বাংলার বিখ্যাত ‘দাদা সিরিজ’-এ নবতম সংযোজন বুধোদা, ভালো নাম বোধিসত্ত্ব মজুমদার। পোশাকে-আশাকে সে ভয়ংকর মডার্ন, ল্যাপটপ আই-ফোন ছাড়া এক পা হাঁটে না-অথচ নেশা অ্যান্টিক-হান্টিং। তার কিশোর সঙ্গী রুবিক। সারা পৃথিবীর অর্কিড-সংগ্রাহকদের স্বপ্ন কালো অর্কিড – আজ অবধি যে অর্কিড কেউ চোখে দ্যাখেনি, অথচ সকলেই বিশ্বাস করে কোথাও না কোথাও লুকিয়ে রয়েছে সেই আশ্চর্য ফুল। মেঘালয়ের জঙ্গলে সেই ব্ল্যাক অর্কিডের রক্তাক্ত অস্তিত্ব নিয়েই প্রথম কাহিনি ‘অর্কিড রহস্য’। ক্যামেরা কিংবা এরোপ্লেন আবিষ্কার হওয়ার অনেক আগে আকাশ থেকে তোলা এক অবিশ্বাস্য ছবি থেকে দ্বিতীয় কাহিনি ‘মাদলপাহাড়ের বামনসন্ন্যাসী’র সূত্রপাত। হিমাচলের নাগোয়ার গ্রামের নাগদেবতার সোনার মূর্তি বছরে একদিনই ব্যাঙ্কের ভল্টের বাইরে বেরোয়- স্নানযাত্রার দিন। কেন ঠিক তার ক’দিন আগে খুন হলেন নাগোয়ার-মন্দিরের পুরোহিত? এই নিয়েই বুধোদা আর রুবিকের তৃতীয় অ্যাডভেঞ্চার ‘হিমাচলের হেঁয়ালি’।
তাঁর জন্ম এবং বড় হওয়া হুগলি জেলার উত্তরপাড়ায়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরাজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর উপাধি অর্জনের পরে তিনি রাজ্য সরকারের অধীনে আধিকারিক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। দীর্ঘ দুই-দশকের লেখক-জীবনে তিনি প্রাপ্তবয়স্ক এবং কিশোর-সাহিত্য, উভয় ধারাতেই জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য তিনি যখন গল্প-উপন্যাস লেখেন, তখন ঘটনার বিবরণের চেয়ে বেশি প্রাধান্য দেন মানব-মনের আলোছায়াকে তুলে আনার বিষয়ে। লেখকের প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা পঞ্চাশের কাছাকাছি। তাঁর বহু কাহিনি রেডিও-স্টোরি হিসেবে সামাজিক মাধ্যমে সমাদর পেয়েছে। সাহিত্যে সামগ্রিক অবদানের জন্য তিনি পেয়েছেন দীনেশচন্দ্র স্মৃতি পুরস্কার এবং নান্দনিক সাহিত্য সম্মান।
'আমি সামান্য একজন অ্যান্টিক হান্টার শ্রীবাস্তব সাহেব। শিল্প সন্ধানী। তবে কি জানেন --- কোনও ক্রাইম, যদি নিখুঁতভাবে করা যায়, তাহলে সেটাও একটা শিল্প।'
এই হলো আমাদের গল্পের মূল কান্ডারী। সুলেখক সৈকত মুখোপাধ্যায়ের কলমের আঁচড়ে বাংলা সাহিত্যের এই নবাগত দাদা, বোধিসত্ত্ব মজুমদার ওরফে বুধোদা। সাথে অনুগত স্যাটেলাইট রুবিক। ক্লাস ইলেভেনের ছেলে রুবিকের ভালো নাম মাল্যবান মিত্র। এই বইয়ের গল্পগুলো সব তার দৃষ্টিভঙ্গিতেই লেখা। সরল, নির্ভেজাল কিছু অ্যাডভেঞ্চার কাহিনী নিয়ে লেখা এই সংকলনটি হয়তো প্রবাদপ্রতিম নয়, তবে এক নিমেষে পড়ে ফেলার মতন বটেই। ভ্রমন, রোমাঞ্চ, অভিযান। দোসর হিসেবে বিনামূল্যে বুধোদার অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার সমাবেশ। আফসোস হয়, যদি আরো কম বয়সে গল্পগুলো পেতাম!
সংকলন জুড়ে তিনটে নাতিদীর্ঘ উপন্যাসিকা।
প্রথম গল্প, 'অর্কিড রহস্য', অ্যাডভেঞ্চারগামী। শুরুর বেশ কিছু অংশ ব্যয় হয় প্রাথমিক পরিচয়পর্ব দিয়ে। বুধোদার বনেদিয়ানা, তার অ্যান্টিক নিয়ে অঢেল জ্ঞান, ইতিহাস ও সংস্কৃতির প্রতি আবেগী টান, আবার সেই তারই আই-ফোন জাতীয় আধুনিক প্রযুক্তির প্রতি নিদারুণ আসক্তি, সবটাই বলে যায় রুবিকের কলম। এবং এর কিছুক্ষনের মধ্যেই গ্যাব্রিয়েল টিলম্যান ও বুধোদাদের সঙ্গে আমরা পাঠকেরা বেরিয়ে পড়ি এক আশ্চর্য অভিযানে। সত্যিই কি মেঘালয়ের গহীন অরণ্যে পাওয়া যায় দুর্লভতম কালো অর্কিড? পাওয়া গেলে সেই গাছের সন্ধান কি সত্যি পেয়েছিল গ্যাব্রিয়েলের পূর্বপুরুষেরা? প্রশ্ন অনেক। এবং পাঠকেরা অদূরেই মেতে ওঠে এক দুর্দান্ত পরিসমাপ্তির সন্ধানে। আফসোস একটাই, গল্পটিকে এত স্বল্প-কলেবরে রচনা করাতে, কিছুটা হলেও কাহিনীর কার্যকারিতা হ্রাস পায়।
দ্বিতীয় গল্প, 'মাদলপাহাড়ের বামনসন্ন্যাসী', সাইফাই ঘরানার। বুধোদার হাতে আসে পাঁচশ বছর পূর্বের এক আশ্চর্য ছবি। অধুনা পৃথিবীতে যাকে বলা হয় স্যাটেলাইট ইমেজারি। যেই সময়কালে ক্যামেরা বা উড়োজাহাজের অস্তিত্বই পৃথিবীতে হয়ে ওঠেনি, সেই সময়ের দলিল হিসেবে কোন অতিলৌকিক রহস্যের হদিস দেয় সেই ছবি? কোন রহস্যের ভয়াল ইতিহাস বুকে নিয়ে জেগে আছে মাদলপাহাড়? কেই বা সেই বামনসন্ন্যাসী ও সদাহাস্যময় গুঙ্গাদানো? একরাশ অদ্ভুত প্রশ্নের সমুক্ষিন হয়ে বেরিয়ে পড়ে বুধোদা ও রুবিক। পাঠক হিসেবে আমাদের আফসোস, যে শুরুর এই রোমাঞ্চ লেখক শেষ পর্যন্ত জিইয়ে রাখতে পারেন নি। গল্পটি তাই সংকলনের সবথেকে দুর্বলতম অংশ। শেষে গিয়ে সবটাই বিশ্রীরকমের ল্যাজেগোবরে হয়েছে।
শেষ গল্প, 'হিমাচলের হেয়ালি', নিখাদ রহস্য কাহিনী। গন্তব্য এবারে হিমাচল প্রদেশের নাগোয়ার গ্রাম। সেই গ্রামের মোগল আমলের জাগ্রত নাগদেবতার মূর্তি দর্শন হেতুই বুধোদা ও রুবিকের যাত্রা। দুর্মূল্য সেই সোনার মূর্তি এবং কিছু রহস্যময় চরিত্রকে ঘিরে পুঞ্জীভূত হয় রহস্য। বিপদ এগিয়ে আসে বিপদের ন্যায়ে, সুগভীর এক চক্রান্তের দামামা বাজে নাগোয়ারের সুন্দর পাহাড়ি জীবনে। সংস্কৃতি ও ইতিহাসকে বাঁচানোর দায়ে, তাই প্রায় ডিটেকটিভ রূপে মঞ্চে নামে বোধিসত্ব মজুমদার। গল্পটি মোটের ওপর প্রেডিকটেবল হলেও, লেখনীর মুনশিয়ানা ও রোমাঞ্চকর গতি, গল্পটিকে দিব্যি উৎরে দেয়। ভালো লাগে বুধোদা ও রুবিকের চরিত্রায়নও। দুজনের মাঝের রসায়ন খুব উপভোগ্য। লেখক সৈকত মুখোপাধ্যায় এখানেই এতো সফল। যারা তার উমাশঙ্কর চৌবেসাহেবের গল্পগুলো পড়েছেন, তারা জানেন, কেবল সাবলীল সংলাপ ও চরিত্রায়নে অভিনবত্ব দিয়ে, গড়পড়তা প্পটকে উপাদেয় করে দেওয়ার তার এই ক্ষমতার কথা। এই গল্পেও সেটার অন্যথা হয় না।
নতুন সংস্করণের প্রচ্ছদখানিও ভারী খাসা। তবে কিনা বেশ কিছু জায়গায় ছাপা ও বানানের গলদ, পাঠ অভিজ্ঞতায় চিরতা রূপে আবির্ভূত হওয়ায় বইটির কপালে সর্বসাকুল্যে জুটছে তিন তারা। বুধোদার অন্যান্য অভিযান পড়বার ইচ্ছে নিয়ে আমি এই বিদেয় হলুম।
“পত্র ভারতী” থেকে জানুয়ারি ২০১৭-য় প্রকাশিত, ১৭৫/- টাকা মূল্যের এই ১৫২ পৃষ্ঠার সুমুদ্রিত হার্ডকভারটিতে স্থান পেয়েছে বুধোদা-রুবিক জুটির তিনটি রহস্যভেদের উপাখ্যান। বইটির নীলমণি রাহা-কৃত প্রচ্ছদ ঢ্যাবঢেবে, এবং ভেতরে নচিকেতা মাহাত-এর অলঙ্করণ তাঁর অন্যান্য কাজের নিরিখে দস্তুরমতো হতাশাজনক। আরো দুঃখের বিষয় হল, বইয়ের প্রথম প্রকাশ-সংক্রান্ত কোনো তথ্যই দেওয়া হয়নি। বাংলা সাহিত্যে দাদাগিরির ঐতিহ্য সুপ্রাচীন। সৃজনশীলতার শীর্ষে থাকা, এবং পাঠকের নাড়ি বোঝায় প্রায় আরোগ্য নিকেতনের জীবন মশাইয়ের মতোই কুশল এক সাহিত্যিক যখন সেই ঘরানায় আমাদের কাছে পেশ করেন এক নতুন ‘দাদা’, তখন প্রত্যাশার পারদ স্বাভাবিক ভাবেই চড়ে যায়। উত্তরপাড়ার বনেদি মজুমদার পরিবারের সদস্য, অ্যান্টিক-হান্টার এবং দুর্লভ বা অদ্ভুত জিনিসের সন্ধানে তৎপর বোধিসত্ত্ব তথা বুধোদা-কে প্রচলিত অর্থে রহস্যভেদী বলা যায় না। কিন্তু অ্যান্টিকের খোঁজ প্রায়ই যে অ্যাডভেঞ্চারে (বা ‘ব্যাড’ ভেঞ্চারে) পরিণত হয়, একথা সকলেই জানেন। তাই বুধোদার ফ্যান তথা বন্ধুতুতো ভাই রুবিক, যার ভালো নাম মাল্যবান মিত্র, যদি তেমনই কিছু অ্যাডভেঞ্চারে শরিক হয়ে সেই গল্পগুলো পেশ করে, সেগুলো গোগ্রাসে গিলতেও আমাদের আপত্তি হওয়ার কথাই নয়। সেগুলো পড়ে কেমন লাগল, তা জানাতেই আজ কি-বোর্ড নিয়ে পড়েছি।
এই বইয়ের প্রথম উপন্যাস “অর্কিড রহস্য”। লেখাটি আদিতে প্রকাশিত হয়েছিল ২০১২-র শারদীয়া ‘সন্দেশ’-এ। এই লেখার প্রারম্ভিক অংশটা ব্যয় হয়েছে বুধোদা ও রুবিকের সঙ্গে আমাদের পরিচয় করাতে। আর তারপরেই আমরা জড়িয়ে পড়েছি কালো অর্কিডের সন্ধানে এক দারুণ অভিযানে। কালো অর্কিড কি সত্যিই ফোটে? কোথায় পাওয়া যাবে তাকে? একশো বছর আগে কেউ কি সত্যিই খুঁজে পেয়েছিলেন কালো অর্কিড? লেখাটা পড়তে গিয়ে কৌতূহল, সাসপেন্স, চমক, এবং ভয় প্রায় ঠাণ্ডা জলের কণার মতোই গড়িয়ে গেছে আমার মেরুদণ্ড দিয়ে, বারবার। মন খুলে লিখি, তথ্য আর রোমাঞ্চের সংমিশ্রণে এমন দুর্ধর্ষ উপন্যাস বাংলা শিশু-কিশোর সাহিত্যে বড়োই দুর্লভ। এখনও যদি লেখাটা না পড়ে থাকেন, তাহলে স্রেফ এটির জন্যই বইটি হস্তগত করতে পরামর্শ দেব।
দ্বিতীয় উপন্যাস “মাদলপাহাড়ের বামনসন্ন্যাসী”। এই লেখাটি আদিতে প্রকাশিত হয়েছিল ২০১৪-র শারদীয়া ‘চিরসবুজ লেখা’-য়। পাঁচশো বছর আগে ক্যামেরা আবিষ্কৃত হয়নি। আকাশ থেকে কোনো জায়গার ফটো নেওয়া তো দূরের কথা, জায়গাটা দেখার জন্য ওড়াই অসম্ভব ছিল। তাহলে মাদলপাহাড়ের ওপর লেক আর তার আশপাশের ছবি, সেই সময়ে, কে তুলল? আজও কেন মাদলপাহাড় স্থানীয় আদিবাসীদের কাছে এক অভিশপ্ত জায়গা, গল্পে শোনা রুপোর পাতের সন্ধানে যেখানে গেলে বামনসন্ন্যাসীর অভিশাপ নেমে আসে ভয়াবহ চর্মরোগ হয়ে? এই গল্পটা, দুর্দান্তভাবে শুরু হয়েও, কেমন যেন, ফ্যানের তলায় বেশিক্ষণ রাখা মুড়ির মতোই মিইয়ে গেল। তাই বুধোদা’র ওপর ভক্তিটাও একটু কমে গেল।
তৃতীয় উপন্যাস “হিমাচলের হেঁয়ালি”। এই লেখাটি প্রকাশিত হয়েছিল ৫ই জানুয়ারি ২০১৫-র ‘আনন্দমেলা’ বিশেষ গল্প-সংখ্যায়। কর্মসূত্রে সেসব লুকোনো জিনিয়াসদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হয় বুধোদাকে, তাদেরই একজনের ফোন ক’দিন ধরে সুইচড অফ। এদিকে তার গ্রাম নাগোয়ার-এ নাগদেবতার সোনার মূর্তিকে চাক্ষুস দেখার বিরল সুযোগ সামনেই। তাই বুধোদা আর রুবিকের আগমন হল সেই গ্রামে। তারপর হঠাৎ করেই সামনে আসতে শুরু করল একের-পর-এক তথ্য, যাদের একসঙ্গে জুড়লে একটা মারাত্মক ছবি ফুটে ওঠে। আর তারপরেই হল খুনটা! তারপর কী হল? গল্পটা সলিড। হাতের প্রায় সব তাস পাঠককে দেখানো বলে রুবিকের চেয়ে অনেক আগেই পাঠক বুঝে ফেলবেন কী ঘটছে, এবং এরপর কী ঘটতে চলেছে। কিন্তু... কিন্তু অপহরণ, খুন, এসব আমরা সেই ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’ থেকে দেখে অভ্যস্ত ছিলাম। তার সঙ্গে, গল্পের ওয়াটেজ বাড়ানোর চেষ্টায় আনা কিছু উষ্টুম-ধুষ্টুম উপকরণ এসেই গল্পটা হিন্দি সিনেমা বানিয়ে ফেলল। এবং আমি বইটা বন্ধ করতে-করতে ভাবলাম, পরের কাহিনিতে আমরা কি আবার পেতে পারি কোনো নতুন চমক, যা এই জুটির মাধ্যমে সত্যান্বেষণকে আবার ফিরিয়ে দেবে ‘অর্কিড রহস্য’-র উচ্চতায়?
ইতিমধ্যে, বইটা যদি এখনও পড়ে না থাকেন, তাহলে দয়া করে দেরি করবেন না। পুজো আগতপ্রায়। পূজাবার্ষিকীর ভারে বেঁকে যাওয়া টেবিলে আরো একটা বই নাহয় তুলেই ফেললেন। পড়ে ফেলুন।
ব্ল্যাক অর্কিডে মূলত তিনটা উপন্যাসিকা মলাটবন্দী হয়েছে। গল্পগুলোও মন্দ নয়। বিশেষত প্রথম আর তৃতীয় গল্পটা ভালো লেগেছে। কিশোর বয়সে পড়লে সম্ভবত চার তারাই দিতাম।
বাংলা সাহিত্যে দাদা’র সংখ্যা নেহায়েত কম না। ফেলুদা, টেনিদা থেকে শুরু করে গুলবাজ ঘনাদা পর্যন্ত। এবার নতুন একজন দাদা’র সাথে পরিচিত হওয়া যাক, নাম বুধোদা। ভালো নাম বোধিসত্ত্ব মজুমদার। মজুমদার-ফ্যামিলির ট্রান্সপোর্টের ব্যবসা না করে নিজে অ্যান্টিক গুডসের ব্যবসা খুলেছে। নিজেকে ও বলে ‘অ্যান্টিক হান্টার’। বুধোদা ডিটেকটিভ না তবে বিভিন্ন জায়গায় অ্যান্টিক বিজনেস করতে গিয়ে অনেক অদ্ভূত ও শিউরে উঠা ঘটানার সম্মুখীন হতে হয়। যার কোনাটা অ্যান্টিক গুডস স্মাগলিং, কোনোটা খুন-খারাবি বা কোনো কেসে অ্যান্টিক এক্সপার্ট হিসেবে পুলিশকে সাহায্য করা। বুধোদার ঘটনাগুলো শুনা যায় মাল্যবান মিত্রের মুখ থেকে, ডাকনাম রুবিক। বুধোদা রুবিকের জ্যাঠতুতো দাদার বন্ধু। মূল ক্যারেক্টারের বর্ণনা গেল, এবার বইয়ের গল্পগুলো নিয়ে আলোচনা করা যাক।
১. অর্কিড রহস্য :- টিলম্যানরা বংশানুক্রমে আর্ল অফ নরফোকের বাগানের মালি। রিচার্ড টিলম্যান ভারতবর্ষে অর্কিডের খুঁজে এসে মেঘালয়ের উপজাতিদের মন্দিরে পেয়েছিলেন এক আশ্চর্য প্রাজাতির অর্কিড, ব্ল্যাক অর্কিড। যে অর্কিডের জন্য পৃথিবীর সব অর্কিড হান্টাররা গত দেড়শ বছর ধরে বৃথাই দৌড়াচ্ছে। এই অর্কিডের বৈজ্ঞানিক নামকরণও করেছেন- ‘টিলম্যানিয়া রুডিরপিয়া’। কিন্তু লন্ডনে পৌঁছানোর আগেই তার আচরনে পরিবর্তন দেখা দেয়, রিচার্ড উন্মাদনা শুরু করেন। তার হাতে জাহাজের কেবিন বয় খুন হতে গিয়ে বেঁচে যায়। সাথে ব্ল্যাক অর্কিডের গাছটাকেও বাঁচানো গেলোনা। সেই বংশের ছেলে গ্যাব্রিয়েল টি লম্যান(গ্যাবি) বাড়ির চোরাকুঠুরি থেকে তার দাদুর দাদু রিচার্ড টিলম্যানের শতবছর পুরোনো ডায়েরি খুঁজে পায়। ডায়েরি থেকে উপজাতিদের সেই মন্দিরে যাওয়ার একটা অস্পষ্ট মানচিত্র পাওয়া যায়। বুধোদার সাহায্যে গ্যাবি কি পারবে তার দাদুর দাদুর সেই আশ্চর্য অর্কিড আরোও একবার খুঁজতে! তাকে স্মৃতিকে সম্মান জানাতে! আর রিচার্ডের আরচনের হঠাৎ পরিবর্তনেরই বা কারন কি?
গল্পটা অসাধারন। পুরোটা গল্প মুগ্ধ হয়ে পড়লাম। রেটিং- ৫/৫
২. মাদলপাহাড়ের বামনসন্ন্যাসী:- কবিরাজ রঘুনাথ দ্বিবেদী বুধোদাকে চিঠি পাঠিয়েছেন। রঘুনাথ লিখেছে, ‘তার প্রয়োজনের ঔষধি গাছ-লতাপাতার খোঁজে মৌডুংরিতে পৌঁছে সেখানের সর্দারের মুখে জানতে পারে মৌডুংরির পাশের মাদল পাহাড়ে এক বামন সন্ন্যাসী থাকে, যার বয়স পাঁচশ বছরের বেশি। পাহাড়ের নিচে আংরাগুহায় সন্ন্যাসীর ও তার লীলাখেলার গুহাচিত্র পাওয়া যায় আর তাতে বাস করে গুঙ্গাদৈত্য। মৌডুংরির কেউ সন্ন্যাসীর মাদল পাহাড়ে যায় না, আগে যেই গিয়েছে ফিরে আসার পর বেশিদিন বাঁচেনি, আবার কেউ চর্মরোগে আক্রান্ত হয়েছে। কৌতুহলী রঘুনাথ রাতের অন্ধকার রওনা হয় মাদল পাহাড়ের উদ্দেশ্যে। মাদল পাহাড়ে হ্রদ এর পাশে একটা গর্তে রূপার মতো ধাতব পদার্থ ছড়িয়ে রয়েছে। খালি জায়গায় দু-তিনটে চৌকোনা রয়েছে যার একটায় শুধু একটা সিন্দুক রয়েছে এবং এর ভেতর কিছু কাপড় ও একটা ছবি।’ ছবিটার একটা কপি রঘুনাথ বুধোদাকে পাঠিয়েছে। গুগলে মাদল পাহাড়ের স্যাটেলাইট ছবি দেখতে গিয়ে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা খায়, পাহাড়ের স্যাটেলাইট ছবি আর রঘুনাথের পাঠানো ছবিটা হুবহু এক এবং ছবিটা চারশ বছরের পুরনো। ক্যামেরা, এরোপ্লেন আবিষ্কার হওয়ার আগে আকাশ থেকে তোলা ছবি। সন্ন্যাসীর সিন্দুকে কীভাবে এলো এই ছবি? এর সাথে বামুনসন্ন্যাসীর ও গুঙ্গাদৈত্যের সম্পর্ক কী?
শেষটা একটু কমন হয়ে গিয়েছে। তবে ভালো ছিল। রেটিং- ৪.৩/৫
3. হিমাচলের হেঁয়ালি:- বুধোদা এবার রুবিককে নিয়ে বেড়াতে গেলেন হিমাচল প্রদেশের নাগোয়ার গ্রামে। নাগোয়ার দেবতার (নাগ দেবতা) মন্দিরকে ঘিরে ধাপে ধাপে নেমে গেছে ঘরবাড়ি, ফসল খেত আর চারপাশে পাহাড়ের ঢেউ। ঔরঙ্গজেবের পুত্র বাহাদুর শাহ ডোগরা ফ্যামিলিকে এই মন্দির তৈরী করে দিয়েছিলো। ঐ গ্রামে বুধোদার পূর্ব পরিচিত বিরাজ সিং উধাও। ফোনও সুইসড অফ। অন্যদিকে নাগদেবতার সোনার মূর্তি ব্যাঙ্কের ভোল্ট থেকে বের করা হয় স্নাসযাত্রার দিন, এর আগেরদিন মন্দিরের প্রধান পুরোহিত খুন হয়ে যায় এবং খুনের স্হানে পাওয়া গিয়েছে বিরাজের নাম খুদাই করা হাতুরি। বিরাজের অন্তর্ধান, মেলার আগে পুরোহিত খুনও। গ্রামে কিছু একটা ধেয়ে আসছে বুধোদা বুঝতে পারছে। তবে কি আসছে এখনও ধরতে পারছে না।
ভালো লাগেনি। এক তৃতীয়াংশ পড়ার পর অনুমান করা গেছে কালপ্রিট কে আর কি হতে যাচ্ছে। রেটিং - ৩.৫/৫
ওভারঅল পুরো বইয়ের জন্য ৪.৩/৫
সৈকত মুখোপাধ্যায়ের ‘মৃত্যুর নিপুণ শিল্প’ আগে পড়া ছিল। বইটিতে তিনটি পল্প রয়েছে ‘মৃত্যুর নিপুণ শিল্প, মাননীয় অমানুষ, ঘাতকের মুখ’। তিনটি গল্পই ভালো ছিলো তবে বিশেষ করে ‘মৃত্যুর নিপুণ শিল্প’ গল্পটা অসাধারন। লেখনী খুব সুন্দর, প্রত্যেকটা গল্প ৪০-৬০ পেইজের হয় তাই সহজেই পড়ে ফেলা যায়। ভদ্রলোকের লেখা উপভোগ করবেন শিউর।
গল্প ১: সুদূর লন্ডন থেকে বুধোদার কাছে এসেছে গ্যাব্রিয়েল টিলম্যান; গ্যাবি। সে এসেছে তার দাদুর একটি ডাইরিতে ভারতের এক জঙ্গলে ব্ল্যাক অর্কিডের খোঁজের ঠিকানা পেয়ে।বুধোদার সহায়তায় সে ঘুরে আসতে চায় সেই দুর্গম পার্বত্য এলাকায়। স��গ্রহ করতে চায় দুনিয়ায় সকলের অদেখা সেই, ব্ল্যাক অর্কিড।
গল্প ২: বুধোদার হাতে হোতাহী এসেপৌঁছিয়েছে ঝাড়খণ্ডের দলমা পাহাড়ের একটি ছবি। সে ছবি খুব সাধারণ নয়। প্রায় ৫০০ বছর আগের দলমা পাহাড়ের ছবি, যেন স্যাটেলাইটের নেয়া ছবি। google earth এর সাথে মিলে যায় সেই ছবি। কিন্তু ৫০০ বছর আগে যখন ক্যামেরাই ছিল না; তখন কে তুললো এই ছবি? সন্ধানে নামলো বুধোদা।
গল্প ৩: হিমাচল নাগোয়ার গ্রামের, নাগদেবতার সোনার মূর্তি বছরে একবারই বের করা হয় ব্যাংক ভল্ট থেকে - স্নান যাত্রার দিন। এই স্নান যাত্রা দেখতে এসে খবর পেলো তার এক বন্ধু নিখোঁজ। এরই মধ্যে খুন হলেন মন্দিরের পুরোহিত। বুধোদার সিক্সথ সেন্স বলছে এই দুই ঘটনাই জড়িয়ে, নেপথ্যে হয়তো চলছে নাগদেবতার সোনার মূর্তি লোপাটের ষড়যন্ত্র। কিন্তু এতো মানুষের সামনে দিয়ে কি ভাবে আসবে আঘাত?বুধোদা কি পারবে নাগোয়ারকে বাঁচাতে??
আজ সকালে শুরু করেছিলাম বইটা। নামিয়ে রাখতে পারিনি। সারাদিন কাজের ফাঁকে পরে শেষ করে ফেলেছি। প্লট গুলো আমার বেশ ভালো লেগেছে, যদিও এরকম প্লট অনেক গল্পেই পড়াকারণ adventure গল্পের প্লট অবশ্য মোটামুটি এরকমই হয়। আমার বিশেষ ভাবে যেটা ভালো লেগেছে, তা হলো প্রকৃতির বর্ণনা। খুব সুন্দর করে, যতটা প্রয়োজন ততটাই বর্ণনা দিয়েছেন লেখক।সত্যি বলতে পড়তে পড়তে আমার ইচ্ছা করছিল জায়গাগুলোতে গিয়ে ঘুরে আসি।এতো প্রাণবন্ত বর্ণনা। গল্পের বুনোটও খুব সুন্দর। এরকম প্লট একাধিক বার পড়া থাকলেও গল্পগুলো এতো টুকু বোর করেনি আমাকে, বরং মসৃনভাবে পড়ে গিয়েছি। সুন্দর এই তিনটি লেখা আমাদের বইমেলায় উপহার দেয়ার জন্য সৈকতদাকে অনেক ধন্যবাদ।
ভয়াবহ আর বিভৎস সব গল্প পড়তে পড়তে যদি ক্লান্ত হয়ে যান। বা আরও একখানা রুদ্ধশ্বাস থ্রিলার হাতে তুলে নেওয়ার আগে একটু বিরতি চান তাহলে হতে তুলে নিন এই বইটি। এরকম বললাম বলে ভাববেন না বইটা খেলো। একদমই না। এটি বেশ হালকা মেজাজের অ্যাডভেঞ্চার পূর্ণ তিনটি রহস্য গল্পের সমাহার। পড়ে মন ভালো হতে বাধ্য। প্রতিটি গল্পই সুন্দর করে লেখা।
অর্কিড রহস্য - সামান্য বীভৎসতার ছোঁয়া দেয়া রোমাঞ্চকর এক অভিযানের গল্প। মাদল পাহাড়ের বামন সন্ন্যাসী - কল্পবিজ্ঞানের একটি শান্তশিষ্ট মন ভালো করা ঝামেলাহীন গল্প। হিমাচলের হেঁয়ালি - খুব সুন্দর এবং হালকা ডিটেকটিভ গল্প।
বইটি না পড়লে খুব বড়ো মিস করবেন। ১৫২ পাতার বই একদিনের বেশি লাগবে না আশা করি। ছোট বেলায় যেমন লেখা পড়তে ভালো লাগতো সেই নস্টালজিয়ায় একটা perfect escape।
গল্পগুলো পড়ে ভালোই লেগেছে। তবে সবথেকে ভালো লেগেছে অর্কিড রহস্য। ঝরঝরে লেখা, কোনো জটিলতা নাই, খুব তাড়াতাড়ি পড়ে ফেলা যায়। দ্বিতীয় গল্পটা অপেক্ষাকৃত দুর্বল মনে হয়েছে। আর তৃতীয় গল্পটা আগে থেকেই বুঝতে পেরে গেছিলাম আসল চক্রান্তের পিছনে কে ।
এখানে দাদা সিরিজের তিনটে গল্প উপস্থাপনা করা হয়েছে। বুধোদা ওরফে বোধিসত্ত্ব মজুমদার, তিনি নিজেকে অ্যান্টিক হান্টার বলে জাহির করেন। তাঁর ভ্রমণ সঙ্গী কিশোর রুবিক ওরফে মাল্যবান মিত্র।বুধোদা রুবিকের সঙ্গে জমজমাট অ্যাডভেঞ্চারের সামিল হবেন আসুন।
১) অর্কিড রহস্য (৪⭐) : মেঘালয়ের এক দুর্গম পাহাড়ে নিহাং উপজাতির এক দেবীমন্দিরের কাছে ব্ল্যাক অর্কিডের সন্ধানে গ্যাব্রিয়েল টিলম্যানের সাথে অভিযানে বেরোন বুধোদা আর সঙ্গে রুবিক। ব্ল্যাক অর্কিড যা পৃথিবীর দুর্লভতম অর্কিড।যার খোঁজে পৃথিবীর অর্কিড হান্টাররা দৌড়ে বেড়াচ্ছে। শেষপর্যন্ত কি তবে ব্ল্যাক অর্কিডের দেখা মিলবে ? ব্ল্যাক অর্কিডের সাথে কি নরবলির কোনো যোগসূত্র আছে ?
২) মাদলপাহাড়ের বামনসন্ন্যাসী : (২.৫⭐) মৌডুংরি গ্রামের পাশেই মাদল পাহাড়। সেখানের একটা ছবি হাতে আসে বুধোদার, যা পাঁচশো বছর আগের তোলা। কিন্তু তখন তো ক্যামেরাই আবিষ্কার হয়নি, স্যাটেলাইট তো দূরের কথা। তবে সেই ছবি তুললো কে ?কিভাবে তুললো ?অন্যদিকে গ্রামবাসীদের কাছে মাদলপাহাড় অভিশপ্ত জায়গা। কি আছে সেখানে ?
৩) হিমাচলের হেঁয়ালি : (৩⭐) নাগোয়ার গ্রামের নাগদেবতার মন্দিরের সোনার মূর্তি একবারই বের করা হয় স্নান যাত্রার দিন। বুধোদা এসেই জানতে পারে তার এক পরিচিত নাম বিরাজ, সে নিরুদ্দেশ। অন্যদিকে খুন হন মন্দিরের পুরোহিত। বুধোদা আঁচ করে কেউ বা কারা মন্দিরের সোনার মূর্তি চুরির পরিকল্পনা করছে। কিন্তু কে ? বুধোদা কি পারবে তাকে ধরতে ?
চারমাস আগে পত্রভারতী থেকে প্রথম এই বইটা কিনেছিলাম নিজের সঞ্চিত অর্থ থেকে 😅 ডিটেকটিভ গল্প চিরকালই পড়তে /শুনতে ভালো লাগে । "অর্কিড রহস্য" বইটিও যথারীতি ভালো লেগেছে ।
বইটি তে তিনটি ডিটেকটিভ গল্প আছে । বুধোদা আর রুবিক এর সব রোমাঞ্চকর অভিযান এর গল্প সবকটি । "অর্কিড রহস্য" হলো বইটি এর প্রথম গল্প বাঁকি দুটি গল্প হলো ২) মাদল পাহাড়ের বামন সন্যাসী ৩) হিমাচলের হেঁয়ালি সবকটি গল্প রোমাঞ্চকর আর রহস্যময় । গল্প গুলির কিছু কিছু জায়গা বেশ predictable , তবে সেটা গল্প গুলির মানটা কে একটুকুও নীচু করে দেয়না । তিনটি গল্পের মধ্যে "অর্কিড রহস্য" আর "হিমাচলের হেঁয়ালি" গল্প দুটি একটু বেশিই ভালো লেগেছে ।☺️
১৫২ পাতার বইটি পড়তে এক দিন মতো লাগলো । বইটি পড়ার সময় আমার বেশ ফেলুদা আর তোপসে এর রোমাঞ্চকর অভিযান এর কথা মনে পড়ছিল । তবে বইটা না পড়লে চরম মিস করতাম ।🤭🤭
"Orchid Rahasya" is the only good story here and even that seems like a copy of Chaander Pahar for 70% of its length. The ending is really good though. "Himachal e Heyali" is utterly forgettable, I don't even remember a thing about it. "Madal Paharer Bamun Sanyasi" is such a fish out of water. I don't know why the author decided to write themselves into a corner in this story. The hook was so implausible it kept me reading and I was really disappointed when it pulled its punches in the end and went down a bland science fiction route (which appeared especially stale to me after all the Cixin Liu I devoured last year). This is such a sorry collection honestly, I don't know how Budho Da took off but I'm glad "Khuni Magic" was such a superior collection. I would not really recommend this unless you're a completionist.
অ্যাডভেঞ্চার গল্প পড়তে খারাপ লাগে না। এটাও লাগল না। তবে বোধিসত্ত্ব মজুমদার ওরফে বুধোদার সাথে রাজা রায়চৌধুরী ওরফে কাকাবাবুর প্রচুর মিল। পড়তে গিয়ে বারবার চোখে লাগছিল ভীষণ।
#রিভিউ_অর্কিড_রহস্য_ #অডিওবুক লেখক - সৈকত মুখোপাধ্যায় প্ল্যাটফর্ম - মির্চি বাংলা - সান্ডে সাস্পেন্স
আজ ইউটিউবে শুনলাম বিশিষ্ট লেখক সৈকত মুখোপাধ্যায় রচিত অ্যাডভেঞ্চার উপন্যাসিকা “ অর্কিড রহস্য”। উপস্থাপনায় মির্চি বাংলা। গল্পের পরিবেশনা নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই, তাই অহেতুক সময় নষ্ট না করে সোজাসুজি গল্পটায় যাই। সৈকত মুখোপাধ্যায় সৃষ্ট বুধোদা এবং রুবিকের সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটল এই প্রথম। বোধিসত্ত্ব ওরফে বুধো এবং তার বন্ধুর খুড়তুতোভাই রুবিক এই উপন্যাসের মূল দুই চরিত্র। একজন হিরো অন্যজন তার সাইডকিক। বোধিসত্ত্ব একজন অ্যান্টিক ডিলার, সেই সঙ্গে বিশ্বের সব কিছুর প্রতিই তার অল্পবিস্তর জ্ঞান রয়েছে। অদ্ভুত কোনো জিনিসের খোঁজ পেলেই সে বেরিয়ে পড়ে রহস্য উন্মোচনের জন্য এবং বলাই বাহুল্য তার সঙ্গে থাকে রুবিক। এই গল্পের শুরুতেই গ্যাব্রিয়েল টিলম্যান নামের এক ইংরেজ ভদ্রলোক হঠাৎই এসে বোধিসত্ত্বর সঙ্গে দেখা করে এবং এক অদ্ভুত কালো অর্কিডের কথা জানায়। গ্যাব্রিয়েলের প্রপিতামহ রিচার্ড টিলম্যান ভারতের মেঘালয় অঞ্চলে এই অর্কিডের সন্ধানে আসেন এবং দন্তুরা নামের এক দেবীর মন্দিরে সেই অর্কিডের সন্ধান পান। তাঁকে সেই মন্দিরে পৌঁছাতে সাহায্য করেন এক হাত কাটা সাধু, কালিনাথ আগমবাগিশ। টিলম্যান সেই অর্কিডের নাম দেন টিলম্যানিয়া রুডিরোপিয়া।
কালো অর্কিড এক দুষ্প্রাপ্য ফুল, এবং সেটি নিয়ে দেশে ফিরতে পারলে যুগান্তকারি কিছু একটা করে ফেলতে পারতেন রিচার্ড টিলম্যান, কিন্তু ফুল সমেত গাছ নিয়ে ফেরার সময় রিচার্ড টিলম্যান পাগল হয়ে যান। জাহাজের একটি বয়কে খুন করতে যাচ্ছিলেন রিচার্ড। তাঁকে গ্রপ্তার করা হয়। জাহাজের কেবিনেই উদ্ধার হয় শুকিয়ে যাওয়া অর্কিডের গাছ। অনেক চেষ্টা করেও সেই অর্কিড থেকে নতুন গাছ সৃষ্টি করতে পারেন নি ইংল্যান্ডের হর্টিকালচার সোসাইটি। রিচার্ড নিজের ডায়েরিতে সব কথাই লিখে রেখে গেছিলেন। তিনি অর্কিডের সন্ধান পেয়ে ছিলেন সেটা নিজের দেশের হর্টিকালচার সোসাইটিকেও জানিয়েছলেন। সবাই তাঁকে সংবর্ধনা জানাতে তৈরি ছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত রিচার্ড সেই ফুল নিয়ে তাদের সামনে আসতে পারেন নি। আর তাই বোধহয় তিনি পাগল হয়ে যান। অবশ্য ডায়েরির শেষ দিকের পাতা ডায়েরি থেকে মিসিং, তাই রিচার্ড ঠিক কীভাবে অর্কিডটি পেয়েছিলেন সেটা জানা যায় নি। ঘটনাটির সময়কাল ১৯১২ সালের মার্চ থেকে আগস্ট মাস।
যাইহোক, তো এই রিচার্ডের নাতি গ্যাব্রিয়েল, এখন, মানে প্রায় একশ বছর পর, আবারও সেই জায়গাটায় যেতে চায়। অর্কিড থাক আর নাই থাক, একটা চেষ্টা করতে চান গ্যাব্রিয়েল, আর তাই সে বোধিসত্ত্বের সাহায্য চায়। বোধিসত্ত্ব আর রুবিক, গ্যাব্রিয়েলের সঙ্গে রওনা দেয়। বর্ষাভীষণ সেই পাহাড়ি অঞ্চলে তারা পৌঁছেও যায়, মূলত বোধিসত্ত্বর তৎপরতায়। কিন্তু দন্তুরার মন্দিরে প্রবেশ করেও তারা অর্কিড পায় না। অবশ্য সেখানে তারা প্রচুর কঙ্কাল খুঁজে পায়, এবং তার মধ্যে একটার হাত কাটা। বোধিসত্ত্ব আর রুবিক বুঝতে পারে, রিচার্ডের সঙ্গি হাতকাটা সাধু,কালিনাথ আগমবাগিশ এই মন্দিরে মারা যায়। কিন্তু কেন? এই কেন’র উত্তর পেতে না পেতেই চলে আসে গল্পের আসল টুইস্ট। সেই রাতেই, গ্যাব্রিয়েল হঠাৎ দন্তুরার মন্দিরের পুরোহিতের নাতিকে নিয়ে চলে যায় এবং দন্তুরার বেদিতে বাচ্চাটাকে ছুরি দিয়ে খুন করতে উদ্যত হয়, কিন্তু ঠিক সময়ে পুরোহিত তির দিয়ে গ্যাব্রিয়েলকে হত্যা করে নাতিকে বাঁচিয়ে নেন। এতদিনের সঙ্গিকে মরে পড়ে থাকতে দেখেও বোধিসত্ত্ব ভাবলেশহীন ভাবে তার শরীরের তল্লাশি করে এবং মৃত গ্যাব্রিয়েলের পকেট থেকে বের করে আনে রিচার্ড টিলম্যানের ডায়েরির ছিড়ে যাওয়া শেষের দিকের পাতাগুলো। আজ্ঞে হ্যাঁ, গ্যাব্রিয়েল নিজেই ডায়েরির পাতাগুলো ছিঁড়ে নিজের সঙ্গে নিয়ে ঘুরছিলেন।
তাহলে এবার প্রশ্ন আসছে, কেন? কেন গ্যাব্রিয়েল পুরোহিতের নাতিকে খুন করতে গেল? কেন? তার দাদুর ডায়েরির পাতাগুলো তার পকেটে পাওয়া গেল? এবং কেনই বা সে এত কান্ড করে এই নিজের দেশ থেকে এতদূর এসে হাজির হল? কী তার উদ্দেশ্য? উত্তর দিল বোধিসত্ত্ব.. সে বলল, গেব্রিয়েলের সঙ্গে যাত্রা শুরুর আগে, সে নাকি তার ব্যাপারে খোঁজ খবর নিয়েছিল। সে জানতে পেরেছিল, গ্যাব্রিয়েল চরম আর্থিক দূর্গতির মধ্যে আছে, উপরন্তু সে জুয়াড়ি। কিন্তু এত আর্থিক অবনতির মধ্যেও সে এই অ্যাডভেঞ্চারে নামল কেন? কারন এই রোমাঞ্চকর যাত্রার কাহিনি টিভি এবং প্রিন্ট মিডিয়া চড়া দামে কিনে নেবে। আর তাই তার ভারতে আসা এবং বোধিসত্ত্বের সাহায্য নিয়ে মেঘালয় যাত্রা করা। আচ্ছা বেশ। কিন্তু গ্যাব্রিয়েল কেন পুরোহিতের নাতিকে খুন করতে চাইল? সেই কেন’র উত্তর পেতে গেলে আগে জানতে হবে রিচার্ডের ডায়েরির শেষ পাতাগুলো গ্যাব্রিয়েল ছিড়ে দিয়েছিল কেন? কারণ, রিচার্ড তার ডায়েরির শেষ পাতায় একজনকে খুন করার কথা লিখে রেখেছিলেন। কাকে খুন? সেই হাত কাটা সাধুকে। হ্যাঁ..যে হাত কাটা সাধুর সাহায্যে রিচার্ড দন্তুরার মন্দিরে আসেন, সেই সাধুকেই তিনি ওই মন্দিরে খুন করে রেখে যান। কিন্তু কেন? কারন, কালো অর্কিড মানুষের রক্ত পেলে তবেই জন্মায়। দন্তুরার মন্দিরে আলো প্রবেশের পথ নেই, তাই ক্লোরোফিল যুক্ত গাছ জন্মাবার উপায় নেই, এমতাবস্থায় দেবীর মন্দিরের বলি প্রদত্ত মানুষের রক্ত থেকেই পুষ্টি নিয়ে জন্মায় কালো অর্কিড। এই ব্যপারটা রিচার্ড আগেই বুঝে গেছিলেন, আর তাই সে সাধুকে খুন করে, তার রক্তের সাহায্যেই রাতারাতি অর্কিড ফুটিয়ে সেখান থেকে ইংল্যান্ড রওনা দিয়েছিলেন। কিন্তু জাহাজে করে যেতে যেতে সেই গাছ পুষ্টির অভাবে শুকিয়ে যেতে থাকে, আর তাই রিচার্ড জাহাজের একটি বয়কে খুন করে তার রক্ত দিয়ে গাছ টাকে বাঁচাতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তার আগেই তিনি ধরা পড়ে যান। আর ঠিক, এই একই কারণে রিচার্ডের নাতি গ্যাব্রিয়েলও খুন করতে চায় পুরোহিতের নাতিকে। তার রক্ত দিয়েই সে কালো অর্কিড ফোটাতে চেয়ে ছিল। এত কিছু বোধিসত্ত্ব নিজেই ব্যাখা করে বলল। অর্কিডের জন্য মানুষের রক্তের প্রয়োজন সেটা সে আগেই বুঝে গেছিল। কী ভাবে? ওই রিচার্ডের দেওয়া অর্কিডের নামটা থেকে। রিচার্ড সেই অর্কিডের নাম রাখেন টিলম্যানেরা রুডিরোপিয়া। টিলম্যানেরা নামটা সে রেখেছিল নিজের পদবির সঙ্গে মিলিয়ে, কিন্তু রুডিরোপিয়া নামটা তিনি রেখেছিলেন হাতকাটা সাধুর মুখে শোনা রুধিরপ্রিয়া অর্থাৎ রক্তপিপাসু কথাটা থেকে। যাইহোক, এই হচ্ছে গল্প। দুর্দান্ত একটা কল্পবিজ্ঞান ভিত্তিক অ্যাডভেঞ্চার গল্প… হতে পারত… যদি না গল্পটার গলায় রুধিরপ্রিয়ার মত প্লট হোলের মুন্ডমালা ঝুলত…
প্লট হোল - ১. দেবী দন্তুরার মন্দির মেঘালয়ে। মেঘালয় একটি বর্ষনপ্রবল অঞ্চল। তাছাড়া গল্পে একাধিক বার বলা হয়েছে দন্তুরার মন্দিরের জল জমার কথা, তাছাড়া সেই মন্দিরে আলো প্রবেশ করে না। আর তাই, এই রকম পরিবেশে হাতকাটা সাধুর অস্থি একশ বছর ধরে টিকে থাকাটা অসম্ভব। মানুষের অস্থি একশ কেন, হাজার বছর ধরেও অক্ষত থাকতে পারে কিন্তু সেটা শুক্ন পরিবেশে অথবা মাটির নীচে। ভেজা স্যাঁতস্যাঁতে পরিবেশে হাড় দ্রুত ডিকম্পোজ হয়ে যায়। তাই রুবিকদের পক্ষে দন্তুরার মন্দিরে একশ বছর আগে মৃত মানুষের অস্থি খুঁজে পাওয়াটা একেবারেই অবাস্তব।
২. বোধিসত্ত্ব যাত্রা শুরুর আগেই জানতেন গ্যাব্রিয়েল গলা পর্যন্ত দেনায় ডুবে আছে, সে জুয়াড়ি এবং পুলিশের খাতায় নাম আছে, তবুও বোধিসত্ত্ব তার সাথে এরকম বিপদজনক যাত্রায় যেতে রাজি হল এবং সেই সঙ্গে ক্লাস ইলেভেনের ছাত্র রুবিককেও নিল…বেশ!
৩. গ্যাব্রিয়েলে চাইলে দাদুর ডায়েরিটাই নিজেদের দেশের টিভি আর মিডিয়াকে দিতে পারত। এর জন্যে নিজের অ্যাডভেঞ্চারাস হওয়ার দরকার ছিল না। ১৯১২ সালে রিচার্ড টিলম্যান ভারত থেকে ফেরার সময় যথেষ্ট বিতর্কের সৃষ্টি করেছিলেন, খুনের চেষ্টা করার ফলে তাঁকে গ্রেফতার পর্যন্ত করা হয় এবং গারদেই তাঁর মৃত্যু হয়। এরকম একটা লোকের লেখা ডায়েরি, তাও একশ বছর পর… সেটা খোদ একটা অ্যান্টিক! সেটার মূল্য কালো অর্কিডের চেয়ে কম কিছু হত কী? মনে হয় না… আর যদি গ্যাব্রিয়েল নিজের যাত্রাকাহিনি দেশে গিয়ে বিক্রি করার কথা ভাবত তাহলে সেটা সে রেকর্ড করত। সালটা ২০১২! কিন্তু গল্পের কোথাও গ্যাব্রিয়েল সব কিছু রেকর্ড করছেন এমন কথা বলা নেই!
এবং…সব শেষে ৪। ওরে ভাই, অর্কিড মানুষের রক্ত পেয়ে ফোটে ঠিকই কিন্তু তার জন্য মানুষ খুন করার কী দরকার? মানুষের রক্তের বৈশিষ্ট্য আরও অনেক প্রানীর হয়। গরু এবং শুয়োর তাদের মধ্যে সহজলভ্য…আগে তাদের দিয়ে চেষ্টা করে দেখতিস, সফল না হলে না হয়… যাইহোক…আরও আছে, কিন্তু এই চারটেই তুলে ধরলাম। কারও যদি এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জানা থাকে তাহলে বলে যাবেন দয়া করে…নাহলে বুধোদার গল্পটা আমার কাছে হযবরল-তে বলা বুধোর সেই গল্পের আধুনিক সংস্করণ ছাড়া আর কিছুই মনে হবে না।
বইটি আমার অসম্ভব সুন্দর লেগেছে । বলতে পারি লেখক সৈকত মুখোপাধ্যায় তার লেখার মধ্য দিয়ে আমাকে নিয়ে গেছেন আমার সেই ফেলে আসা কিশোর বয়সে যখন সবেমাত্র ‛ফেলুদা’ পড়তে শিখেছি । তখন যে আনন্দ পেতাম, এই বই পড়েও আমার একদম একই অনুভূতি হয়েছে । হতে পারে বইটির টার্গেট ছিল কিশোর-কিশোরীরা , কিন্তু আমার ব্যক্তিগত মত - এই বই সব বয়সের পাঠকদের জন্য সমান প্রযোজ্য... আর এটাই এই লেখকের কলমের মুন্সীয়ানা ।
🔸সৈকত মুখোপাধ্যায়ের লেখা এই সংকলনটিতে স্থান পেয়েছে তার সৃষ্ট চরিত্র ‛বুধোদা এবং রুবিক’ এর তিনটি অ্যাডভেঞ্চার নভেলা । বাংলার বিখ্যাত ‛দাদা’ সিরিজের নবতম সংযোজন হলেন ‛বুধোদা’... যার আসল নাম বোধিসত্ত্ব মজুমদার । ইনি ডিটেকটিভ বা সত্যান্বেষী নন... বরং ইনি একজন আপাদমস্তক সৌখিন মানুষ । ইনি পেশায় একজন ‛অ্যান্টিক হান্টার’, কিন্তু তা সত্ত্বেও বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রহস্য উন্মোচনে জড়িয়ে পড়েন তিনি । সেই প্রসঙ্গে বুধোদার মত - ‛কোনো ক্রাইম যদি নিখুঁত ভাবে করা যায়, তাহলে সেটাও একটা শিল্প।’ প্রতিটি অভিযানেই বুধোদার সঙ্গী হয় রুবিক, যার ভালো নাম মাল্যবান মিত্র । রুবিক বুধোদার খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধুর খুড়তুতো ভাই । এদের দুজনের কীর্তিকলাপ নিয়েই এই সংকলনের নভেলাগুলি ।
🔹অর্কিড রহস্য : সারা পৃথিবীর অর্কিড-সংগ্রাহকদের তীব্র অনুসন্ধিৎসা ‛কালো অর্কিড’ নিয়ে । আদৌ কি এইরকম কোনো অর্কিড পৃথিবীতে আছে, নাকি এটি কেবলই একটি মিথ ? লন্ডন থেকে বুধোদার সাথে দেখা করতে আসা গ্যাবি টিলম্যান দাবি করেন যে তার প্রপিতামহের বাবা রবার্ট টিলম্যান খুঁজে পেয়েছিলেন ঐ দূষ্পাপ্য ‛কালো অর্কিড’... তাও আবার এই ভারতবর্ষেই । কিন্তু সেই অর্কিড নিয়ে ইংল্যান্ডে ফিরতে পারেননি তিনি, ইংল্যান্ডের মাটিতে যখন পা রাখলেন তখন তিনি পুরোপুরি মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছেন । ঠিক কি হয়েছিল ফেরার পথে? সত্যিই কি তিনি অর্কিড খুঁজে পেয়েছিলেন? রবার্ট টিলম্যানের যে লুকোনো ডায়েরি থেকে গ্যাবি এতকিছু জেনেছিলেন... তার শেষ কয়েকটি পৃষ্ঠাই বা গেল কোথায়?
এই সব প্রশ্নের উত্তর আছে এই নভেলাটিতে... অবিশ্বাস্য মোচড়ে গল্প শেষ করে দারুণ রোমাঞ্চ সৃষ্টি করেছেন লেখক ।
🔹মাদলপাহাড়ের বামনসন্ন্যাসী : এই নভেলার নামকরনটি আমার খুব আকর্ষণীয় লেগেছে । বুধোদার ঘনিষ্ঠ বন্ধু রঘুনাথ দ্বিবেদী একজন আয়ুর্বেদ চিকিৎসক, ঝাড়খণ্ডের সারান্ডা থেকে তিনি একটি চিঠি পাঠান বুধোদার উদ্দেশ্যে, সাথে একটি স্যাটেলাইট ইমেজ । সেই ইমেজে ফুটে উঠেছে সারান্ডার কোনো এক মাদল আকৃতির পাহাড়ের প্রতিকৃতি । অথচ সেই ইমেজ বর্তমান সময়ের থেকেও প্রায় ৫০০ বছর আগের... তখন স্যাটেলাইট তো দূরের কথা, ক্যামেরাও আবিষ্কার হয়নি । তাহলে এই ছবির উৎস কি? কিভাবে তোলা হলো এই ছবি? ঐ পাহাড়ে নাকি বাস করেন এক বামনাকৃতি মানুষ, যার বয়সের নাকি কোনো সীমা নেই । আসলে কি এই বামনসন্ন্যাসীর পরিচয়?? সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে মাদলপাহাড়ে যায় বুধোদা এবং রুবিক ।
অনেক ক্ষেত্রে লেখকরা সুন্দরভাবে রহস্য তৈরী করেন, কিন্তু রহস্যের জট খোলার সময় ব্যাপারটা এলোমেলো হয়ে যায় । এই নভেলায় লেখক যেমন সুন্দরভাবে রহস্য সৃষ্টি করেছেন, তেমন রহস্যভেদেও দারুণ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন ।
🔹হিমাচলের হেঁয়ালি : হিমাচল প্রদেশের নাগোয়াড়ের বিখ্যাত নাগদেবের পুজো এবং স্নানযাত্রা দেখবার বাসনা নিয়ে হিমাচল পাড়ি দেয় বুধোদা এবং রুবিক । কিন্তু সেখানেও রহস্য পিছু ছাড়ে না ওদের । স্নানযাত্রার ঠিক আগেই খুন হয়ে মন্দিরের ঘাটে পড়ে থাকেন মন্দিরের পুরোহিত সায়ন আচার্য । এদিকে তার আগেই নিখোঁজ হয়ে গেছে বুধোদার পরিচিত যুবক বিরাজ । এই খুনের সাথে কি কোনো সম্পর্ক আছে ঐ নিখোঁজ হওয়ার? ঐ ঐতিহ্যবাহী নাগদেবের মূর্তির সাথে জড়িয়ে আছে সমস্ত এলাকাবাসীর সেন্টিমেন্ট । তাই বাধ্য হয়েই বুধোদার দ্বারস্থ হয় নাগোয়াড়ের পুলিশ-মহল । সত্যিই কি আরও কোনো রহস্য লুকিয়ে আছে এই ঘটনার আড়ালে? আদৌ কি সমস্ত হেঁয়ালির সমাধান করতে পারবে বুধোদা?
গল্পটি অসাধারণ লেগেছে আমার । লেখকের ভ্রমণ-প্রেম সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে এই নভেলায় । রহস্যের জট পাকিয়ে তা সমাধান করতে লেখক যে অসম্ভব পারদর্শী তার দৃষ্টান্ত এই গল্পটিও ।
আবারও বলবো, শুধু কিশোরপাঠ্য নয়... ঘটনাপ্রবাহের সুন্দর বর্ণনা এবং লেখকের অসাধারণ গল্প বলার ধরণের জন্য সমস্ত বয়সের পাঠককূলের মনে জায়গা করে নিতে সক্ষম হবে এই সংকলনটি ।
বাংলা সাহিত্যের দাদা সিরিজে অন্যতম সংযোজন হল বুধোদা ওরফে বোধিসত্ব মজুমদার। বসবাস উত্তরপাড়ার হেমকুঞ্জে। তিনি পোশাক ও যন্ত্রপাতির ব্যাপারে ভীষণ আধুনিক হলেও তাঁর পেশা ও নেশা হল পুরোনো ও মূল্যবান জিনিসের খোঁজ করা। এসমস্ত রোমাঞ্চকর অভিযানে তাঁর সঙ্গী হল কিশোর রুবিক ওরফে মাল্যবান মিত্র। সে বিদ্যালয়ের ছাত্র, মেধাবী ও ক্রিকেট খেলতে ভালোবাসে। সম্পর্কে সে বুধোদার বন্ধুর খুড়তুতো ভাই।
এ বইয়ের দুই মলাটের মধ্যে সংরক্ষিত আছে এই জুটির তিনটি এডভেঞ্চার কাহিনী। সেগুলি হল -
👉অর্কিড রহস্য:- সারা পৃথিবীর পুষ্পপ্রেমী তথা অর্কিডপ্রেমীদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও দুষ্প্রাপ্য হল কালো অর্কিড। সেই অর্কিড বিষয়ে শুনেছেন অনেকেই কিন্তু চোখে দেখেনি। একদিন সুদূর ইংল্যান্ড থেকে এক সাহেব গ্যাবরিয়েল টিলম্যান বুধোদার কাছে এসে জানান, ওনার এক পূর্বপুরুষ রিচার্ড টিলম্যান একশো বছর আগে ভারতবর্ষের মেঘালয়ে এসেছিলেন কালো অর্কিডের খোঁজে এবং পেয়েওছিলেন তার খোঁজ। কিন্তু কি হল তারপর? কালো অর্কিডের খোঁজে ওই সাহেবের সঙ্গে বুধোদা আর রুবিক পাড়ি দেয় মেঘালয়। 👉মাদলপাহাড়ের বামনসন্ন্যাসী:- বুধোদার এক কবিরাজ বন্ধু রঘুনাথ দ্বিবেদী গাছগাছড়ার অনুসন্ধানে গিয়েছিলেন মৌডুঙরি গ্রামে। সেখানে গিয়ে তিনি জানতে পারেন ঐ গ্রামের অনতিদূরে মাদলপাহাড়ে রয়েছেন একজন বামনসন্ন্যাসী। তবে সেই জায়গাকে সবাই এড়িয়েই চলে। এসমস্ত কথা বুধোদা কে জানান রঘুনাথ বাবু আর তার সঙ্গে ঐ জায়গার এক গুহা থেকে প্রাপ্ত এক ছবিও তিনি পাঠান বুধোদাকে। বুধোদা ঐ ছবির সঙ্গে স্যাটেলাইট থেকে তোলা মাদলপাহাড়ের ছবির অদ্ভুত মিল পান। কিন্তু রঘুনাথ বাবুর ছবিটি যে সময়ে তোলা হয়েছে বলে মনে করছে বুধোদা, সেই সময় তো স্যাটেলাইট আবিষ্কারই হয়নি। তাহলে কে তুললো এই ছবি? এই রহস্য উন্মোচন করতে রুবিক কে সঙ্গী করে বুধোদা ফের বেড়িয়ে পড়ে মাদলপাহাড়ের উদ্দেশ্যে। 👉হিমাচলের হেঁয়ালি:- হিমাচলের নাগোয়ার গ্রামের সোনার তৈরী রত্নখচিত নাগদেবতা কে সিন্দুক থেকে বার করা হয় বছরে মাত্র পাঁচ দিনের জন্য; স্নানযাত্রার সময়। বছরের বাকি সময় সেই মূর্তির জা���়গায় থাকে পাথরের শিলা। এই কথা বুধোদা জানতে পারে বিরাজ সিং এর কাছ থেকে। স্নানযাত্রা অনুষ্ঠান দেখবার জন্য রুবিক কে সঙ্গে নিয়ে বুধোদা চলে আসে হিমাচলে কিন্তু বিরাজ সিং এর সাথে যোগাযোগ করতে পারে না। অন্যদিকে খুন হন মন্দিরের পুরোহিত সায়ন আচার্য। এই দুই ঘটনা কি কোনোভাবে সম্পর্কিত? রহস্য উন্মোচনে মাঠে নামে বুধোদা।
এই তিনটি রহস্য রোমাঞ্চের কাহিনী আমি খুবই উপভাগ করেছি। এই সিরিজের বাকি দুটি বই "খুনি ম্যাজিক" আর "বুধোদার তিন রহস্য" ও শীঘ্রই পড়তে হবে। তবে বর্তমান প্রচ্ছদের থেকে আমার আগের সবুজ রঙের প্রচ্ছদ টাই বেশি পছন্দের। যারা কিশোর সাহিত্য পড়তে ভালোবাসেন, তারা একবার পড়ে দেখতেই পারেন।
💫📚বাংলার বিখ্যাত ‘ দাদা সিরিজ ’ - এ নবতম সংযোজন বুধোদা , ভালো নাম বোধিসত্ত্ব মজুমদার । পোশাকে - আশাকে সে ভয়ংকর মডার্ন , ল্যাপটপ আই - ফোন ছাড়া এক পা হাঁটে না — অথচ নেশা অ্যান্টিক - হান্টিং । তার কিশোর সঙ্গী রুবিক । সারা পৃথিবীর অর্কিড 5 - সংগ্রাহকদের স্বপ্ন কালো অর্কিড — আজ অবধি যে অর্কিড কেউ চোখে দ্যাখেনি , অথচ সকলেই বিশ্বাস করে কোথাও না কোথাও লুকিয়ে রয়েছে সেই আশ্চর্য ফুল । মেঘালয়ের জঙ্গলে সেই ব্ল্যাক অর্কিডের রক্তাক্ত অস্তিত্ব নিয়েই প্রথম কাহিনি ‘ অর্কিড রহস্য ' । ক্যামেরা কিংবা এরোপ্লেন আবিষ্কার হওয়ার অনেক আগে আকাশ থেকে তোলা এক অবিশ্বাস্য ছবি থেকে দ্বিতীয় কাহিনি ‘ মাদলপাহড়ের বামনসন্ন্যাসী’র সূত্রপাত । হিমাচলের নাগোয়ার গ্রামের নাগদেবতার সোনার মূর্তি বছরে একদিনই ব্যাঙ্কের ভল্টের বাইরে বেরোয়— স্নানযাত্রার দিন । কেন ঠিক তার ক’দিন আগে খুন হলেন নাগোয়ার - মন্দিরের পুরোহিত ? এই নিয়েই বুধোদা আর রুবিকের তৃতীয় অ্যাডভেঞ্চার ‘ হিমাচলের হেঁয়ালি ' ।📚💫
অ্যান্টিক হান্টার বুধোদা এর তিনটি রহস্যগল্প নিয়ে এই বই। অর্কিড রহস্য, মাদলপাহাড়ের বামনসন্ন্যাসী আর হিমাচলের হেঁয়ালি। প্রথম গল্প অর্কিড রহস্য এ বইয়ের বেস্ট গল্প। নির্দ্বিধায় প্লট খুবই ইউনিক। মেঘালয়ের এক দুর্গম পাহাড়ে নিহাং উপজাতির এক দেবীমন্দিরের গুহায় ব্ল্যাক অর্কিডের সন্ধানে গ্যাব্রিয়েল টিলম্যান নামে এক ব্রিটিশের সাথে অভিযানে চলেন বুধোদা আর রুবিক। শেষপর্যন্ত ব্ল্যাকডের সন্ধান পাওয়া যায় কিনা সেটা নিয়ে রহস্য এগোতে থাকে। দ্বিতীয় গল্প মাদলপাহাড়ের বামনসন্ন্যাসী এই বইয়ের দুর্বলতম গল্প। সায়েন্স ফিকশন আর এলিয়েনের ব্যাপারস্যাপার আসলে ঠিক বাংলা রহস্যগল্পে খাপ খায় না। তৃতীয় গল্প হিমাচলের হেঁয়ালিও বেশ ভালো লেগেছে। যদিও গল্প কিছুটা প্রেডিক্টেবল ছিলো। হিমাচলের নাগোয়ার গ্রামের এক নাগদেবতার মন্দির ঘিরে এক খুন এবং খুন পরবর্তী রহস্য সমাধানে নামেন বুধোদা আর রুবিক।
একটা ভালো থ্রিলার বই।বিলেত থেকে মি. টেলিসমেন এসেছে বুধোদার খোজে।তিনি বুধোদা সম্পর্কে জানেন এক মিউচুয়াল বন্ধুর মাধ্যমে।তিনি রিসেন্টলি তার দাদার একটা ডায়েরি খুজে পেয়েছেন যেখানে লেখা আছে কিভাবে তার দাদা ভারতের মেঘালয়ে কালো অর্কিড এর দেখা পেয়েছিলেন।বুধোদা একজন মডার্ন মানুষ, নেশা তার এন্টিক হাইকিং, এবং তার বাল্য সঙ্গী রুবিক। এরা তিনজন মিলে মেঘালয়ে বেড়িয়ে পড়ে ব্ল্যক অর্কিড এর খোজে।বলে রাখা ভালো অর্কিড একটি ভারতীয় উপমহাদেশীয় ফুল।এর অনেক রঙ থাকা সত্বেও কালো রঙের অর্কুড কেউ দেখেনি।তবুও মি. টেলিসম্যন এর দাদা কিভাবে এই ফুল খুজে পেলেন মেঘালয়ে এবং এই ফুল নিয়ে ইংল্যন্ডে আসার সময় তিনি কেন পাগল হয়ে গেলেন আর ফুল গাছ টাই কেন মারা গেল সেটা জানার জন্য বইটা পড়তে হবে,আর স্পয়েল করলাম না।
বুধোদা রুবিক আবির্ভাবেই মন কেড়ে নিয়েছে। বাংলায় অনেক থ্রিলার রাইটার আছে, উঠছেন, লিখছেন এখনও অব্দি থ্রিলার এডভেঞ্চার জর মধ্যে সেরা সৈকত। কল্পবিজ্ঞান, সামাজিক গল্প বা অ্যাডভেঞ্চার সবেতেই সৈকত অনবদ্য। অর্কিড রহস্যের তিনটি গল্পই মনকাড়া।