উপক্রমনিকাঃ অমর কথাসাহিত্যিক স্বর্গীয় বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কিশোর ক্লাসিক ‘চাঁদের পাহাড়’। পূর্ব আফ্রিকায় প্রকৃতির কোলে লুকানো বিপুল গুপ্তধন – হীরে। বুনিপ তার রক্ষক। ডিয়েগো আলভারেজ, জন কার্টার, আত্তিলিও গাত্তির মৃত্যুর অভিশাপ নিয়ে সেই সম্পদ হারিয়েই রইল কোনো এক অজানা গুহায়। হারিয়ে ফেলা সেই খনির কয়েকটি হীরে নিয়ে শঙ্কর ফিরে এল তাঁর অজ পাড়াগাঁয়ে। কিন্তু রহস্যময় গুপ্তধন তাঁর পিছু ছাড়ল না। এক জমিদার পরিবারের কোনো এক পুরাতন নকশাকে ঘিরে শুরু হোল শঙ্করের আরেক নতুন অভিযান। ১৯১১ সালের বাংলার ঐতিহাসিক পটভূমিকায়, শঙ্কর ধীরে ধীরে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে গেল গভীর এক রহস্যের জালে। পুরানো মন্দির, মাটির তলায় সুড়ঙ্গপথ, অজানা জংলা গাছ, বিচিত্র পারিবারিক ইতিহাস, আকস্মিক মৃত্যুর আবহে জটিল হয়ে উঠল শঙ্করের অনুসন্ধান। আর শঙ্করের সেই দ্বিতীয় অভিযানের পটভূমিকায় জমে উঠল এই “অভিশপ্ত গুপ্তধন”। সমসাময়িক সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও ভাষার ব্যবহার পাঠককে দেবে শতাধিক বছর পূর্বের ইতিহাস পাঠের বিরল অনুভূতি। - লেখক
কোনো বইয়ের নাম “অভিশপ্ত গুপ্তধন” শুনলে প্রথম প্রতিক্রিয়া কী হয়? আমার অন্তত কপালটা কুঁচকে যায়, কারণ নামের মধ্যেই ‘অভিশাপ’ আর ‘গুপ্তধন’-এর মতো দু-দুটো অতিনাটকীয় শব্দের উপস্থিতি আমার কাছে লেখাটার গুরুত্ব নিদারুণভাবে কমিয়ে দেয়। আলোচ্য উপন্যাসটি, সত্যি বলছি, স্রেফ তার নামমাহাত্ম্যের জন্যই পড়ার কথা ভাবিনি প্রকাশের পর অনেক দিন কেটে গেলেও। কিন্তু লেখক অত্যন্ত সহৃদয় হয়ে আমার মতো রহস্যপিপাসু পাঠক যাতে বইটি পড়ার সুযোগ পান সে ব্যাপারে তৎপর হন, ফলে বইটি আমার কাছে এসে পৌঁছয়। মাত্র ৯৩ পাতার পেপারব্যাকটি পড়তে বেশিক্ষণ লাগল না। আমিও ঝটপট বইটি পড়ে কেমন লাগল সে কথা জানাতে বসে পড়লাম।
কী নিয়ে লেখা হয়েছে বইটি? পাঠকেরা শুনলে খুশি, বা হতাশ হবেন, ১৯১১ সালের বাংলায় এক জমিদারবাড়িতে লুকোনো গুপ্তধন উদ্ধার নিয়ে খুন, জখম, চক্রান্ত, ষড়যন্ত্র, ইত্যাদির এক জটিল ছক কষতে গিয়ে লেখক কোনো নিজস্ব চরিত্র সৃষ্টি করেননি, বরং বিভূতিভূষণের এক ও অদ্বিতীয় চরিত্র শঙ্করকেই তিনি ফিরিয়ে এনেছেন রহস্যভেদী হিসেবে। কিন্তু পার্থ দে-র “চাঁদের উপত্যকা” এবং “রাজহংসীর সরোবর”-এর মতো করে এই কাহিনিতে শঙ্করের কোনো অ্যাডভেঞ্চার আমরা পাইনি। বরং এতে আমরা তার সঙ্কেতলিপি পাঠোদ্ধারের দক্ষতা, এবং ঠান্ডা মাথায় অপরাধীর মুখোশ খুলে ফেলার ক্ষমতার যে পরিচয় পাই, তা বহুলাংশে প্রদোষ চন্দ্র মিত্র, বা তাঁর গৌরবান্বিত পূর্বসূরী জয়ন্ত-মানিকের কথাই মনে করিয়ে দেয়। আর এখানেই লেখকের বিরুদ্ধে আমার মাথায় রাগটা জমতে শুরু করে! বিভূতিভূষণ এডওয়ার্ডিয়ান সময়ের এক “জীবন মৃত্যু পায়ের ভৃত্য, চিত্ত ভাবনাহীন” বাঙালির কীর্তি লিখতে গিয়ে, এমনকি তার চেয়েও কয়েকশো বা হাজার বছরের পুরোনো সময়কে ধরতে গিয়ে যে ভুল করেননি, এই উপন্যাসের লেখক সচেতনভাবে সেটা করেছেন। তিনি ‘ছ’-এর বদলে লাগাতার ‘চ’ বলে, অথচ অন্যত্র বাক্য-গঠনের ব্যাপারে আধুনিক সিনট্যাক্স ব্যবহার করে পিরিয়ড পিসের বদলে একটি হাস্যকর গদ্য নির্মাণ করেছেন। ভূমিকায় সমসাময়িক রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতির ব্যবহারের কথা বললেও লেখক আদৌ সেসব কিছু করতে পারেননি। তার কোনো প্রয়োজনও ছিল না, কারণ এই উপন্যাস আসলে যা নিয়ে, সেই গুপ্তধন উদ্ধার ও আনুষঙ্গিক রহস্যভেদের কাজটা লেখক শঙ্করের মাধ্যমে চমৎকার ভাবে করেছেন, ফলে বাকি আজাইরা প্যাচালের কোনো দরকার হয়নি।
হ্যাঁ, আসল কথা এটাই যে এই গল্পে শব্দের ধাঁধা, নকশা, কবিতা, ছবি, পুরোনো বাড়িতে গুপ্তধন লুকোনোর কৌশল, মন্দির নির্মাণের সঙ্গে জড়িত কিছু পদ্ধতি: এসবই দারুণ ভাবে কাজে লাগানো হয়েছে রহস্যভেদের জন্য। সঙ্গে থেকেছে গল্পের দুরন্ত গতি, এবং লেখকের তরফে হাতের সব তাস দেখানোর মতো করে পাঠকের সঙ্গে প্রতিটি সূত্র ভাগ করে নেওয়ার সততা। ফলে ভাষার বিরক্তিকর ব্যাপারগুলো উপেক্ষা করতে পারলে এটি একটি উপভোগ্য কাহিনি হয়ে ওঠে, যা পাঠককে তার জ্ঞান ও বুদ্ধি প্রয়োগের পর্যাপ্ত সুযোগ করে দেয়।
কিন্তু… কিন্তু বিভা পাবলকেশনস-এর যেক’টি বই আমি আজ অবধি পড়েছি তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছাপার ভুলে কলংকিত এই বইটি! এত অজস্র এবং অকল্পনীয় রকম ভুল পেয়েছি এই বইয়ে, যে মাঝেমধ্যে আশঙ্কা হচ্ছিল, নিজের বানানের ণত্ব-ষত্ব না লোপ পেয়ে যায়! আর, সম্পূর্ণ অনাবশ্যক ও প্রক্ষিপ্ত একটি রোমান্সকে কাহিনির গলায় মৃত সাপের মতো করে জড়ানোর কোনো মানে ছিল না, এটাও বলতেই হচ্ছে।
সামগ্রিকভাবে এটাই বলার যে লেখক আমাদের একটি চমৎকার রহস্যকাহিনি উপহার দিয়েছেন, যার বস্তাপচা নামকরণ, পোকায় কাটা ভাষা, এবং ন্যাপথালিনের গন্ধের মতো অনভিপ্রেত রোমান্সের টোন বাদ দিলে একটি গতিময় এবং বুদ্ধিদীপ্ত চেহারা ফুটে ওঠে। আগামী দিনে নিজের অত্যন্ত শক্তিশালী কলম ও ধীমান মস্তিষ্ক কাজে লাগিয়ে, সেই গতিময় ও বুদ্ধিদীপ্ত কাঠামোর সাহায্যে আরো নির্মেদ ও সোজাসাপটা লেখা তিনি আমাদের উপহার দেবেন, এই আশাতেই রইলাম।