Shawkat Osman (Bengali: শওকত ওসমান; Sheikh Azizur Rahman; 1917 – 1998) was a Bangladeshi novelist and short story writer.Osman's first prominent novel was Janani. Janani (Mother)is a portrait of the disintegration of a family because of the rural and urban divide. In Kritadaser Hasi (Laugh of a Slave), Osman explores the darkness of contemporary politics and reality of dictatorship.
Awards Bangla Academy Award (1962) Adamjee Literary Award (1966) President Award (1967) Ekushey Padak (1983) Mahbubullah Foundation Prize (1983) Muktadhara Literary Award (1991) Independence Day Award (1997)
শওকত ওসমানের অসাধারণ লেখনীতে স্বাধীনতা শুরুর প্রেক্ষাপট আর ২৫ মার্চ কালরাত্রির এক পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা উঠে এসেছে। লেখনীর ভাষায় ফুটে উঠেছে সেই রাতের ভয়াবহতা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে চলে বেশুমার গণহত্যা। প্রতিটি গণহত্যা, প্রতিটি হত্যা, পরিবারগুলোর আর্তনাদ, বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষের সুখ-দু:খ, পাকিস্তান রাষ্ট্রে তাদের বঞ্ছনা আর হতাশার ইতিহাস প্রতিটি চরিত্র ফুটে উঠেছে শব্দের অক্ষরে।
২৩শে মার্চ ঘোষণা হয় স্বাধীনতার। ২৫শে মার্চ রাতে ইমাম নাম গ্রহণ করেছিলেন মিলিটারি গভর্ণর টিক্কা খান। বেতার মারফত যুদ্ধ পরিচালনা করছিলেন খান সাহেব, কোড নাম ইমাম। এই ইমাম সেই ইমাম যার আদেশে শুধু মন্দির না মসজিদ এও হামলা হয়েছিলো, সকালে মসজিদে আজান দিতে যাওয়ার সময় মসজিদের সামনেই ব্রাশফায়ার করা হয় মোয়াজ্জেমকে। এই ইমাম এর আদেশেই মুসলমান উর্দুভাষী বিহারিরা পূর্ব বঙ্গের মুসলমানদের ধরে ধরে জবাই করে মোহাম্মদপুরে। গণহত্যার শুরুটা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিয়ে, এক রাতেই ওদের হিসেব মতে ৩০০ ছাত্র (প্রকৃত হিসেবে আরো বেশি) মারে ওরা। হিন্দু অধ্যাপক জি.সি. দেব থেকে শুরু করে মুসলমান অধ্যাপক মোজাম্মেল হক, ক্যান্টিনের মধু দা, কেউই ছাড় পাননি। স্বপরিবারে হত্যা করা হয় তাঁদের। ঘরে ঢুকে কুরআন অধ্যয়নরত অধ্যাপক মনিরুজ্জামানকে হত্যা করে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঝান্ডা নিয়ে আসা ইমামের মিলিটারির দল। ছাড় পায়নি মেয়েদের হলও। ধর্ষণ থেকে রেহাই পায়নি ষোলো বছর বয়সী মেয়েটাও, যে একটা রাতের জন্য বোনের হোস্টেলে থাকতে এসেছিলো।
জনগনের সেবক পুলিশরাও বসে থাকেনি। রাজারবাগ পুলিশলাইনে সবাই সতর্ক হয়ে যায়। আশে পাশের বাড়িতে এবং বাড়ির ছাদে সশস্ত্র আশ্রয় নেয় পুলিশ বাঙালির জান-মালের হেফাজত নিশ্চিত করতে। হোক পুরোনো মডেলের অস্ত্র, তারপরও রাজারবাগের পুলিশরা সে-রাতে ছিলো অকুতোভয়। পুলিশ ছাউনির উপর পড়তে থাকলো একের পর এক মর্টার শেল। নিশ্চিহ্ন করা হলো রাজারবাগ পুলিশ কমান্ডদের।
সারাদিন পরিশ্রমের পর ক্লান্ত শরীরে যখন নিউমার্কেট এর হকাররা দোকানের সামনেই কাথা মুড়ি দিয়ে শুয়েছিলো, সেই ঘুমন্ত অরাজনীতিক খেটে খাওয়া মানুষ গুলোকে ব্রাশ ফায়ার করতেও তাদের দু'বার ভাবতে হয়নি। দেশব্যাপী জায়গায় জায়গায় ক্যাম্প তৈরী করে চলতে থাকে তাঁদের উপর অমানুষিক নির্যাতন। ঠাকুরগাঁও ইপিআর হেডকোয়ার্টারে দু'টি চিতাবাঘ পোষা হতো। আর এই চিতাবাঘের খাঁচায় তারা নিরিহ মানুষ ঢুকিয়ে দিয়ে মজা দেখতো 'বাঘ কি করে মানু্ষ খায়'! প্রচলিত তথ্য মতে ৭১ এর নয় মাসে মোট ৩০০ জনের মত কয়েদির জায়গা হয়েছিলো এই বাঘের খাঁচায়।
শওকত ওসমান শেষে একটা উপসংহার টেনেছেন যেটার সমসাময়িক প্রাসঙ্গিকতা এখনো রয়েছে — "এখনও এদেশে বহু লোক আছে যারা লাখ লাখ নরনারী হত্যা মা-বোনের বেইজ্জতি দেখার পরও পাকিস্তানের স্বপ্ন দেখে। সাহেবের জুতাপেটা খেয়ে যে-গোলামের সকাল সন্ধ্যা পেট ভরত, সে সাহেব বনে গেলেও স্বাভাবিক হতে পারে না। বরং পুরোনো জুতার জন্য আফসোস করে।"
গায়ে কাঁটা দেয়ার মত লেখা আর বর্ণনা কেবল লেখক শওকত ওসমান এর হাত থেকেই আসা সম্ভব। পড়েছি আর শিউরে উঠেছি। বইটি সত্যিকার অর্থেই সেই কালরাত্রির 'খন্ড চিত্র'। অল্প কয়েকটা ঘটনার বর্ণনা এসেছে শুধু, আর বিশেষ করে ঢাকা শহরের। এ ছাড়াও বইটিতে কোন তথ্য, পরিসংখ্যান বা ভৌগোলিক উপাদান নেই যা থেকে আপনি গণহত্যার পরিমাণ টা আইডিয়া করতে পারেন। বইটি মূলত 'গণহত্যা'র আবেগিক বিশ্লেষণ।
ধর্মের বিভেদের কথা বলে গড়ে উঠেছিল দুটি দেশ। 'সব মুসলমান ভাই ভাই'- বলা দেশের এক অংশ কেন ঝাঁপিয়ে পড়ে চালিয়েছিল গণহত্যা? কেন নেমে এসেছিল কালরাত?
১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করলেও স্বাধীনতার স্বপ্ন বহু আগ থেকেই বাঙালিদের মনে বাসা বেঁধেছিল। কিন্তু কেন? ১৯৪৭ সালে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে জায়গাজমি বদল, কেনাবেঁচা ও দখল করা শুরু করে একশ্রেণির মানুষ। যাদের অধিকাংশই ছিল বিহারী। ভারতে যারা ছিল মধ্যবিত্ত পূর্ব পাকিস্তানে এসে হয়ে যায় বিপুল সম্পদের মালিক। বিভিন্ন ব্যাবসাও তারা কেনা শুরু করে। কিন্তু নিম্নবিত্তদের ঠিকানা হয় বিভিন্ন বস্তিতে। ভাষা ও সংস্কৃতির ব্যাপক পার্থক্য থাকার কারণে বাঙালিরা তাদের বহিরাগত ভাবতেও শুরু করে। দীর্ঘ ২৩ বছরের বৈষম্য ও শোষণের কারণে বিষিয়ে উঠেছিলো মানুষেরা সাথে বিহারীদের অত্যাচার। কিন্তু ধর্মের দোহাই দিয়ে পাকিস্তানি শোষকেরা দাবিয়ে রেখেছিল বাঙালিদের। পূর্ব পাকিস্তানের সম্পদ বারবার লুট করতে থাকে পশ্চিম পাকিস্তান। ১৯৬৫ সালে যখন ভারত পাকিস্তান যুদ্ধ হয় পূর্ব পাকিস্তানের বর্ডার ছিল অরক্ষিত। ছাত্রসমাজে কথা উঠে একদিন স্বাধীনতা আসবে কিন্তু অনেকেই মনে করে বাঙালিদের দিয়ে হবে না। দেশের অধিকাংশ জনগণ যেখানে মধ্যবিত্ত সেখানে কেউ কি পরিবারের আগে দেশ ও জনগণের কথা ভাববে?
৭ মার্চের ভাষণের পর প্রস্তুতি শুরু হয় তবে বিভিন্নজন টালবাহানা শুরু করে। আদোও কি যুদ্ধ হবে? ২৫ মার্চ ১৯৭১ সালের বেলা ১০টায় এসব নিয়েই কথা হচ্ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়। রাত ৯টায় কুর্মিটোলা থেকে ট্যাঙ্ক আসতে থাকে আর শুরু হয় একের পর এক তান্ডব। চারিদিকে হাহাকার, আর্তচিৎকার, আগুন, লাশ, ধ্বংসের মাধ্যমে শুরু হয় "পশ্চিশে মার্চের কালোরাত"। বেতার মারফৎ যুদ্ধ পরিচালনা করেছিলেন মিলিটারি গভর্নর টিক্কা খান যার কোড নাম ছিল "ইমাম"। এই ইমামের আদেশেই বস্তিতে আগুন, মন্দির-মসজিদে বোমা হামলা হয়। নিরীহ মানুষেরা ভেবেছিল শাসক যতই খারাপ হোক অন্তত ধর্মীয় উপাসনালয়ে আঘাত আসবে না। কিন্তু জালিম কি ধর্মের কথা শুনে? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের নির্বিচারে হত্যা করা হয়। পুলিশ লাইনের বিল্ডিংয়ে পুলিশ জওয়ানরা অবস্থান নিয়ে পাল্টা আক্রমণ শুরু করলেও পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাত থেকে শেষ রক্ষা হয়নি৷ জ্বলে ওঠে পুলিশ ছাউনির টিনের ঘরগুলোও।
জাতির মেরুদণ্ড ছাত্রসমাজ ও বুদ্ধিজীবীরা। আর সেটা পাকিস্তানি হায়নারা ভালোই জানতো। তাই শুরু করে ছাত্রসমাজ ও শিক্ষিত সমাজের ওপর ভয়াবহ হত্যাকান্ড। অধ্যাপক জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতাকে নিজের স্ত্রী-কন্যার সামনে গুলি করে মারা হয়। ডক্টর গোবিন্দ দেব ভাবদাবী ছিলেন কিন্তু সংস্কৃত নাম হওয়ার কারণে নজরে পড়ে যান। পালক কন্যা রোকেয়া ও জামাই মোহাম্মদ আলিও সেইদিন রক্ষা পায়নি। অধ্যাপক মনিরুজ্জামানকে জায়নামাজে কোরান তেলাওয়াতরত অবস্থায় উঠিয়ে পারিবারের পুরুষ সদস্যদের সাথে হত্যা করা হয়। কালোরাতে মারা গেছিল বহু নাম জানা-অজানা মানুষেরা। কিন্তু একটা বিষয় পরিষ্কার হয়ে গেছিল- ধর্মের নাম করে এতোদিন অধর্ম সহ্য করলেও আর সহ্য করা চলে না।
৭২ পৃষ্ঠায় লেখক ২৫ মার্চের ভয়াবহতার কথা তুলে ধরেছেন। বহু সত্য চরিত্রের সাথে কয়েকটা কাল্পনিক চরিত্রের আদলে বলেছেন সেই রাতের অসংখ্য নিরীহ মানুষদের চরম পরিণতির কথা। বিভিন্ন ঘটনার সাথে দর্শনিক কথাবার্��াও আছে। কিছু জায়গায় অতিরিক্ত মনে হয়েছে তাই কিছুটা বিরক্তও লেগেছে। কিন্তু শেষ করার পর শুধু একবুক বেদনা ছিল। শুধু একটা কথাই বলবো, "অমানুষের কোনো ধর্ম হয় না।"
বই: কালরাত্রি খণ্ডচিত্র লেখক: শওকত ওসমান জনরা: হিস্টরিকাল ফিকশন প্রচ্ছদ: ধ্রুব এষ প্রকাশনী: সময় প্রথম প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ১৯৮৬ পৃষ্ঠা সংখ্যা: ৭২ মুদ্রিত মূল্য: ১২৫/-