"এখানে, এ বাড়িতে আসবার পর মুহূর্ত থেকেই আমার মন যেন সহস্রচক্ষু হয়ে উঠেছে- এই মাত্র সেটা টের পাচ্ছি। সব কিছুর মধ্যে খুঁজে পাচ্ছি অর্থ, সব কিছুকে নিজের অংশ করে তোলার প্রচন্ড টান বোধ করছি। যেন এমনি করে আমার ব্যর্থতা, ক্ষয়, স্মৃতি সমস্ত কিছুর ওপরে গড়ে উঠবে অসামান্য সুন্দর সৌধ। আসলে সব কষ্টের মূলে রয়েছে মানুষের এই কষ্ট পাবার ক্ষমতাটা৷ আমার মন যদি পাথরের হতো, আমার চোখ যদি দৃষ্টির অতীতে কিছু না দেখতে পারত, তাহলে চমৎকার দিন কাটত আমার। কিন্তু কোথায় যে কবে কুড়িয়ে পেলাম এই স্বভাবটা- ঘুরে ফিরে উলটে পালটে একটা ছবি, একটা মুহূর্ত, কী একটা অনুভূতিকে না দেখতে পারলে যেন শান্তি হয় না। নিশাত বলে, আমার আইন না পড়ে সাহিত্য কি দর্শন পড়া উচিত ছিল। হয়ত আগাগোড়াই আমি ভুল করে এসেছি। জীবনে যা করা উচিত ছিল, যা করলে আমার সুখে সম্মানে দিন কাটত, তা করিনি... অথচ এমনিতে আমি খুব হিসেবি। অন্তত সবাই তাই বলে।"
- সৈয়দ শামসুল হক, জনক ও কালো কফি
একজনকে মানুষকে কল্পনা করুন, যিনি সারাজীবন বেশ পোড় খেয়ে বেঁচে এসেছেন, এজন্য হয়ে গেছেন অতি হিসেবি। এমন একজন মানুষ, যিনি বাস্তব জীবনের থেকে বেশি সময় অতিবাহিত করেন নিজের মাথায়, নিজের চিন্তায়-দুশ্চিন্তায়-কল্পনায়। সোজা কথায় যাদের আমরা 'ওভারথিংকার' ট্যাগ দিয়ে থাকি। গল্পটা তেমন একজনের, তার নিজের বয়ানে লেখা।
আমরা তাকে শুরুতে দেখি খুব হিসেবি রূপে, যিনি নিজের প্রিয় মানুষের সাথে ঘর বাঁধার স্বপ্নে বিভোর ছিলেন৷ ধীরে ধীরে তাকে দেখি আত্মোপলব্ধিতে হকচকিত হয়ে নিজেকে ধ্বংস করতে, যেন স্বেচ্ছামৃত্যু বরণ করতে।
কিছু বই পড়ে বেশি কথা লিখতে ইচ্ছা করে না, আসলে লেখার জন্য যথেষ্ট শব্দ জানা থাকে না। কিন্তু সবাইকে জানাতে ইচ্ছা করে। এটা তেমনই এক বই। মাত্র ৬০ পৃষ্ঠার উপন্যাসিকা৷ প্লট নেই, ক্যারেক্টার স্টাডি বলাটাই বেশি মানায়।
বইটা আমার চিন্তাভাবনা এলোমেলো করে দিলো, বইটা আমায় মুগ্ধ করলো।
১) "আমার চশমার কাঁচ আচ্ছন্ন হয়ে গেল গরম কফির ধোঁয়ায় ঠিক যে মুহূর্তে চুমুক দেবার জন্য মুখ নামিয়েছি, তখন।
এই জিনিসটা আমার খুব ভালো লাগত; এই বাষ্প লেগে দৃষ্টি শাদা হয়ে যাওয়া, বিন্দু বিন্দু জলকণার মধ্যে অণুর মতো রামধনুর রং দেখতে পাওয়া। আর সুগন্ধ, কালোকফির সাড়া জাগানো সুবাস। অন্যান্য দিন, এই রকম একা বসতাম আমি, কোনো রেস্তোরাঁয়, কালো কফির পেয়ালা নিয়ে, বিকেলে, ঠাণ্ডা হাওয়া বইতো এয়ার কন্ডিশনার থেকে, লোকেরা চলত মৃদু পায়ে, সুন্দরী মেয়েদেব দেখা পাওয়া যেত। ভুলে যাওয়া এক উপন্যাসে পড়া নায়কের মতো আমি কালোকফি চুমুকে চুমুকে নিঃশেষ করতাম, যেন এমনি করেই সে নায়ক কাছে পাচ্ছে তার মেয়েটিকে যে মেয়েটি ভালোবাসত কালোকফি। আমার অনেকদিন ইচ্ছে হয়েছে, নিশাতকে ঐ উপন্যাসের মেয়েটির মতো কালোকফির জন্যে পাগল হতে দেখি। কিন্তু আমার স্কুটারে চড়ার আনন্দও যেমন অর্থহীন কিংবা দুর্বোধ্য নিশাতের কাছে, তেমনি কালোকফির স্বাদটা। নিশাত কালোকফি একেবারেই খেতে পারে না। সরু করে ফেলে ঠোঁট, বলে, হেমলক। বিষ।
আমি তখন হো হো করে হেসে বলি, আর আমি সক্রেটিস?"
২) "মানুষ যখন স্কুল বানায়, দেশ চালায়, সংসার করে, হাসপাতাল কী মসজিদের পরিকল্পনা করে- তখন তারা একজন আরেকজন সম্পর্কে কিছু না জেনে একসঙ্গে মিলিত হতে পারে অথচ সেই মানুষই যখন একসঙ্গে জুয়ো খেলে, মদ্যপান করে, ধর্ষণে সঙ্গী হয়, রাহাজানির জন্যে জোট পাকায় তখন কত সহজে এবং পরস্পরের কত কম তথ্য জেনে হাতে হাত মেলাতে পারে। আসলে, আমাদের রক্তের ভেতরে রয়েছে পাপ আর বুদ্ধির মধ্যে পুণ্যের ধারণা। এই পাপের বেসাতিতে বন্ধু জোটে সহজে। রক্তের ডাক বলেই হয়ত পাপের বন্ধু যত নিকট হতে পারে পুণ্যের বন্ধু ততখানি হতে পারে না।"
হক সাহেবের কলমে আরও একটা স্বপ্নভঙ্গের উপাখ্যান, যেখানে কালো কফির ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন চশমার কাঁচে ঘোলাটে হয়ে ওঠে জীবন; প্রাপ্তি অপ্রাপ্তির সীমারেখা মুছে গিয়ে বেঁচে থাকাকে বিলাসিতা বলে মনে হয়।
শৈশবে বাবাকে হারানো গ্যাদার মা যখন পুনরায় বিয়ে করেন, তখন তাকে রেখে যান চাচাদের কাছে। দীর্ঘ ২৬ বছর পরে, নামকরা উকিলের জুনিয়র গ্যাদা যায় নিজের মায়ের সাথে দেখা করতে, নিজের বিয়ের খবর জানাতে। এরপরে তার জীবনের ব্যাপক পরিবর্তনই এই উপন্যাসের পরিণতি।
সৈয়দ শামসুল হকের এই উপন্যাসটি তেমন পরিচিত না হলেও মুগ্ধকর।
সৈয়দ হক ভূমিকাতে দাবী করেছেন, যখনই তিনি কলম ধরেছেন তখনই তিনি তিনটি গুণ থেকে কখনো সজ্ঞানে সরে আসেননি। সেই তিনটি গুণ হলোঃ ১) একজন লেখকের হৃদয় হবে সিংহের মতো, হবে সে অকুতোভয়। ২) চোখ হবে ঈগলের মত, কোন কিছুই দৃষ্টি এড়াবে না তার ৩) হাত হবে নারীর মতো মমতাময়, জননীর মতো কল্যাণমাখা।
প্রথমে ভূমিকা পড়ে মনে হয়ছিল লেখক নিজের সম্পর্কে বাড়িয়ে বাড়িয়ে বলছেন! কিন্তু 'জনক ও কালোকফি' সেই ধারণা সম্পূর্ণরুপে মিথ্যা প্রমাণিত করে।
সৈয়দ হক এক জাদুকরের নাম। কোমল পেলব ভাষায় এত চমৎকার করে গল্প বলেন, অন্য কোন একটা জগতে চলে যেতে হয় লেখকের লেখনীর সাথে। ছোট্ট একটা উপন্যাস, এর মধ্যেই কাহিনির কত মোড়, টানাপোড়েন। আর ৬৫ সালের লেখা হলেও ভাষা শৈলী আর কাহিনির বুননে কে বলবে এই লেখা আজকালকার সমসাময়িক লেখা নয়!
সৈয়দ শামসুল হকের উপন্যাসের সাথে দীর্ঘদিন আমার পরিচয় ছিল না। পত্রপত্রিকায় তার লেখা দেখতাম, পড়তাম। তার তিন পয়সার জ্যোৎস্না, হৃৎকমলের টানে, মার্জিনে মন্তব্য প্রভ্রৃতি নন ফিকশন লেখা বেশ আগ্রহ নিয়ে পড়েছি। তার ফিকশনের মধ্যে আমার প্রথম পড়া উপন্যাসটি হল ‘খেলারাম খেলে যা’। মনে আছে, কোন এক পরীক্ষার আগে বইটি পড়েছিলাম। এক অনন্য যাত্রার আনন্দ পেয়েছি বইই পড়ে। খেলারাম খেলে যা’ পড়ার অন্যতম আকর্ষণ ছিল ঢাকা নিয়ে। এই ব্যস্ত শহরটাকে জাদুর শহর নাম দিয়েছি আমরা, কিন্তু এই শহরের গল্পগুলো সব বিচ্ছিন্ন বিচ্ছিন্ন। বিচ্ছিন্নতা এই অর্থে যে, আমাদের বৈচিত্রময় জীবনযাত্রাগুলো যেখানে ঢাকার অলংকার হিসেবে থাকতে পারতো, সেখানে সব আলাদা আলাদা হয়ে আছে। মিরপুরবাসী সালেহর সাথে বেচারাম দেওরীর বাবলু মিয়ার গল্প মিলবে না কখনই। ঢাকার গল্প পূর্ণতা পায় না, ঢাকার গল্পে আমাদের মানুষেরা কথা বলে না, দোকানে দাঁড়িয়ে বিকাশ করে না। বরং অল্প কিছু মানুষ হাসে, কথা বলে। কাহিনী সাজায়।
‘জনক ও কালো কফি’ শুরু থেকেই দূর্দান্ত লেগেছিল। জুনিয়র আইনজীবী মুশতাক, তার প্রেয��সী নিশাত। নিশাতকে নিয়ে লেখক যতক্ষণ লিখেছেন, মনে হয়েছে তার লেখার হাতে লেখকের কলমটা সরিয়ে কবির কলমটা কেউ দিয়েছে। প্রচন্ড মুগ্ধতা নিয়ে পড়েছি। একজন লেখক প্রেমিকের ভাষায় লিখছেন, তার প্রেমিকার প্রতি ভালোভাসা, তার প্রেমিকার প্রতি হাহাকার যদি পাঠকের মনটাকে মোচড় দিতে পারে, তাহলে কী বলা যায় না লেখকের লেখাটি স্বার্থক? সৈয়দ হক তার লেখনীশক্তি দিয়ে আমাদের দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন একজন প্রেমিকের আকুতিতে, তার ভালোবাসা ও সীমাবদ্ধতায়।
আমার পড়াশোনা নেই বললেই চলে, তবু একজন পাঠক হিসেবে একটা উপন্যাসের কাছে যতটুকু আবদার রাখতে পারি তার অন্যতম একটি হল- উপন্যাসের চরিত্রদের মুহূর্তযাপনের সঙ্গে সঙ্গে খুব আলতো করে হলেও সে সময়ের প্রেক্ষাপটটি তুলে ধরে আনা। অর্থ্যাৎ সে সময়ে চায়ের কাপে, জনপদে ও জোতস্নায় ঐ সময়টিকে একটু ধরে রাখা। আমরা বাঙ্গালীরা, বিশেষ করে এই পূর্ব বাংলার যে পিছিয়ে পড়া জনপদের লোকেরা, তাদের জীবন্যাপনের দলিল আমাদের কাছে তেমন নেই বললেই চলে। তাই যখন আমি বাংলার কোন পুরোনো লেখকের লেখা পড়ি, খুব আগ্রহ নিয়ে পড় এই ভেবে যে হয়তো সেখানে একটু করে হলেও অতীতের সামান্য স্বাদ নিতে পারবো।
এইখানে লেখক উপন্যাসটি কালের ব্যাপারটা বাদ দিয়ে শুধুমাত্র চরিত্রদের মধ্যেই ধরে রেখেছেন। একটি উপন্যাস শুধুমাত্র কয়েকটি চরিত্রের সংলাপে, ন্যারেটরের ভাবনা চিন্তা দিয়ে লেখা বেশ দূরহ কাজ আমি মনে করি, সৈয়দ হক সেটা করেছেন। লেখকের সাথে তার মা’র এনকাউন্টার পর্যন্তই এই উপন্যাস একটি গতিতে চলছিল, এর পরে লেখক অন্য একটি গতি আনতে চেয়েছে। মুশতাকের মানসিক যন্ত্রনা লিখতে চেষ্টা করেছেন। সেটা করতে গিয়ে আমার মনে হয়েছে, উপন্যাসটি তার বৈশিষ্ট্য হারিয়ে ফেলেছে।
সার্ত্রের অস্তিত্ববাদী ও কামুর অ্যাবসার্ডিটি এবং দান্তের নরক ও পরিশুদ্ধির এক টুকরো ছবি জনক ও কালোকফি। পিতৃহন্তার দায় কাঁধে তুলে নিয়ে আত্ম নিপীড়নের যে চিত্র তুলে এনেছেন সৈয়দ হক, তা অবিশ্বাস্য! উপন্যাসে গ্রটেস্ক (Grotesque) এর চমৎকার ব্যবহার করেছেন তিনি। চমৎকার বাংলা সিনেমাও হতে পারত বইটা। পাঁচে পাঁচ রেটিং।