ভেবে যদি কোন কিছুর কূল কিনারা না পাওয়া যায় এর মত Hetic Day আর কিছুই নয়। লিখার শব্দ যদি মাথায় না আসে তা আরো বড় কষ্ট। 'কুছ পরোয়া নেহি হাম হে না' এমন বাক্য যদি কেউ শুনাতো সত্য তাকে জীবন দিয়ে ভালবাসতাম।
"কালকেতুর উপাখ্যান" পড়ে আমার মনে হচ্ছে কী যেন পড়লাম। সৌন্দর্য বুঝি এমন হয়। কথার মাঝে বুঝি এত রূপ থাকে? কাউকে ভৎসনা করা ও যে শিল্প তা জেনেছি আজ। ইট ভাঙ্গার আওয়াজের মত মাথায় বারবার বাজছে, কালকেতু বীর, মহাবীর।
যেহেতু আগের সব কিছু ছিল কাব্যময়। মিথলজি ঢঙে বলা কওয়া হয় তাই এর সৌন্দর্য আলাদা। কিছু জায়গা আমি বুঝিনি, কিন্তু পড়ে জেনেছি, বিশাল ভূবনে পাতা ঝরা সূর্যের ঝিলিক ছিল এই কাব্যের সরলতা।
কালকেতু একজন শিকারী। সে শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করতো। তার স্ত্রী ফল্লুরা। হঠাত করে চন্ডী দেবীর শখ হল কালকেতুর মাধ্যমে তার ধর্ম প্রচার করা। তাই তিনি ষড়যন্ত্র শুরু করে দিলেন। কালকেতু যে বনে শিকার করত, তিনি সে বনের সব জীব বন্দী করে রাখলো। কালকেতু তখন শিকার না পেয়ে অনাহারে ভুগছিল। একদিন সে গুঁইসাপ দেখল পথে, যা অশোভন। তাই সে মেরে বাড়িতে নিয়ে আসলো। ফল্লুরা তাকে আজও খালি হাতে ফিরতে দেখে কান্না করতে লাগলো।
কালকেতু তখন বাজারে গেল কিছু জোগাড় করত। তখন দেবী চন্ডী নিজের রুপ ধারণ করলো। তিনি, তাদের বলল, তার পূর্জা করলে রাজ্য দিবে, ভরপুর স্বর্ণ দিবে।
তিনি কালকেতুকে গুজরাটে রাজ্য দিল। কিন্তু সেখানে ভাড়ুদত্ত নামক এক ছল কপাটির কারণে তাকে কলিঙ্গ রাজ্যের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হতে হয়। সে হেরে যায়। কিন্তু দেবী চন্ডী তার উপর সদয় সর্বদা। তিনি কলিঙ্গের রাজাকে স্বপ্নে আদেশ দিলেন, কালকেতুকে তার রাজ্য ফিরিয়ে দিতে।
মধ্যযুগের অনন্য একটি ধারা চন্ডীমঙ্গল কাব্য এর একটি বিশেষ ধারা কালকেতু উপাখ্যান। যেতেতু মধ্যযুগ ছিল পুরোই কাব্য নির্ভর তাই মঙ্গল কাব্য গুলোও কাব্যশশীল এবং ভাষা বর্তমানের তুলোনায় অনেক কঠিন। তাছাড়া মঙ্গলকাব্য লেখার উদ্দেশ্য ছিল যা সেই ফলাস্রুতিতে কঠিন অস্বাভাবিক নয়।।। যাই হোক তথাপি একটি সুন্দর মিথলোজিক্যাল কাহিনী আসে এই কালকেতু উপাখ্যান এ। নিচে ব্রাকেট এর মাঝে তুলে ধরা হলো
( নীলাম্বর স্বর্গে বেশ সুখে কাটাচ্ছিল। শিবের পুজোতে মননিবেশ করেছিলো নিজেকে। কিন্তু দেবী চণ্ডীর ইচ্ছেয় নীলাম্বের ভাগ্যাকাশে দুঃখের মেঘ দেখা দিলো। চণ্ডীর ইচ্ছে হয়েছে পৃথিবীতে তার পুজো প্রচারের। কিন্তু কে করবে তার পুজো প্রচার? চণ্ডী এ-কাজে নীলাম্বরকে মনে মনে নীলাম্বরকে মনোনীত করলো। চণ্ডী তার স্বামী শিবকে বললো, 'নীলাম্বরকে পৃথিবীতে পাঠিয়ে দাও, সে পৃথিবীতে আমার পুজো প্রচার করবে'। শিব বললো, 'বিনা অপরাধে আমি তাকে কী ক’রে স্বর্গ থেকে বিদায় দিই?' চণ্ডী মনে মনে পরিকল্পনা আঁটলো, সে নীলাম্বরকে পাঠাবেই। একদিন শিবপুজোর জন্যে বাগানে ফুল তুলছিলো নীলাম্বর। চণ্ডী সেখানে গেলো, নিজেকে বিষাক্ত কীটে রুপান্তরিত করলো, এবং নীলাম্বরের তোলা ফুলে গোপনে লুকিয়ে রইলো। ঘনিয়ে এলো নীলাম্বরের স্বর্গ থেকে বিদায়ের দিন। নীলাম্বর ফুল দিয়ে শিবপুজো করতে গেলে ফুলের মধ্যে লুকিয়ে থাকা কীট শিবকে দংশন করলো। কীটের কামড়ে শিউরে উঠলো শিব, অভিশাপ দিলো নীলাম্বরকে, 'যাও, পৃথিবীতে গিয়ে জন্ম নাও ব্যাধ হয়ে।' শিবের অভিশাপে দেবতা নীলাম্বরের সব দেবত্ব বিলীন হয়ে গেলো। বেচারির নিজের কোন অপরাধ ছিলো না, তবুও দৈব দয়ায় তাকে চলে আসতে হল এ কষ্টভরা পৃথিবীতে। সে জন্ম নিলো ধর্মকেতু নামক এক ব্যাধের পুত্র হয়ে। অন্যদিকে তার স্ত্রী ছায়াও চ’লে এলো পৃথিবীতে অন্য এক ব্যাধের কন্যা হয়ে। নীলাম্বরের নাম হলো কালকেতু, আর ছায়ার নাম হলো ফুল্লরা।
কালকেতু ব্যাধের ছেলে, সুন্দর স্বাস্থ্যবান। বনের পশুরা তার জ্বালায় অস্থির হয়ে উঠলো। তার বিয়ে হলো এগারো বছর বয়সে ফুল্লরার সাথে। পৃথিবীতেও তারা বেশ সুখে দিন কাটাতে লাগলো। কালকেতু ছিলো অসাধারণ শিকারী, তার নিক্ষিপ্ত শরে প্রতিদিন প্রাণ হারাতে লাগলো সংখ্যাহীন বনচর পশু। ছোটখাটো দুর্বল পশুদের তো কথাই নেই, এমনকি বাঘ-সিংহরাও ভীত হয়ে উঠলো। বনে পশুদের বাস করা হয়ে উঠলো অসাধ্য। পশুরা ভাবতে লাগলো কী ক’রে রক্ষা পাওয়া যায় এ-শিকারীর শর থেকে। সব পশু একত্র হয়ে ধরলো তাদের দেবী চণ্ডীকে; বললো, বাঁচাও কালকেতুর শর থেকে। চণ্ডী বললো, বেশ। শুরু হল চণ্ডীর চক্রান্ত। কালকেতুকে অস্থির ক’রে তুললো নানাভাবে।
কালকেতু জীবিকা নির্বাহ করে পশু মেরে। একদিন সে বনে গিয়ে দেখলো বনে কোন পশু নেই। চণ্ডী সেদিন ছল ক’রে বনের পশুদের লুকিয়ে রেখেছিলো। সেদিন কালকেতু কোন শিকার পেলো না, না খেয়ে তাকে দিন কাটাতে হলো। পরদিন আবার সে তীরধনুক নিয়ে শিকারে গেলো। পথে দেখলো সে একটি স্বর্ণগোধিকা অর্থাৎ গুইসাপ। এ জিনিসটি অলক্ষুণে; তাই কালকেতু চিন্তিত হয়ে পড়লো রেগে উঠলো কালকেতু। সে গোধিকাটিকে বেঁধে নিলো। মনে মনে ভাবলো, আজ যদি কোনো শিকার না মেলে তবে এটিকেই খাওয়া যাবে।
সেদিন কোনো শিকার মিললো না তার। সে গোধিকাটিকে নিয়ে বাড়ি ফিরে এসে দেখলো তার প্রতীক্ষায় ব’সে আছে ফুল্লরা। কিছু রান্না হয় নি। গতকাল তারা খেতে পায় নি, আজো খেতে পাবে না। কালকেতুর শিকারহীন ফিরে আসতে দেখে প্রায় কেঁদে ফেললো ফুল্লরা। কালকেতুকে বললো, 'এ গোধিকাটিকে আজ রান্না করো, পাশের বাড়ির বিমলাদের থেকে কিছু খুদ এনে রাঁধ, আমি হাটে যাচ্ছি।' এ বলে কালকেতু চ’লে গেলো।
তার পরেই এলো বিস্ময়, ঘটলো অভাবনীয় ঘটনা। গোধিকাটি আসলে ছিলো দেবী চণ্ডী। ফুল্লরা বিমলাদের বাড়িতে যেতেই সে এক অপরূপ সুন্দরী যুবতীর রূপ ধারণ করলো। বিমলাদের বাড়ি থেকে ফিরে এসে নিজের আঙ্গিনায় এক অপূর্ব সুন্দরী যুবতীকে দেখে অবাক হয়ে গেলো ফুল্লরা। সাথে সাথে হলো ভীতও। ফুল্লরা তার পরিচয় জিজ্ঞেস করলো। দেবী চণ্ডী ছলনাময়ী, শুরু করলো তার ছলনা। সরলভাবে বললো, 'কালকেতু আমাকে নিয়ে এসেছে।'
একথা শুনে ভয় পেলো ফুল্লরা। এতোদিন সে স্বামীকে নিয়ে সুখে ছিল, ভাবলো এবার বুঝি তার সুখের দিন ফুরোলো। ফুল্লরা অনেক বুঝালো যুবতীটিকে। বললো, 'তুমি খুব ভালো, তুমি খুব সুন্দরী। তুমি তোমার নিজের বাড়িতে ফিরে যাও, নইলে মানুষ নানা কথা বলবে।' কিন্তু যুবতী ফুল্লরার কথায় কোনো কান দিলো না; বললো, 'আমি এখানে থাকবো।' এতে কেঁদে ফেললো ফুল্লরা, দৌড়ে চ’লে গেলো হাটে কালকেতুর কাছে। বললো সব কথা। শুনে কালকেতুও অবাক। সে বাড়ি ফিরে এলো ফুল্লরার সাথে, এবং যুবতীকে দেখে অবাক হলো। কালকেতু বার বার তাকে বললো, তুমি চ’লে যাও। কিন্তু কোনো কথা বলে না যুবতী। তাতে রেগে গেলো কালকেতু, তীরধনুক জুড়লো, যুবতীকে সে হত্যা করবে। যখন কালকেতু তীর নিক্ষেপ করতে যাবে তখন ঘটলো আরো বিস্ময়কর এক ঘটনা। এবার এবার দেবী চণ্ডী নিজের মুর্তিতে দেখা দিলো। সে আশ্চর্য সুন্দরী মেয়ে পরিণত হলো দেবী চণ্ডীতে। চোখের সামনে এমন অলৌকিক ব্যাপার দেখে ব্যাধ কালকেতু মুগ্ধ হয়ে গেলো। চণ্ডী বল���ো, তোমরা আমার পুজো প্রচার করো, আমি তোমাদের অজস্র সম্পদ দেবো, রাজ্য দেবো। রাজি হলো কালকেতু-ফুল্লরা। অবশ্য দেবীর কথা প্রথমে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারে নি ফুল্লরা, কেননা এ ছিলো অভাবিত। দেবী সাথে সাথে সাত ললস ধন দান করলো।
কালকেতু জীবনে সোনা দেখেনি। সে সোনা লাভের পর সোনা ভাঙ্গাতে যায় মুরারি শীল নামের এক বেণের কাছে। বেণে চতুর, কালকেতু বোকা। বেণে ভাবলো, দেখি না একটু বাজিয়ে যদি কালকেতুকে ঠকাতে পারি। তাই বেণে মুরারি শীল বললো,
"সোনা রূপা নহে বাপা এ বেঙ্গো পিতল।
ঘষিয়া মাজিয়ে বাপু করেছ উজ্জ্বল।।"
মুরারি বলছে, এ সোনারূপো নয়, পেতল। তুমি ঘ’ষেমেজে উজ্জ্বল ক’রে এনেছো। কালকেতু বললো, এ আমি দেবীর কাছ থেকে পেয়েছি। কবির ভাষারঃ
"কালকেতু বলে খুড়া না কর ঝগড়া।
অংগুরী লইয়া আমি যাই অন্য পাড়া।।"
তখন বেণের টনক নড়ে। সে তো চিনেছে এ-সোনার মতো সোনা হয় না। তাই বেণে শেষে সোনা রেখে দেয়।
কালকেতু পরে গুজরাটে বন কেটে নির্মাণ করে বিরাট নগর। কালকেতু হয় গুজরাটের রাজা আর ফুল্লরা হয় রাণী। সেখানে ছিলো ভাড়ুদত্ত নামের এক দুষ্টু লোক। দুষ্টুরা মন্ত্রী হ’তে চায় চিরকালই, সেও এসে কালকেতুর মন্ত্রী হ’তে চাইলো। কালকেতু তাতে রাজি হলো না। এতে ভাড়ুদত্ত ক্ষেপে গেলো। সে চ’লে গেলো কলিঙ্গে, সেখানকার রাজাকে নানা কিছু বুঝিয়ে কালকেতুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে রাজি করালো। বেঁধে গেলো যুদ্ধ। কালকেতু আগে ছিলো ব্যাধ, এখন রাজা। সে যুদ্ধ জানে না। তাই যুদ্ধে হেরে গেলো, এসে পালিয়ে রইলো, বউয়ের পরামর্শ মতো, ধানের গোলার ভেতরে। কলিঙ্গরাজ তাকে বন্দী ক’রে নিয়ে গেলো, কারাগারে কালকেতু স্মরণ করলো দেবী চণ্ডীকে।
চণ্ডী কালকেতুর ওপর সব সময় সদয়, কেননা কালকেতু তার ভক্ত। দেবী কলিঙ্গের রাজাকে স্বপ্নে দেখা দিলো। বললো, কালকেতু আমার ভক্ত, তাকে মুক্তি দাও, তার রাজ্য ফিরিয়ে দাও। কলিঙ্গরাজ দেবীর স্বপ্নাদেশ পেয়ে মুক্তি দিলো কালকেতুকে, ফিরিয়ে দিলো তার রাজ্য। কালকেতু তার রাজ্য ফিরে এসে আবার রাজা হলো, রাজত্ব করতে লাগলো বেশ সুখে। ফুল্লরা তার সুখী রানী। অনেক দিন রজত্ব ক’রে বৃদ্ধ হলো কালকেতু আর ফুল্লরা, এবং এক শুভদিনে মহাসমারোহে আবার নীলাম্বর-ছায়ারূপে ফিরে গেলো স্বর্গে। { সংগ্রহিত} )
কালকেতু এবং ফুল্লরাকে স্বর্গ থেকে মর্তে পাঠানো হয় মর্তে দেবী চন্ডীর পূজা প্রচার করার জন্য। মর্তে পূজা প্রচার এর পরে তাদের মৃত্যুর মাধ্যমে স্বর্গে তুলে নেওয়া হয়।