মুহাম্মদ মোজাম্মেল হক (১৮৬০-১৯৩৩) অন্যতম প্রসিদ্ধ বাঙালি কবি ও ঔপন্যাসিক। পেশাগত দিক থেকে তিনি একজন সাংবাদিকও ছিলেন। বাঙালি-মুসলমানদের জন্য সর্বপ্রথম পাঠ্যপুস্তক রচনাও তার অন্যতম কৃতিত্ব। মূল ফারসি থেকে শাহনামা কাব্যের প্রথমাংশের অনুবাদ তার অমর কীর্তি। তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ রচনা মৌলিক উপন্যাস জোহরা (১৯১৭)।
বই : জোহরা লেখক : মুহাম্মদ মোজাম্মেল হক প্রকাশনী : মাটিগন্ধা #রেটিং : ৪.৫/০৫
"মুহাম্মদ মোজাম্মেল হক" মূলত একজন কবি হিসেবেই বেশি পরিচিত, তবে গদ্য ও উপন্যাস রচনায়ও তিনি পারদর্শী ছিলেন। ১৯১৭ সালে তিনি রচনা করেন 'জোহরা', যা ওনার অন্যতম জনপ্রিয় উপন্যাস হিসেবে বিবেচিত। বইটা শেষ করে মনের ভিতর মিশ্র অনুভূতি, না পুরোপুরি মুগ্ধতা আর-না পুরোপুরি হতাশা।
জোহরা একটি চমৎকার প্রেমকাহিনির পাশাপাশি তৎকালীন বাঙালি মুসলিম সমাজের চিন্তাধারা, পারিবারিক রীতি, নারী-পুরুষ সম্পর্ক ও সামাজিক মূল্যবোধের এক জীবন্ত দলিল। যে সমাজ তখন সবে নিজেকে গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিল, সাহিত্যের আয়নায় নিজের মুখ দেখতে চাইছিল, সেই সমাজের একটি প্রামাণিক প্রতিচ্ছবি এই উপন্যাসে ধরা পড়েছে। জোহরার চরিত্রটাকে লেখক সংবেদনশীল, মর্যাদাবোধসম্পন্ন এবং গভীরভাবে মানবিক করে তুলেছেন । ভাষায় পুরোনো দিনের এক নিজস্ব সৌন্দর্য আছে, আবেগের একটা সংযম আছে, যা আজকের দিনে বিরল। তবে পড়ার সময় বারবার একটা অস্বস্তি এসে বসত। উপন্যাসের ঘটনাপ্রবাহ আধুনিক মানদণ্ডে অনেকটাই ধীরগতির। দীর্ঘ বর্ণনা ও সংলাপের ভারে কোথাও কোথাও গল্পের স্বাভাবিক টান থমকে যায়। মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা বা বহুমাত্রিক চরিত্রায়ন যারা খোঁজেন, তারা কিছুটা হতাশ হতে পারেন। আরেকটা বিষয় এড়ানো কঠিন, বইটার শক্তি আর দুর্বলতা একই জায়গা থেকে উৎসারিত। যে পুরোনো ভাষা, সামাজিক রীতি ও নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি একদল পাঠকের কাছে বইটাকে অনন্য করে তুলবে, ঠিক সেটাই আরেক দলের কাছে এটাকে সময়ের থেকে পিছিয়ে থাকা বলে মনে করাবে। নারী চরিত্রের উপস্থাপনা নিয়েও এই দ্বিধা থাকতে পারে, কেউ বলবে যুগের তুলনায় অগ্রসর, কেউ বলবে আজকের দৃষ্টিতে সীমাবদ্ধ। তবু বলবো, জোহরা-কে 'ভালো' বা 'খারাপ' বলে এককথায় বিচার করা একদমই ঠিক হবে না। এর সাহিত্যিক উৎকর্ষের চেয়ে ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব অনেক বেশি। "মুহাম্মদ মোজাম্মেল হক" বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ কর্তৃক 'কাব্যকণ্ঠ' উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন, এবং ওনার এই উপন্যাসে সেই কাব্যিক সংবেদনশীলতার ছাপ স্পষ্ট।
কেউ যদি আধুনিক থ্রিলার বা দ্রুতগতির গল্পের পাঠক হন, তাহলে বইটাকে ধীর ও উপদেশমূলক লাগবে। কিন্তু বাংলার মুসলিম সমাজের প্রাচীন সাহিত্যধারা, ভাষার বিবর্তন এবং শতবর্ষ আগের মানসজগতের প্রতি যদি সামান্যটুকু আগ্রহ থাকে, তাহলে "জোহরা একটি মূল্যবান পাঠ্য, এতে কোনো সন্দেহ নেই"।
📌 ফ্রন্টের স্টাইলা সম্ভবত ১৯শ শতাব্দীর শেষ এবং ২০শ শতাব্দীর(সঠিক বলতে পারছি না) শুরুতে যেরকম ব্যবহার করা হতো, ঠিক সেরকমই রাখা হয়েছে। বর্তমানের যেসকল ফ্রন্টগুলো পড়ে অভ্যস্ত সেরকম না। প্রকাশনীর উচিত ছিল পুরনো ফ্রন্ট পরিবর্তন করে বর্তমানেরগুলো থেকে ব্যবহার করা। কালির ছাপ তুলনামূলক পড়ার মতো ছিল বিধায়, কিন্তু এখানেও আরো উন্নত করার যেতো।