“কে এই তারানাথ তান্ত্রিক? মধ্য কলকাতার এক এঁদো গলিতে বাস করা আধপাগল, নেশাখোর, বাউন্ডুলে, হিপি ধরণের এই ব্যক্তিটির পেছনে রয়েছে কোন অন্ধকারাছন্ন ইতিহাস? পাড়ার লোকে তাঁকে এড়িয়ে চলে, কমবয়েসী মেয়েরা ভাবে বুড়ো পারভার্ট, বাচ্চারা দেখলে ভয়ে ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেলে, উঠতি ছোকরারা এক কালে পেছনে লাগার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু কি এক কারণে তারা এখন এনার ছায়াও মাড়ায় না। আরেকটা কারণ অবশ্য TnT-র বন্ধু শঙ্কর রায়চৌধুরী, লালবাজারের ক্রাইম ডিপার্টমেন্টের দুঁদে অফিসার। তবে শঙ্কর TnT-র বাড়িতে কোনোদিনই উর্দি পরে আসে না, কি কারণে যে মাস্তানগুলো TnTকে সমীহ করে চলে কে জানে? TnT-র আরেক বন্ধু বিভূতি ব্যানার্জি, স্ট্রাগলিং লেখক, ঔপন্যাসিক; তার স্বপ্ন বাংলায় প্রাপ্তমনস্কদের হরর উপন্যাস লিখে তাকে বেস্টসেলার করার (প্রকাশকেরা অবশ্য বলে 'বাংলায় আবার হরর কি? পরকীয়া নিয়ে লেখো, বা নারী স্বাধীনতা, বা এল.জি.বি.টি সমাজ নিয়ে, একেবারে জমে যাবে ভায়া!') মোদ্দা কথা বঙ্গের স্টিফেন কিং হতে চান বিভুবাবু। তা সেই স্বপ্ন পূরণ করার হেতু TnT-র সাথে তার এতো ওঠাবসা, যদি গল্পের কিছু রসদ পাওয়া যায়। TnT এই দুটি ছেলেকে, নিজের মুখে প্রকাশ না করলেও আপন ভাই বা সন্তানের মতো ভালোবাসেন। কিন্তু এরাও জানে না কোথা থেকে এই অদ্ভুত ব্যক্তির আবির্ভাব, তাঁর অতিপ্রাকৃত শক্তির পেছনে রহস্য কি? TnT-র বক্তব্য তাঁর জন্ম বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে, সত্যি বলতে কি লোকটার বয়েস দেখলে বোঝা যায় না আসলে কত হতে পারে। আর TnT- সবসময়ে ওই কালো চশমা কেন পরে থাকেন? ওনার চোখ দেখা যায়না কেন? কি রহস্য লুকিয়ে আছে ওই কালো চশমার পেছনে? TnT-র অতীতের গহন অন্ধকারে কি লুকিয়ে আছে? জানতে হলে পড়ুন তারানাথ তান্ত্রিক আঁধার নগরী”
প্রথমে বলে রাখি প্রচ্ছদে রুদ্রাক্ষের মালার সাথে বেমানান পোশাকে বসে থাকা লোকটি তারানাথ তান্ত্রিক। এ’কথায় অনেকেরই মোহভঙ্গ হতে পারে। বাংলা বইপাড়ায় তান্ত্রিক হরর জগতের একচ্ছত্র সম্রাটের মডার্ন অ্যাডাপ্টেশন এই তারানাথ; দুই সাগরেদ শঙ্কর আর বিভূতির কাছে সর্টকাটে টিএনটি । আমার অবশ্য টিএনটির লুক দেখে শিল্পী এস. এম. সুলতানের কথাই মনে হলো প্রথমে!
পথম কপাতা পড়ে ভাবলাম এতো পুরোনো কাহিনী! পরে দেখলাম ফ্ল্যাশব্যাক ছিল। প্লট আজকের যুগের আধুনিক কলকাতায়। তবে আঁকা দেখে প্রথমে চমকে যাই একটু। বাংলা কমিক্সের সাথে তো মেলে না! আক্ষরিক অর্থেই কিছু ‘ইন্টারন্যাশনাল প্লেয়ারের’ হাতে পুষ্ট হয়েছে কমিক্সটি। এর মূল ভাষাও বাংলা নয়। বর্তমান কলকাতার কথ্য ভাষায় অনুবাদ করা।
মূল গল্পের কাহিনীর একটু আভাস দিই এখন। বিভূতি আর শঙ্করের গার্লফ্রেন্ড ট্রামে যখন ছিল তখন একটা বিভৎস ঘটনা ঘটে। এক নাদান চেহারার ভদ্রলোকের ফোনে একটা ভয়েস মেসেজ আসে; সেটা শোনার পরপরই লোকটার দৃষ্টি পাল্টে গেল। আচমকটা এক সহযাত্রীরা গলায় দেয় কামড় বসিয়ে! লোকটার মুখের চামড়া তুলে আততায়ী নিজের মুখে সেটা মুখোশের মতো করে পরে নেয়। এরপর উপর্যপুরি এরকম ঘটনা আনন্দ নগরী কলকাতার ঘুম উড়িয়ে দেয়। মুখ্যমন্ত্রীর অবশ্য বলেছে এটা মাওবাদী চক্রান্ত। বামেদের কথা তো উঠেই গেল তখন,স্পয়লার হয়ে যাবে তাও বলি, নকশালদের কথা উঠলে বাঙালি পাঠকদের মনে যে বিখ্যাত চরিত্রর কথা মনে উঁকি দেয়, আঁধার নগরীর আতঙ্কের বীজ কিন্তু সেখানেই! ওভারঅল অলংকরণ সত্যিই অসাধারণ হয়েছে। ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের একাধিক শিল্পীর আঁকা আর লেখকের কাহিনী ইউনিক করে তোলার প্রচেষ্টা প্রশংসার যোগ্য।
তারানাথ তান্ত্রিক সংক্ষেপে টিএনটি। তার কাছে কয়েকজন ছেলে-ছোকরা মাঝে মাঝে আসে চা-মুড়ি খায়, টিএনটির আজিব আজিব গল্প শুনে মজা পায়। হয়তো বিশ্বাস করে বা করে না।
হঠাৎ একদিন শহরে শুরু হয় অদ্ভূত রকম কাজ-কারবার। ট্রেনের ভরা কামরায় একজনের ফোন আসে...কলটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে কিছু একটা বলা হয় এরপরই ফোনওয়ালা হয়ে উঠে নরমাংসভোজী। আশপাশের সবাইকে কামড়ে দেয়, কামড় খাওয়া মানুষগুলোও হয়ে উঠে জম্বী। একটাই তাড়না কাজ করে তাদের মাঝে খিদে খিদে এক পেট খিদে......
এমন আরো আরো ঘটনা ঘটতে থাকে শহরে...কিন্তু কেন? এসবের শুরুটা কোথায়? টিএনটি কিছু জানে? সুরাহা করতে পারবে এইবের?
সাধারনত বাংলা কমিক্সের আর্টওয়ার্ক হয় খুব দুর্বল কিসিমের। কিন্তু এই বইয়ের আর্টওয়ার্ক দেখে ভাল্লাগছে। বাংলায় এমন কাজও হয়েছে। অসামমমমমম! বইয়ের কাহিনীর গাথুনিও মন্দ না। টিএনটির পরের বইয়ের জন্য খুব আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষায় থাকলাম।
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়-এর লেখার সঙ্গে, আরো অনেকের মতো, আমার প্রথম পরিচয় ঘটে "পথের পাঁচালি"-র শিশু-কিশোরপাঠ্য রূপ, সিগনেট প্রেস থেকে প্রকাশিত এবং সত্যজিৎ রায়ের অলঙ্করণ-সমৃদ্ধ "আম আঁটির ভেঁপু"-র মাধ্যমে। স্কুল জীবন শেষ হবার আগেই চেনাজানা হয় লবটুলিয়া-বইহার এলাকার প্রকৃতি ও মানুষের সঙ্গে, "আরণ্যক"-এর মাধ্যমে। তারপর গভীর বন্ধুত্ব হয় "চাঁদের পাহাড়"-এর শঙ্করের সঙ্গে। কিন্তু, ভূতের গল্প হোক বা অ্যাডভেঞ্চার, প্রকৃতির বর্ণনা হোক বা তুলসীতলায় ঝোড়ো হাওয়ার হাত থেকে একটি কম্পমান প্রদীপশিখাকে বাঁচিয়ে রাখতে সচেষ্ট এক ভীরু-কোমল পল্লীবধূর মনের তল পাওয়ার চেষ্টা, বিভূতিভূষণকে, কেন যেন, সহজ-সরল মানুষের সহজ-সরল গল্পকার বলেই ভেবে এসেছিলাম অনেক দিন। তারপর একদিন পড়ার সুযোগ পেলাম "তারানাথ তান্ত্রিকের গল্প"। আর আমার মাথাটা এক্কেবারে ঘুরে গেল। এ কী সাংঘাতিক লেখা! বিভূতিভূষণ এই রকম ভয়োৎপাদক লেখা লিখতে পারেন, এ তো ভাবাই যায়না। তারপর কেটে গেছে অনেক দিন। বিভূতিভূষণের সুযোগ্য পুত্র তারাদাস তারানাথ তান্ত্রিক-কে কেন্দ্রে রেখে আমাদের উপহার দিয়েছেন অনেক ভৌতিক বা অলৌকিক রসের গল্প। টিভি-র পর্দায় পৈশাচিক চরিত্রচিত্রণ ও কাহিনিনির্মাণের দ্বারা অলঙ্কৃত এক আক্ষরিক অর্থে ভয়ানক টিভি সিরিজ অবধি এসে পৌঁছেছে। কিন্তু সেই গল্পে পড়া ভয়ের অনুভূতি, আমাদের দেখা-শোনার বাইরে এক বুদ্ধির অগম্য নারকীয় অন্ধকারে তলিয়ে যাওয়ার সেই শিহরণ আর পাইনি। যদ্দিন না এই বিশেষ বইটির ইংরেজি সংস্করণ (একাধিক খণ্ডে) পড়ার সৌভাগ্য হয়। সেদিন মনে হয়েছিল, হ্যাঁ, তারানাথ তান্ত্রিক নামক চরিত্রর মধ্যে লুকিয়ে থাকা সম্ভাবনা এই প্রথম বাস্তবায়িত হল স্বাধীনতা-উত্তর বাংলার এক রক্তাক্ত অধ্যায় আর আজকের এই নষ্ট সময়ের পটভূমিতে। গল্পের শুরু হয় বিভূতিভূষণের গল্পের মতো করেই, তবে অননুমেয় বয়স ও রহস্যময় অতীতের তারানাথের শ্রোতা এখানে সি.আই.ডি অফিসার শঙ্কর (!) এবং উঠতি লেখক বিভূতি (!)। তারপর কলকাতা মেট্রোয় ঘটে একের পর এক ব্যাখ্যাতীত খুন, যা 'মাননীয়া'-র ভাষণে "মাওবাদী চক্রান্ত" হিসেবেই বর্ণিত হয়। কিন্তু পুলিশ না-জানুক, প্রশাসন না-মানুক, তারানাথ বুঝতে পারে যে হত্যা ও নৃশংসতার এক কল্পনাতীত যুগ নেমে আসছে কল্লোলিনী এই শহরের বুকে। তারপর কী হল? সেটা জানতে হলে পড়তে হবে বন্ধুগণ। মাত্র ৩৯৯ টাকা দামের এই আনপুটডাউনেবল পেপারব্যাকটি, যা ঝরঝরে অথচ প্রাপ্তবয়স্ক পাঠকের কাছে উপভোগ্য বাংলায় প্রকাশ করেছে স্পিচবাবল এন্টারটেইনমেন্ট, ঝটপট জোগাড় করুন, আর বুঁদ হয়ে যান আঁধার নগরীর ঝাঁঝালো নেশায়। আমি তো ইতিমধ্যেই পরের গল্পের জন্য দিন গুনছি।
বিভূতিভূষণ এবং তারাদাস বন্দোপাধ্যায়ের অমর সৃষ্টি ‛তারানাথ তান্ত্রিক’এর গল্প আপনারা নিশ্চয়ই পড়েছেন বা অডিও স্টোরি শুনেছেন... আচ্ছা কখনো সেই ‛তারানাথ’কে এই বর্তমান সময়ের কল্লোলিনী কলকাতার মানুষ হিসেবে কল্পনা করেছেন কি ?
▫️স্কুল-কলেজে কেমিস্ট্রি বই-তে আমরা পড়েছি ‛TNT’ মানে হল ‛Trinitrotoluene’... আচ্ছা কখনো ভেবে দেখেছেন কি, তারানাথ তান্ত্রিকের নামের অদ্যাক্ষরগুলি হয় ‛TNT’.
📜 বিষয়বস্তু : কলকাতা মেট্রো রেলে এক ভয়াবহ গণহত্যা কে কেন্দ্ৰ করে এই কাহিনীর শুরু । প্রতিশোধ ও প্রতিহিংসার আগুন যে কত ভয়ঙ্কর হতে পারে, তারই দৃষ্টান্ত এই গল্পটি । গল্পের মূল চরিত্রে চারজন.. সি.আই.ডি অফিসার শঙ্কর রায় চৌধুরী, তার প্রেমিকা সাংবাদিক স্নেহা বোস, বন্ধু বিভূতি ব্যানার্জী এবং রহস্যময় অতীন্দ্রিয় ক্ষমতার অধিকারী তারানাথ তান্ত্রিক ওরফে TNT । গল্পের সূত্রপাতহয় রক্তে রাঙা অতীতে যা বর্তমানকে করে তুলেছে নরকতুল্য । TNT কি পারবে এই ‛আনন্দ নগরী’ কলকাতা শহরকে ‛অন্ধকার নগরী’তে পরিণত হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করতে ?
▫️ব��ংলায় যে এত অসাধারণ ‛গ্রাফিক নভেল’ হতে পারে, কয়েকমাস আগেও এই কথাটি জানতাম না । তারপরেই হাতে পেলাম ‛শ্বাপদ সনে’ গ্রাফিক নভেলটি, আমার ধারণা পুরোপুরি বদলে গেল । বাংলা গ্রাফিক নভেল সম্পর্কে আরও খোঁজখবর করতে গিয়ে জানতে পারলাম ‛তারানাথ তান্ত্রিক’ নিয়ে বাংলা গ্রাফিক নভেল হয়েছে । এরপরেই বইটি সংগ্রহ করলাম এবং পড়ে ফেললাম ।
📜 বইটির সম্পর্কে আমার প্রতিক্রিয়া ভালো এবং খারাপ দু-রকমেরই ।
🔸ভালো দিক :
▫️এই বইয়ের গল্পটি কিন্তু তারানাথ তান্ত্রিকের কোনো মূল গল্পের অ্যাডাপ্টেশন নয়, বরং বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়ের সৃষ্ট চরিত্রটির ‛আধুনিকীকরণ’। গল্পটি বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে লেখা আদ্যোপান্ত টানটান একটি মৌলিক কাহিনী । এককথায় ‛আনপুটডাউনেবল্’।
▫️একটি গ্রাফিক নভেলের মেরুদন্ড হল তার ইলাস্ট্রেশনস্ । এই বইটির প্রতিটি ছবি এবং কালার কম্বিনেশন দুর্দান্ত, পড়া হয়ে যাওয়ার পরেও পাতার ওপর থেকে চোখ সরাতে পারিনি ঐ ছবিগুলির আকর্ষণে ।
🔸খারাপ দিক :
▫️এতকিছু ভালোর মধ্যেও এই বইটির একটি খুব খারাপ দিক আছে । বইটির পাতার কোয়ালিটি বেশ ভালোই, কিন্তু বাইন্ডিং ‛জঘন্যতম’। আমি এত জঘন্য মেকিং আজ পর্যন্ত কোনো বইয়ে দেখিনি । আমি ভীষণ যত্ন নিয়ে বই পড়ি (একথা বলাই বাহুল্য), তা সত্ত্বেও আমার বইটির পাতা খুলে গেছে ।
সবমিলিয়ে বলতে পারি এত দুর্দান্ত কন্টেন্ট বাংলা গ্রাফিক নভেলে খুব বেশি নেই, কিন্তু বইটি অক্ষত অবস্থায় সংগ্রহ করতে চাইলে আদৌ সম্ভব হবে বলে আমার মনে হয় না ।
Low expectation নিয়েই শুরু করেছিলাম, কেননা এরকম কালজয়ী চরিত্রের উপর ভিত্তি করে তৈরি সাহিত্যগুলোর বেশীরভা্গই শেষমেষ লেজেগোবরে অবস্থা হয়ে যায়। তবে তারানাথ তান্ত্রিকের এই মডার্ন TNT রূপ বেশ উপভোগ করেছি।
এটা বিভূতিভূষণের উপন্যাস/গল্প থেকে অনুপ্রাণিত কোন গ্রাফিক নভেল না(আমি এমনটাই আশা করেছিলাম) বরং তার প্রতি একটা ট্রিবিউট বা শ্রদ্ধার্ঘ্যবলা যায়। এমনকি , এখানে যে তারানাথ তান্ত্রিক বা টিএনটি তার চরিত্রও বিভূতিভূষণের তারানাথের থেকে ভিন্ন। উপন্যাসের তারানাথ আত্মভোলা সংসারী মানুষ, উনবিংশ শতাব্দীর প্রেক্ষাপটে নির্মিত অন্যদিকে টিএনটি যেন সত্তর দশক থেকে উঠে আসা বিপ্লবী মাইন্ডসেটের কোন হিপ্পি, যে সমাজের প্রচলিত নিয়মকে বুড়ো আংগুল দেখায় । উপন্যাসের তারানাথ সাত্ত্বিক জীবন যাপনের দৃষ্টান্ত এদিকে কমিক্স এর তারানাথ হরেক রকমের নেশা ও কু-অভ্যাসে আক্রান্ত। কমিক্স এর টিএনটি সংসার বিবর্জিত একলা মানুষ ,যেখানে গল্প-উপন্যাসের তারানাথের মধ্যে আমরা এক আদর্শ স্বামী ও পিতাকে খুঁজে পায়।
তবে দুই তারানাথের কিছু জায়গায় মিলে যায়। দুজনেই অন্যের জীবন বাঁচাতে নিজের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলতে দুবার ভাবেন না। তন্ত্রের দুর্গম অন্ধকার গলিগুলোতে দুজনেই চষে বেড়িয়েছেন। অশুভ শক্তি যতই ধূর্ত আর শক্তিশালী হোক না কেন দুই তারানাথই বুদ্ধিতে আর কৌশলে তাদের চেয়ে কয়েক ধাপ এগিয়ে থাকেন্, তাই প্রথমে কিছুটা সমস্যায় পড়লেও গল্পের শেষে শুভশক্তিরই জয় হয়।
তারানাথ তান্ত্রিকের সঙ্গে আমাদের প্রথম পরিচয় ঘটেছে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এর হাত ধরে। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এমন একটি চরিত্রের সৃষ্টি আমাদের দীর্ঘদিন ধরেই মুগ্ধ করে রেখেছে। সেই তারানাথ তান্ত্রিক চরিত্রকে ঘিরে এই বইতে রয়েছে একটি গ্রাফিক নভেল, অর্থাৎ ছবি এবং সংলাপের মাধ্যমে উপন্যাস গড়ে উঠেছে। আধুনিকীকরণ, বর্তমান এবং ফেলে আসা সমাজ, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের কথা মাথায় রেখে উপন্যাসটি রচনা করেছেন লেখক শমীক দাশগুপ্ত। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এর মূল গল্পের সঙ্গে তারানাথ তান্ত্রিকের চরিত্র বাদ দিলে এই উপন্যাসের কোনো মিল নেই। লেখক অত্যন্ত যত্ন সহকারে উপন্যাসটি আমাদের মতো অসংখ্য তারানাথ তান্ত্রিক চরিত্রের গুণমুগ্ধ ভক্তদের জন্য লিখেছেন, তাই এটিকে ফ্যান ফিকশনও বলা যেতেই পারে।
বইটির ভালো দিক ―
১) যারা এই চরিত্রের সঙ্গে পরিচিত, তারা এই বই পড়লে চমকে যেতে পারে, এতটাই আধুনিকীকরণ এবং বদল আনা হয়েছে। তাও কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমরা পুরোনো প্রেক্ষাপট ভুলতে পারি না, শেষ পর্যন্ত তারানাথ তান্ত্রিক মনে পড়ে যায় সেই পুরোনোভাবেই। লেখক সেই সামঞ্জস্য বজায় রেখেছেন। তার জন্য লেখককে কুর্নিশ।
২) বইটির অসাধারণ প্রচ্ছদ এবং গ্রাফিক্স পাঠকদের মুগ্ধ করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। কবে শেষ বর্তমান সময়ে পাবলিশ হওয়া এত সুন্দর গ্রাফিক নভেল পড়েছি, মনে পড়ে না। পাতার ক্যোয়ালিটিও বেশ ভালো।
৩) অল্প দু-একটা বানান ছাড়া খুব একটা ভুল বানান চোখে পড়েনি বললেই চলে। আজকাল কিছু পড়তে গেলে যেটা অন্যতম অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
৪) আধুনিকতার ছোঁয়া থাকা সত্ত্বেও বিভূতিভূষণ এর মতোই শমীক পাঠকদের কখনও এই উপলব্ধি মনে আসতেই দেননি যে, "যা পড়ছি, সেগুলো অবাস্তব।" বারবার মনে হয়েছে, আমাদের চোখের আড়ালেই ঘরের দেওয়ালের ওপারেই সমান্তরাল একটা জগতের অস্তিত্ব আছে, যেটা মানসচক্ষে দেখা সম্ভব নয়। এই দিক থেকে উপন্যাসটি পুরোপুরি সফল।
বইটির খারাপ দিক -
এত ভালো বইয়ের খারাপ দিক কিছু থাকতেই পারে না। তবুও একটা দিক আমার কাছে কষ্টদায়ক মনে হয়েছে, সেটা হল, বইয়ের বাঁধাই অত্যন্ত নিম্নমানের। পাতার ক্যোয়ালিটি যথেষ্ট ভালো হওয়া সত্ত্বেও বাঁধাই শক্তপোক্ত না হওয়ার জন্য একবার পড়তে গেলেই পুরো বইয়ের সব কটা পাতাই খুলে হাতে চলে আসছে। এত ভালো বই হারাতে চাই না। আশা করব, পরের মুদ্রণ বেরোলে এটি উন্নত হবে।
ততদিন শুভেচ্ছা রইল লেখক এবং প্রকাশনা সংস্থা Speechbubble team এর জন্য।
“আঁধার নগরী”-র গল্প আসলে আঁধার নগরী নিয়েই। কলকাতা কীভাবে ‘আঁধার নগরী’ হয়ে গেল বলা যাবে না। কারণ এই ব্যাপারগুলো ছবিরূপে দেখতে গেলে বেশ একটা আনন্দ পাওয়া যায়। গল্পের শুরুটা বলা যায়,যেখানে TNT–র ঘরে বসে তাঁর তান্ত্রিক হবার গপ্পে (কিংবা গুলে) মশগুল দুই বন্ধু শঙ্কর রায়চৌধুরী (পেশায় পুলিশ) ও বিভূতি ব্যানার্জী (নামটা খেয়াল করেছেন?)। দেখা হবে শঙ্করের প্রেমিকা সাংবাদিক স্নেহা বসুর সাথে। এরপরেই ঘটবে সেই অঘটন যার কারণে কলকাতা হবে আঁধার নগরী। গল্পটা বেশ লেগেছে। ক্ষুদ্র পরিসরেই গল্প অনেক জায়গায় ছুটেছে, বাহাত্তরের নকশাল এসে জুড়েছে। ছোট গল্পের মধ্যে সুন্দর টুইস্ট-ও আছে। হরর গল্পের এমন গোছানো ব্যাপারটা বেশ লেগেছে।
গ্রাফিক নভেলের অন্যতম শর্ত কথা কম, গ্রাফিক দিয়ে গল্প তুলে ধরা। এটা এই গ্রাফিক নভেল সুন্দর সামলেছে। বিশেষ করে এ্যাকশন দৃশ্যগুলো পড়তে বেশ মজা লেগেছে। পুরো গল্পের যেই একটা ডার্ক থিম সেটা আলোআঁধারির খেলায় চমৎকার ফুটেছে গ্রাফিক্সে। অভিযোগ করার একমাত্র জ��য়গা সম্ভবত ফন্ট সাইজ লেখার, এত ছোট যে পড়তে একটু অসুবিধাই হয়।
গল্পের চরিত্রদের পেছনের গল্প আছে বইয়ের শেষে। চরিত্রগুলোর পেছনের অনুপ্রেরনার সাথে চরিত্রগুলোর কাজকর্ম মিলিয়ে মজা পেয়েছি।