গল্প- সুভা
লেখক- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
নবম-দশম শ্রেণীতে রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প ‘সুভা’ পড়েছিলাম। তখন কেবল পাশ করতে হবে, পরীক্ষার খাতায় ভালো নম্বর পেতে হবে এই ভেবেই পড়ে গেছি। কখনো এর ভেতরে লুকায়িত মর্মার্থ বোঝার চেষ্টা করিনি। ক্লাসের শিক্ষক গল্পটির পাঠ পরিচিতি বিশ্লেষণ করলেও যতটুকু পরীক্ষার খাতায় লিখার জন্য প্রয়োজন ততটুকুইু মাথায় নিয়েছিলাম কেবল। কিংবা আমার ছোট মাথা গভীর অর্থের সন্ধান পায়নি তখন পর্যন্তও!
সেই যে এসএসসি পরীক্ষা দিলাম, এরপর আজ আবার নতুন করে গল্পটি পড়তে ইচ্ছে হলো। জানতে ইচ্ছে করছিল সকল অজানা প্রশ্নের উত্তর। আমি জানতাম, গল্পটা যতই পড়ি সমাপ্তিতে কোনোরূপ পরিবর্তন আসবে না। তবুও পড়েছি, যদি কোনো পরিবর্তন আসে! যদি বোবা মেয়েটি তার একটিমাত্র শেষ আশ্রয় খুঁজে পায়! কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। আমাদের সমাজে কালো-সাদা, লম্বা-বেঁটে, বোবা, কানা, কালা এসবকে ব্যক্তির নিজস্ব ত্রুটি হিসেবেই ধরা হয়। কেউ একবারও ভাবে না, যদি আমাদের নিজেদের তৈরি করার দায়িত্ব নিজেদের উপরেই বর্তানো হতো, তবে আমরা নিজের সর্বস্বটা দিয়ে নিজেকে আকর্ষণীয় করার জন্যই লেগে পড়তাম। স্বেচ্ছায় কেউ কখনো নিজের ত্রুটি ধরে রাখতো না।
‘সুভা’ গল্পের প্রধান চরিত্র সুভাষিণী। মেয়েটির নাম যখন রাখা হয় তখন কেউ জানতোই না মেয়েটি আদতে বোবা। বয়সের সাথে সাথে যখন সত্যটা উন্মুক্ত হচ্ছিল, মেয়েটির চারপাশের পরিবেশও পাল্টে গেলো হঠাৎই। মেয়েটির মা তো সুভাকে নিজের ত্রুটি বলেই মন থেকে মেনে নিয়েছিল। কিন্তু সুভার বাবা অন্য দুই মেয়ের থেকে তাঁকেই অধিক স্নেহ করতেন। হয়তো এটাই ছিল সুভার জীবনের প্রথম ও শেষ প্রাপ্তি!
কথা বলতে পারে না বলে মেয়েটির কোনো বন্ধু নেই এমনটি ভাবা উচিত নয়। মেয়েটি নিজের মতো অনেকগুলো স্বার্থহীন বন্ধু জুটিয়ে নিতে পেরেছিল জীবনে। গোয়ালের দুটো গাঁভী, ছাগল, বিড়ালশাবলসহ নিজের দিককার বিপরীত একজন বন্ধুও ছিল তার। যার কিনা আবার নিজস্ব ভাষাও আছে! তবু সে সুভার গুরুত্ব বুঝতে পারতো। তার অবশ্য কারণও আছে। মাছ ধরার ক্ষেত্রে যে বাক্যহীন বন্ধুই শ্রেয়! সেই অদ্ভুত ছেলেটির নাম প্রতাপ। অকর্মণ্য এই ছেলেটি নিজের পরিবারের আপন না হতে পারলেও দুঃসম্পর্কের অনেকেরই খুব কাছের হয়ে উঠেছিল। যেমনটা সুভাষিণীর সাথে ঘটেছে। সুভা কি কেবল তাকে বন্ধু বলেই মানতো? নাকি ভেতরে ছিল অনেক না বলা কথা? উত্তরটা জানা হবে না কখনোই।
মেয়ের বয়স বাড়ছে। চারপাশের কানাঘুষাও বাড়ছে। কিন্তু পাত্রের সন্ধান নেই। বোবা এই মেয়েকে কে-ই বা বিয়ে করবে? কিন্তু একদিন হঠাৎই বিয়ে হয়ে গেলো সুভার। বাবা-মা তার অগোচরে কলকাতা যাওয়ার তোড়জোড় শুরু করলো। আসল কারণটা ধরতে না পারলেও সুভা জানতো কোনো একটা অস্বাভাবিকতা অবশ্যই রয়েছে। কিন্তু কে জানতো বিয়ের চেয়েও বড় অস্বাভাবিকতা তখন পর্যন্ত তার জীবনে অপেক্ষা করছিল?
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সুভা’ শুধুমাত্র একটি সুভার গল্প নয়। বরং এটি হাজার হাজার সুভার জীবনকাহিনী তুলে ধরেছে। এই গল্পের সুভা শুধুমাত্র নিজের মুখের ভাষাহীনতার কারণে জন্মের পর থেকে কম হেয় হয়নি। এমনকি তার স্বামীও তাকে বিন্দু পরিমাণ ছাড় দেয়নি। এমন হাজারো সুভা আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। যাদের আমরা দেখি কিন্তু বুঝতে পারি না। বুঝলেও মেনে নিতে পারি না। বহুকাল থেকেই এমনটা হয়ে আসছি। আরো বহু যুগ হয়তো চলবেও!