এই বইয়ের কি আদৌ পাঠ-প্রতিক্রিয়া হয়? যদি হয়, তাহলে কীভাবে তাকে সাজাই বলুন তো? আজ থেকে প্রায় পঁচিশ বছর আগে এই বইটির সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাৎ হয়। "অমৃত কুম্ভের সন্ধানে" ও "শাম্ব" উত্তর সেই সময়ে আমি কালকূটের নেশায় ডুবে গেছিলাম। কিন্তু এই বইটির বিষয়বস্তু আমার কাছে বড়োই 'অন্যরকম' ঠেকেছিল। জল আর আকাশ, হিন্দুস্তান ও পাকিস্তান, হিন্দু আর মুসলিম, প্রেম আর প্রতারণা, বিশ্বাস আর বেঁচে থাকা মিশে যাওয়ার এই অপরূপ আখ্যানের মর্ম আমি সেদিন বুঝিনি। দিন যায়। মেস ছাড়ার সময় কোথায় হারিয়ে যায় বইটা। ক্রমে টাক আর মধ্যপ্রদেশ বাড়ে। পড়া-বেকারত্ব-চাকরি-সংসার সবকিছুর মধ্য দিয়ে এসে পৌঁছই জীবন-নদীর খেয়াঘাটে। মাঝিকে খুঁজি এই প্রশ্ন নিয়ে, "ওপারে কোন দেশ গো?" এই সময়, 'নায়ক' সিনেমার সেই একদা দোর্দণ্ডপ্রতাপ চরিত্রের মতো "আমি নয়, আমার soul" পড়তে চায় এই বইটাকে। আমি বইটা আবার কিনলাম। তারপর রাতে ঘরে ফিরে ডুবে গেলাম এই আশ্চর্য প্রদীপে, যেখান থেকে বেরিয়ে আসা জ্বিনও জানে না আমি ঠিক কী চাইছি তার কাছে। তারপর... এই উপন্যাস এক অনন্তযাত্রার। যাদের আমরা শহুরে, শিক্ষিত ভাষায় প্রান্তিক মানুষ বলি, তাদের বিশ্বাস, আচার, সুখ-দুঃখ, গান, কিংবদন্তি আর আশা-নিরাশার মহাকাব্য বলা চলে একে। লেখক একে ক্ষেত্রসমীক্ষার নির্মোহ ফ্রেমে বাঁধেননি। এই লেখার পেছনে তাঁর কোনো এজেন্ডা আমি অন্তত খুঁজে পাইনি। বরং আমি এতে পেয়েছি অপার বিস্ময়। এতে আছে প্রবল বেগে ধাবমান জীবনে পথের বাঁকে ফেলে আসা মানুষদের নিয়ে নানা ভাবনার অনুরণন। আর আছে "জীবন এত ছোটো কেনে?" এই অনুক্ত আক্ষেপ। এই বইয়ের পাঠ-প্রতিক্রিয়া লেখার সাধ্য সত্যিই আমার নেই। তাই বইটা, যদি এখনও না পড়ে থাকেন তাহলে পড়তে বলার অনুরোধটুকু ছাড়া আমার কিচ্ছু লেখার নেই। এ বই না পড়লে আপনার কী হবে, জানি না। তবে পড়ার পর আপনিও লালনের শরণ নিয়ে হয়তো গেয়ে উঠবেন, "এমন মানব জনম আর কি হবে...?" আর হ্যাঁ, ঝিনি'র মতো এই বইটার স্মৃতিও আপনার কাছে থেকে যাবে অসহ্য সুখের কষ্ট নিয়ে।
নীললোহিতের দিকশূন্যপুর পড়ে মনে হয়েছিল - আমিও যদি হারিয়ে যেতে পারতাম ! কিন্তু ভাবাই সার, কাজের কাজ আর করা হয় না, কিন্তু এই রকম অনেক লোক আছে ভেবে এক প্রকার শান্তি, এই যা।
কালকূটের এই কাহিনী পড়া শুরু করে মনে হয়েছিল - সুনীলবাবু নির্ঘাত চুরি করেছিলেন, আর শেষ করে বুঝলাম ভুল ভেবেছিলাম। চলছিল বেশ, "দেত্তরি ছাই, কেটে পড়ি" গোছের কথকের সাথে এগিয়ে চলা যায় সহজে, ঘোর আসে, কিন্তু মনে হয় ক্ষতি নেই। রহস্য রোমান্ধহীন এক কাহিনীর মাদকতায় ক্ষতি নেই। শেষে মনে হয় সব ভুল, কালকূট নাম যে নাহলে বৃথা হয়ে যায়। অমৃত কুম্ভের মধ্যেই বিষ।
অকারণে অজানার খোঁজে হারিয়ে যাওয়ার এক কাহিনী। কাল্পনিক না বাস্তব জানি না, এখন শুধুই কালকূটকে আবিষ্কারের আনন্দ।
জীবন বড়ো মায়াময়। তার অপরূপ খেলা ছড়িয়ে থাকে ভারতবর্ষের পথে প্রান্তরে। গন্তব্যহীন গন্তব্যের উদ্দেশ্যে পথ চলি। কোথা থেকে এসেছি জানা নেই, কোথায় যাবো তাও অজানা। এই কাহিনীতে লেখক নিজেও ঘুরে বেড়িয়েছেন অচেনা-অজানার পথেপ্রান্তরে। সাথে আমাকেও ঘুরিয়েছেন। ক্যানিং হয়ে গোসাবা যাবার পথে দরিয়ার বাঁধ থেকে সুদূর উত্তর পশ্চিমের সুবিস্তৃত রাঢ়ের ধূলিমলিন রাঙা মাটির পথ। চোখের সামনে একে একে পার হয়ে গেছে মৌলীক্ষার মাঠ, বক্রেশ্বরের রাতের মহাশ্মশান, শান্তিনিকেতনের পৌষ মেলা, চন্ডীদাসের জন্মস্থান, জয়দেবের কেন্দুলীর মেলা, সতীপীঠ অট্টহাস্যের মন্দির, হাড়োয়ার পীর গোরাচাঁদের মেলা!! ইছামতী,কোপাই, অজয়, বিদ্যাধরী আরও কতো অজানা নদীনালা যে পার হয়ে গেলাম তার ইয়ত্তা নেই। কতো অজানা মানুষের সাথে দেখা হয়েছে! কতো বিচিত্র তাদের জীবন-ধারণ, তাদের জীবনের গল্প! মুগ্ধ বিস্ময়ে জোড়হাত করে ভবের খেলা দেখে বেড়িয়েছি। যা পেয়েছি তুলে রেখে দিয়েছি আপন ঝোলায়! কখনো দরিয়ার বাঁধে লারান ঠাকুরের হোটেলে রাত্রিবাস করতে হয়েছে আবার কখনও রাত্রিযাপন করতে হয়েছে বাউলের আখড়ায় কিংবা তান্ত্রিকের ঘরে! বিচিত্র তার অভিজ্ঞতা।.......... ভারতবর্ষের পথে পথে সাধক। শুনেছিলাম তাদের সাথে যে মেয়েরা থাকে তাদের সাধনসঙ্গিনী বলা হয়। সাধারণ সংসারের স্বামী-স্ত্রী এর মধ্যে যে আবেগী সম্পর্ক থাকে তা তাদের মধ্যে নেই। তবে আর সাধক-সাধিকা কেনো? সেখানে আছে শুধুই নির্লিপ্তি, মুক্তি।...................... তবে কেনো গাজির ফিরে আসার পথ চেয়ে অপেক্ষা করে তার সাধনসঙ্গিনী নয়নতারা? কেনোই বা রাঢ়ের ধুলোয় হারিয়ে যাওয়া গোকুলের জন্য চোখের কোলে মেঘ নামে বিন্দুর? কোন অমোঘ আকর্ষণে সে উদাসী হয়ে থাকে দূরের দিগন্তের দিকে চেয়ে? কেনো ভৈরব ব্রক্ষ্মানন্দ অবধূত আশ্রম ছেড়ে গেলে তার ফেরার পথ চেয়ে অপেক্ষা করে ভৈরবী যোগমতী? কেনোই বা তার অনশন? কেনোই বা জন্মদুখিনী বিরাগীনী অলকা অনুসরণ করে বেড়ায় বিরাগী কালকূটকে?........ জীবনের সুর বেজে যায় নীরবে নিভৃতে! রং বেশভূষা পরিবর্তিত হতে থাকে শুধু। কখনো তা সাদা থান কখনো বা গেরুয়া শাড়ি কিংবা লাল শাড়ি!! প্রাণের সেই একই অমোঘ সুরতরঙ্গ বেজে যায় মানব হৃদয়ে। সেই সুর.......ধর্ম জাতি বর্ণ ভেদাভেদের উর্ধ্বে গিয়ে প্রতিষ্ঠা দেয় মানুষকে, সমর্পণ শেখায় জীবনের প্রতি!...... নাহলে কেনো হিন্দু বোষ্টুমী নয়নতারা তার দলছুট হয়ে হাঁটা দেয় মামুদ গাজির সাথে? কেনো বারোবিলাসিনী দুলি অনন্তকে রক্ষা করতে চেয়ে আশ্রয় নেয় মহামায়া হোটেলে? কেনো নীরজা তার প্রেমিক অচিনদা কে ফেলে শান্তিনিকেতন ছেড়ে পা দেয় সুদূর কলকাতার পথে? কেনো তার চোখের জল রুদ্ধ হয় না? কেনো এক সামান্য তাঁতি বৌ ঘর সংসার ছেড়ে রেখে পালিয়ে আসে কার্তিক ঘোষালের সাধিকা হতে? ........ জানা নেই। জীবনের গল্প শুনি। ঠিক ভুল সঠিক বেঠিক কে দূরে সড়িয়ে রেখে জীবনের জয়যাত্রা দেখি! কতো অপূর্ব তার কাহিনী! রূপ অরূপের দিকে নাই বা তাকালাম? ........... দ্বাপরে যে ব্যাথায় বেজেছিলেন শ্রীরাধিকা সেই একই ব্যাথায় যেনো বেজে চলেছে ঝিনি, আঙুরলতা, সুষি, দুলি, বিন্দু, যোগমতীরা!........ আমি কেবল মানবলীলার কাছে নত সমর্পণে বুকের কাছে দু হাত জড়ো করে পথ চলি! মানবলীলা দেখতে দেখতে যাই। জীবনের খেলায় কারোর মূল্য কম নয়। বারোবিলাসীনী দুলি থেকে তাড়ি খেয়ে বুঁদ হয়ে থাকা রিক্সাচালক, সবাই অমূল্য! এই বিচিত্র সংসারের খেলাঘরে সবাই যেনো এক মায়াময় ভূমিকা পালন করে চলেছে।
লেখকের সাথে ঘুরে ঘুরে রাঢ়ের বারোভুঁইয়াদের লোককথা শুনি। বাউলের আখড়ায় গোপীদাসের মুখে সাধনতত্ত্ব শুনি। তান্ত্রিক ব্রহ্মানন্দ অবধূতের মুখে শুনি তন্ত্রের কথা শুনি। বুঝিনা কিছুই! শুধু বিস্ময়ে অভিভূত হই!!.... বাকিটা তীব্র আক্ষেপ! সাধক আর হতে পারলাম কই? কেনো গোপীদাস বলে ওঠে.... "আমি বাউল নই গো বাবু! সারাটা জীবন পথে প্রান্তরে ঘুরে ঘুরে গান গেয়েই কাটিয়ে দি���াম। বাউল আর হতে পারলাম কোথা?"..... ফকির মামুদ গাজি বলে ওঠে .... "তা বাবু শুনেছো সাধকের কখনো কোনো ছাওয়াল পাওয়াল থাকে? সাধক আর হতে পারলুম কই? মিয়া-বিবি হয়েই জীবন কেটে গেলো!!"........ তান্ত্রিক অবধূত বলে ওঠে..... "ধুর শালো, শশ্মানের কুত্যার মতো ঘুরে ঘুরেই সারাজীবন কেটে গেলো! সাধন ভজন আর হলো কই?"..........আমি যেনো লেখকের মতো দেখতে পাই......কোনো ফকির নয়, কোনো বাউল নয়, কোনো তান্ত্রিক নয়, এক নিতান্তই গরীব ভারতবর্ষীকে!
এই বই যতদিন স্মৃতিতে থাকবে ততদিন ঝিনিও জড়িয়ে থাকবে জীবনজোড়া! দরিয়ার বুকে যেতে যেতে যে নাগরিকার সাথে দেখা হয়েছিলো কালকূটের, কেনো সে আজীবন অনুসরণ করতে থাকে কালকূটকে? কেনো সেই দার্শনিকার চোখে উজান বেয়ে যায় বারবার? মেঘ এসে থমকে দাঁড়ায় চোখের কোলে? কেনো সেই শহুরে বিদুষী বারবার কালকূটের কাছে এসে ব্যাক্ত করে নিজের চোখের জলকে? চিঠির উত্তর না দেওয়ায় কেনো তার এতো অভিমান? কেনো সে সাহিত্যিককে ডেকে নিয়ে যায় অজয় আর কোপাইয়ের তীরে নির্জন নিরালায় শুধু একটু মনের কথা বলবার জন্যে? "আমাকে তোমার পায়ে একটু শুতে দেবে গো?" বললাম "পায়ে কেনো? কোলেই মাথা রাখো!"...... কেনো বারবার ঝিনি ভবঘুরে লেখককে জিগ্যেস করে ওঠে "এরপর কোথায় যাবে? " " বাড়ি ফিরবে না? কেনো? ফিরতে ভয় হয়? পাছে আমি আবারও চিঠি লিখে বসি!"........ "আমি আবারও চিঠি লিখবো। তোমার কাছ থেকে কোনো প্রত্যুত্তর আশা না করেই!"...... কেনো ঝিনির ভেজা কন্ঠে আর্তস্বর বেজে ওঠে বারবার " আমি তো কিছু কিনতে আসিনি। শুধু নিজেকে হাট করে বিকোতে এসেছি"!!............. এ পর্যায়ে এসে লেখকের কথা শুনে রাগ হয় বৈকি!!.... গাজির মতো সুরে গেয়ে উঠতে ইচ্ছে করে "যে জন প্রেমের ভাব জানে না / তার সঙ্গে কীসের লেনাদেনা?" .........
" ক্ষ্যাপা না জেনে তুই আপন খবর যাবি কোথায়? "
এই বইকে আগলে রেখে আমি থেকে যাবো সারাটি জীবন। চোখ বন্ধ করলেই দেখতে পাবো এক আলখাল্লা পরা মানুষ রাতের গাঢ় অন্ধকারে গান গাইতে গাইতে এগিয়ে যায় আঁকাবাঁকা পথ ধরে ধরে! যুগান্তের ওপার থেকে যেনো সে হেঁটে এসেছে!! কলস্বরা স্রোতস্বিনী আর রাতের একফালি চাঁদ তার স্বাক্ষী! জন্ম মৃত্যু রূপ অরূপ অচেনা অজানার বাঁধন পেরিয়ে কোথা থেকে যেনো এক রহস্যময়ী কন্ঠস্বর ভেসে আসে............" এমনও সাধের জনম আর পাবে না মন/ বারে বারে আর ফিরে আসা হবে না".......
কেবল পাতার সংখ্যায় না, সাহিত্যের বিচারেও এ এক বিশাল বড় উপন্যাস, তাতে সন্দেহ নেই। বিট্টু (স্ত্রী - ২০১৮ ) র মত প্রেমভাব থেকে বর্জিত মানুষের জন্য একবারেই সুপারিশ যোগ্য নয়। হিন্দি বা ইংরাজিতে একের পর এক ক্রাইম থ্রিলার, সাইকো থ্রিলার কিংবা টেরোরিস্ট হান্টিং মূলক সিরিজ দেখে দেখে যদি মন একঘেয়ে হয়, তাহলে মন ভালো করার জন্য যথোচিত উপাদান। আর একটা কথা, পাঠকদের চাহিদা হোক বা ডান ব্রাউন গোত্রীয় বিদেশি লেখকের অতি প্রভাব হোক, ইদানিং কালের সাহিত্যে লেখকদের মধ্যে নিজের গবেষণার মাহাত্ম্য প্রচারের প্রাচুর্যতা ই বেশি দেখি। কেউ বিজ্ঞানী, কেউ ঐতিহাসিক, কেউ বা আবার পৌরাণিক। ভাষার লালিত্য, বর্ণনামূলক চিত্রায়ণ কিংবা জীবনের ছোট ছোট মুহূর্ত উপভোগ যে আনন্দ এই প্রকারের গল্প পড়ে পাওয়া যায়, সেটা ক্রমশঃ কমে আসছে । লেখকদের সেদিকে দৃষ্টিপাত করা উচিত।
সমরেশ বসু.. বাংলা সাহিত্যের রাজপুত্র..জীবনে যাপনে ব্যতিক্রমী.. মধ্যবিত্ত বাঙালির কোনো সজ্ঞাতেই যেন ঠিকমতো খাপ খায়না এমন চিন্তা এবং প্রাত্যহিক যাপন। ঠিক এই জায়গা থেকেই "কালকূট" নিজের জাত নিজের আত্মপরিচয় যেন ঘোষণা করেন। আমি সকলের নই.. আমি আমার অন্তর-জাত প্রেম ভালোবাসার বশ.. এবং বশংবদ। লালন বলেছিলেন--ভজলে মানুষ সোনার মানুষ পাবি। আগুনে পুড়লে তবেই সোনা হয় খাঁটি... মানুষ ও...
"দিব তার তুলনা কি যার প্রেমে জগৎ সুখী, হেরিলে জুড়ায় আঁখি, সামান্যে কি দেখিতে পারে তারে ? তারে যে দেখেছে সেই মজেছে ছাই দিয়ে সংসারে, হারায়ে সেই মানুষে তার উদ্দেশে আমি দেশ বিদেশে বেড়াই ঘুরে। আমি কোথায় পাব তারে আমার মনের মানুষ যে রে..." ~ গগন হরকরা
কে সেই মনের মানুষ যার খোঁজে ঘুরে বেড়ান লেখক ? কী সেই রূপ যার দর্শন অভিলাষী তিনি ? তিনি কি কোনো দেব বিগ্রহ বা পরম সাধক, মন্দিরে বা মসজিদে যাঁর বাস ? বুক ভর্তি বিষের ভান্ড নিয়ে কাকে খুঁজে ফেরেন কালকূট ?
"... আমি তীর্থ অতীর্থ জানি না। মন্ত্রতন্ত্র সাধনপূজন সন্যাস-বৈরাগ্য, কিছু আমার নেই। কীসের সন্ধানে ফিরি তাও জানি না।... আমি যেন এমনি করে চলতে পারি, এমনি করে দেখতে পাই, আর পাওনা নিয়ে চলে যাই। পথ চলাতে এই আমার পরম পাওয়া যেন...।"
এই; এই পথ চলাই আদতে তাঁর ডেস্টিনেশন। তাই দক্ষিণের বিদ্যেধরীর ঢেউয়ে ভর করে তাঁর ভেসে পড়া। তাই মলুটি / মল্লহাটির কালীপুজো থেকে বোলপুর শান্তিনিকেতনের পৌষমেলা, চন্ডীদাস আর রজকিনীর পদধুলি ধন্য নানুর থেকে সিউড়িতে বাউল গোপীদাসের আখড়া, বক্রেশ্বরে বাবার 'থান' আর মহাশ্মশান থেকে অট্টহাসের সতীপীঠ হয়ে কেন্দুলিতে জয়দেবের মেলা, নবদ্বীপের ধুলট উৎসব থেকে ফাল্গুন মাসে হাড়োয়ায় পীর গোরাচাঁদের মেলা ঘুরে বেড়ান তিনি। মেলা দেখেন। কত রকম কত মানুষের সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। তিনি মানুষ দেখেন। কত আশ্চর্য সম্পর্কের পরশ লাগে তাঁর গায়ে। স্নেহ, প্রীতি, সখ্য, তাঁকে ভরিয়ে তুলতে চায়। তিনি সাড়া না দিয়ে পারেন না। অথচ যে কোনো বন্ধনকে তাঁর ভয়। ভয় তাঁর নিজের মনকেই।
"... মানুষের প্রাণের টান তাকে কোথায় নিয়ে যায়। কেবল সম্পর্কের কথা মেনেছি। কিন্তু সম্পর্ক গড়ে ওঠার কত যে বিচিত্র বিস্ময় রহস্য, সময়ের আশ্চর্য মাপজোক, তা যেন এমন করে জানা ছিল না।... সে সম্পর্কের কোনও নাম নেই, শুরু নেই, শেষ নেই। সে সম্পর্কের খোঁজ পাবে না এই সমাজের শাস্ত্রে বিধানে। এতে তুমি যে রং-ই মাখাতে চাও, রং ধরবে না। এই পরিচয় আছে অচিনে বিচিত্রে...।"
গাজি তাঁকে শুধোয়– "... কেমন বোঝেন বাবু ? তার চোখের ঝিলিকে যেন রহস্য। ভুরু নেচে ওঠে। কী বোঝার কথা বলে গাজি ? কথা আসে কোন বায় থেকে ? জিজ্ঞেস করি, 'কীসের ?' গাজি ঘাড় দুলিয়ে দূরের দিকে দেখিয়ে বলে, 'এই ভেসে পড়া?..."
এই ভেসে পড়ার পথে দেখা হয়ে যায় মামুদ গাজি, অলকা চক্রবর্তী ওরফে ঝিনি, দুলি, মাহাতো চাচা ও আঙরি, সুষি, ধনু, অচিনবাবু, গোপীদাস বাউল ও তাঁর প্রকৃতি রাধা, গোকুল বাউল ও তার প্রকৃতি বিন্দু, সুজন, কুসুম, কাশীনাথ, নিতাই, অবধূত ও তার প্রকৃতি যোগমতী, মদন বাউল ও তাঁর প্রকৃতি মনোহরা ও আরও কত নাম না জানা মানুষের সঙ্গে। চলার পথে তিনি মানবজমিন আবাদ করে চলেন, তাতে তাঁর প্রাণের ভিতরে কলকলিয়ে যায়। তাতে যদি চোখের জলের ছিটে থাকে, একটা খুশির ঝরনাও বাজে। তিনি অবাক হন যত, মুগ্ধ হন আরও বেশি। চলার পথে এই তাঁর প্রাপ্তি। কী খুঁজে ফেরেন তা তিনি জানেন না, শুধু পথ চলাকে তিনি গড় করেন।
"...কেবল মনে হয় আমি এখানে নেই, বর্তমানে নেই। আমি যেন হাজার বছর ধরে অনেক পায়ের চিহ্নে চিহ্নে চলেছি। আমি বহু দূর থেকে আসি আমারই ছায়ায় ছায়ায়। একা না, বহু লক্ষ কোটির সঙ্গে।"
চলতে চলতে তিনি উপলব্ধি করেন সব কিছুর চেয়ে মানুষ বড়। মানুষের জীবনধর্ম বড়। শুধুমাত্র পুরোহিত আর মোল্লার মন্ত্রেই মানুষ মানুষের কাছে ধরা পড়ে না। মরা মন্ত্রে জাগে না। প্রাণের ধিকিধিকি চাই...।
এই প্রাণের ধিকিধিকির খোঁজ পাওয়া যায় গাজী, আঙরি, ঝিনি, অচিনবাবু, গোপীদাস, বিন্দু, যোগমতীর প্রীতির নির্ঝরে। গোপী��াস তাঁকে শেখায় বাউল ফকিরের অমোঘ মন্ত্র – যা নেই ভান্ডে তা নেই ব্রহ্মান্ডে।
।। রূপ স্বরূপ অরূপ দিখাকে হাম হি মে হাম হি খেলে... আপনি মাধী মে আপ মে ডোলু খেলুঁ সহজ স্ব-ইচ্ছা ।। (কবীর)
হাত মেলে ধরে ঘুরিয়ে নিয়ে তর্জনী দিয়ে নিজের বুক দেখায়। ঘাড় বাঁকিয়ে বলে, 'বাবু এই ঘরখানি আছে।'
মুরশেদ আর গুরুর নামে পথ চলার এমন বিচিত্র ছবি দেখতে দেখতে বারে বারে বুকের কাছে হাত এনে, কাকে যে নমস্কার করতে চান তিনি নিজেই বুঝতে পারেন না। কেবল প্রার্থনা করেন, "আমার মনকে স্পন্দিত রাখতে দাও, আমার চোখ খোলা রাখো।"
নিজেকে বিকিয়ে হাট করতে আসা তাঁর অচিন অধরার সন্ধানে। ত্রাণের খোঁজে যান কিনা তা তিনি জানেন না, শুধু এইটুকু জানেন তাঁর সবই বিষের ভরা। সেই বিষ তিনি সইতে পারেন না। অমোঘ সেই কালকূট বিষ নিয়েই তাঁর চলা।
এই মহাগ্রন্থের কোনো পাঠ প্রতিক্রিয়া বোধহয় হয় না। শুধু পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায়, আখরে আখরে এক ধরা-অধরা, বোঝা না বোঝার খেলা চলতে থাকে। ইচ্ছে হয় কালকূট সেই বিষ কন্ঠে ধারণ করে দেখি মুরশেদের নামের মরণে কেমন সুখ।
এই বই সম্পর্কে কিছু বলা মানেই ধৃষ্টতা। গতরাত্তিরে শেষ করেছি। এখনও ঘোরের মধ্যে রয়েছি। এমন সুন্দর করেও লেখা যায়? বইটিতে লেখক পরিব্রাজক হয়ে নিজে ঘুরেছেন। আমাকেও ঘুরিয়েছেন। আমি ওনার সাথেই দক্ষিণের বাদা অঞ্চলের লোনা হাওয়ায় শ্বাস নিয়েছি, বীরভূমের লালমাটির ধুলো মেখে বাউল শুনেছি, বাউলের সাধনতত্ত্ব জেনেছি। সর্বোপরি দেখেছি মানুষকে। লেখক এই এক উপন্যাসে মানবসত্ত্বার কত না রূপ দেখিয়েছেন। এত ভিন্ন রূপ, এত ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন সমাজ, তা সত্ত্বেও একটা মৌলিক জায়গায় সব মানুষই এক। দ্বাপরে যে ব্যথায় বেজেছিল শ্রীরাধিকা, সেই একই ব্যাথায় গল্পে বেজেছে ঝিনি, দুলি, বিন্দু, যোগোরা। মানবের দুনিয়ায় কেউই ফেলনা নয়। দাগী চোর হোক অথবা মদমাতাল ভৈরব, সকল শ্রেণীর মানুষই তাদের অন্তরে কোনো না কোনো ঐশ্বর্যের খনি কেটে রেখেছে। প্রথম দর্শনে বা সামান্য আলাপনে সে খনির হদিশ পাওয়া যায় না। কিন্তু লেখকের মতো ক্ষমতা থাকলে, সেই ঐশ্বর্যে ধনী হয়ে ঘরে ফেরা যায় অনায়াসেই। তাই, এই বই পড়লে নিজেকে ক্ষুদ্র লাগে। মনে হয়, মানুষের জগতের এহেন পরিচয় নিজের অভিজ্ঞতায় প্রত্যক্ষ করতে না পারলে, এই মানবজীবনের মূল্য কোথায়?
এই বইয়ের সবকথা বুঝতে পেরেছি, এমন বলার সাহস আমার নেই। এত গভীর উপলব্ধি দিয়ে লেখক কাহিনি গড়েছেন যে তার সম্পূর্ণ মর্মার্থ আমার এই স্বল্প বয়সের অনভিজ্ঞ জীবন দিয়ে টের পাওয়া সম্ভব নয়। তথাপি, যতটুকু বুঝেছি, সেটুকুর ঘোর থেকেই এখনও বেরোতে পারি নি।
বইটা পড়তে পড়তে কখনো মনে হয়েছে, এ তো কবিতা। কবিতার মতো রূপকে সাজানো সুন্দর শব্দবন্ধ দিয়ে লেখক লিখে গেছেন। কখনও মনে হয়েছে, রোমান্টিক ক্লাসিক। আবার কখনো মনে হয়েছে নিছক একটা ভ্রমণকাহিনী পড়ছি। একেকটা পর্বে একেকটা অনভূতি। যতগুলো চরিত্র লেখক গড়েছেন, সবকটাকে ভালো না বেসে থাকা যায় নি। এমনকি তুচ্ছ রিক্সাওয়ালাকেও প্রেমের দেশের মাঝি মনে হয়েছে। সবার মধ্যে ঐশ্বর্য। সব্বাই ধনী। লেখক আর তাঁর সাথে সাথে আমি নিজেই কেবল রিক্ত। সকলের অন্তরের ঐশ্বর্য থেকে সংগ্রহ করে করে ফিরি।
এই বই সবার পড়া উচিত। বারবার পড়া উচিত। অন্তত এই একটা বই না পড়লে জীবনে বড় একটা কিছু মিস হয়ে যায়।
আমরা শহুরে, শিক্ষিত ভাষায় যাদের প্রান্তিক মানুষ বলি, তাদের বিশ্বাস, আচার, সুখ-দুঃখ, গান, কিংবদন্তি আর আশা-নিরাশার মহাকাব্য বলা চলে এই বইকে। এতে আছে প্রবল বেগে ধাবমান জীবনে পথের বাঁকে ফেলে আসা মানুষদের নিয়ে নানা ভাবনার অনুরণন। আর আছে “জীবন এত ছোটো কেন?” এই অনুক্ত আক্ষেপ।
এ বই না পড়লে আপনার কী হবে, জানি না। তবে পড়ার পর আপনিও লালনের শরণ নিয়ে হয়তো গেয়ে উঠবেন, “এমন মানব জনম আর কি হবে…?” আর হ্যাঁ, ঝিনি’র মতো এই বইটার স্মৃতিও আপনার কাছে থেকে যাবে অসহ্য সুখের কষ্ট নিয়ে। যে ভাবে ঝিনি চরিত্রটি দেখানো হয়েছে, মনের ভিতরে কোথাও কিছু একটা বেজেছে – বারংবার ইচ্ছা হয়েছে যেন তাকে শক্ত হতে দেখি, লেখকের ওপরে নিষ্ফল ক্রোধ জন্ম নিয়েছে। নিজেকে কালকূট প্রমাণ করার জন্য এতটার দরকার ছিল কি? সামান্য পাঠক আমি, উত্তর জানা নেই।
আমি শুধু কল্পনা করতে পারি যে কালকূটের যাত্রাপথের শেষ হবে ঝিনি নামক নদীতে মিশে..যদ্দিন না শেষ হচ্ছে তদ্দিন চরৈবতি..
“আমি কোথায় পাব তারে, আমার মনের মানুষ যেরে॥ হারায়ে সেই মানুষে তার উদ্দেশে দেশ বিদেশে, আমি দেশ বিদেশে বেড়াই ঘুরে। কোথায় পাব তারে আমার মনের মানুষ যেরে।”
পড়তে পড়তে খেয়াল হয়নি কখন নারাণ ঠাকুর, মাহাতো চাচী-চাচা, সুষি, কুসুম, লিলি, ভৈরবী, গোপীদাস, অবধূত, অধর মাঝিকে নিয়ে তৈরী করা পৃথিবীর মধ্যে ঢুকে গেছি। এ যেন এক অনন্ত যাত্রা, যেখানে পথ চলতে চলতে চরিত্রগুলো বদলে যেতে থাকে; কিছু চরিত্র কিছুটা পথ সঙ্গ দেয়, তো কিছু চরিত্র আরেকটু বেশী সময় সাথে থাকে।
অতিথির তারাপদ কিসের ডাকে যেন বারবার দৌড়ে যেত, আংটি চাটুজ্যের ছোটভাই বসন্তেরও মন বসত না ঘরে - এই বারংবার বাঁধনহারা হতে চাওয়ার চেষ্টাটা হয়ত জীবনেরই একটা অংশ, যারা একেবারে পেরে যায় তারা অন্যজগতের সন্ধান পায়; লেখকের মতন কারো অবস্থা হয় পরশপাথর সন্ধানকারী মানুষের মতন - কি যেন তারা খুঁজেই চলে; আর কিছু মানুষ যাঁতাকলে পিষতে পিষতেও ভিতরে ভিতরে সদা পলাতক হয়ে জীবনটা কাটিয়ে দেয়। যারা বেরিয়ে পড়তে পারে একবার তারাই সেই ইন্দ্রজালের সন্ধান পায় যে মায়ার বশে সিঁধেল চোরও চুরি ছাড়তে পারে, বছরে অন্তত একবার একসাথে কাঁদবার জন্য কোনও কাঁধ পাওয়া যায়। কিসের সন্ধানে এ যাত্রা ছিল? সত্যের, সুন্দরের, জীবনের - কোনটার? জানিনা আমি..আমি শুধু মানুষ দেখলাম একের পর এক..সবাই যেন কোনও একই জায়গায় শেষমেশ লীন হয়ে গেলেন।
গাজী, অনেক জন্মের বন্ধু ছিলে যেন তুমি - মামুদ গাজীকে হয়ত কোনদিনও ভুলতে পারব না, বা বলা চলে চাইব না। এরকম বন্ধু, সঙ্গী হয়ত বইয়ের পাতাতেই পাওয়া যায়। দেখা হবে দোস্ত কোথাও না কোথাও - চিনে নেব তোমাকে এক দেখাতেই।
পড়তে পড়তে লেখকের সাথে সহমর্মিতা বরং কমই বোধ করেছি, যতটা আত্মীয়তা তৈরী হওয়ার তা হয়েছে ঝিনির সাথেই। মনে হচ্ছিল - লেখার কোনও একটা চরিত্র হয়ে ঝিনি’কে বলি, ‘পাশে আছি, পাশে থাকব। তুমি যত ইচ্ছা বিষ পান কর..যেদিন সে আসবে তুমি চলে যেও; ততদিন না হয় তোমার পাশটুকুতে থাকি - না হয় একটু দূরেই রইলাম।‘ এতদিন মাধবীলতার মোহাবিষ্ট ছিলাম, ঝিনি এসে সেই মোহপাশ থেকে যেন মুক্ত করলেন। যে ভাবে ঝিনি চরিত্রটি দেখানো হয়েছে, মনের ভিতরে কোথাও কিছু একটা বেজেছে - বারংবার ইচ্ছা হয়েছে যেন তাকে শক্ত হতে দেখি, লেখকের ওপরে নিষ্ফল ক্রোধ জন��ম নিয়েছে। নিজেকে কালকূট প্রমাণ করার জন্য এতটার দরকার ছিল কি? সামান্য পাঠক আমি, উত্তর জানা নেই।
আমি শুধু কল্পনা করতে পারি যে যাত্রাপথের শেষ হবে ঝিনি নামক নদীতে মিশে..যদ্দিন না শেষ হচ্ছে তদ্দিন চরৈবতি..
পুনশ্চ : আবারও পড়ব, আরো যত্ন সহকারে..
This entire review has been hidden because of spoilers.
সমরেস বসু ( কালকূট ) এর লেখা নিতান্তই আমাকে মুগ্ধ করে | বিশেষ করে এই বইটি |
যেটি আমার পড়া অন্য সকল বইয়ের মধ্যে এটি খুবই অন্যরকম বই । এই বইটির রিভিউ দেয়া খুব কঠিন! যাই লিখবো না কেনো কম হয়ে যাবে! একটি বই যেটা আপনাকে অন্য ভিন্ন কোনো জগতে নিয়ে যেতে পারে , এই বই খুব সুন্দর এবং কথাগুলো এত সুন্দর করে বর্ণনা করা যা সত্যি অসাধারন | প্রেম , ভালোবাসা ও এক গভীর ফিলসফি তে ভরা এই বইটি !
A book full of philosophy, love, longings and wander thirst. It requires a very qualified person to review the book. It feels audacious to review it. I only can say that I loved the journey and now standing speechless at the end.