এই ভ্রমণ কাহিনি সম্পর্কে প্রখ্যাত প্রাবন্ধিক ও গবেষক মফিদুল হক বইয়ের অবতরণিকায় লিখেছেন, “... সঞ্জয় দে এখন পাঠকের দরবারে পেশ করছেন তাঁর মার্কিনী প্রবাসজীবনের বিভিন্ন অভিজ্ঞতায় গাঁথা মালিকা, খুলেছেন টুকরো কথার ঝাঁপি। এখানেও আমরা পাই অবলোকনের সেই বিশিষ্টতার পরিচয়, তিনি সমাজ ও ইতিহাসের আলোকে ঘটনার বিচার করতে সক্ষম, তবে কোনোভাবেই তা তথ্য ও তত্ত্ব-ভারাক্রান্ত হয় না। ঝরঝরে স্বাদু গদ্যে সহজিয়া ঢং-এ তিনি বলে যান তাঁর কথা। তদুপরি মার্কিন জীবনের যেসব বয়ান তিনি দিয়েছেন, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার নানা দিক, সেইসঙ্গে মার্কিন-জীবন দেখা ও বোঝার জন্য ঘুরে বেড়ানোর বৃত্তান্ত, সব মিলিয়ে এই গ্রন্থও হয়েছে বিশিষ্ট। তিনি এখানে গল্পই বলতে চেয়েছেন, তবে তা কখনও গাল-গপ্পো হয়ে ওঠেনি। মার্কিন-জীবন ও প্রকৃতি ঘিরে সঞ্জয় দের এইসব কথা-কাহিনি পাঠকদের নিয়ে যাবে আনন্দময় ভুবনে, তিনি মূল সড়ক ছেড়ে ঘুরেছেন পথে-বেপথে, সচরাচর সবাই যা করে, সেই প্রবণতা থেকে নিজেকে তিনি আলাদা করে নিতে পারেন, ফলে তাঁর দেখা ও বলায় রয়েছে এক ব্যতিক্রমী তরতাজা ভাব, সহজভাবে রসের ভিয়েনে মেলে ধরা হয়েছে জীবন ও সমাজের চালচিত্র।"
ছোটবেলায় আমার আমেরিকা যাওয়ার খুব শখ ছিল। নির্দিষ্ট করে বললে ক্যালিফোর্নিয়ার লস অ্যাঞ্জেলস এর রকি বীচ শহরে, লোহা-লক্কড়ের জঞ্জালের নিচে তিন গোয়েন্দার হেডকোয়ার্টার এ! এদিকে তাসখন্দের সুফি চিত্রকরের মাধ্যমে সঞ্জয় দে এর সাথে প্রথম পরিচয়টাও দিব্যি ছিল! তাই নীলক্ষেতের এক দোকানে বই কেনা শেষে হঠাৎ যখন এই বইটা চোখে পড়ল, দিয়ে দিতে বললাম। বিক্রেতা অতিশয় সদাশয় ব্যক্তি, আগে কিছু বেশি পরিমাণ বই কেনার কারণেই বোধহয় বইখানা ফ্রিই দিলেন। আমেরিকার টুকরো গপ্পো আক্ষরিক অর্থেই টুকরো টুকরো গল্পেই সাজানো। লেখকের আমেরিকা যাওয়া থেকে শুরু করে পরবর্তীকালে নানান অভিজ্ঞতা থেকে তাঁর পছন্দের দশটি ঘটনা নিয়ে এই বইটি রচিত। স্মৃতিকথা, ভ্রমণকাহিনীর সাথে সাথে তাই দু একটা অন্যান্য প্রবন্ধও যুক্ত হয়ে মোটামুটি বইটিকে একটা সুস্বাদু পাঁচমিশালী রূপ দিয়েছে। লেখকের প্রথম বাড়িওয়ালা কেইন, বনি ভাই, শাওন ভাই, সাকিব ভাই, আরিফ, কৌশিক, ক্রিস-ইত্যাদি মানুষের সাথে পরিচিত হতে মন্দ লাগে নি। ক্রিস আর নানাকোর প্রেম এবং পরিণতিটা বিষাদমাখা। খুব গতানুগতিক জায়গাতে ঘুরতে গেছেন লেখক বিষয়টি এমন না। তাই এসেছে নিউ মেক্সিকোর পারমাণবিক বিজ্ঞান জাদুঘর বেড়ানোর বর্ণনা বা ডালাসে কেনেডির খুনের সেই ছয়তলার জানালার কথা। আকাশছোঁয়া বৃক্ষের খোঁজে এর দুইটা পর্ব, ইলিনয় আর ক্যালিফোর্নিয়া, এই দুইটা প্রবন্ধে প্রকৃতির বিবরণ অংশটুকু সত্যিই মনকাড়া। ইচ্ছে করে এমন ক্যাম্পিং এ যেতে৷ নর্থ ডাকোটাতে গিয়ে পুলিশের খপ্পরে পড়ার অংশটুকু বেশ মজার। আমেরিকার খাদ্য অপচয় নিয়ে প্রবন্ধটি খুবই চিত্তাকর্ষক। স্ট্রিপ ডান্স বা নারী ফুটবলারকে নিয়ে লেখকের ভাবনা আমার ভালো লেগেছে। আমেরিকার গল্প লেখক লিখেছেন একেবারে সাবলীল ভাষায়, পড়তে কয়েক ঘণ্টা লেগেছে মাত্র। কিন্তু হালের ভ্রমণকাহিনী লেখকদের মধ্যে তাঁর কলম যে আমার ব্যক্তিগত শেলফে আরো কিছু জায়গা দখল করতে যাচ্ছে, তা নিজেই বুঝতে পারছি বেশ।