শিক্ষক মানুষ, সুধীর চক্রবর্তী সুযোগ পেলেই বেরিয়ে পড়তেন শহর ছেড়ে। নেমে পড়তেন অখ্যাত কোনো স্থানে।দেখা হতো বিচিত্র শ্রেণি পেশার সব মানুষের সঙ্গে। এইসব অচেনা অনাম্নী মানুষজন, যাদের কাছে "অর্থ কীর্তি সচ্ছলতা"ই সব নয়, যাদের কাছে জীবনের আরো মানে আছে, জীবন যাদের কাছে মূল্যবান কিছু, নিজের ধরনে জীবনকে যারা সাজিয়েছেন, হতে পারেন তিনি মাটিপ্রেমী কৃষক, অভাবী কর্মঠ নারী, স্বল্পায়ু ছাত্র (যিনি না থেকেও আছেন), কোনো শিক্ষক বা বাউল; যারা জীবনকে ভালোবাসেন - এমন কিছু মানুষের গল্প "মাটি-পৃথিবীর টানে"। লেখকের শান্ত, স্নিগ্ধ গদ্য মন শীতল করে দেয়।
আমার মেয়ে সুধীর চক্রবর্তীর 'গভীর নির্জন পথে' পড়ে এতোটাই আপ্লুত যে দেশে এসে পাঠক সমাবেশ থেকে তাঁর লেখা 'মাটি-পৃথিবীর টানে " কিনে পড়ে ফেললো। আমার ছেলে সুধীর চক্রবর্তীর মতোই ঘোরাঘুরির টানে ঘুরে ( তবে উনার মতো লেখালেখিতে নয়)। এমনি ঘোরার সময় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার ছলিমগঞ্জে কথা প্রসঙ্গে সি এন জি চালক এক পীর বাউলের মুরিদকে 'গভীর নির্জন পথে' বই থেকে শব্দ চয়ন করে কি একটা বলাতে চালক আপ্লুত হবার গল্প শোনালো ছেলে। আমি এখনও 'গভীর নির্জন পথে' পড়া শুরু করিনি। তবে 'মাটি-পৃথিবীর টানে " শেষ করলাম। কিছুটা পড়েই মেয়েকে জিজ্ঞেস করেছিলাম কোনটা ভালো লেগেছে?'গভীর নির্জন পথে' না 'মাটি-পৃথিবীর টানে " ? সে নির্দ্বিধায় বলে দিল 'গভীর নির্জন পথে' । আমি পিছিয়ে আছি। সফট কপি বলে 'গভীর নির্জন পথে' শুরু করিনি। যাহোক, 'মাটি-পৃথিবীর টানে " রবিঠাকুরের সংজ্ঞায় ছোটগল্পের সমাহার নয়। বড় গল্পও নয়। গল্পের আরেকটি ঢং্যের --- আঙ্গিকের স্বাদ পেলাম 'মাটি-পৃথিবীর টানে " পড়ে। উদ্ধুদ্ধ হলাম ঘুরেফিরে এমন গল্প সংগ্রহের---লেখার। কিন্তু আমার সময়, বয়স, অবস্থান, পরিবেশ, মেধা, সৃজনশীলতা, মানসিক ও শারিরীক শক্তিতে কি তা কুলাবে? 'মাটি-পৃথিবীর টানে " বইয়ের প্রচ্ছদের সামনে পিছনে---দুটো দিকই দিলাম। কারণ উনি অত্যন্ত যত্নের সাথে প্রচ্ছদ নিয়ে ভাবেন। তাঁর লেখা লালনের বইয়ের প্রচ্ছদ সৃষ্টির কাহিনী তিনি এ বইয়ে বলেছেনও।প্রাইমারী বিদ্যালয় যে পায়ে মারি --- এ তত্ত্ব তিনি শুনিয়েছেন এক লোক মানবের মুখে। বাংলাদেশ, এদেশের মানুষ, সংস্কৃতি পশ্চিম বাংলার সাহিত্যিকদের কাছে এক রোমান্টিক বিষয়। তা সমরেশ মজুমদারের 'কইতে কথা বাধে' এবং এ বইয়েও প্রতিফলিত।
সারা বইয়ে শরতের চাঁদনি রাতে খুশি সম্প্রদায়ের গ্রামে গিয়ে তালের শাঁস খাওয়ার প্রস্তাব একটু ঋতু বিরুদ্ধ লেগেছে বৈকি। সবশেষে, 'গভীর নির্জন পথে' পড়ার জন্য উন্মুখ হয়ে আছি।হার্ড কপি থাকলে অবশ্য পড়া শুরু করে দিতাম।