একদম অন্যরকম একটা বই পড়ে শেষ করলাম। সত্যেন সেনের লেখা খুবই সরলরৈখিক টাইপের, সাবলীল। তরতর করে পড়া এগিয়ে চলে। তারপরেও বইটা পড়তে দীর্ঘ সময় নিয়েছি। কেন? তার কারণ হচ্ছে কন্টেন্ট (অবশ্য এই এটো দিন সময়ের ভিতরে চোখের বালি রিভাইজ দেয়া, গোটা সাতেক সিনেমা দেখাও অন্তর্ভুক্ত ছিল) যা হোক... প্রসঙ্গে আসি।
দেশবিভাগ নিয়ে তো অনেক বইই লেখা হয়েছে। পদচিহ্ন বইটায় যেই সমস্যাগুলোর কথা তুলে ধরেছে তা সত্যিই চিন্তার খোরাক যোগায়। ১৯৪৭ সালে ভারত পাকিস্তান ভাগ হয়.. সেই সাথে বিপর্যস্ত হয় সাধারণ মানুষের জনজীবন। দেশভাগের আগে থেকেই দাঙ্গা-হাঙ্গামা লেগে ছিলো, পরবর্তীতে কী হয় তা ভেবে পাকিস্তানের হিন্দুরা পাড়ি জমায় হিন্দুস্তান তথা ভারতে আর ভারতের মুসলিমরা চলে আসে পাকিস্তানে। এইটুক আমরা সবাই জানি, কিন্তু জানি না, যারা নিজ দেশের টানে ধর্মকে প্রধান না করে দেশান্তর হয়নি তাদের খবর অর্থাৎ মোটাদাগে সংখ্যালঘুদের অবস্থা। সত্যেন সেনের আঁকা শ্রীপুর একটি বর্ধিষ্ণু, হিন্দুপ্রধান গ্রাম (ছিল)। দেশভাগের ফলে শ্রীপুর বর্তমানে শ্রীহীন। যে কয়েকটি পরিবার এখনও দেশান্তর হয়নি তার মাঝে যামিনী রায়ের পরিবার একটি। যামিনীর বড় ছেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া সুবিনয় তার বন্ধু আনিসকে নিয়ে গ্রামে বেড়াতে আসে। সেই থেকে শুরু হয় বইয়ের উপাখ্যান। হিন্দু কনজারভেটিভ পরিবারে একটি মুসলিম ছেলের আগমন, গ্রামের ইতিহাস, বর্তমানে সংখ্যালঘু হয়ে যাওয়া হিন্দু পরিবারগুলোর অসুবিধা, অসোয়াস্তি, মুসলিম পরিবারগুলোর সুবিধা কিংবা সমস্যা, হিন্দু মুসলিম বিভেদ, তাদের ক্ষোভ, পারষ্পারিক সম্প্রীতি কিংবা বিদ্বেষ, আন্দোলন, দাঙ্গা-হাঙ্গামা, শাষন কিংবা শোষণ, গ্রাম্য রাজনীতি প্রভৃতি সব কিছু উঠে এসেছে বইটিতে। প্রথম পর্ব খুবই সুন্দর। দ্বিতীয় পর্ব পড়তে যেয়ে বিপত্তি! ক্যান সত্যেন বাবু শেষ করলেন না? -_- এমনকি গা ছমছমে একটা দাঙ্গার ঘটনা বর্ণনার সময় লাইনটা পর্যন্ত শেষ করলেন না -_- এটাও শেষ করলে নিশ্চিত প্রথম খন্ডের মতোই দারুণ কিছু হতো।
ভিন্নধর্মী একটা বই। দুই দিকের দৃষ্টিকোণ থেকেই লেখা। জগেন বাবুর কী হল জানা হয়নি, লায়লীর ভাগ্য যেমন জানা হয়নি তেমনি জানা হয়নি আরতির জীবনে কী ঘটে। সংকোচ বা প্রথা ভেঙ্গে শেষ হাসি সে হাসতে পারে কি না... এতো প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া সত্ত্বেও বলব, ভাল্লাগসে! ^_^