কোমল, জন্মের পর তার পিতা ছলছল চোখে ডেকেছিল ‘কুমু,’ এরপর থেকে সকলের কাছেই সে কুমু। নীলসাগরি নদীর তীরে সাজানো ছোট্ট পৃথিবী ছেড়ে কিভাবে মেয়েটি পদার্পণ করল ভিন্ন এক জগতে, এটি তারই গল্প। জীবন পথের অলি-গলিতে কতরঙের মানুষের যে বসবাস, সে কি কুমু জানত? এই মানুষগুলোই পাল্টে দিতে থাকে তার জীবনের গতিপথ। হাজারও বিষাদের ভিড়ে বেঁচে থাকার একটি কারণ খুঁজে নেয়ার গল্প এটি। আরও আছে ঘৃণা, মায়া, প্রেম আর সখ্যতা। পেয়ে হারানোর ব্যথা, না পাওয়ার যাতনা নিয়ে কাটিয়ে দেয়া অগনিত রজনীর দীর্ঘশ্বাসের ছোঁয়া।
জীবনের তাগিদে সকল পিছুটান বিসর্জন দিয়ে, রোজকার দৌড়ে চলার মাঝে যে কষ্টজলে বারবার হোঁচট খেয়ে জর্জরিত কুমু--তারই নাম শঙ্খরঙা জল।
Tania Sultana (Bengali: তানিয়া সুলতানা) is a fiction writer. At 1999, she went to Rome, Italy with her family and started living there. She had gratuated in Tourism from the university of Cristoforo Colombo. She is also passionate about painting and writing poetry.
"মানুষ শব্দে অভ্যস্ত, নীরবতায় নয়। অথচ নৈঃশব্দেও কত কথা থাকে, তা যদি লোকে উপলব্ধি করত!" - দাগ কেটে গিয়েছে লাইনটা। আসলে শুধু এই লাইনটাই নয়, পুরো বইটাই দাগ কেটে গিয়েছে মনে । শহর ও গ্রামের মাঝামাঝি এক ছোট্ট ক্যানভাসে সীমিত চরিত্রের মধ্য দিয়ে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে কোমলের জীবনের গল্প। কুমু বলে ডাকে সবাই তাকে। মুগ্ধ হয়েছি প্রকৃতির অনায়াস অসাধারণ বর্ণনায়, মুগ্ধ হয়েছি জীবনবোধকে এরকম কলমের আচড়ে সুন্দরভাবে বইয়ের পাতায় পাতায় ফুটিয়ে তোলার প্রয়াসে। সব গুলো চরিত্র তার প্রয়োজনীয়তা অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করে গিয়েছে। সাবলীলতার দরুণ পড়তে সময়ও লাগেনি বেশি। সামনে আশা করি এরকম আরো বই পাবো :)
- প্রায় শ-খানেক পৃষ্টা পড়ার পর তানিয়া সুলতানা'র দ্বিতীয় মৌলিক উপন্যাস ' শঙ্খরঙা জল' নিয়ে এই ছিলো আমার অনুভূতি। এমনিতে নতুন লেখক/লেখিকার ব্যাপারে আমার বেশ অনীহা থাকে। তার উপর এটি আবার ছিলো কথা সাহিত্য। গ্রাম-বাংলার সামাজিক পটভূমিকায় রচিত কাহিনী। আমার মতো থ্রিলার প্রেমী পাঠকের জন্য একেবারে Out of the Domain এর ব্যাপার-স্যাপার। তারপরও আমি বলবো, লেখিকা বেশ সফল ভাবে উপন্যাসটি সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছেন।
- বলছিলাম বইটি পড়তে পড়তে দৃশ্যকাব্যের অতলে হারিয়ে যাওয়ার কথা। এ উপন্যাসটি মূলত অনেক অনেক দৃশ্যকাব্যের মিশেল। দৃশ্যকাব্য বলে সাহিত্যের কোন ধারা থাকলে উপন্যাসটিকে আমি সেই ধারায় ফেলবো। প্রকৃতির এতো চমৎকার বর্ণনা পড়ে মনে হয় যেন কোন শিল্পীর রংতুলির আঁচড়ে আঁকা ছবি চোখের সামনে ভেসে বেড়াচ্ছে। লেখিকার লেখনী যেন বইয়ের পাতাগুলোকে করে তুলেছে ছবি আঁকার এক বিশাল ক্যানভাস।
- কাহিনীর শুরু হয় ছোট্ট মফস্বল শহর কন্কনাগরে। উপন্যাসের বিভিন্ন কুশীলবের পরিচিতি দিতে দিতে লেখিকা পাঠককে নিয়ে যান কাহিনীর গভীরে। গ্রাম-বাংলার পারিবারিক জীবন, বিভিন্ন চরিত্রের জীবনের চিরন্তন জটিলতা, আবেগ, অনুভূতি, সামাজিক অবস্হান নিয়েই মূল কাহিনীর সন্নিবেশ ঘটেছে। এ যেন শঙ্খরঙা জলে প্রতিবিম্বিত হয়েছে আমাদের চারপাশের জীবনের বাস্তব প্রতিচ্ছবি।
- সবচেয়ে যা ভালো লেগেছে তা হলো, বইয়ের পরতে পরতে জীবনবোধের গল্প, মানুষের সূক্ষ্ম আবেগের অদ্ভুত সব বর্ণনা। যা পড়ে উপলব্ধি করতে গেলে নিজেকে খুব দিশেহারা লাগে। পড়তে পড়তে থমকে যেতে হয়, ভাবতে হয়, হারিয়ে যেতে হয় আবেগের গহীনে।
- উপন্যাসের শুরুটা যদিও কন্কনাগরের সৈয়দ বাড়ী দিয়ে, কিন্তু গল্পের মূল চরিত্র ভিন্ন কেউ। পাঠক পড়তে পড়তেই তা বুঝতে পারবেন। আমার আগাম বলার কোন কারণ নেই। সৈয়দ পরিবার কন্কনাগরে বেশ প্রভাবশালী। গৃহকর্তা সৈয়দ জসিম ইন্তেকাল করেছেন বেশ কিছুদিন। কর্ত্রী রাবেয়া, পুত্র হারুন, কন্যা শিরিন, জামাতা জুবায়ের, গৃহপরিচারিকা হনুফা, এদের নিয়ে সৈয়দ বাড়ীর পারিবারিক বন্ধন গড়ে উঠেছে। সৈয়দ জসিমের ব্যবসায়িক কাজ-কর্ম তাঁর মৃত্যুর পর পুত্র হারুন ও জামাতা জুবায়েরই দেখাশোনা করছে। আর্থিক ভাবে সমৃদ্ধ পরিবারটিকে বাহ্যিকভাবে সুখী, জটিলতাহীন মনে হলেও আদতে তা নয়। গোলাপেও যেমন কাঁটা থাকে, মৌচাকের ভেতর মধুর পাশাপাশি যেমন থাকে মৌমাছির বিষাক্ত হুল, তেমনি এ পরিবারের ভেতরও রয়েছে না পাওয়ার বেদনা হিংসার বিষবাষ্প, কর্তৃত্ব বিস্তারের প্রতিযোগীতা। কি এক বোবা কান্না যেন গুমড়ে গুমড়ে খাচ্ছে পুরো পরিবারকেই।
- গল্পে আরো আছে কুমু। যার নাম কোমল থেকে হয়ে গিয়েছে কুমু। এই কুমু যেন দু:খ সাগরে ভেসে বেড়ানো এক উদভ্রান্ত ভেলা। এ যেন স্বয়ং প্রতিমা ব্যানার্জীর গানের সেই জলে ভাসা পদ্ম। কুমু আমাকে বার বার সেই গানের কথাই মনে করিয়ে দেয়-
“জলে ভাসা পদ্ম আমি শুধুই পেলাম ছলনা ও আমার সহেলী, আমার নাই তো কোথাও কোন ঠাঁই।”
- কুমুর বাবা ছিলেন মাঝি। নীলসাগরি নদীর তীরে বাপ-বেটির ছিলো এক আপন ভুবন। সেখানেই সুখে-দুখে চলে যাচ্ছিলো তাদের জীবন। কিন্তু নীলসাগরির যেন কুমুর জীবনের সেই শান্তি সইলো না। সে হিংসুক হয়ে উঠলো। নীলসাগরির উত্তাল ঢেউয়ে মৃত্যু ভর করে আসলো কুমুর বাবার জীবনে। কেড়ে নিলো আদরের বাপজানকে কুমুর কাছ থেকে। কুমুর জীবনে এরপর নেমে এলো এক আদি অমানিষা, যা তার দু:সম্পর্কের এক মামার মাধ্যমে কিছুটা লাঘব হলেও জলে ভাসা পদ্ম কি আর থেমে থাকতে জানে। এ তীর, ও তীর করে সে তো ভাসতেই থাকে জীবন নদীর জোয়ার-ভাটায়। কুমুও পদ্মের মতো ভাসতে থাকে এখান থেকে ওখানে।
- কুমু চরিত্রটি বেশ দাগ কাঁটে পাঠক মনে। লেখিকা প্রথমে কুমুকে বেশ স্নেহময়ী করে চিত্রিত করেছেন। যেন আস্ত এক মায়া-কানন। যার গভীরে খুঁড়লে স্নেহ ছাড়া আর কিছুই আবাদ হয়না। তবু মাঝামাঝি এসে কুমুর চরিত্রে দ্বিধা-দ্বন্ধ পাঠককেও কিছুটা হলে ধন্ধে ফেলবে। হঠাত করে পাঠক কুমুকে বেশ নিঠুর চরিত্রে দেখতে পাবেন। যা তার পূর্ববর্তী চিত্রের সাথে একেবারে বেমানান লাগে। তবে আমি মনে করি, কাহিনীর উত্থান-পতনে এর প্রয়োজন ছিলো বেশ। শেষে এসে চরিত্রটি পছন্দের তালিকায়ই যুক্ত হয়।
- হারুনকেও বেশ মানিয়ে যায় তার চরিত্রে। অব্যক্ত এক দু:খ ঘিরে থাকে হারুনকে। যা প্রকাশ করার ভাষা তার জানা নেই। লেখিকা যেমন বলেছেন- "মানুষ শব্দে অভ্যস্ত, নীরবতায় নয়। অথচ নৈঃশব্দেও কত কথা থাকে, তা যদি লোকে উপলবধি করত!" পুরোটা উপন্যাস জুড়ে হারুনও যেন নৈঃশব্দের মতো আমাদের বলে যায় অজস্র সব কথা। যা উপলব্ধি করতে গেলে ভাবতে হয় অনেক, চোখ বুজে প্রবেশ করতে হয় চিন্তার গহীনে।
- উপন্যাসে আরো আছে গলু। পুরো উপন্যাসে আমার প্রিয় চরিত্র বলা যায়। তার মাধ্যমেই যেন লেখিকা আমাদের গ্রাম-বাংলার সারল্যের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। তার কথা-বার্তা, কাজ-কর্ম সবকিছুই এতো সহজ-সরল মনে হয় এমন সব চরিত্র যদি আশে পাশে থাকতো তবে জীবন অনেক সুন্দর হতো। মানসিক ভাবে প্রতিবন্ধী গলুর সবচেয়ে উল্লেখ্য হচ্ছে বন্ধু হারুনের জন্য তার ভালবাসা। বৈশিষ্ঠের বিচারে যা তাকে নিয়ে যায় উচ্চ থেকে আরো উচ্চে।
- চরিত্র হিসেবে আরো আছেন হরুন-শিরিনের মা রাবেয়া। তিনি শিরিনের আপন মা হলেও হারুনের সতমা। কিন্তু লেখিকা যেন তাকে বাংলার মাতৃরূপই দান করেছেন। সতপুত্র হারুনের প্রতি তার মমতা বাংলার সতমাদের প্রতি আমাদের ভুল ধারণা ভেন্গে দেবে বিলকুল। আপন মেয়ে শিরিন কিংবা সতপুত্র হারুন কারো জন্যই তার মমতার কমতি দেখা যায়নি কখনো। রাবেয়া যেন নির্লোভ মাতৃত্বেরই প্রতীক। তাই তো সৈয়দ জসিম যখন সব সম্পত্তি পুত্র হারুনের নামে লিখে দিয়ে যান, তখন সতমা হয়েও তিনি ব্যাপারটা মেনে নেন পরম মমতায়।
- শিরিন ও তার স্বামী জুবায়েরকে খুব সাদামাটা লাগে। আমাদের দেশে এমন সব চরিত্র অহরহ দেখা যায়। তারপরও প্রেমিক ও স্বামীর মাঝে পার্থক্য গড়ে তোলার লক্ষ্যে লেখিকা জুবায়েরকে খুব সুন্দরভাবে চিত্রিত করেছেন। আমাদের দেশের প্রেমিক-প্রেমিকা যুগলদের জুবায়ের-শিরিনকে দ���য়ে অনেক কিছু শেখার আছে।
- যাই হোক, বইয়ের লেখিকা তানিয়া সুলতানা আরেকটি পরিচয় এখানে তুলে ধরা প্রয়োজন। তিনি অদ্ভুত সুন্দর সব ছবি আঁকেন। তাই তো প্রচ্ছদশিল্পী হিসেবেও স্বয়ং লেখিকার নাম দেখে আমি অবাক হইনা। প্রচ্ছদটি দেখলেই বই পড়ার আগ্রহটা বেড়ে যায় অনেক। আর এমন সুন্দর ছবি আঁকেন যিনি, তার দ্বারা বইয়ের পাতায় পাতায় অদ্ভুত সব দৃশ্য কল্পের চিত্রায়নও তাই আমার কাছে খুব অস্বাভাবিক লাগে না। একটি ধারণা জন্মায় শুধু। যারা চিত্র শিল্পী, লেখক হিসেবেও তারা খুব একটা খারাপ না। বরং লিখলে তাদের সফল হবারই সম্ভবনা বেশী।
- আরেকটি প্রসংগ না টানলেই নয়। উপন্যাসটিতে লেখিকা বেশ কয়েকটি স্বরচিত কবিতা যোগ করেছেন। যা বিভিন্ন চরিত্র বা তাদের মানসিক অবস্হা কিংবা উপন্যাসের সার্বিক অবস্হা বর্ননায় বেশ সহায়ক হয়েছে। আর কবিতাগুলোও বেশ হৃদয় ছোঁয়া। ছন্দময়, অনাবিল।
- অনেক বকর বকর করলাম। এবার শেষ কথা বলেই ফেলি। বই পড়ে মন খারাপ করার মতো অতি আবেগী মানুষ আমি না। খুব কম বই পড়েই মন খারাপ হয়েছে। তার মধ্যে অধিকাংশ বই-ই আবার হুমায়ূন আহমেদের। হুমায়ূন আহমদে খুব অল্প কথায় মানুষের আবেগের গভীরে পৌছে যেতে পারতেন। শন্খরান্গা জল আবেগের সেই গভীরতাটুকু ছুঁতে সক্ষম হয়েছে বলে মনে করি। আর কাহিনীর মাঝে মাঝে ছোট-খাটো কিছু ট্যুইষ্ট বইটিকে আরো ইন্টারেষ্টিং করেছে বলা যায়। লেখিকার উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি কামনা করছি। ভবিষ্যতে তার কাছ থেকে আরো সুন্দর সুন্দর বই হাতে পাওয়ার আশায় রইলাম। সবাইকে বইটি পড়ে দেখার আমন্ত্রন রইলো।
একটি পাঁচ তারকার দাবিদার বই, শেষ পর্যন্ত পাঁচ তারকা পেল না। কেন? কারণ গল্পটি অনেকটা জোর পূর্বক শেষ করে দেওয়া হয়েছে। কাহিনী ফুরানোর আগেই একরকম হার্ডব্রেক কষে থামিয়ে দেওয়া হয়েছে। ব্যাপারটা যথেষ্ট কষ্ট দিয়েছে বৈকি! আমি যখন উপন্যাস পড়তে বসি, তখন এই আশা নিয়ে বসি, যে একটি পূর্ণাঙ্গ গল্প পড়ার সুযোগ মিলবে। কারণ উপন্যাস আর ছোটগল্প এক নয়। সুতরাং, গল্পের শেষে পাঠকের আকাঙ্ক্ষা হতে হবে যথাসম্ভব সীমিত। শঙ্খরঙা জল গল্পের শেষে আকাঙ্ক্ষা থেকে গেছে অগাধ; সুতরাং, বেশ অস্থির লাগছে।
যাই হোক। কেবল আমার নির্দিষ্ট হতাশার জন্য গল্পকে ছোট করে দেখার কোনও মানে নেই। গল্প যথেষ্ট ভালই হয়েছে। গ্রাম এবং শহরের মাঝখানে ঝুলে থাকা একটি পরিবেশে প্রগতি পেয়েছে কাহিনী। যেখানে কুমুর মতো এক মেয়ের জীবন কাহিনী উঠে এসেছে বিভিন্ন সময় এবং প্রেক্ষাপটে। গল্পে চরিত্র সীমাহীন নয়, এবং সুন্দর রূপে চিত্রায়িত। গল্পে যাকে যেভাবে দেখাতে চেষ্টা করা হয়েছে, তাকে সেভাবেই দেখতে পেরেছি। ছোট বড় সব চরিত্রই প্রাঞ্জল। পালগি বুড়ি, গলু, পলাশী-র মতো চরিত্রগুলো বাড়তি মাত্রা যোগ করেছে। আছে হারুনের মতো স্বামী, জুবায়েরের মতো নরপশু। আবার, রাবেয়ার ভালমানুষী এবং লায়লার লোভী চরিত্র ভালই কনট্রাস্ট তৈরি করেছে। আছে হনুফা কিংবা শিরিনের মতো ভালবাসাপিপাসু মানুষেরা, যারা চাইলেও প্রেম তাদের ভাগ্যে সঠিকভাবে ধরা দেয় না। গল্পের মানুষগুলো কখনও মানবিক, আবার প্রয়োজনের তাগিদে নির্মম, তখন তাদের ঠিক চেনা যায় না। সত্যি, পৃথিবীটা এমনই। আমরা পরিস্থিতি এবং পরিবেশের তাগিদে বদলে যাই, প্রতিবাদী হই না, মুখ লুকিয়ে ঝামেলা এড়াতে চাই। যা করার প্রয়োজন তা না করে অপেক্ষাকৃত সহজ পথ বেছে নিই।
গল্পের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হচ্ছে প্রকৃতি পরিবেশের বর্ণনা। এক এক সময়ে হৃদয়স্পর্শী সব বিবরণের জন্য অনায়াসে পড়ে গেছি পাতার পর পাতা। এক ধরনের হাহাকার বিস্তৃতি পেয়েছে বাক্যের পরতে পরতে। এই হাহাকার সবাই সৃষ্টি করতে পারে না, সবাই প্রগতিও দিতে পারে না এতে। লেখিকা দারুন দক্ষতায় কাজটি করেছেন। তবে কবিতার ব্যবহার কমানো যেতে পারত। সব উপন্যাসে কবিতা ঠিক পরিপূরক হিসাবে কাজ করে না। প্রেক্ষাপটহীন কাব্য বাঞ্ছনীয় নয়। যে কারণে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'কবি' উপন্যাসে কবিতা খাপ খায়, সেই কারণটিই যদি অনুপস্থিত থাকে তবে কাব্যের কি প্রয়োজন? কে জানে!
বইতে বেশ কিছু বানানের ভুল-ভ্রান্তি লক্ষণীয়। বিষয়টাকে আমি মুদ্রনগত ত্রুটির অধীনেই ফেলছি।
লেখিকা সাহিত্য জগতে অপেক্ষাকৃত নবীনা। কিন্তু লেখনীর ধার তার বিরোধিতা করে। অত্যান্ত পরিপক্ক লেখনী, সুন্দর উপমা এবং কথকতার ইন্দ্রজাল সৃষ্টিতে তিনি পটীয়সী। প্রথম উপন্যাস 'ভাঙা জোছনা' যেমন মোহিত করেছিল, শঙ্খরঙা জল-ও তেমন করেছে। আশাকরি ভবিষ্যতে আরো ব্যতিক্রমী কিছু পাবো তার থেকে। পাবো গ্রাম বাংলার বাইরের কিছু লেখা, পাবো আধুনিক প্রেক্ষাপটে মানুষের জীবনগতির কিছু বাস্তব প্রাণবন্ত চিত্র। এবং তাতে অনির্দিষ্ট আকাঙ্ক্ষা জিইয়ে না রেখে বরং আর পরিপূর্ণ ইতি টানা হবে গল্পের। আমি নিশ্চিত তিনি পারবেন আশা পূরণ করতে।
লাল কষ্ট নীল কষ্ট কাঁচা হলুদ রঙের কষ্ট পাথর চাপা সবুজ ঘাসের সাদা কষ্ট, আলোর মাঝে কালোর কষ্ট ‘মালটি-কালার’ কষ্ট আছে কষ্ট নেবে কষ্ট ।
হেলাল হাফিজের ফেরিওলা দিয়ে শুরু করলাম কেন, তাইতো? লাল কষ্ট, নীল কষ্ট, কাঁচা হলুদ রঙের কষ্টের সাথে আজকে নতুন একটা কষ্ট যোগ হয়েছে। এই কষ্ট শঙ্খরঙা। হয়ত বলবেন, আবেগ অনুভূতির আবার রং হয় নাকি। উত্তর...হ্যা হয়। এই যেমন ক্রোধের রং লাল, চনমনে ভাবের রং সবুজ, বিষণ্ণতার রং ধূসর...ঠিক তেমন কষ্টগুলো শঙ্খরঙা। শঙ্খ স্নিগ্ধতার প্রতীক, বিষাদের রংটাও নাহয় নীল শঙ্খের মতো হোক। রুপকধর্মী নামটার আড়ালে গভির কিছু লুকিয়ে রেখেছেন লেখক...যা পড়ার পরেই শুধুমাত্র বোঝা যায়। শুধু হাহাকার কিংবা শুধু বিষাদ নয়...শঙ্খরঙা জল ছোট্ট ছোট্ট বিশুদ্ধ অনুভূতিরও গল্প। বইয়ের একটা লাইন ধরেই বলি,“ মানুষ শব্দে অভ্যস্ত ‘নীরবতায়’ নয়।অথচ নৈশব্দেও কত কথা থাকে, তা যদি লোকে উপলদ্ধি করত।” সকল অনুভূতি প্রকাশের জন্য শব্দের প্রয়োজন পড়ে না, নিস্তব্ধতা বাকিটুকু বলেই ফেলে...বিষাদ এখানে প্রকট, সুখানুভূতি প্রচ্ছন্ন। বিষাদের আড়ালে লুকিয়ে থাকা টিমটিমে সুখানুভূতিটাও কিন্তু শঙ্খরঙা জল। সাধারণত মূল চরিত্রকে লেখকরা একটু গ্ল্যামারাস কিংবা ভাবগম্ভির দেখাতে ভালোবাসে...কোমল কিংবা কুমু একেবারেই সাদামাটা যার কায়িক কিংবা মুখশ্রীর বর্ণনা হয়ত সেভাবে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে মনে থাকবে না বঙ্কিমের সেই কুন্দের ‘অনিন্দিতগৌরকান্তিস্নিগ্ধজ্যোতির্ময়রূপিণীর’ মতো কিন্তু অন্তঃস্থলে সে নিজের জায়গা করে নিয়েছে তার অনুভূতিগুলো গিয়ে। কুমু বিশেষ নিজস্ব আঙ্গিকে...তার ভাবগুলো বিশেষায়িত। একাকীত্বে নিজের সাথে কথা বলাই হোক কিংবা বিভিন্ন সম্পর্কের প্রতি তার আকুলতার মাধ্যমেই হোক...কুমু এক অজানা ভালোলাগা নিয়ে অন্তর্ধানপটে থেকে যাবে মেলাদিন। প্রকৃতির সাথে সাথে সুক্ষ্ম সুক্ষ্ম মানব অনুভূতিগুলোর বর্ণনা ভালো লেগেছে ভীষণ। কনক্রিটময় পরিপার্শ্বে প্রথম বৃষ্টির গন্ধ কিংবা সোঁদা মাটির গন্ধের মতো শঙ্খরঙা জলটাও এক অন্য ধরনের অনুভূতি এনে দিয়েছে...এখনও পুরোপুরি যান্ত্রিক হয়নি সবকিছু, অনুভূতিগুলো জাদুঘরে যায়নি। ভা���ো লেগেছে...ভীষণ ভীষণ ভালো লেগেছে...এই বিষয়টা স্মরণ করানোর জন্য। গল্প বলার কায়দা অত্যন্ত পছন্দ হয়েছে... মাঝে মাঝে মনে হচ্ছিলো কেউ গল্প শোনাচ্ছে...আমি পড়ছি না। গল্প কথকের সাথে কঙ্কনাগরের পথে হেঁটেছি আমিও কিংবা নীল-সাগরির তীরে। আরেকটা বিষয় খুব খুব ভালো লেগেছে...কুমুর গুনগুন করে আওড়ে যাওয়া শব্দরুপ অনুভূতিগুলো—
ওগো আমার একলা আকাশ চান্নিপসর গাড়ি একটু আলো দিয়া যাইও আইসা আমার বাড়ি...
বাড়ি তো নয় বাবুই বাসা খড়কুটোতে গড়ি শঙ্খরঙের নদী আছে নাম নীল-সাগরি।
ওগো আমার দুঃখ বাতাস ডুমুর পাতার কথা ভাসাই নিও তোমার লগে মনের যত ব্যাথা।
একবাক্যে সোজা কথা...শঙ্খরঙা জল আমাকে মুগ্ধ করেছে। <3 <3 <3
নামটাই বেশ বাতিক্রম। বইটি পড়ার খুব ইচ্ছে ছিল আমার। টানা দুইমাস অপেক্ষা করতে হয়েছে বইটি কেনার জন্য। সদূর ইউরোপ, ইতালির শহর রুমে বসে অসাধারণ একটি যথাযথ, সুনিপুণ গ্রামীন পটভূমি তৈরি করেছেন লেখিকা , ভাবতে বেশ অবাকই হতে হয়। । বর্তমান সময়ের গোয়েন্দা কিংবা অনুবাদ গল্পের ভীড়ে এমন গ্রামীণ ঘরানার স্বাদ পাওয়া ভুলেই গিয়েছিলাম। প্রতিটি চরিত্র অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ফুটে উঠেছে বইয়ের পাতায়। চরিত্রের মধ্যকার অনূভূতি গুলো বেশ জীবন্ত হয়ে ফুটে উঠেছেন লেখিকার কলমের কালিতে। গল্পের মধ্যকার ছোট ছোট ছড়া গুলো ও অসাধারণ হয়েছে। একটা তুমুল ঘোর তৈরী হয়েছে পুরো গল্প ঘিরে। আর গল্পের মধ্যকার ঘটনা গুলোর পরিণতি একদমই আন্দাজ করা যায় না।
যে জল বিন্দুতে শুরু ছিল তার বিন্দুতেই শেষ যে জলে কেউ সবটা হারালো সেই শঙ্খরঙা জল
কঙ্কনাগর গ্রামের সৈয়দ বাড়ির গল্প। প্রথম পক্ষের স্ত্রী পুত্র হারুনকে রেখে গত হওয়ার পরে সৈয়দ জসিম বিয়ে করে ঘরে আনেন রাবেয়াকে। সচরাচর যা হয়, সৎমা মানেই আগের পক্ষের সন্তানদের ছ্যা ছ্যা করা কিংবা পথের কাঁটা মনে করা। কিন্তু রাবেয়া যেন একেবারে তার উল্টো। হারুনকে নিজের ঔরসজাত শিরিন থেকেও বেশি ভালোবাসেন। আগলে রেখে মানুষ করেছেন। শিরিনের বিয়ে হলেও হারুনের বিয়ে হয়নি। হারুনকে একজন সুপাত্রীর হাতে দিলেই রাবেয়ার শান্তি। সৈয়দ বাড়ির মেয়ে শিরিন। প্রেম করে পালিয়ে বিয়ে করে তার প্রেমে ডুবে থাকা জুবায়েরকে। এরপর শেষে সৈয়দ বাড়িতেই স্বামীকে নিয়ে থিতু হয়। একটু মেজাজী মেয়ে সে। সারাক্ষণ এই- ওই নিয়ে গজগজ করেই চলেছে। জুবায়ের হারুনের সাথে আড়ৎ সামলায়। কিন্তু একজনের হাতের নিচে আর কত? বাড়ির সম্পত্তিতে ভাগ চাই। ভাগ দাবি করার জন্য তার ঘরে নেই একটা সন্তান। হারুনের দয়াতেই আর কতদিন? রাগ হয় বেশ, লোভ হয় আরো! নীলসাগরি নদীর তীরের ছোট্ট গ্রামে মঈন মাঝির ঘর আলো করে এসেছিল কোমল নামের মেয়েটি। মেয়েকে কোলে নিয়ে মঈন আদর করে কুমু নামে ডাকলেন। সেই থেকেই কুমু নামে বড়ো হতে থাকে কোমল। কুমুর অভাবের সংসার তবুও বাবার ভালোবাসায় দিন কাটিয়ে দিচ্ছিল। কিন্তু শঙ্খরঙা জলের এই মেয়েটির জীবনে সুখ সয় না বেশিদিন। যে ঝড় একদিন কেড়ে নিয়েছিল তার জন্মদাত্রীকে সেই ঝড়ের কাছেই হারিয়ে গেল পিতাও। অনিশ্চয়তার পথে শুরু হলো তার যাত্রা। গল্পটা তারও। বলে না, উপওয়ালাই সব মিলিয়ে দেয়। তেমনি সময়ের ফেরে সৈয়দ বাড়ির বড়ো বউ হিসেবে নিজেকে নতুন করে ফিরে পেলো কুমু। হারুনের জন্য সুপাত্রী হিসেবে কুমুকেই শেষমেষ পছন্দ হলো। পিতা-মাতা হারিয়ে মামার বাড়িতে আশ্রয় নেয়া কুমুকে মামীর জোরাজুরিতে সেই সৈয়দ বাড়িতেই বিয়ে দিতে হলো। লাভ হলো তাদের। কিন্তু কুমু কি তার বিয়ের রহস্য জানে? শ্বশুরবাড়িতে প্রথমবারের মতো কুমু দেখতে পেলো হারুনকে। কথা বললো সে নিজেই প্রথমে। কিন্তু হায়! মামা-মামী সত্য লুকিয়ে কার কাছে বিয়ে দিলো? হাহাকার লাগে কুমুর। কিন্তু সে হাহাকার দেখানোর বোঝানোর কেউ নেই। শাশুড়ি মানুষ হিসেবে অসাধারণ। ননদ শিরিন, কাজের লোক হনুফাও তাকে আপন করে নিয়েছে। স্বামী মানুষটাও ভালো। কিন্তু তাও কোথায় যেন নীরবতা, শুন্যতা। আহারে! গলু, আঠারো উনিশের যুবক। কিন্তু বুদ্ধিতে সেই ছোটোটিই রয়ে গেছে। তার সবথেকে প্রিয় বন্ধু হারুন। হারুনের বিয়ে হয়ে গেছে, তাই সে চিন্তিত। হারুন কি বউ নিয়েই থাকবে? তার সাথে আর ঘুরবে না? মেলায় যাবে না? অবহেলারও শেষ আছে। হারুনের মতো মানুষকে এড়িয়ে থাকা যায় না। ধীরে ধীরে কুমুর মনে ধরে যায় হারুনকে। কতশত স্মৃতি জমা হয়। ঘর আলো করে আসে পুত্র নোটন। আহ এত সুখ বুঝি বিধাতা লিখেছিল কুমুর কপালে! এত সুখ যে গা জ্বলে যায় জুবায়েরের। শিরিনকে অসহ্য লাগে। কুমু, হারুন অর নোটনের সুখের সংসার দেখতে পারে না সে। কেনই বা পারবে। তার ঘর আলো করে কেউ যে এলো না। সুখের স্থায়ীত্ব শঙ্খরঙা মেয়েটির কি সইবে? এই পৃথিবী যে বড়ো কঠিন জায়গা। এখানে টিকে থাকতে প্রতি মুহূর্তে পরীক্ষা দিতে হয়। ঝড়ের রাতগুলোয় কুমুর মনে শঙ্কা জাগে। একেকটা ঝড়ের রাত যেন একেকটা পরীক্ষা। ঝড়েই যে অতীতে সব হারিয়েছে। এই ঝড় আর কত কেড়ে নেবে তার থেকে? জুবায়েরের লোলুপ দৃষ্টি আর ষড়যন্ত্র থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে চলতে পারবে কয়দিন?
পাঠ প্রতিক্রিয়া: অনেকদিন পর স্নিগ্ধ, স্বচ্ছ, শুভ্রতায় মেশানো একটা বই পড়লাম। গত সপ্তাহে বাতিঘরে বই বদল করতে গিয়ে আচমকাই বইটার দিকে চোখ গেল। চশমা ছাড়া ঝাপসা লেখাটা বুঝতে পারছিলাম না। সামনে গিয়ে বইটা হাতে নিতেই খুব পছন্দ হয়ে গেল। ব্যস দাম শোধ করে নিয়ে নিলাম। বইটার প্রচ্ছদ দেখেই মূলত ঝটপট নিয়ে নেয়া আরকি। লেখিকার প্রথম কোনো বই পড়েছি। প্রথম অভিজ্ঞতা বলবো খুব ভালো। গ্রামের সাদামাটা মানুষের জীবনযাপন, তাদের নিত্য দিনের কর্ম, বাড়ির চার দেয়ালের মাঝে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনা নিয়েই লেখিকা মলাটবদ্ধ করেছেন বইটি। সৈয়দ বাড়ির মানুষগুলো যেন আর দশটা মানুষের মতোই বাস্তব। কারো মনে নিদারুণ ভালোবাসা, তো কারো মনে চাপা দুঃখ, কেউ ফুঁসছে রাগে কিংবা লোভে, কেউ বা মনের হাজারো অনুভূতি চোখের ভাষায় এঁকে বোঝাচ্ছে। কত ধরনের মানুষ আছে এখানে। উপন্যাসের মূল চরিত্র কে সেটা বুঝতে মোটামুটি কয়েক পাতা এগুতে হবে। প্রথমেই লেখিকার মনের ভাব ধরে ফেলা যায়নি। শব্দের খেলে প্রথমে গল্প বুনেছেন এরপর ধীরে ধীরে ডালপালা ছড়িয়েছেন। সবথেকে দারুণ লেগেছে উপন্যাসের প্রকৃতির বর্ণনা। এত কোমল, এত স্নিগ্ধতায় প্রকৃতিকে বর্ণনা করেছেন তাতে মুগ্ধ হয়েছি। বিশেষ করে ঝড়ো প্রকৃতির বর্ণনা আর তার সাথে মনের যে ভয়ের কথা লিখেছেন দারুণ লেগেছে। থ্রিলার ঘরনা না হলেও এই বইয়ের কিছু অংশ পড়ার সময় কী হয় কী হয় বা প্লিজ এমন যেন না হয়, না হয় ধরনের অনুভূতি হয়েছে। কিছু অংশ পড়ার সময় অদ্ভুত ভালোলাগা কাজ করেছে, কোথাও খুব বিষন্ন লেগেছে, কোথাও খুব রাগ লেগেছে। আর শেষটায়....?
আমার মনে হয়েছে শেষটায় লেখিকা বেশ তাড়াহুড়ো করে ফেলেছেন। 2X স্পিডে শেষ করে দিয়েছেন। চাইলে একটু গুছিয়ে, একটু সুন্দর করে ইতি টানতে পারতেন। হুট করেই শেষ হয়ে যাওয়াটা উপন্যাসের সৌন্দর্যকে কমিয়ে দিয়েছে। শুরুতে যেমন সময় নিয়ে এগিয়েছেন সেখানে একটু কম সময় দিয়ে সেটা শেষে দিলে মনে হয় আরেকটু ভালো হতো। উপন্যাসে বেশ কিছু কবিতা পরিস্থিতির সাথে মিলিয়ে রচনা করেছেন সেগুলো খুব ভালো লেগেছে।
চরিত্রায়ন: গলু চরিত্রটাকে আমার খুব পছন্দ হয়েছে। তার সরলতা, ভালোবাসা আবার পরিস্থিতির প্রয়োজনে একেবারে রক্ষাকর্তা হিসেবে আবির্ভাব দারুণ লেগেছে। কুমুকে মাঝে বিরক্ত আর পরিস্থিতির শিকার এ দুইয়ের মাঝামাঝি লাগছিল। জুবায়ের চরিত্রটা আমাদের আশেপাশের অনেক মুখোশধারী কিংবা স্বার্থপরেরই প্রতীক। হারুন, শিরিন, রাবেয়া এদেরকেও খুব ভালো লেগেছে। শিরিনের জন্য বেশ কষ্ট লেগেছে।
প্রচ্ছদ: শুরুতেই বলেছি বইয়ের চেহারা পছন্দ হয়েছে বলেই কিনেছি। প্রচ্ছদটা আমার খুব পছন্দ হয়েছে।
গল্প ভালো লেগেছে কিন্তু লেখার ধরনটা ভাল লাগেনি। বিশেষ করে প্রথম দিকে। পড়তে গিয���ে মনে হচ্ছিলো লেখিকা ইনফরমাল না ফরমাল ভাবে লিখবেন তা ঠিক রাখতে পারছিলেননা তাই এক অংশ থেকে আরেক অংশে যাবার ব্যাপারটা কেমন যেন এবড়ো থেবড়ো লেগেছে। কিন্তু ধীরে ধীরে সেটা ঠিক হয়ে এসেছে। হারুন চরিত্রটা মনে খুব দাগ কাটে। তাঁকে, তার অনুভূতিগুলোকে আরেকটু ফোকাস করলে হয়তো একটা অন্য মাত্রা পেত বইটি। খারাপ না, তবে অনেক বেশি ভাল হতে পারতো।
কাহিনী সংক্ষেপ - কোমল, জন্মের পর তার পিতা ছলছল চোখে ডেকেছিল ‘কুমু,’ এরপর থেকে সকলের কাছেই সে কুমু।
নীলসাগরি নদীর তীরে সাজানো ছোট্ট পৃথিবী ছেড়ে কিভাবে মেয়েটি পদার্পণ করল ভিন্ন এক জগতে, এটি তারই গল্প। জীবন পথের অলি-গলিতে কতরঙের মানুষের যে বসবাস, সে কি কুমু জানত? এই মানুষগুলোই পাল্টে দিতে থাকে তার জীবনের গতিপথ। হাজারও বিষাদের ভিড়ে বেঁচে থাকার একটি কারণ খুঁজে নেয়ার গল্প এটি। আরও আছে ঘৃণা, মায়া, প্রেম আর সখ্যতা। পেয়ে হারানোর ব্যথা, না পাওয়ার যাতনা নিয়ে কাটিয়ে দেয়া অগনিত রজনীর দীর্ঘশ্বাসের ছোঁয়া।
জীবনের তাগিদে সকল পিছুটান বিসর্জন দিয়ে, রোজকার দৌড়ে চলার মাঝে যে কষ্টজলে বারবার হোঁচট খেয়ে জর্জরিত কুমু--তারই নাম শঙ্খরঙা জল।
### "চোখের জলেরও তো ক্লান্তি থাকে, নাকি ?"
"ভাঙা জ্যোৎস্না" খ্যাত তানিয়া সুলতানার দ্বিতীয় উপন্যাস শঙ্খরঙা জল। সম্পূর্ণ জীবনধর্মী এই বইটায় ফুটে উঠেছে অনেকগুলো গল্প , অনেকগুলো মানুষের গল্প।
কংকানগরের সৈয়দ বাড়ি, জসীম সাহেব, রাবেয়া, শিরিন ,জুবায়ের, হারুন, গলু, মনিরা, হনুফা, ঘটক কেন্দুমিয়া , পাগলী আশুবিবি, নীলসাগরী গ্রামের কোমল, জন্মলগ্নে মরে যাওয়া মা, একমাত্র আশ্রয়; বাবা মইন মাঝি , নোটন , লায়লা সহ আরো কতো চরিত্রের গল্প বলে গেলো এই শঙ্খরঙা জল !!!
এতোগুলো চরিত্র থাকার পরের আমাদের গল্প এগিয়ে গিয়েছে কোমল ওরফে কুমু কে কেন্দ্র করে। কুমুর অসহায়ত্তের গল্প, পাবার গল্প, হারিয়ে ফেলার গল্প , যাযাবরের মতো ছুটে চলার গল্প । শক্ত একটা বুকে মাথা রেখে পরম নির্ভরতায় ভালবাসা খুঁজে পাবার গল্প এই শঙ্খরঙা জল !!!
আমাদের সবার জীবনেই কিছু অপ্রাপ্তি থেকে যায় , হাসিমুখের আড়ালে হুট করেই লুকিয়ে ফেলতে হয় সেইসব না পাওয়া গুলো অথবা হারিয়ে ফেলার গল্প গুলো । শঙ্খরঙা জলের চরিত্র গুলোও ঠিক তেমনই। সবার ভেতরেই একটা অব্যাক্ত যন্ত্রনা, না পাওয়ার গল্প , চোখ জ্বালা করা বিষাদ, তবুও জীবনের তাগিদে ছুটে চলা, মিথ্যে হাসিতে লুকিয়ে ফেলা চোখের নিচের কালি !!!
শঙ্খরঙা জল এর প্রতিটা লাইন ই যেনো পরম মমতা দিয়ে লেখা, বিশেষ করে প্রকৃতির ছোট ছোট দৃশ্যের বর্ণনাগুলো !!! পড়তে গিয়ে হোঁচট খাবেন না কখনোই। বরং মনে হবে, আরে এ তো আমাদের চেনা গ্রাম , চেনা দৃশ্য , যেগুলো কখনোই খুব একটা খেয়াল করে লক্ষ্য করা হয়নি । অধ্যায়ের ফাঁকে ফাঁকে লেখিকার কবিতা গুলোও ছুঁয়ে গিয়েছে খুব করে !!! অদ্ভুত, মায়াময় !!!
কিছু কিছু অধ্যায়ের শেষের লাইনগুলো তো একেবারে ভেতর থেকে দীর্ঘশ্বাস টেনে বের করে নিয়ে আসে !!! শঙ্খরঙা জল আসলে খুব মন খারাপ করা ভালো একটা বই !!!
শঙ্খরঙা জল , কিছু মানুষের আজন্ম না পাবার গল্প নিদারুণ অসহায়ত্তের গল্প , বন্ধুত্তের গল্প , আশ্রয় খুঁজে পাবার গল্প , হারানোর গল্প , পাশবিকতার গল্প , মনুষ্যত্ব'র গল্প !!! শঙ্খরঙা জল , আসলে গল্প হয়েও জীবন্ত হয়ে ওঠার গল্প !!!
# বাতিঘর পরিবারে লেখিকাকে স্বাগতম !!! সেই সাথে তিনি বিশেষ ধন্যবাদ প্রাপ্য, এতো মায়াময়, শীতল একটা প্রছদ এর জন্য । লেখিকার প্রথম দুটো বইই গ্রামীণ পটভুমিতে রচিত, পাঠক হিসেবে তাঁর কাছে আবদার থাকবে পরের কোন উপন্যাস এর পটভুমি যাতে একদম শহুরে হয়। তাঁর লেখা অক্ষর গুলোতে যাতে ফুটে উঠে শহুরে, যান্ত্রিক জীবনের হাসি-কান্না গুলো। ধন্যবাদ আবার ও , একটা ভালো বইয়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দেবার জন্য !!! অপেক্ষায় থাকলাম পরবর্তী উপন্যাস এর !!!
‘শঙ্খরঙা জল’ উপন্যাসটি তরুণ লেখিকা ‘তানিয়া সুলতানা’ রচিত একটি জীবনধর্মী উপন্যাস। যেখানে লেখিকা খুব সুস্পষ্ট বর্ণনায় কুমু (কোমল) নামের এজটি মেয়ের জীবন প্রবাহ তুলে ধরেছেন।
কঙ্কানগর একটি মফস্বল শহর। শহরের আর দশটা বাড়ির মতো সৈয়দ বাড়িও একটা। সৈয়দ বাড়ির সত্ত্বাধিকারী ছিলেন সৈয়দ জসীম। তার স্ত্রী রাবেয়া এবং এক ছেলে হারুন এবং এক মেয়ে শিরিন। সুখেরই সংসার বলা চলে।
মৃত্যুর আগে সৈয়দ জসীম তার বিষয়সম্পত্তি সব কিছু ছেলে হারুনের নামে করে দিয়ে যান। রাবেয়া যদিও হারুনের সৎ মা তারপরও তিনি এবিষয় নিয়ে কিছু বলেননি। কারণ তিনি হারুনকে নিজের ছেলের মতোই বা নিজে গর্ভের ছেলের থেকে বেশি ভালোবাসেন।
হারুনের বোন শিরিন, যে রাবেয়ার নিজ সন্তান, সে তার স্বামী জুবায়েরকে নিয়ে থাকে সৈয়দ বাড়িতেই। তারা তারা পালিয়ে বিয়ে করেছে। অনেক কিছুর পর সৈয়দ জসীম তা মেনে নেয়।
যথারীতি হারুন এর বিয়ের সময় উপস্থিত। তার মা রাবেয়া তার জন্য পাত্রীর খোঁজে গেদু ঘটককে দায়িত্ব দেয়। গেদু ঘটক পাত্রীর খোঁজে নেমে পড়ে।
কুমু এক অজপাড়াগাঁ এর এক গরিব মাঝীর মেয়ে। কুমুর জন্ম হয় এক ঝড়ের রাতে। জন্মের সময়ই তাঁর মা মারা যায়। বাবা মঈন মাঝী বেশ আদরে বড় করতে থাকে মেয়েকে।
মেয়ের ভবিষ্যতের কতা চিন্তা করে মঈন মাঝী নিজের অসুখ-বিসুখের কথা না ভেবে দিনরাত কসরত করে যায়। কুমুর মানাও সে শোনে না। এমনি করে একদিন নদীতে যায় মঈন মাঝী। হঠাৎ করে ঝড় ওঠে। এই ঝড়কে বড় ভয় কুমুর। অবশেষে তার ভয়ই সত্যি হলো। বাবা আর ফেরেনি সে ঝড়ের রাতের পর।
বাবাকে হারিয়ে কুমু যখন নিঃস্ব, এদিকে কুমুর মায়ের চিকিৎসার জন্য মহাজনের কাছ থেকে টাকা এনেছিলো তাঁর বাবা, বাড়িটি বন্দক রেখে। বাবার মৃত্যুর পর মহাজন ঘোষণা করে বাড়ি সে দখল করবে। কেউ ছিলোনা কুমুর পক্ষ হয়ে মহাজনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে দুটো কথা বল।
বাবার মুখে কুমু শুনেছিলো তারা এক মামা আছে শহরে থাকে। যিনি মাঝে মাঝে চিঠি ���িয়ে তাদের খোঁজ খবর নেয়। শেষে উপায়ন্তর না পেয়ে কুমু বাবার টাংক থেকে পুরোনো সে চিঠিগুলো নেয় এবং সে ঠিকানা অনুযায়ী চিঠি লিখে তাঁর বর্তমান পরিস্থিতি বর্ণনা করে।
তাঁর চিঠি পেয়ে তাঁর মামা শরিফ সাহেব আসেন এবং কুমুকে নিয়ে আসেন তাঁর বাড়িতে। মামার বাড়িতে থেকে যায় কুমু। মামী তাঁর সাথে কাজের মেয়ের মতো ব্যাবহার করলেই মুখ বুঝে সব সহে নেয় কুমু।
মামা শরিফ সাহেব একসময় কুমুর বিয়ের কথা ভাবেন। এবং নানান ঘটনাক্রমে গেদু ঘটকের মাধ্যমে হারুনের সাথে বিয়ে ঠিক হয়।
একদিন কুমু শুনতে পায় তাঁর মামা-মামী তার বিয়ে নিয়ে কথা বলছে। একসময় সে শোনে যে, আমাদের দেশের প্রথা অনুযায়ী কন্যার পরিবার বরের পরিবারকে টাকা পয়সা প্রদান করে। কিন্তু তাঁর বেলায় উল্টো। তখন সে আঁচ করে যে, এ বিয়ের মধ্যে কোনো রহস্য আছে। কুমু ভাবে হয়তো পাত্র বুড়ো কারণ গ্রামে গঞ্জে তো টাকার বিনিময়ে বুড়োর সাথে ষোড়শী কন্যার বিয়ে তো অহরহ হচ্ছে। কিন্তু আসলে রহস্যটা কী এবং কুমুর শেষ পরিনতি কী হয়েছিল তা জানতে পড়ে ফেলুন ‘তানিয়া সুলতানা’ রচিত জীবনধর্মী ‘শঙ্খরঙা জল’ উপন্যাসটি।
অসাধারণ একটা উপন্যাস শঙ্খরঙা জল। এ উপন্যাসে অঙ্কিত গল্পটি মানুষের জীবনের অতি চেনা একটি গল্প। গল্পের কুমুর মতো আমাদের দেশে প্রায় মেয়েদের হতে হয় এমনি নানান অপ্রীতিকর ঘটনার। যার করালগ্রাস থেকে কেউ হয়তো রক্ষা পায় কেউবা পায় না।
খুব সম্ভবত ২০১৮ সালে কিনেছিলাম বইটা। এতদিন বইটা না পড়ায় এখন মনে হচ্ছে বইটার উপর কিছুটা অবিচার হয়েছে। এমন দারুণ একটা বই বুকশেলফে ফেলে রাখা সত্যিই খুব অন্যায়। পড়া শেষে এই অনুভূতিই হচ্ছে।
'শঙ্খরঙা জল' খুব আহামরি কোন গল্প নয়, তবে অদ্ভূত এক মায়ায় জড়ানো গল্প। এ গল্প বন্ধুত্বের, এ গল্প ভালোবাসার, অসহায়ত্বের গল্প, মানুষের ভেতর লুকিয়ে থাকা পশুত্বের গল্প, একটা সুন্দর সংসারের গল্প, পাবার গল্প, আবার পেয়েও হারানোর গল্প। জীবনধর্মী অনেকগুলো গল্পের সন্নিবেশ হয়ে উঠেছে 'শঙ্খরঙা জল'। যদিও কিছু অংশ আমার কাছে সিনেমাটিক মনে হয়েছে, তবে গল্পের আবেগীয় আবেদনে তা খুব বড় ভুল হয়ে পাঠকের চোখে ধরা দিবে না আশা করি।
গল্পের কেন্দ্রিয় চরিত্র কুমু। ভালো নাম কোমল, জন্মের পর ছলছল চোখে বাবা কুমু নামে ডেকেছিল। সেই থেকে এই নামেই বেড়ে উঠেছে। জন্মের পর হারিয়েছে মা'কে। এরপর নীলসাগরি নদীর তীরে মাঝি বাবার সাথে স্বপ্ন বুনতে বুনতে সুখেই দিন যাচ্ছিল তাঁদের। কিন্তু এক ঝড়ের রাতে বাবাকে হারিয়ে জীবন সংসারে একা হয়ে পড়ে কুমু। আশ্রয় পায় দূর সম্পর্কের এক মামার বাড়িতে।
লেখিকা শুরু থেকেই এই কুমু চরিত্রটিকে এত মায়া দিয়ে সৃষ্টি করেছেন, পাঠকের মনের এক কোণেও তাঁর জন্য একটা স্নেহের জায়গা তৈরি হতে বাধ্য। মেয়েটার দুঃখে পাঠকও দুঃখবোধ করবে। মেয়েটার আনন্দে পাঠকের ঠোঁটের কোণেও হাসির রেখা ফুটে উঠবে।
কুমুর গল্পের সমান্তরালে আরো একটা পরিবারের গল্প বলে গেছেন লেখিকা। কঙ্কনাগরের একটা ছোট্ট, সম্ভ্রান্ত, মধ্যবিত্ত পরিবারের গল্প। সৈয়দ পরিবারের কর্তা সৈয়দ জসিমের মৃত্যুর পর গৃহকর্ত্রী রাবেয়া, পুত্র হারুন, কন্যা শিরিন, জামাতা জুবায়ের, গৃহপরিচারিকা হনুফা কে নিয়েই এই পরিবার। কর্তার মৃত্যুর পর পুত্র আর জামাতা মিলে পারিবারিক ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। বাহ্যিকভাবে গুছানো, পরিপাটি, সুন্দর একটি পরিবারের প্রতিচ্ছবি দেখালেও লোভ, হিংসা আর কর্তৃত্ব বিস্তারের কালো ছায়াও রয়েছে এখানে। একই সাথে রয়েছে মা রাবেয়ার মাতৃত্বসুলভ দায়িত্ব ও আচরণের সুন্দর সব প্রতিচ্ছবি। হারুণের সৎ মা হয়েও রাবেয়ার নির্লোভ যে চিত্র আমরা দেখতে পাই, তা মায়েদের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধাবোধ যেন অনেকগুন বাড়িয়ে দেয়। রাবেয়া এক সময় হয়ে উঠে সমস্ত মায়ের প্রতিনিধি।
একসময় এই পরিবারেই হারুনের বউ হয়ে ঘরে আসে কুমু। জলে ভাসা পদ্মের মত ভাসতে ভাসতে যার জীবন, সে খুঁজে পায় শান্তির নীড়। কোনদিন মায়ের আদর না পেলেও এখানে এসে তাও পূরণ হয়। তারপরও একটা হতাশা থাকে, থাকে অপ্রাপ্তি। যদিও এক পর্যায়ে সবকিছু মানিয়ে একটা সুন্দর সংসার রচিতই হচ্ছিল তার জীবনে।
কিন্তু আপনি যখন সুন্দর স্বপ্ন বুনন করছেন, তখন অদৃষ্টের কেউ হয়তো মানুষের স্বপ্ন বাস্তবতা নিয়ে হাসছে। কারণ দিনশেষে মানুষের স্বপ্ন পূরণের ক্ষমতা তার নিজ থাকে না, থাকে ঐ অদৃষ্টে। কুমুর স্বপ্নময় জীবনেও ঘটে ছন্দপতন।
সেই ছন্দপতন, মানব জীবনের চিরন্তন জটিলতা, আবেগ, গ্রাম ও শহরের আবহ, প্রকৃতির বর্ণনা, সংগ্রামী জীবন মিলিয়ে 'শঙ্খরঙা জল' যেন হয়ে উঠেছে আমাদের জীবনের প্রতিচ্ছবি।
পড়তে পারেন তানিয়া সুলতানা'র 'শঙ্খরঙা জল'। আমন্ত্রন রইলো। ওহ, অারেকটা কথা ভুলে গিয়েছিলাম, বইয়ের যে সুন্দর প্রচ্ছদটা দেখছেন, সেটাও লেখিকার আঁকা।
প্রতিক্ষার ক্ষত-বিক্ষত ফোঁটা যে জলে মিশে একাকার যার ভেজা গন্ধে জনম জনমের হাহাকার যে জল বিন্দুতে শুরু ছিল তাঁর বিন্দুতেই শেষ যে জলে সবটা হারালো সেই শঙ্খরঙা জল।।
This entire review has been hidden because of spoilers.
বই পড়ার সময় বারবার মনে একটা প্রশ্নই উচ্চারিত হচ্ছিল। 'শঙ্খরঙা জল' এর অর্থ কী? বইয়ে বেশ কয়বারই এই শব্দ দুটো এসেছে - তারপরও অর্থ পাইনি। পেয়েছি একদম ১৭১ পৃষ্ঠায় গিয়ে। মানে বইয়ের শেষে। এর অর্থ জীবনকে বারবার হোঁচট খাওয়ানো দুর্দশার জল।
মূল গল্পের ক্ষেত্রে আসি। গল্পটায় অনেকগুলো চরিত্র ছিল। প্রায় বিশ-বাইশটা। সবগুলোই গুরুত্বপূর্ণ না হলেও, গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রের সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়। প্রায় দশ-বারোটির মত। সবারই গল্পে অবদান ভালভাবেই ফুঁটে উঠেছে। সবধরণের চরিত্রের বহিঃপ্রকাশই ছিল। কোমল-নরম-শান্ত আবার সাথে সাথে দুঃশ্চরিত্র-লোভীও ছিল।
কোন ক্যারেক্টার নিয়ে আলাদা করে কিছু বলব না। স্পয়লার দেওয়ার ইচ্ছা নেই। অবশ্য দিলেও তাতে খুব একটা লাভ নেই। গল্পে লেগে থাকা মায়া তো আমি আর আনতে পারবো না।
গল্পের লেখনীর পুরোটাই জড়িয়ে ছিল একধরণের মায়ার আবেশে। অদ্ভুত এক মায়া। পড়তে গিয়ে গল্পের প্রতিটা সুখ-দুঃখ-কান্না-হাসি-ভালবাসা-ঘৃণা সবই অনুভব করতে পেরেছি। পড়ার সময় আমার মুখের এক্সপ্রেশন রেকর্ড করে রাখলে বুঝা যেত। পড়তে গিয়ে প্রতিটা মুহুর্তেই মুখে মুচকি হাসি ফুটে উঠেছে, আবার কিছু সময় পর তা কুঞ্চিত হয়ে যায়, মাঝে মাঝে চোখে ঝাপসা, আবার কিছু সময় পর তা জ্বলে উঠে রাগে। আসলে পুরোপুরি ডুবে গিয়েছিলাম গল্পের ভিতর।
লেখিকার লেখনীর ধার��� অন্যরকম। প্রথম দিকে খাপ খাওয়াতে সমস্যা হচ্ছিল। মনোযোগ পাচ্ছিলাম না। একবার উঠেও যেতে নিয়েছিলাম। তখনই আটকে গেলাম লেখার মায়ায়। উঠেছি ঠিকই পরে। তবে তা বই শেষ করার পর।
পড়েছি বললে ভুল হবে - সত্যিকার অর্থে আমার মনে হয়েছে আমি গল্পটা দৃশ্যায়ন দেখেছি। কোন কাঁচের গ্লাসের বেড়ার ভিতর মানুষগুলো তাদের জীবনযাপন করছিল - আর আমি বাইরে দাঁড়িয়ে তা অবলোকন করে গেছি। নিখুঁত বর্ণনা, পরিবেশ ফুটিয়ে তোলা - এই দক্ষতাগুলোর জন্যই এমনটা সম্ভব হয়েছে।
যাই হোক, প্রশংসার পর কিছুটা নেতিবাচক দিক তুলে ধরি। আমার কাছে লেগেছে শেষের দিকে গল্পটাকে হুট করে থামিয়ে দেওয়া হয়েছে। আরো কিছুটা যাওয়া যেত। আরো কিছুটা বর্ণনা করা যেত। প্রথমদিকে যতটা নিখুঁত ভাব ছিল, শেষ দিকে ততটা ছিল না। তবে এতে যে খুব অসুবিধা হয়েছে তা না - গল্প পরিপূর্ণই আছে। তারপরও ঐ অংশটুকু আরো ভাল করা যেত।
বানান বিভ্রাট জাতীয় সমস্যা আছে বেশ। অবশ্য তাতে লেখিকার দোষ নেই - এটা প্রুফিং-এর সমস্যা। যুক্তবর্ণগুলো কিছু জায়গায় সরে গেছে, ক এর নিচের উ-কার দূরে সরে গেছে, 'য়' গুলো কিছু কিছু ক্ষেত্রে 'ও'। আর, আমার কাছে লেগেছে কিছু কিছু ক্ষেত্রে কয়েকটা শব্দ বাদ পড়ে গেছে। অবশ্য গল্পের সাথে সেঁটে গেলে সেটা অবশ্য এতটা প্রভাব ফেলে না।
আবার প্রশংসায় ফিরে যাই। ছড়া গুলো ভাল ছিল। শেষের পঙ্কতিমালাটাও। তবে, সবচেয়ে বেশি ভাল ছিল 'নাম নীলসাগরি' গীতটা। (গীতই তো।) আসলে মুগ্ধতা লাগার শুরু এই গীত থেকেই। সুর করেও পড়া লাগে না - এমনিই সুর এসে যায়।
গল্পের অলংকার বৃদ্ধি করেছে বেশ কিছু উক্তি। আমার চোখে যে কয়েকটা পড়েছিল - তা তুলে ধরলাম। -- মানুষের জীবন এত বিচিত্র কেন। কিছু মানুষ কী প্রগাঢ় মমতা নিয়ে অপেক্ষা করে। যার জন্য করে তার কাছে এই অপেক্ষার কোন মূল্য নেই। এ যেন অবান্তর, অনর্থক অপেক্ষা। -- মানুষ 'শব্দে' অভ্যস্ত, 'নীরবতায়' নয়। অথচ নৈশব্দেও কত কথা থাকে, তা যদি লোকে উপলব্ধি করত! -- মানুষের ভীড়ে ঘাপটি মেরে থাকে কিছু অমানুষ। বিবেকহীন এসব অমানুষের কাতারে যেমন নারী আছে, আছে পুরুষ। অবশ্য অমানুষের কোন জাত নেই। অমানুষ শুধুই অমানুষ। -- একসময় প্রাকৃতিক নিয়মে মনে আঁধার কম হতে থাকে। চোখের জল পরিণত হয় দীর্ঘশ্বাসে। জীবন পথে এগোবার তাগাদায় জোরে শ্বাস টেনে এক প্রহরে নিজের মনকে বুঝ দেয় মানুষ, 'বাঁচতে হবে।' -- কত রহস্যময় মানুষের জীবন, অনুভূতির এই রাজ্য। কেউ না চেয়েও কারও ক্ষতি করে চলেছে, কেউ বা যেচে।'
প্রচ্ছদঃ চমৎকার প্রচ্ছদ। গল্পের সাথে দারুণ মানানসই।
লেখিকার মাঝে আবহমান বাংলা ফুঁটিয়ে তোলার বিশেষ একটা দক্ষতা আছে। 'ভাঙা জোছনা', 'শঙ্খরঙা জল' তারই প্রমাণ। বাংলার সাহিত্য জগতের উজ্জ্বল নক্ষত্র হওয়ার অপার সম্ভাবনা আছে লেখিকার।
কোনো এক তুমুল বৃষ্টির দিনে জন্ম হয় কোমলের।কিন্তু জন্মক্ষনেই মা হারা হয় অভাগী। দেখতে কালো হলেও পদ্মপাতার মতন মুখখানি আর ডাগর চোখের জন্য দেখতে অসম্ভব সুন্দর লাগে।বাবা আদর করে মেয়েকে ডাকত কুমু।নীলসাগরীর তীরে ছোট্ট বাড়িতে বাবার সাথে বেশ সুখেই দিন কাটছিল কুমুর। কিন্তু জনম দুঃখী কুমুর কপালে সেই সুখ বেশিদিন টিকলো না। হুট করে বাবাও মারা গেল।
শেষে ঠাই হলো এক দুর সম্পর্কের মামার বাড়িতে।মামীর হাজারো অত্যাচার আর দুঃখ,দুর্দশার মধ্যে দুচোখে শঙ্খরঙা জল নিয়ে সেই সংসারে মানিয়ে নেয়।কিন্তু একবছরের মাথায়ই তার সেই মামা-মামী মিলে কিছু অর্থের লোভে পাত্রের ব্যাপারে কিছু না জানিয়েই এক বোবা ছেলের সাথে তাকে বিয়ে দিয়ে দেয়।তারপর কি হলো কুমুর জীবনে? জনম দুঃখী কুমু কি পেয়েছিল সুখের দেখা?জানতে পড়তে পারেন "শঙ্খরঙা জল" উপন্যাসটি।
নতুন লেখক হিসেবে সুন্দর একটা প্লট নিয়ে বেশ অসাধারণ ভঙ্গিতেই গল্প গেঁথেছেন তানিয়া সুলতানা।কিছু বানান ভুল থাকলেও বই পড়তে শুরু করলে পরবর্তী গল্পই আপনাকে আকর্ষণ করে সামনের দিকে টেনে নিয়ে যাবে।আমার মতে বেশ সুন্দর একটা উপন্যাস।প্রিয় লাইন:
**মানুষগুলো কেন চিরকাল ছোট থাকে না? কি সহজসরল পবিত্র মন। কত সহজে আপন করে নেয় অপরিচিত একজন মানুষকে।
পুরা বইটা একটা বাংলা সিনেমার স্ক্রিপ্ট মনে হয়েছে...ছোটবেলায় মা বাবা হারানো মেয়ের গ্রামে বসবাস করতে না পারা, শহরে মামা বাড়ি মামীর অযত্ন আর অবহেলায় বড় হওয়া, টাকার বিনিময়ে মামী তাকে না জানিয়ে বিয়ে দিয়ে দেয় এক বোবা লোকের সাথে সেখানে স্বামীর সাথে যখন প্রেম প্রেম চলে তখন স্বামীর মারা যাওয়া...এবং যথারীতি তাদের প্রাপ্য সম্পত্তি হাতিয়ে নিতে আবির্ভাব হয় ভিলেন, শেষে সব সইতে না পেরে যখন মেয়েটা শেষ দৃশ্যে পালিয়ে যাওয়া এবং ঠিক তক্ষনি ভিলেনের তার উপর ঝাপিয়ে পড়ে ইজ্জ্বত নেওয়ার চেষ্টা আর ঠিক তক্ষনি একেবারেই যার আসার কথা না নায়কের বন্ধু উড়ে এসে মেয়েটাকে বাচানো...
This entire review has been hidden because of spoilers.
একদম ঝরঝরে লেখা....পড়ে খুব আরাম পাইসি....গ্রামীণ পটভূমির বর্ণনা গুলো বেশ ভালো লাগসে.....বইটা পড়ার সময় কেন জানি মনে হইসে অনেক প্রাচীন বাংলায় চলে গেসি... সর্বপ্ররি পড়ার সময়টা ভালোই উপভোগ করসি....