"কোন বাঙালি আজ পর্যন্ত আত্মজীবনী লেখে নি, কেননা আত্মজীবনী লেখার জন্যে দরকার সততা। বাঙালির আত্মজীবনী হচ্ছে শয়তানের লেখা ফেরেশতার আত্মজীবনী।"(প্রবচন নং ৯৩)
হুমায়ুন আজাদের প্রবচনটি বিনাকারণেই আনলাম।আত্মকথা পড়তে বড্ড ভালো পাই। যেকোনো বাঙালির আত্মজীবনী আরো মনোযোগ দিয়ে পাঠ করি এবং প্রভূত জ্ঞান লাভ করি। যদিও অর্থনীতির বিচারে এই জ্ঞানের কানাকড়ি দামও নেই।
রমেশচন্দ্র মজুমদারের আত্মজীবনীর নামই "জীবনের স্মৃতিদীপে"। ইতিহাসবিদ হিসেবে তিনি যতটা আলোচিত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকালীন অধ্যাপক ও প্রথমদিককার উপাচার্য হিসেবে তাঁর কর্মজীবন ততটা সাধারণে আলোকপ্রাপ্ত নয়।
১৯৭৩ সালে তিনি তার এই জীবনকথা লিখেছেন। জন্মেছিলেন বিক্রমপুরের এক ব্রাহ্মণ পরিবারে। উনিশ শতককের শেষভাগের পূর্ববঙ্গের গ্রামীণ পরিবেশের একটি নির্ভেজাল চিত্রের সন্ধান দিয়ে স্মৃতিরোমন্থন শুরু করেন এই প্রবীণ।সেসময়কার একটি হিন্দুসংখ্যাগরিষ্ঠ গ্রাম কেমন হতে পারে তার বর্ণনা রমেশচন্দ্র অতিউত্তমভাবে দিয়েছেন। নদী ভাঙন বাংলার একটি বড় সমস্যা। লেখক নিজের জেলায় নদীভাঙনে কতোশতো ঐতিহাসিক পুরাকীর্তি নদী জবরদখল করেছে তার একটি লিস্টি দিতে চেষ্টা করছেন।
রমেশচন্দ্র নিজের বংশলতিকা বিশ্লেষণ করে আগেই পাঠককে জানিয়ে দিচ্ছেন, তিনি সাধারণ মাপের ব্রাহ্মণ নন, স্বয়ং রাজাগজাদের রক্ত পাতায় লতায় তাদের শরীরে বহমান।
রাজাগজা থাকুক। ছেলেবেলায় যাই। লেখকের গ্রামে কুলীন ব্রাহ্মণমশাইদের খুব প্রকোপ ছিল। তার সাক্ষ্য হাজিরে তিনি লিখেছেন-
"আমার এক সহপাঠী ছিলেন কুলীন ব্রাহ্মণ, তার বাবা পঞ্চাশ ষাটটি বিবাহ করেছিলেন, এরমধ্যে পাঁচ ছজন স্ত্রী আমাদের গ্রামে অর্থাৎ,শ্বশুর বাড়িতে থাকতেন। তাদের গ্রামের নামেই তাদের ডাকা হত। এঁর একভাইও চল্লিশ পঁয়তাল্লিশটি বিবাহ করেছিলেন।"
আরেকটি ঘটনা বেশ মজার ও কুলীনত্বের হ্যাপা বুঝবার মতো -
"একদিন সকালে গ্রামের ডাকঘরে যথারীতি সকলে সমাবেত হয়েছেন। একটি যুবক এসে জিজ্ঞেস করল-শ্যামাচরণ মুখার্জির বাড়ি কোনদিকে? একজন জিজ্ঞেস করল তিনি তোমার কে হন? যুবক উত্তরে বলল তিনি আমার পিতা। উক্ত শ্যামাচরণ মুখার্জিও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। বলা বাহুল্য, পুত্রকে তিনি কোনদিন দেখেন নি। তিনি লজ্জিত হলেন ও পুত্রকে বাড়ি নিয়ে গেলেন।"
আবার, গ্রামে হিন্দুমুসলমানের মাঝে সাম্প্রদায়িকতা তীব্র ছিল না। রমেশচন্দ্রের ছেলেবেলার সবচে প্রিয়বন্ধু একজন মুসলমান। এই চিত্র একটি ইঙ্গিতবহন করছে। বিশশতকের শেষভাগেও সাম্প্রদায়িকতা ততটা জঘন্যরূপ নেয়নি।
১৯০০ সালে কলিকাতায় প্রথম আসেন রমেশচন্দ্র মজুমদার। পরে আবার ঢাকায় চলে যান। গিয়ে ভর্তি হন কলেজিয়েট স্কুলে। সেখানথেকে পাকাপাকি পশ্চিমবঙ্গে চলে আসেন। এখানথেকেই এন্ট্রান্স পাশ করেন ১৯০৬ সালে, তারপর রিপন কলেজে ভর্তি হন। তখন সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি দেশব্যাপী খ্যাতনামা জননেতা। সেই সুরেন ব্যানার্জি রিপন কলেজে ক্লাস নিতেন। ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লব তখনো দানাবাঁধেনি প্রবলভাবে। তবুও সেইসময়কার যুবসমাজের চিন্তারাজ্য ধারণা কিছুটা হলেও দিতে চেষ্টা করেন। তবে তাঁর লেখনীতে মুসলমান জনগোষ্ঠীর কথা এখানে পাচ্ছি না। হয়তো কলিকাতায় তিনি শিক্ষাজীবনে কোনো মুসলমান শিক্ষার্থী দেখেনই নি কিংবা সান্নিধ্য পাননি।
অনার্সে দ্বিতীয়শ্রেণিতে প্রথম হন এবং কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন আশুতোষ মুখার্জির যুগ চলছে। প্রবলপ্রতাপশালী এই ব্যক্তিকে রমেশচন্দ্রের আত্মকথায় বহুমুখী ভূমিকায় পাব।
মাস্টার্সে প্রথমশ্রেণি পান তবে হন দ্বিতীয়। তাই নিয়মানুযায়ী যিনি প্রথম তিনি শিক্ষক হন কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের।
শিক্ষাজীবন শেষ করে ইতিহাসে উচ্চতর গবেষণা করতে চান লেখক। হাজির হন বিখ্যাত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মহাশয়ের কাছে। প্রথমে গাঁইগুই করলেও তাঁর মাধ্যমেই গবেষণার হাতেখড়ি পান রমেশচন্দ্র মজুমদার। কিন্তু মানবমনে কৃতজ্ঞতাবোধ বড়বেশি কম।গুরু শাস্ত্রী মহাশয়ের কৃতজ্ঞতা সারা বইতে কোথাও তো স্বীকার করেন ই নি বরং অবস্থাবিশেষে তাকে হেয় করার ঘটনাও প্রফুল্লচিত্তে বয়ান করেছেন!
চাকরি পান না, পান না অবশেষে আশুতোষ মুখার্জির চেষ্টায় ও নিজের যোগ্যতাবলে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি পেয়ে যান। এইখানে এক নবীন শিক্ষককে কীভাবে তাঁর সহকর্মী প্রবীণ শিক্ষকরা পদেপদে বিপদে ফেলতে চেয়েছে তা নিয়ে কিছু ঘটনা লিখেছেন যা সত্যিই ঘৃণার জন্ম দেয় (স্মরণযোগ্য, আপনি একপক্ষের বয়ান পড়ছেন) ।
মহেঞ্জোদাড়োর আবিষ্কারক রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাথে মেধার একটি অলিখিত দ্বন্দ্ব আজীবন ছিল লেখকের। আবার,ঐতিহাসিকদের দুদল আছে,একদলে আশুতোষ, রমেশচন্দ্র সহ অনেকে, ওপরদলে আচার্য যদুনাথ সরকার,হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ও রাখালদাস। এঁরা গবেষণায় মেতে উঠতে গিয়ে প্রতিযোগিতাকে নিয়ে যান ব্যক্তিগতজীবনে। কাঁদা ছোড়াছুড়ি করেছেন দুদল, একে অপরের কীর্তিকে মলিন করতে চেয়েছেন নোংরাভাবে। তাতে তাঁরা কতটুকু উপকৃত হয়েছেন জানি না, তবে ভারতের ইতিহাসচর্চা পিছিয়েছে অনেক। সারাবইতে এসব দলাদলির ঘটনা অনেক আছে।
কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাতবছর শিক্ষকতা করেছেন লেখক। এরপর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হলে তাতে আশুতোষ মুখার্জির সুপারিশে নিয়োগ পান ভারত বিষয়ক ইতিহাসের অধ্যাপক পদে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুরা চাইতেন না। তারা একে "সাংস্কৃতিক" ভাঙন বলে প্রচার করতেন। সত্যি হল, এতে যতটা না সাংস্কৃতিক ভাঙানের যুক্তি, তারচে বেশি তাদের স্বার্থ ছিল পূর্ববাংলাকে দাবিয়ে রাখবার চেষ্টা।
এই ঢাবি বিরোধী আন্দোলনের চাঁই ছিলেন আশুতোষ। তিনি কোনোভাবেই মানতে পারতেন না কলিকাতার সমান্তরালে একটি বিশ্ববিদ্যালয় পাবে পূর্ববঙ্গের মানুষরা;বিশেষত, পূর্ববঙ্গ আবার মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ! এ হতে পারে না।
কীভাবে আশুতোষ গং তুষ্ট হলেন তার বিস্তারিত লিখেছেন লেখক।আমি মনে করি এই ঘটনার বর্ণনার ঐতিহাসিক মূল্য অপরিসীম। আশুতোষ গভর্ণরের সাথে 'ঢাকা প্যাক্ট' এ আসেন যে, ঢাবির বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে হবে ঠুঁটো জগন্নাথ কেননা এর ক্ষমতা থাকবে ঢাকার মাত্র দশমাইলের মধ্য! দীর্ঘদিন ঢাবির ক্ষমতা ছিল এটুকুই।
১৯২১ সালে ঢাবিতে শিক্ষকতা শুরু করেন। দীর্ঘ একুশ বছর ছিলেন ঢাকায়। ঢাবির ইতিহাস ও ঢাকার তৎকালীন পরিস্থিতি বুঝতে লেখকের এই অধ্যায়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৩৭ সালে এ এফ রহমানের পর ভিসি হন রমেশচন্দ্র মজুমদার। এখানে তিনি আমার অজানা দারুণ একটি তথ্য দিয়েছেন। তিনি দাবী করেছেন, ঢাবির এক্সিকিউটিভ কমিটি ভিসি হিসেবে নামের মনোনয়ন পাঠান চ্যান্সেলর অর্থাৎ গভর্ণরের কাছে। নাম দুটি ছিল-
১.হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী
২.রমেশচন্দ্র মজুমদার
সোহরাওয়ার্দীকে যে ঢাবির ভিসি নিয়োগের কথা উঠেছিল তা বেশ আগ্রহউদ্দীপক।
ভিসি ছিলেন রমেশচন্দ্র সাড়ে পাঁচবছর। এই সময়ে নানা গুণীজনের সান্নিধ্য পেয়েছেন ভিসিত্বের সুবাদে। তাঁদের মধ্যে যাঁদের কথা তিনি লিখেছেন বিশদভাবে তাঁরা- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর,শরৎচন্দ্র(এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলের ঢাকাবাসীরা অনেকেই চান নি শরৎকে সম্মাননা দেয়া হোক!) , আল্লামা ইকবাল, সরোজিনী নাইডু ও হায়দ্রাবাদের স্যার আকবর হায়দার।
ভিসি রমেশচন্দ্রের ঢাবি বিষয়ক স্মৃতিচারণা পড়ে বোঝার উপায় নেই যে ঢাবিতে মুসলমান শিক্ষার্থী ও শিক্ষক ছিল। এক "মৌলভি শহিদুল্লার " কথা তিনি লিখেছেন।
ঢাকার রায়টের কথা লিখতে গিয়ে দোষ চাপিয়েছেন মুসলমানদের ওপর।
১৯৪২ সালে ঢাবি থেকে অবসরে যান। এরপর আজীবন ইতিহাস হাতড়ে বেরিয়েছেন, শিক্ষকতা করেছেন, বই লিখেছেন হিন্দু যুগ, মুসলমান যুগ আর ইংরেজযুগ ভাগ করে।
দেশভাগের দায় অনেকটা মুসলিম লীগের ঘাড়ে চাপিয়েছেন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে বলেছেন "বিদ্রোহ " এবং সেই কার্যে যেহেতু ভারত তথা হিন্দুরা সহায়তা দিয়েছে তাই তিনি নেতৃবৃন্দের কাছে দাবী জানিয়েছেন "বাংলাদেশের সীমান্তের একটি অংশ পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুদের দিয়ে দিতে।"
জীবন বড়ই বৈচিত্র্যময় ও পঙ্কিলময়। সেই পঙ্কিলতা কারো কম, তো কারো বেশি। কিন্নর ড. রমেশচন্দ্র মজুমদারের জীবনপাঠে জ্ঞান লাভ হল তাঁর জীবনপথে কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নেন নি, কারো অনিষ্ঠ করা তো দূরে থাকুক চিন্তায় করেন নি। এবং সার্বিক বিবেচনায় তিনি গৃহে থেকেও সন্ন্যাসিরর জীবনযাপন করেছেন।
"জীবনের স্মৃতিদীপে" পাঠ শেষ। আসুন, এখন আমরা মনে করি হুমায়ুন আজাদ তাঁর প্রবচনগুচ্ছের ৯৩ নং প্রবচনে কী বলেছিলেন।