রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের "দেনাপাওনা" কেবল একটি গল্প নয়—এ এক লাল আঁচে দগ্ধ হওয়া সমাজচিত্র, যেখানে পণপ্রথার বিষাক্ত শিকড় মেয়েদের জীবনকে ক্রমাগত গিলে খায়, তাদের স্বপ্ন, মর্যাদা আর মানবিকতা ধ্বংস করে দেয় মৃত্যুর অনেক আগেই। এটি এক সভ্যতার মুখোশ খুলে দেওয়া দলিল, যেখানে মেয়েদের অস্তিত্ব গচ্ছিত রাখা হয় নগদের বিনিময়ে।
গল্পের কেন্দ্রে নিরুপমা—পাঁচ ছেলের পর জন্মানো আনন্দের ফুল, আদরের আলোকবর্তিকা। কিন্তু সমাজের তথাকথিত ‘সন্মান’-এর নামে সেই ভালোবাসাই ধুলোয় মিশে যায়, যখন দশ হাজার টাকার পণ না দিতে পারায় তাকে ঠেলে দেওয়া হয় এক নিঃসঙ্গ দগ্ধজীবনে। ভালোবাসা মুহূর্তে হয়ে ওঠে বোঝা—a liability stamped in rupees.
রামসুন্দর, এক অসহায় পিতা, তার সমস্ত স্বপ্ন এবং অর্থ এক করে কন্যার জন্য বনেদী পাত্র খোঁজেন, কিন্তু বনেদিয়ানা কেবল গহনায় নয়, মনেও গভীরতায়। পণ দিতে না পারার অপরাধে কন্যা নিরুপমা, স্বামীর অনুপস্থিতিতে, শ্বশুরবাড়িতে হয়ে ওঠে নির্যাতনের চরম প্রতিমা। শাশুড়ির অবজ্ঞা, দাসীদের অপমান, এবং স্বামীর নিঃসংশয় বিচ্ছিন্নতা—এই ত্রিধারা যেন নিরুপমার জীবনে a slow-burn execution।
এই দৃষ্টান্তে রবীন্দ্রনাথ যে সূক্ষ্ম কিন্তু দৃপ্ত প্রতিবাদ রেখেছেন, তা “এইবারে বিশ হাজার টাকা হাতে হাতে আদায়” বাক্যে বিদ্রূপের সর্বোচ্চ রূপে পৌঁছে গেছে। স্বামীর নিষ্ক্রিয়তা, পিতার নিরুপায়তা, এবং সমাজের নির্লজ্জ নিষ্ঠুরতাই এই মৃত্যুতে সমবেত হত্যাকারী। নিরুপমা স্বেচ্ছায় শরীরের প্রতি অবহেলা করে মৃত্যুর দিকে এগোয়—এই মৃত্যু আত্মহত্যা নয়, এক unavoidable সামাজিক হত্যা।
এই গল্পের প্রেক্ষিতে তুলনা টানা যায় প্রেমচাঁদের "কাফন"-এর সঙ্গে, যেখানে দারিদ্র্য আর নৃশংসতার সংমিশ্রণে মৃত্যুর অর্থ হয় এক উদাসীন রসিকতা। আবার "নির্মলা" বা "দাহেজ"-এও নারী চরিত্রদের জীবনের ব্যর্থতা ও মৃত্যুর পেছনে পণ-প্রথা সরাসরি দায়ী।
কিন্তু রবীন্দ্রনাথের শৈলী আরও সূক্ষ্ম, ব্যঙ্গাত্মক— তা আড়াল করে না, এক নির্মম পৃথিবী পাঠককে দেখায় মর্মে গিয়ে।
মাহাশ্বেতা দেবীর "দ্রৌপদী" বা দিনা মেহতার "Brides Are Not for Burning"-এ যে নারীর শরীর হয়ে ওঠে প্রতিরোধের ভূমি, নিরুপমা সেখানে silent resistance—নিজেকে বারবার অমানবিক আচরণের মধ্যেও স্রেফ “টাকার থলি” নয় বরং “এই বাড়ির বধূ” হিসেবে চিহ্নিত করতে চায়।
"দেনাপাওনা"র চরম ট্র্যাজেডি হলো, যেখানে সমাজ ধুমধামে মৃতের মর্যাদা রক্ষা করতে চায়, জীবিতের কান্না সেখানে কোনো মূল্য বহন করে না। এই মৃত্যু কোনো আদালতে দোষী বানাবে না শ্বশুরবাড়িকে, পণপ্রথাকে, কিংবা ছদ্মপতিকে। কারণ সমাজ already acquitted them all in advance।
আজকের দিনে দাঁড়িয়েও, যখন পাত্রীপক্ষকে বলা হয়—“আমরা কিছুই চাই না, তবে একটা গাড়ি, একটা ফ্ল্যাট, আর পঞ্চাশ লক্ষ টাকার সোনাদানা দিলে মন্দ হয় না”, তখন "দেনাপাওনা" আমাদের আবার টেনে আনে এক নির্মম বাস্তবের সামনে। সেখানে আমরা দেখি, নিরুপমা কেবল একটি চরিত্র নয়—সে এক প্রতীক, এক ছায়া, যে আজও ঘুরে বেড়াচ্ছে আমাদের সমাজের প্রতিটি পাত্রী বিজ্ঞাপন, এনগেজমেন্ট পার্টি, আর ফেসবুক লাইভ বিবাহ অনুষ্ঠানে।
রবীন্দ্রনাথ যে সামাজিক দাগ তুলে দিয়েছিলেন নিরুপমার শরীরে, তা আজও মুছে যায়নি। বরং Veena Talwar Oldenburg-এর Dowry Murder: The Imperial Origins of a Cultural Crime বইটি সেই দাগের উৎসে গিয়ে পৌঁছায়। পণ যে কেবল একটি সাংস্কৃতিক প্রথা নয়, বরং ঔপনিবেশিক এবং পিতৃতান্ত্রিক শোষণের যৌথ ফসল—এই ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ যেন ঠাকুরের গল্পের এক বাস্তব-প্রমাণ।
একইসঙ্গে Baby Halder-এর A Life Less Ordinary–এ আমরা দেখি, কীভাবে একজন সাধারণ গৃহবধূ, যাকে অল্প বয়সে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়েছিল, নির্যাতনের চক্র থেকে পালিয়ে এসে নিজের জীবনের গল্প লেখেন। তার জীবনেও পণ ছিল প্রথম ধাক্কা, যা ধীরে ধীরে সহিংসতার দিকে ঠেলে দিয়েছিল।
"দেনাপাওনা" তাই কেবল ইতিহাস নয়—এটি এখনকার ডায়েরির পাতা।
এটি নিছক একটি সাহিত্যকর্ম নয়—এটি প্রমাণ, প্রতিবাদ, এবং পিতৃতন্ত্রের বিরুদ্ধে এক চিরন্তন চিৎকার।
নিরুপমারা মরেন, মরে যান প্রতিদিন, কিন্তু গল্পটি বেঁচে থাকে—জ্বলে ওঠে যখনই কেউ বলে, “আমরা তো শুধু সামান্য কিছুই চেয়েছি।”
এ গল্প আজো সমান প্রাসঙ্গিক। পড়তে উদ্বুদ্ধ করুন আগামী প্রজন্মকে।
অলমতি বিস্তরেণ।