পরামর্শ দেয় কিংবা মালিক পক্ষের মাঝে সমঝোতা করে দেয়। অন্যদিকে সত্যপ্রিয় হচ্ছে সেই মালিক পক্ষ। যার প্রতিটা কাজের কোন না কোন একটা উদ্দেশ্য থাকে। তার বিচিত্র রূপ। মুখে অমায়িক কথা থাকলেও সবাই জানে এক সময় সে ঠিকই তার কাজ উদ্ধার করে নিবে। বাংলা সাহিত্য কিংবা সিনেমায় মালিক শ্রমিকের সম্পর্ক নিয়ে বেশ কিছু গল্প আছে। শুরু থেকেই একদিন যে শ্রমিকদের নয়নমণি ছিল সেই যে একসময় মালিকের চক্রান্তে তাদের দুচোখের বিষ হবে তাই ধারনা ছিল। হয়েছেও তাই। কিন্তু এই বই যেখান আলাদা তা হচ্ছে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এর লেখার গুনে।
সত্যপ্রিয় ছুটি নিতে বলে কিন্তু স্ত্রী অসুস্থ জেনেও তার কর্মচারী ছুটি নিতে পারে না, বেতন বাড়ানোর কথা উঠলে সবাই জানে এখন বাড়ালেও দুদিন পরে সত্যপ্রিয় ঠিকই তা উশুল করে নিবে। নিজের সিদ্ধান্তে সমাধান না হলে আরেকজন কে দোষী করে ঠিকই অন্যদের কাছে তিনি যেন কিছুই জানেন না। মালিক পক্ষের এই যে রূপ আজ এত বছর পর এসে ঠিক তাই আছে। সত্যপ্রিয় পত্রিকায় লেখা পাঠায় - সে সবাই কে রাজভক্ত হয়ে থাকতে বলে, তার মতে সরকারের অনুগত থাকলে অচিরেই স্বাধীনতা আসবে। কিন্তু সরকার কি খুশিমনেই স্বাধীনতা দিবে? এই প্রশ্নের উত্তর না পেলেও জ্যোতিস্ময় সত্যপ্রিয়র অনুগত থেকেই কাজ করে যায়। যশোধার বাড়িতে যারা থাকে, তারা যশোধার মমতা, ভালবাসা, সাহায্য পায়। কিন্তু তারা মনে করে এটা তাদের প্রাপ্য। এটাই হওয়ার কথা। বিনিময়ে তাদের যেন কিছুই দেওয়ার নেই। আশেপাশের এত উত্থান পতনের মাঝে নন্দ আর সুবর্ণ তাদের ভবিষ্যৎ চিন্তা করে। ৬০ টাকা বেতন থেকে ১০০ টাকা কেন হচ্ছে না। অথবা সুবর্ণের ভাই কেন চাকরি ছেড়ে দিয়ে দরিদ্র হয়ে যাচ্ছে না। যাতে তাদের মর্যাদা বেড়ে যায়।
এরকম আরও টুকরো টুকরো ঘটনা আর জীবনবোধ নিয়েই শহরতলি।
যশোদা নামের এক নারীকে ঘিরে তৈরি হয় এই গল্প । যার দুইটা মেস ছিলো সমাজের নিম্ন আয়ের কুলি মজুরদের জন্য । শুধুমাত্র ভাড়াটিয়া নয় সেসব মানুষদের সুখ দুঃখের অংশ হয়ে গিয়েছিল সে - কাজের ব্যবস্থ করেতো তাদের জন্য । কিন্তু যাদের জন্য সে এত কষ্ট করে তারাই তার থেকে মুখ ঘুরিয়ে নেয় - শহরতলির এক শিল্প পতি র প্ররোচনার কারণে ।যশোদা জড়িয়ে পরে শ্রমিক আন্দোলোনের সাথে সেখান থেকেই তার সাথে শিল্প পতির ধন্ধ । এক শহরতলির পটভূমি তে এই গল্প ,আলোচনা করেছে আসে পাশের নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে জীবনযাত্রা । একই সাথে ফুটে উঠেছে শহরতলি থেকে শহরে রুপান্তর হওয়ার ঘটনা । খুব সুন্দর সময় কাটানোর মতো একটা বই ।
দুই পর্বে ভাগ করা এই উপন্যাসের প্রথম অংশটি সুন্দর। লেখক হিসেবে মানিকের শক্তিমত্তার পরিচয় দেয়। কিন্তু দ্বিতীয় পর্বে সেই ধার নেই। বরং বেশ ম্রিয়মাণ। ৩.৫/৫