সমুদ্রতটে কাফকা (ইংরেজি - Kafka on the Shore, জাপানি - Umibe no Kafuka)
লেখক - হারুকি মুরাকামি (Haruki Murakami)
অনুবাদক - অভিজিৎ মুখার্জি
প্রকাশনী - যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশনা
মূল্য - প্রথম খন্ড - ৩০০ টাকা (৩৮২ পাতা) , দ্বিতীয় খন্ড - ৪০০ টাকা (৪১৭ পাতা) ।
প্রথমে অনুবাদকের ব্যাপারে দু'এক কথা বলি - অভিজিৎ মুখার্জি যাদব বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অফ লিংগুইস্টিকস অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজেস্ - এর প্রাক্তন জয়েন্ট ডিরেক্টর এবং বর্তমানে যাদব বিশ্ববিদ্যালয়ে জাপানি ভাষা শিক্ষার ভারপ্রাপ্ত অধ্যাপক। পড়িয়েছেন জাপানের কানাজাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রযুক্তি, বহুবার জাপানি ভাষার শিক্ষকতার প্রশিক্ষণ পেয়েছেন জাপান ফাইন্ডেশনের। জাপানি সাহিত্য বাংলায় অনুবাদের জন্য ২০১৭ সালে পশ্চিমবঙ্গ বাংলা একাডেমি থেকে লীলা রায় স্মরণ সম্মানে সম্মানিত হয়েছেন।
তাই এইরকম একজন মানুষের অনুবাদ যে উৎকৃষ্ট মানের হবে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। মূল জাপানি থেকে প্রথমবার বাংলা ভাষায় অনূদিত হয়েছে। অতি চমৎকার অনুবাদ, সুন্দর বর্ণনা, একবারের জন্যেও মনে হয়নি অনুবাদ পড়ছি।
হারুকি মুরাকামি, বিশ্বসাহিত্যের পাঠকের কাছে জাপানের হারুকি মুরাকামি অপরিচিত নাম নয়। পুবের, পশ্চিমের, প্রাচীন এবং হালের সংস্কৃতি, ইতিহাস ও রুচির অন্ধিসন্ধির খোঁজ রাখা, প্রঞ্জাবান এই লেখক একাধারে দার্শনিকও বটে। ওনার ২০০২ সালে প্রকাশিত উপন্যাস "উমিবে নো কাফুকা (Umibe no Kafuka)" এযাবৎ মুরাকামির সব থেকে জনপ্রিয় উপন্যাস, বিশ্বের প্রায় পঞ্চাশটিরও বেশি ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে।
কাহিনী - সুদীর্ঘ উপন্যাস শুরু হচ্ছে একসাথে দুটো ঘটনা নিয়ে, পনেরো বছরের তামুরা কাফকা বাড়ি থেকে পালিয়েছে বাইরে পরিবেশের সাথে পরিচিত হবার জন্য, বাবার দেওয়া ইদিপাস-শাপ থেকে বাঁচতে টোকিও থেকে পালিয়ে রহস্যময় এক পুরোনো লাইব্রেরিতে আশ্রয় নেয়।
অপরদিকে, নাকাতা নামের এক বুড়ো, ছোটবেলায় এক্সিডেন্টে ব্রেন ড্যামেজ হয়ে পড়ালেখার ক্ষমতা হারিয়ে বোকা হয়ে গিয়েছে, কিন্তু অস্বাভাবিক ব্যাপার হল, সে এরপর থেকেই বিড়ালদের সাথে কথা বলতে পারে৷ তাই সে বুড়ো বয়সে পাড়ার লোকদের হারানো বিড়াল খুঁজে দেয়। একদিন গোমা নামের এক বিড়াল খুঁজতে গিয়ে সে পরিচিত হয় জনি ওয়াকার নামে দাবী করা এক মানুষের সাথে, যে বিড়ালদের ধরে তাদের মেরে ফেলে আত্মা দিয়ে একটা বাশি বানানোর তাল করছে৷ তারপর?
পাতায় পাতায় যে গভীর জীবন দৃষ্টি, মানুষের জীবন এর অসারতা, উদ্দেশ্য, ভালবা���া, ভেতরের বা মনের রাক্ষসের সাথে পরিচয়, নিজেকে ধ্বংস করার প্রবনতা, সাথে সুপারন্যাচারাল ঘটনা, কিছুটা এডাল্ট জিনিস নিয়ে ঘাটা, জৈবিক আর মানসিক ভালবাসার সম্পর্ক, নিজের মধ্যে নিজেকে হারিয়ে ফেলা ---- কি নেই! বুড়ো নাকাতা, মিমি নামের বিড়াল, জনি ওয়াকার, ক্রো, কাফকা, মিস সাইকি, অশিমা, হোশিনো, সাকুরা ---- এরা একেকজন যে আমাকে এমনভাবে আকৃষ্ট করেছে, যে আমি ওদের চাক্ষুষ দেখছিলাম বইয়ের পাতায়৷ অনেকদিন তাদের ভুলতে পারব না, এটা সত্য৷
এই মরণশীল পৃথিবীর কিনারায় আছে আরেক জগৎ। যেখানে বিচ্ছেদ নেই, বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া নেই, সময় যেখানে থাবা বসাতে পারে না; যেখান থেকে আমরা বার বার এই পৃথিবীটাতে আসি, আবার ফিরে যাই, ফেরার পথে কুড়িয়ে নিতে হয় সেই সব অস্ত্র, বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া ঠেকাতে নানা চিহ্নের উপকরণ।
উপন্যাস সমাপ্ত হওয়ার পর ভূতগ্রস্তের মত লাগছিল। মনে হচ্ছিল জগতের একটি নয়, একাধিক স্তরে যাওয়া আসা ঘটেছিল পাঠক হিসেবে। কিন্তু এমন তো হয়! স্বরচিত ধারণার জগতে বাছাই করা মেটাফর নিয়ে মানুষ কি আজীবন একটি ভুল ধারনার সাথে বাস করে না?