#রিভিউ_অর্কিড_রহস্য_
#অডিওবুক
লেখক - সৈকত মুখোপাধ্যায়
প্ল্যাটফর্ম - মির্চি বাংলা - সান্ডে সাস্পেন্স
আজ ইউটিউবে শুনলাম বিশিষ্ট লেখক সৈকত মুখোপাধ্যায় রচিত অ্যাডভেঞ্চার উপন্যাসিকা “ অর্কিড রহস্য”। উপস্থাপনায় মির্চি বাংলা।
গল্পের পরিবেশনা নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই, তাই অহেতুক সময় নষ্ট না করে সোজাসুজি গল্পটায় যাই।
সৈকত মুখোপাধ্যায় সৃষ্ট বুধোদা এবং রুবিকের সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটল এই প্রথম। বোধিসত্ত্ব ওরফে বুধো এবং তার বন্ধুর খুড়তুতোভাই রুবিক এই উপন্যাসের মূল দুই চরিত্র। একজন হিরো অন্যজন তার সাইডকিক।
বোধিসত্ত্ব একজন অ্যান্টিক ডিলার, সেই সঙ্গে বিশ্বের সব কিছুর প্রতিই তার অল্পবিস্তর জ্ঞান রয়েছে। অদ্ভুত কোনো জিনিসের খোঁজ পেলেই সে বেরিয়ে পড়ে রহস্য উন্মোচনের জন্য এবং বলাই বাহুল্য তার সঙ্গে থাকে রুবিক।
এই গল্পের শুরুতেই গ্যাব্রিয়েল টিলম্যান নামের এক ইংরেজ ভদ্রলোক হঠাৎই এসে বোধিসত্ত্বর সঙ্গে দেখা করে এবং এক অদ্ভুত কালো অর্কিডের কথা জানায়।
গ্যাব্রিয়েলের প্রপিতামহ রিচার্ড টিলম্যান ভারতের মেঘালয় অঞ্চলে এই অর্কিডের সন্ধানে আসেন এবং দন্তুরা নামের এক দেবীর মন্দিরে সেই অর্কিডের সন্ধান পান। তাঁকে সেই মন্দিরে পৌঁছাতে সাহায্য করেন এক হাত কাটা সাধু, কালিনাথ আগমবাগিশ। টিলম্যান সেই অর্কিডের নাম দেন টিলম্যানিয়া রুডিরোপিয়া।
কালো অর্কিড এক দুষ্প্রাপ্য ফুল, এবং সেটি নিয়ে দেশে ফিরতে পারলে যুগান্তকারি কিছু একটা করে ফেলতে পারতেন রিচার্ড টিলম্যান, কিন্তু ফুল সমেত গাছ নিয়ে ফেরার সময় রিচার্ড টিলম্যান পাগল হয়ে যান। জাহাজের একটি বয়কে খুন করতে যাচ্ছিলেন রিচার্ড। তাঁকে গ্রপ্তার করা হয়। জাহাজের কেবিনেই উদ্ধার হয় শুকিয়ে যাওয়া অর্কিডের গাছ। অনেক চেষ্টা করেও সেই অর্কিড থেকে নতুন গাছ সৃষ্টি করতে পারেন নি ইংল্যান্ডের হর্টিকালচার সোসাইটি।
রিচার্ড নিজের ডায়েরিতে সব কথাই লিখে রেখে গেছিলেন। তিনি অর্কিডের সন্ধান পেয়ে ছিলেন সেটা নিজের দেশের হর্টিকালচার সোসাইটিকেও জানিয়েছলেন। সবাই তাঁকে সংবর্ধনা জানাতে তৈরি ছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত রিচার্ড সেই ফুল নিয়ে তাদের সামনে আসতে পারেন নি। আর তাই বোধহয় তিনি পাগল হয়ে যান। অবশ্য ডায়েরির শেষ দিকের পাতা ডায়েরি থেকে মিসিং, তাই রিচার্ড ঠিক কীভাবে অর্কিডটি পেয়েছিলেন সেটা জানা যায় নি। ঘটনাটির সময়কাল ১৯১২ সালের মার্চ থেকে আগস্ট মাস।
যাইহোক, তো এই রিচার্ডের নাতি গ্যাব্রিয়েল, এখন, মানে প্রায় একশ বছর পর, আবারও সেই জায়গাটায় যেতে চায়। অর্কিড থাক আর নাই থাক, একটা চেষ্টা করতে চান গ্যাব্রিয়েল, আর তাই সে বোধিসত্ত্বের সাহায্য চায়।
বোধিসত্ত্ব আর রুবিক, গ্যাব্রিয়েলের সঙ্গে রওনা দেয়। বর্ষাভীষণ সেই পাহাড়ি অঞ্চলে তারা পৌঁছেও যায়, মূলত বোধিসত্ত্বর তৎপরতায়। কিন্তু দন্তুরার মন্দিরে প্রবেশ করেও তারা অর্কিড পায় না। অবশ্য সেখানে তারা প্রচুর কঙ্কাল খুঁজে পায়, এবং তার মধ্যে একটার হাত কাটা। বোধিসত্ত্ব আর রুবিক বুঝতে পারে, রিচার্ডের সঙ্গি হাতকাটা সাধু,কালিনাথ আগমবাগিশ এই মন্দিরে মারা যায়। কিন্তু কেন? এই কেন’র উত্তর পেতে না পেতেই চলে আসে গল্পের আসল টুইস্ট। সেই রাতেই, গ্যাব্রিয়েল হঠাৎ দন্তুরার মন্দিরের পুরোহিতের নাতিকে নিয়ে চলে যায় এবং দন্তুরার বেদিতে বাচ্চাটাকে ছুরি দিয়ে খুন করতে উদ্যত হয়, কিন্তু ঠিক সময়ে পুরোহিত তির দিয়ে গ্যাব্রিয়েলকে হত্যা করে নাতিকে বাঁচিয়ে নেন।
এতদিনের সঙ্গিকে মরে পড়ে থাকতে দেখেও বোধিসত্ত্ব ভাবলেশহীন ভাবে তার শরীরের তল্লাশি করে এবং মৃত গ্যাব্রিয়েলের পকেট থেকে বের করে আনে রিচার্ড টিলম্যানের ডায়েরির ছিড়ে যাওয়া শেষের দিকের পাতাগুলো। আজ্ঞে হ্যাঁ, গ্যাব্রিয়েল নিজেই ডায়েরির পাতাগুলো ছিঁড়ে নিজের সঙ্গে নিয়ে ঘুরছিলেন।
তাহলে এবার প্রশ্ন আসছে, কেন? কেন গ্যাব্রিয়েল পুরোহিতের নাতিকে খুন করতে গেল?
কেন? তার দাদুর ডায়েরির পাতাগুলো তার পকেটে পাওয়া গেল? এবং কেনই বা সে এত কান্ড করে এই নিজের দেশ থেকে এতদূর এসে হাজির হল? কী তার উদ্দেশ্য?
উত্তর দিল বোধিসত্ত্ব..
সে বলল, গেব্রিয়েলের সঙ্গে যাত্রা শুরুর আগে, সে নাকি তার ব্যাপারে খোঁজ খবর নিয়েছিল। সে জানতে পেরেছিল, গ্যাব্রিয়েল চরম আর্থিক দূর্গতির মধ্যে আছে, উপরন্তু সে জুয়াড়ি। কিন্তু এত আর্থিক অবনতির মধ্যেও সে এই অ্যাডভেঞ্চারে নামল কেন? কারন এই রোমাঞ্চকর যাত্রার কাহিনি টিভি এবং প্রিন্ট মিডিয়া চড়া দামে কিনে নেবে।
আর তাই তার ভারতে আসা এবং বোধিসত্ত্বের সাহায্য নিয়ে মেঘালয় যাত্রা করা।
আচ্ছা বেশ। কিন্তু গ্যাব্রিয়েল কেন পুরোহিতের নাতিকে খুন করতে চাইল? সেই কেন’র উত্তর পেতে গেলে আগে জানতে হবে রিচার্ডের ডায়েরির শেষ পাতাগুলো গ্যাব্রিয়েল ছিড়ে দিয়েছিল কেন? কারণ, রিচার্ড তার ডায়েরির শেষ পাতায় একজনকে খুন করার কথা লিখে রেখেছিলেন। কাকে খুন? সেই হাত কাটা সাধুকে। হ্যাঁ..যে হাত কাটা সাধুর সাহায্যে রিচার্ড দন্তুরার মন্দিরে আসেন, সেই সাধুকেই তিনি ওই মন্দিরে খুন করে রেখে যান। কিন্তু কেন? কারন, কালো অর্কিড মানুষের রক্ত পেলে তবেই জন্মায়। দন্তুরার মন্দিরে আলো প্রবেশের পথ নেই, তাই ক্লোরোফিল যুক্ত গাছ জন্মাবার উপায় নেই, এমতাবস্থায় দেবীর মন্দিরের বলি প্রদত্ত মানুষের রক্ত থেকেই পুষ্টি নিয়ে জন্মায় কালো অর্কিড। এই ব্যপারটা রিচার্ড আগেই বুঝে গেছিলেন, আর তাই সে সাধুকে খুন করে, তার রক্তের সাহায্যেই রাতারাতি অর্কিড ফুটিয়ে সেখান থেকে ইংল্যান্ড রওনা দিয়েছিলেন। কিন্তু জাহাজে করে যেতে যেতে সেই গাছ পুষ্টির অভাবে শুকিয়ে যেতে থাকে, আর তাই রিচার্ড জাহাজের একটি বয়কে খুন করে তার রক্ত দিয়ে গাছ টাকে বাঁচাতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তার আগেই তিনি ধরা পড়ে যান। আর ঠিক, এই একই কারণে রিচার্ডের নাতি গ্যাব্রিয়েলও খুন করতে চায় পুরোহিতের নাতিকে। তার রক্ত দিয়েই সে কালো অর্কিড ফোটাতে চেয়ে ছিল।
এত কিছু বোধিসত্ত্ব নিজেই ব্যাখা করে বলল। অর্কিডের জন্য মানুষের রক্তের প্রয়োজন সেটা সে আগেই বুঝে গেছিল। কী ভাবে? ওই রিচার্ডের দেওয়া অর্কিডের নামটা থেকে। রিচার্ড সেই অর্কিডের নাম রাখেন টিলম্যানেরা রুডিরোপিয়া। টিলম্যানেরা নামটা সে রেখেছিল নিজের পদবির সঙ্গে মিলিয়ে, কিন্তু রুডিরোপিয়া নামটা তিনি রেখেছিলেন হাতকাটা সাধুর মুখে শোনা রুধিরপ্রিয়া অর্থাৎ রক্তপিপাসু কথাটা থেকে।
যাইহোক, এই হচ্ছে গল্প। দুর্দান্ত একটা কল্পবিজ্ঞান ভিত্তিক অ্যাডভেঞ্চার গল্প… হতে পারত… যদি না গল্পটার গলায় রুধিরপ্রিয়ার মত প্লট হোলের মুন্ডমালা ঝুলত…
প্লট হোল -
১. দেবী দন্তুরার মন্দির মেঘালয়ে। মেঘালয় একটি বর্ষনপ্রবল অঞ্চল। তাছাড়া গল্পে একাধিক বার বলা হয়েছে দন্তুরার মন্দিরের জল জমার কথা, তাছাড়া সেই মন্দিরে আলো প্রবেশ করে না। আর তাই, এই রকম পরিবেশে হাতকাটা সাধুর অস্থি একশ বছর ধরে টিকে থাকাটা অসম্ভব। মানুষের অস্থি একশ কেন, হাজার বছর ধরেও অক্ষত থাকতে পারে কিন্তু সেটা শুক্ন পরিবেশে অথবা মাটির নীচে। ভেজা স্যাঁতস্যাঁতে পরিবেশে হাড় দ্রুত ডিকম্পোজ হয়ে যায়। তাই রুবিকদের পক্ষে দন্তুরার মন্দিরে একশ বছর আগে মৃত মানুষের অস্থি খুঁজে পাওয়াটা একেবারেই অবাস্তব।
২. বোধিসত্ত্ব যাত্রা শুরুর আগেই জানতেন গ্যাব্রিয়েল গলা পর্যন্ত দেনায় ডুবে আছে, সে জুয়াড়ি এবং পুলিশের খাতায় নাম আছে, তবুও বোধিসত্ত্ব তার সাথে এরকম বিপদজনক যাত্রায় যেতে রাজি হল এবং সেই সঙ্গে ক্লাস ইলেভেনের ছাত্র রুবিককেও নিল…বেশ!
৩. গ্যাব্রিয়েলে চাইলে দাদুর ডায়েরিটাই নিজেদের দেশের টিভি আর মিডিয়াকে দিতে পারত। এর জন্যে নিজের অ্যাডভেঞ্চারাস হওয়ার দরকার ছিল না। ১৯১২ সালে রিচার্ড টিলম্যান ভারত থেকে ফেরার সময় যথেষ্ট বিতর্কের সৃষ্টি করেছিলেন, খুনের চেষ্টা করার ফলে তাঁকে গ্রেফতার পর্যন্ত করা হয় এবং গারদেই তাঁর মৃত্যু হয়। এরকম একটা লোকের লেখা ডায়েরি, তাও একশ বছর পর… সেটা খোদ একটা অ্যান্টিক! সেটার মূল্য কালো অর্কিডের চেয়ে কম কিছু হত কী? মনে হয় না…
আর যদি গ্যাব্রিয়েল নিজের যাত্রাকাহিনি দেশে গিয়ে বিক্রি করার কথা ভাবত তাহলে সেটা সে রেকর্ড করত। সালটা ২০১২! কিন্তু গল্পের কোথাও গ্যাব্রিয়েল সব কিছু রেকর্ড করছেন এমন কথা বলা নেই!
এবং…সব শেষে
৪। ওরে ভাই, অর্কিড মানুষের রক্ত পেয়ে ফোটে ঠিকই কিন্তু তার জন্য মানুষ খুন করার কী দরকার? মানুষের রক্তের বৈশিষ্ট্য আরও অনেক প্রানীর হয়। গরু এবং শুয়োর তাদের মধ্যে সহজলভ্য…আগে তাদের দিয়ে চেষ্টা করে দেখতিস, সফল না হলে না হয়…
যাইহোক…আরও আছে, কিন্তু এই চারটেই তুলে ধরলাম।
কারও যদি এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জানা থাকে তাহলে বলে যাবেন দয়া করে…নাহলে বুধোদার গল্পটা আমার কাছে হযবরল-তে বলা বুধোর সেই গল্পের আধুনিক সংস্করণ ছাড়া আর কিছুই মনে হবে না।
পবিত্র ঘোষ