Jump to ratings and reviews
Rate this book

অনিমেষ ##২

কালবেলা

Rate this book
অনিমেষ যখন প্রথম কলকাতায় পা রেখেছিল তখন রাস্তায় ট্রাম জ্বলছে, গুলি চলছে। উত্তরবঙ্গ থেকে আসা এই তরুণটি সেদিন দুর্ঘটনার শিকার হয়েছিল। তারপর আর পাঁচটা মানুষের মতো গা ভাসিয়ে ভেসে যেতে যেতে হঠাৎ তার জীবনের মোড় পাল্টালো। ছাত্র-রাজনীতি তাকে নিয়ে গেল জটিল আবর্তে। এই দেশে আর দেশের মানুষের পাশে দাঁড়ানোর দুর্বার বাসনায় বিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির পতাকার নীচে গিয়ে দাঁড়াল। কিন্তু মনুষ্যত্ব এবং মানবিক মূল্যবোধ তাকে সরিয়ে নিয়ে এল উগ্র রাজনীতিতে। সত্তরের সেই আগুনে ঝাঁপ দিয়ে নিজেকে দগ্ধ করে সে দেখল, দাহ্যবস্তুর কোনও সৃষ্টিশীল ক্ষমতা নেই। পুলিশের নির্মম অত্যাচারে সে যখন বিকলাঙ্গ তখন বিপ্লবের শরিকরা হয় নিঃশেষ নয় গুছিয়ে নিয়েছে আখের। অনিমেষ অবাক হয়ে দেখল মাধবীলতাকে। মাধবীলতা কোনও রাজনীতি করেনি কখনও, শুধু তাকে ভালবেসে আলোকস্তম্ভের মতো একা মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। খরতপ্ত মধ্যাহ্নে যে এক গ্লাস শীতল জলের চেয়ে বেশি কিছু হতে চায় না। বাংলাদেশের এই মেয়ে যে কিনা শুধু ধূপের মতো নিজেকে পোড়ায় আগামীকালকে সুন্দর করতে। দেশ গড়ার জন্যে বিপ্লবের নিষ্ফল হতাশায় ডুবে যেতে যেতে অনিমেষ আবিষ্কার করেছিল বিপ্লবের আর এক নাম মাধবীলতা। দেশ পত্রিকায় ধারাবাহিক প্রকাশের সময় এই দুটি চরিত্র লক্ষ পাঠকের ভালবাসা পেয়েছিল। সুস্থ উপন্যাসের সেইখানেই সার্থকতা।

সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কারে ভূষিত।

632 pages, Hardcover

First published January 1, 1983

Loading...
Loading...

About the author

Samaresh Majumdar

348 books736 followers
Samaresh Majumdar (Bangla: সমরেশ মজুমদার) was a well-known Bengali writer. He spent his childhood years in the tea gardens of Duars, Jalpaiguri, West Bengal, India. He was a student of the Jalpaiguri Zilla School, Jalpaiguri. He completed his bachelors in Bengali from Scottish Church College, Kolkata. His first story appeared in "Desh" in 1967. "Dour" was his first novel, which was published in "Desh" in 1976. Author of novels, short stories and travelogues, Samaresh received the Indian government's coveted Sahitya Akademi award for the second book of the Animesh series, 'Kalbela".

Some of his famous characters are:

1. Animesh & Madhabilata (Animesh Quartet)
2. Arjun - Fictional sleuth.
3. Dipaboli (Saatkahon)

সমরেশ মজুমদার-এর জন্ম ১০ মার্চ ১৯৪৪। শৈশব কেটেছে ডুয়ার্সের চা-বাগানে। জলপাইগুড়ি জেলা স্কুলের ছাত্র। কলকাতায় আসেন ১৯৬০-এ। শিক্ষা: স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে বাংলায় অনার্স, পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এম.এ। প্রথমে গ্রুপ থিয়েটার করতেন। তারপর নাটক লিখতে গিয়ে গল্প লেখা। প্রথম গল্প ‘দেশ’ পত্রিকায়, ১৯৬৭ সালে। প্রথম উপন্যাস ‘দৌড়’, ১৯৭৫-এ ‘দেশ’ পত্রিকায়। গ্রন্থ: দৌড়, এই আমি রেণু, উত্তরাধিকার, বন্দীনিবাস, বড় পাপ হে, উজান গঙ্গা, বাসভূমি, লক্ষ্মীর পাঁচালি, উনিশ বিশ, সওয়ার, কালবেলা, কালপুরুষ এবং আরও অনেক। সম্মান: ১৯৮২ সালের আনন্দ পুরস্কার তাঁর যোগ্যতার স্বীকৃতি। এ ছাড়া ‘দৌড়’ চলচ্চিত্রের কাহিনিকার হিসাবে বি এফ জে এ, দিশারী এবং চলচ্চিত্র প্রসার সমিতির পুরস্কার। ১৯৮৪ সালে ‘কালবেলা’ উপন্যাসের জন্য পেয়েছেন সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার।

মৃত্যু : ৮ মে, ২০২৩

Ratings & Reviews

What do you think?
Rate this book

Friends & Following

Create a free account to discover what your friends think of this book!

Community Reviews

5 stars
1,702 (52%)
4 stars
1,092 (33%)
3 stars
344 (10%)
2 stars
65 (2%)
1 star
20 (<1%)
Displaying 1 - 30 of 190 reviews
Profile Image for Aishu Rehman.
1,148 reviews1,208 followers
March 4, 2019
পুরো গল্প জুড়ে রাজনীতি ও বিপ্লব থাকলেও পাঠকের মনে অনেক বড় জায়গা জুড়ে থাকবে মাধবিলতা। গল্পের শেষে সবাই যখন হারিয়ে গেলো, মাধবিলতায় পূর্ণতা পেলো অনিমেষ। ভালবাসার জন্য মাধবিলতার ত্যাগ বাকি সবকিছুকে ম্লান করে দেয়। পুরো গল্পটা এক নিঃশ্বাসে শেষ করেছি।

অনিমেষ মিত্র। জলপাইগুড়ি থেকে কলকাতা আসে উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য। কলকাতায় পা রাখতেই পরে বিপদের মুখে। কলকাতায় তখন কারফিউ চলে। পুলিশ তাকে সন্দেহ করে গুলি ছোড়ে। থাইয়ের নিচে হাটুর উপরের অংশে গুলি লেগে হাসপাতালে পড়ে থাকে তিনমাস। সুস্থ হতে হতে একটা শিক্ষাবছর নষ্ট হয়ে যায় অনিমেষের। রাজনীতি সম্পর্কে বুঝ হবার পর থেকেই সে বামপন্থী মনোভাব ধারন করে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গিয়ে জড়িয়ে পরে বামপন্থী কমিউনিস্ট পার্টির সাথে। পুলিশের গুলিতে হওয়া ক্ষতচিহ্নটাকে 'সাধারন মানুষের উপর পুলিশি নির্যাতনের' প্রকৃত হিসেবে ব্যবহার করে ছাত্র ইউনিয়নে বিপুল ভোটে জয়লাভ করে। কিন্তু সে যেই আদর্শ নিয়ে বামপন্থী কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেয় কিছুদিন পরে বুঝতে পারে সবই ফাকি। সবাই ক্ষমতার গদিটাকে পাওয়ার জন্য বিভিন্ন আদর্শের দোহাই দেয়। ধীরেধীরে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে তার সহপাঠিনী মাধবিলতার সাথে। মাধবিলতার ভাষ্য মতে লতার মতই অনিমেষের জীবনে জড়িয়ে পড়ে মাধবিলতা। অনিমেষ চায় সমাজ ব্যাবস্থার পরিবর্তন। কিন্তু এই পরিবর্তন কিভাবে আসবে! রাজনীতি করে পরিবর্তন আনা সম্ভব নয় সেটা খুব ভালভাবে বুঝতে পেরেছিলো অনিমেষ। যার হাত ধরে বামপন্থী কমিউনিস্ট পার্টিতে এসেছিলো; সেই সুভাসদাকে যখন পার্টি থেকে বের করে দেওয়া হলো তখন সুভাসদার পথ অনুসরণ করে বিপ্লবী হলো অনিমেষ। আর মাধবিলতা?? জানতে হলে যারা পড়েন নাই তারা ঝটপট পড়ে ফেলুন।

অসামান্য, অসাধারণ, অতুলনীয়। সাহিত্য একাডেমী পুরষ্কার - ১৯৮৪ পাওয়া এই উপন্যাস আমার পাঠকজীবনের একটা অন্যরকম অভিজ্ঞতা। অনিমেষ আর মাধবীলতাকে যেমন অসংখ্য পাঠক ভালোবেসেছেন, ভালোবেসেছি আমিও।
Profile Image for Dystopian.
508 reviews291 followers
November 25, 2023
কালবেলা কে একটা জনরায় আবদ্ধ করা আমাদের সাহিত্যবোধ আর আত্মিক সীমাবদ্ধতা স্পষ্টভাবে। কালবেলা কোনো রাজনৈতিক উপন্যাস নয়। ভালোবাসার উপন্যাস, নিজেকে পদে পদে খুজে নেওয়ার উপন্যাস৷

প্রয়াত লেখকের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই।
Profile Image for Rubell.
198 reviews23 followers
July 1, 2021
'কালবেলা' নকশাল আন্দোলনে জড়িয়ে যাওয়া এক অবিমৃষ্যকারী তরুণের সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ ম্লান হয়ে যাওয়ার গল্প। ভুল মানুষের প্রেমে পড়া একজন জেদি তরুণীর জীবনের সকল সাধ আহ্লাদ ত্যাগ করে হাসিমুখে দুর্দশাগ্রস্ত জীবন বেছে নেওয়ার গল্প।
কালবেলার প্রথমার্ধ খুব ধীরগতির, চমকবিহীন। বিরক্তিকর। তবে প্রথমার্ধের গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে মস্কোপন্থী কমিউনিস্টদের ভণ্ডামি সম্পর্কে খুব পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়।
কালবেলা উপন্যাস জমতে শুরু করে অনিমেষ যখন মস্কোপন্থী থেকে চীনপন্থী হয়। বাস্তবতার নিরিখে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত, কিন্তু পাঠক হিসেবে সেটা রোমাঞ্চের আভাস। এবং সমরেশ মজুমদার হতাশ করেননি, শেষ অধ্যায়গুলিতে কিছু শ্বাসরুদ্ধকর উত্তেজনার উপাদান আছে। কিছু অপরিণত যুবক যারা নিজ নিজ পরিবারের দায়িত্ব নেওয়ার মত ম্যাচিউর না, তারা কোন প্রপার হোমওয়ার্ক ছাড়াই নেমে পড়ে দেশোদ্ধার করতে। ভারতের মত দেশ, যেখানে কোন যুদ্ধ-বিগ্রহ চলছে না, সেখানে বসে পকেটে পিস্তল নিয়ে "চীনের চেয়ারম্যান, আমাদের চেয়ারম্যান" স্লোগান দিয়ে, মাও সে তুংয়ের মত গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরাওয়ের স্বপ্ন দেখা তরুণদের পরিণতি কী হতে পারে তা আঁচ করতে সমস্যা হওয়ার কথা নয়। কিন্তু তারপরও মাধবীলতা এমন অপরিণামদর্শী যুবককে ভালোবেসেছে, ব্যাপারটা বোকামি হলেও এই বোকামির একটা পোয়েটিক সৌন্দর্য আছে বৈকি, একটাই তো জীবন! ঝুঁকি না নিলে মজা কোথায়! ভালোবাসা থাকলে অনেক বড় কষ্টও কখনও কখনও ছোট কষ্ট মনে হয়, মাধবীলতার হয়ত তাই মনে হয়েছে। কালবেলায় বাকি প্রেমিকাদের পরিণতিও খুব একটা সুখের নয়, নীলা কিংবা শীলা সেন, সবাই ভালোবেসে দুর্বিষহ জীবনে পতিত হয়েছে। অসম প্রেমের পরিণতি করুণ হওয়াটাই স্বাভাবিক। অর্থাৎ কালবেলা উপন্যাসের একটা বড় সৌন্দর্য বলা যায় গল্পের বাস্তবতা। কালবেলার ঐতিহাসিক গুরুত্বটাও কম নয়, গত শতাব্দীর ষাট এবং সত্তরের দশকের পশ্চিমবাংলার উন্মাতাল তারুণ্য সফলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে এখানে, প্রেম কিংবা বিদ্রোহ- তখনকার তরুণ প্রজন্ম সবকিছুতেই কিঞ্চিত চরমপন্থী ছিল। সুকান্তের 'আঠারো বছর' এই তরুণদের মাঝে নেমে এসেছিল, তবে ট্র্যাজেডিরূপে।
কমরেড সমরেশ মজুমদার, লাল সেলাম!
Profile Image for Saifuddin Rajib.
Author 3 books30 followers
August 23, 2018
রাজনীতি ছাপিয়ে প্রেমের গল্প 'কালবেলা'।
সমরেশ মজুমদারের মোহিনী পড়েছেন ক'জনে! অনেকের ভাল লাগেনি, তাইতো! আমার বড্ড ভাল লেগেছিল, কারণ আমি গল্পের ভেতরে আরেক গল্প আবিস্কারের নেশায় বই পড়ি। কালবেলাকে মোহিনীর সাথে তুলনা করবো না, তবে আবিস্কারের নেশায় কালবেলা তেমনই এক উপন্যাস। গভীর রাজনীতির মাঝেও প্রেম খুঁজে পেয়েছি, মোহিনীতে পেয়েছিলাম এক মানুষ নারীকে, প্রাণবন্ত সে নারী। আসলে খুঁজতে হয়েছে, রাজনীতি পছন্দের নয় কিনা! বিশাল সাইজের চিত্রপট নিয়ে সিরিজ বইয়ের দ্বিতীয় এটি, এত বড় সিরিজ লিখতে গেলেই লেখকের ব্যক্তিসত্ত্বা এমনিতেই উঠে আসে। মানে সমরেশের ব্যক্তিজীবন। উনি অবশ্য কিঞ্চিৎ অস্বীকার করেছিলেন। সে করুক, সমরেশ মজুমদার যে অনিমেষের মাঝে আপন সত্ত্বার বীজ বপন করে কালবেলা লিখেছিলেন তা অস্বীকার করার উপায় এই। আসুন একটু হিন্ট দেই,
উত্তরাধিকার লেখার পরে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার পালাবদল ঘটেছে, সদ্য ক্ষমতায় সিপিআই। আষ্টেপৃষ্ঠে মার্ক্সবাদী কমিউনিস্ট। এদেরই শাখাপ্রশাখা নকশাল আন্দোলন করেছিল। ক্ষমতায় আসার পরে রাজবন্দীদের মুক্তি, ফৌজদারী মামলা তুলে নেওয়ার সব কিছুই করেছিল সিপিআই। উদ্দেশ্য শুরুর আদর্শের সবাইকে আবার একভূত করা। ঠিক সেগুলো পরিষ্কারভাবে এসেছে কালবেলায়। যে কথা বলছিলাম, উত্তরাধিকার লেখার পরে সমরেশ মজুমদারকে সিপিআই মন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য বলেছিলেন উত্তরাধিকার বইটি কমিউনিস্ট পার্টির দলিল হিসাবে ঘোষণা দাও, লাখ কপি বিক্রি হবে। লেখক অবশ্য সেকথা শোনেননি যদিও তার ভেতরে কমিউনিজমের আদর্শই ছিল ঠিক একই জিনিস তিনি বইটির মুখ্য চরিত্র অনিমেষে দেখিয়েছিলেন। এখানে কথা আছে, অভিজ্ঞতা কথা বলে। হয়ত কিছুটা চিন্তাও কাজ করছিল, গতানুগতিক রাজনীতির বই তাও যদি শুধু কমিউনিস্টদের নিয়ে হয় তবে বইটি হয়ে যায় বিশেষ শ্রেণীর। সে সময়কার চরম জনপ্রিয় লেখক সমরেশ মজুমদার বেশ ডিপ্লোমেটিক ছিলেন বোঝা যায়, তিনি কালবেলায় নিয়ে এলেন প্রেম। আহা যেই সেই প্রেম নয়, মাধবীলতার লদকালদকি প্রেম। বিশ্বাস করুন, শুধু সামাজিক ও রাজনৈতিক উপন্যাস হলে মাধবীলতা চরিত্রের কোন দরকারই ছিল না। কিন্তু অভিজ্ঞ এই লেখক কেন বিশেষ গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকবেন! দেশ পত্রিকায় যখন উপন্যাসটি ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করে, উঠতি বয়সী রোম্যান্টিক পড়ুয়ারা দেদারছে কিনেছে পত্রিকা। তৎকালীন সাহিত্য সমালোচকরা বলেছিলেন গোপনে গোপনে সরকারপক্ষও বইটির প্রচারে সহায়তা করেছিল। ওই যে কারণ পটভূমিতে পশ্চিমবঙ্গের কমিউনিস্ট। আরেকটা জিনিস খেয়াল করবেন, উত্তরবঙের জলপাইগুড়ি থেকে কোলকাতায় এসেছিলেন অনিমেষ। লেখক নিজেই কিন্তু তাই! এটা অবশ্য সমস্যা না, লেখক তার চেনা পট, পরিবেশ নিয়ে লিখবেন এটা অন্যায় নয়।

কি আছে 'কালবেলা'য়ঃ
কী নেই বলুন! একটুতো বললামই, রাজনীতি আর প্রেম। হ্যাঁ ওটা মুখ্যা ওটা ছাড়াও রয়েছে। তার আগে গল্পে আলোকপাত করা যাক।
জলপাইগুড়ি, কাঞ্চনজঙ্গার শীতল আবহাওয়া ছেড়ে উপন্যাসের নায়ক অনিমেষ চলে আসে কোলকাতায়। এটা অবশ্য উত্তরাধিকার ছিলো। কোলকাতায় আসার প্রথম দিনে পুলিশ ও মিছিলকারীদের মাঝে বুলেটবিদ্ধ হয় অনিমেষ। মিশনারী কলেজ স্কটিশ চার্চে ভর্তি হয়ে যে হোস্টেলে তার জায়গা হয়েছিলো সেখানে ছিল জামসেদপুরের ধনীর দুলাল তরুন কবি ত্রিদিব সেনগুপ্ত। ক্ষণে ক্ষণে কবিতা আর নেশার আভরণে ডুবে থাকা ত্রিদিবের সাথে ভাল সখ্যতা হয় অনিমেষের। বাংলায় এমএর ছাত্র অলক্ষ্যে জড়িয়ে পড়ে কমিউনিজমে, স্বপ্ন সাম্যের ভারতবর্ষ গড়ে তোলা।
জলপাইগুড়ির মত পাহাড়ি এলাকা থেকে আসা অনিমেষ তখনো বুঝতে পারেনি রাজনীতির ভেতরেও গভীর বিষাক্ত নগ্নতা রয়েছে। চোখের সামনে ভাগ হতে দেখেছে আদর্শকে। রাজনীতিতে যখন গভীরভাবে অনিমেষ ডুববে তখনই তার জীবনে এলো সহপাঠিনী মাধবীলতা। ধনীর দুলালী মাধবীলতা রাজনীতিতে আকৃষ্ট না হলেও অনিমেষে সঁপে দিয়েছিল নিজেকে। একেবারে গভীরভাবে। একদিকে রাজনীতি অন্যদিকে প্রেম দুটোর মাঝে ব্যাল্যান্স করেছে অনিমেষ। মাধবীলতা তার জগৎজূড়ে থাকা অনিমেষকে নিয়ে ভালবাসাছাড়া বিশেষ ভাবনা ছিল না। এদিকে দলীয় কোন্দলে ভাগ হয়ে যায় সুভাষ এবং হয়ে ধীরে ধীরে গড়ে তোলে বিদ্রোহী গ্রুপ। আদর্শ বিবর্জিত নেতাদের ছেড়ে অনিমেষও ভিড়ে যায় সুভাষের সাথে সশস্ত্র আন্দোলনে, নকশালবাদ। একে একে হারিয়েছিল বন্ধু কবি ত্রিবিদ সেনগুপ্ত। সুভাষ'দাকেও।

দীর্ঘ এই পরিক্রমায় মাধবীলতা কখনো অনিমেষের উপরে বিশ্বাস হারায়নি। আন্দোলনে পাশে না থাকলেও ব্যক্তিজীবনে সুখ ছড়িয়েছে তারা। সুখ-প্রেমের সেই গভীর ভাবনা লেখক সজীব রেখেছিলেন কালবেলায়। গ্রেফতার হয়ে পুলিশি নির্যাতনের শিকার হয়ে পঙ্গু হয় অনিমেষ।
অনিমেষ পঙ্গু হয়ে জেল থেকে মুক্তি পেয়েছিল। এতদিনে মাধবীলতা নিজেকে বিকিয়ে দেয়নি। যে শরীর সে অনিমেষকে দিয়েছিল সেই শরীরের বয়েছে অনিমেষের রক্তও। একমাত্র পুত্র সন্তানকে নিয়ে জীর্ণশীর্ণ সেই বাড়িতেই ওঠে অনিমেষ। তিনটে মানুষের সে ঘর। শারীরিক অক্ষমতা, দারিদ্র, মাথার ওপরে শীর্ণ চাল থাকলেও সেখানে মাধবীলতার ভালবাসা ছিল। আর ফলাফল স্বরূপ সন্তান। যে ভালবাসা হৃদয়ের সেখানে বিশ্বাসের বন্ধন ছিল, সামাজিক বিয়ের দরকার হয়নি তবুও সে মাধবীলতা মিত্র। অনিমেষ মিত্রের স্ত্রী।

নিখাদ রাজনৈতিক উপন্যাস 'কালবেলা' তবে রাজনীতি খুব বেশি পছন্দের নয় বলে আমি বইটিকে বলব অপরাজনীতির সুন্দর বিবরণ। অপরাজনীতি যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে তার বাস্তব দৃশ্যপট পশ্চিমবঙ্গ। একই সময়ে যখন ভারতের অন্য প্রদেশগুলো সমৃদ্ধি করেছে পশ্চিমবঙ্গ খুইয়েছে ঐতিহ্য। অথচ কী ছিলনা তাদের। নকশালবাদ, বামরাজনীতি নিঃশেষ করে দিয়েছে। লেখক নিজে কমিউনিস্ট বলে একটা ভালোর শেষ দেখিয়েছেন। কিন্তু বইটি জুড়ে তিনি দেখিয়েছেন সেই অপরাজনীতির অবক্ষয়ের চিত্র, রক্তপাত হানাহানি। সেই রাজনীতির কথা বলতে গিয়ে এই জনপ্রিয় লেখক মুদ্রার অন্য পিঠের কোন চিত্রের শিক্ষা দেখাতে পারেননি। বাতলে দিতে পারেননি কেন ঘটলো।
টাইটেল দিয়েছিলাম, রাজনীতিকে ছাপিয়ে প্রেমের গল্প 'কালবেলা'। ঠিক এখানে রেখেছেন দারুণ সব বার্তা, বলা চলে প্রেমের বার্তা। নারী ও ভালবাসার সংগ্রামের বার্তা। চরম বাস্তববাদী রাজনীতির সাথে সাথে প্রেম পছন্দ করেননা এমন পাঠকের উপন্যাস নয় 'কালবেলা'। তবে একটা মেয়ে ভালবাসার দায়বদ্ধতাকে ছাপিয়ে কীভাবে পরিপূর্ণ নারী হয়ে উঠতে পারে সেটার জীবন্ত উদাহরণ মাধবীলতা। লেখক হয়ত অনিমেষকে নেতা নয় বরং বিদ্রোহীই রাখতে চেয়েছিলেন বলে মাধবীলতাকে গণ্ডীতে আবদ্ধ রেখেছিলেন।
Profile Image for Masudur Tipu.
200 reviews8 followers
September 12, 2026
শেষে এতো আকুলতা! ধরে রাখা অনেক কঠিন! সব পুরুষ একজন মাধবীলতা চায়।
ইচ্ছে করেই উত্তরাধিকার পড়ার অনেক বছর পর কালবেলা পড়লাম, ক্লাসিক বই জমিয়ে রাখাই ভালো। কারণ শেষ হয়ে গেলে আফসোস হয়।
Profile Image for অনিরুদ্ধ.
143 reviews21 followers
July 19, 2020
বেশ সময় নিয়েই শেষ করলাম 'উত্তরাধিকার'-এর দ্বিতীয় পর্ব 'কালবেলা।' সময় লাগার মানে বইটা আমাকে টানেনি এমন মনে করা ভুল হবে। আসলে এর মুগ্ধতা এতটাই আচ্ছন্ন করে রেখেছিল যে আমি এই জাল থেকে মুক্ত হতে চাচ্ছিলাম না। কিন্তু একসময় ঠিকই শেষ পৃষ্ঠায় যেয়ে একই সাথে দীর্ঘশ্বাস এবং নতুন দিনের আশায় বুক বাঁধা- দুটো অনুভূতি যখন একসাথে কাজ করে তখন সেই বই সম্পর্কে আর কিছু বলার প্রয়োজন পরে না।

তবুও দুটি কথা না বললেই নয়। উত্তরাধিকার পড়েছি তিন মাস হয়নি। বালক অনিমেষের রক্তে 'বন্দেমাতরম' উত্তেজনার ঢেউ বইয়ে দেয়। সে একটা সমাজতান্ত্রিক দেশের স্বপ্ন দেখতে দেখতে বড় হতে থাকে। কিন্তু ধীরে ধীরে সে বুঝতে পারে প্রতিটি রাজনৈতিক দল আদতে নাম বা গঠন ভিন্ন হলেও তাদের মেরুদণ্ড একই ধাঁচে গড়া। কলকাতায় প্রথম এসেই ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধ সময়ে পুলিসের কাছে গুলি খেয়ে একটি বছর নষ্ট হয় তার জীবন থেকে। কিন্তু পুরোনো অতীত ভুলে যেয়ে নতুন আশায়, নতুন দিনের স্বপ্নে ক্রমেই নিজেকে রাঙিয়ে নেয় সে। আর এসময় তার জীবনে আসে মাধবীলতা। মাধবীলতা- যে কোন ব্যাকরণ না মেনে একভাবে লড়ে যায়।

অনিমেষ, সুবাসদা, মহাদেবদা এরা বিপ্লবের আগুন জ্বালিয়ে দেয়। চারিদিকে 'নির্বাচন বয়কট করো' 'পার্লামেন্ট শুয়োয়ের খোয়ার' শ্লোগানে নিজেদের রক্তে আগুন জ্বালিয়ে দেয় তারা। কিন্তু তাদের ধারণা সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত করে তার পরিণত হয় আতঙ্কবাদী রূপে। যাদের সমর্থন পাবে বলে বিপ্লবের শুরু তারাই যেন বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়।

কিন্তু একজন মাধবীলতা। যে সারাটা সময় অনিমেষকে সমর্থন জুগিয়েছে, পরম নির্ভরতায় তাকে লতার নতো আঁকড়ে ধরেছে, আর অনিমেষ অবাক চোখে শুধু দেখেছে। তার এই নীরব বিপ্লব যা সমাজের বিরুদ্ধে, অনিমেষের জন্য তা বাকরুদ্ধ করে দেয় অনিমেষকে। বুঝতে পেরেও কোথায় যেন সুতোর টান ছিঁড়ে যায়।

বিপ্লব, রাজনীতি সব ছাপিয়ে এক মাধবীলতা সকলকে মোহের চাদরে বন্দী করে ফেলে। মাধবীলতায় মুগ্ধ আমি, আমার মতো আরো অনেক পাঠক। বিপ্লবের দাউদাউ করে জ্বলা আগুনে মাধবীলতা যেন পরম শান্তির পরশে জুড়িয়ে দেয় অনিমেষকে।

আমার পুরো লেখার মাঝেই মুগ্ধতা ছড়ানো। সম্পূর্ণরূপে তা প্রকাশ করা কখনোই সম্ভব না। তবে অনিমেষের আবিষ্কার করা সত্যগুলো কি পরিবর্তন হয়েছে? বা কেউ কি পারবে এই সম্পূর্ণ সিস্টেমকে নতুন করে ঢেলে সাজাতে?
Profile Image for Habib Ehsan.
18 reviews10 followers
July 27, 2021
কলেজে পড়ার উদ্দেশ্যে আসা হলো কলকাতায় অনিমেষের। এসেই কলকাতার শহরে গন্ডগোলের মধ্যে পড়ে গেল সে। ফলাফল গুলিবিদ্ধ হয়ে হাস্পাতালের বেডে।

এতটুকুই যতেষ্ট বাকি গল্পের জন্য। কেননা এখান থেকেই শুরু অনিমেষের অশান্ত জীবনের। যদি এই ঘটনা না ঘটত তাহলে কালবেলা এখানেই শেষ হয়ে যেতে পারত। যেমনটা নেড স্টার্ক যদি সাউথে না যেত তাহলে হইতো গেম অব থ্রোনসে বাকি সিজনগুলোও আর আসত না।

আদর্শ, আন্দোলন,পুলিশের রাজনৈতিক অত্যাচার এতকিছুর মধ্যে ভালো লেগেছে অনিমেষ আর মাধবীলতার প্রেম। পরিচয় থেকে শুরু হয়ে শেষ পর্যন্ত তাদের অটুট ভালোবাসা। মাধবীলতার ত্যাগ আর অনিমেষের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের পাশে দাড়িয়ে তাকে সমর্থন দিয়ে যাওয়া।
Profile Image for Tahjiba Adrita.
107 reviews35 followers
February 29, 2020
কালবেলা" উপন্যাসটি নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। সমরেশ মজুমদার এর "উত্তরাধিকার" সিরিজের দ্বিতীয় বই এটি এবং সম্ভবত সবচেয়ে জনপ্রিয়ও। বইটি যখন প্রথম পড়েছিলাম তখন নক্সাল,কমিউনিজম,রাজনীতি এসব নিয়ে কিছুই বুঝতামই না বলা চলে।আজ অনেক বছর পরিণত বয়সে এসে বইটি পড়ে অনেক ভাবছি।৭০ দশকের উত্তাল রাজনীতির দৃশ্যপট হচ্ছে উপন্যাসটি। কিন্তু ২০২০ এসেও কি সেই দৃশ্যপট কি একটু বদলেছে? শুধু আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে এই। "কালবেলা" কি শুধু রাজনীতি,বিপ্লবের গল্প? নাকি রাজনীতি কে ছাপিয়ে প্রেমের গল্প? উপন্যাসটি যেন এক গল্পের ভেতর আরেক গল্প। সেই গল্পের নায়িকা হচ্ছে মাধবীলতা। এখন বুঝতে পারছি স্কুলে থাকাকালীন সময়ে আমি হয়ত বইটির অর্ধেক ব্যাপারই বুঝে উঠতে পারি নিই,পারলে হয়ত দীপাবলি (সাতকাহন) হতে না চেয়ে মাধবীলতাই হতে চাইতাম। বাংলা সাহিত্যে এত শক্তিশালী আধুনিক চরিত্র আর দ্বিতীয় কোনটি আছে বলে মনে পড়ছে না। উত্তরাধিকার পড়ে মা মরা অনিমেষ এত প্রতি মায়া জন্মালেও, কালবেলা পড়ে অনিমেষ কে একজন আবেগের বশবর্তী বোকা মানুষ মনে হচ্ছে।যে নিজেই নিজের সম্পর্কে জানে না। আসল বিপ্লবী তো মাধবীলতা,যার নিজের সম্পর্কে, জীবন সম্পর্কে এমনকি রাজনীতি সম্পর্কেও অনিমেষের চেয়ে অনেক বেশী জ্ঞান রয়েছে। যে প্রতিনিয়ত তার নিজের সত্তার সাথে বিপ্লব করে গেছে,কোন কিছুর বিনিময় ছাড়া।মাধবীলতার চারিত্রিক দৃঢ়তা সবকিছু কেই ছাপিয়া যায়।

আরেকজন এর কথা না বললেই নয় তিনি হচ্ছেন সরিৎশেখর,লোকটা শুধু দিয়েই গেল বিনিময়ে কিছুই পেলো না। তার প্রতি উদাসীনতার কারণে কেন জানি অনিমেষ কে অকৃতজ্ঞও মনে হচ্ছিল।সিরিল,শীলা,বারীন এই চরিত্রগুলো ছোট হলেও বেশ শক্তিশালী এমন কি অনিমেষের চেয়ে বেশ দৃঢ় মনে হয়েছে আমার।
তবে সবকিছুর উর্ধ্বে হচ্ছে মাধবীলতা।লতাই আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে আছে অনিমেষ কে। গল্পের শেষে সবাই যখন হারিয়ে যায় মাধবীলতাতেই পূর্ণতা পায় অনিমেষ। ভালোবাসার জন্য মাধবীলতার ত্যাগ সবকিছুকেই ম্লান করে দেয়। আসলেই কি এভাবে সবছেড়ে ছুড়ে কাউকে ভালোবাসা যায়?
Profile Image for Avishek Bhattacharjee.
400 reviews86 followers
December 31, 2021
এটা সে সময়ে পড়া বই যখন আমি সামাজিক বই পড়তাম। বইটা বাসায় ছিল, তাই পড়েছি। ভাল লেগেছিলো বেশ। লেখকের লেখার মুন্সিয়ানা ব্যাপক। একটা উত্তাল সময়, কিছু সম্পর্কের পরিণতি আর মানুষের মূল্যবোধ নিয়ে লেখা চমৎকার একটা বই। যদিও এ বইয়ে অনিমেষ নায়ক কিন্তু বাস্তব জগতের হেরে যাওয়া অনিমেষ আর তাকে ভালোবাসার মুল্য চোকানো মাধবীলতাদের জন্য আমার মায়া হয়না, কেবল করুনা হয়।
Profile Image for Mainak Mandal.
21 reviews12 followers
August 8, 2026
কথাশিল্পী সমরেশ মজুমদারের ‘কালবেলা’ (১৯৮১-৮২) বাংলা সাহিত্যের একটি মাইলফলক এবং তাঁর বিখ্যাত ‘দৌড়াদৌড়ি’ ট্রিলজির (উত্তরাধিকার, কালবেলা, কালপুরুষ) দ্বিতীয় তথা সবচেয়ে জনপ্রিয় অংশ। এটি কেবল একটি রাজনৈতিক উপন্যাস নয়, এটি সত্তরের দশকের উত্তাল পশ্চিমবঙ্গ, বিশেষ করে নকশালবাড়ি আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে রচিত এক যুবমানসের স্বপ্ন, মোহভঙ্গ এবং এক শাশ্বত প্রেমের মহাকাব্য।


Summary
উপন্যাসের মূল কাহিনীর শুরু উত্তরবঙ্গের জলপাইগুড়ির এক যুবক অনিমেষ মিত্র-কে কেন্দ্র করে। অনিমেষ তার ঠাকুরদার কাছে মানুষ। উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে সে উত্তরবঙ্গ ছেড়ে কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজে পড়তে আসে। কলকাতার মেস-জীবন এবং কলেজের পরিমণ্ডল তার সামনে সম্পূর্ণ এক নতুন জগত উন্মোচন করে।
কলকাতায় এসে অনিমেষের আলাপ হয় মাধবীলতা নামের এক শান্ত, দৃঢ়চেতা এবং বুদ্ধিমতী তরুণীর সাথে। ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে এক গভীর, নিবিড় প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। কিন্তু এই সময়েই অনিমেষ জড়িয়ে পড়ে তৎকালীন বামপন্থী ছাত্র রাজনীতিতে, যা পরবর্তীতে চরমপন্থী নকশালবাড়ি আন্দোলনে রূপ নেয়। অনিমেষ রাষ্ট্রব্যবস্থা ও সমাজ পরিবর্তনের এক রোমান্টিক স্বপ্নে উদ্বুদ্ধ হয়ে পড়াশোনা, ভবিষ্যৎ এবং মাধবীলতার প্রেমকে আড়ালে রেখে পুরোপুরি আন্ডারগ্রাউন্ড বা গুপ্ত রাজনীতিতে যোগ দেয়।

আন্দোলন তীব্র হলে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নেমে আসে চরম দমনপীড়ন। অনিমেষ পুলিশের হাতে ধরা পড়ে এবং দিনের পর দিন অমানুষিক লক-আপ টর্চারের শিকার হয়। পুলিশের অত্যাচারে তার একটি পা চিরতরে পঙ্গু হয়ে যায়। অনিমেষ যখন জেলে, তখন মাধবীলতা জানতে পারে সে অন্তঃসত্ত্বা। সমাজ, পরিবার এবং লোকলজ্জার তোয়াক্কা না করে, মাধবীলতা অনিমেষের সন্তানকে জন্ম দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। সে একাই লড়াকু মায়ের মতো চাকরি করে তাদের সন্তান অর্ক-কে বড় করে তোলে এবং দীর্ঘকাল অনিমেষের জন্য অপেক্ষা করে।

কাহিনীর শেষে, দীর্ঘ এক দশক পর জেল থেকে যখন পঙ্গু, ভগ্নস্বাস্থ্য ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত অনিমেষ মুক্তি পায়, তখন সমাজ ও রাজনীতির প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ বদলে গেছে। যে বিপ্লবের জন্য সে জীবন যৌবন বিসর্জন দিল, সেই কমরেডরাই তাকে ভুলে গেছে। এই চরম শূন্যতার মধ্যে মাধবীলতা তার হাত ধরে। কোনো আইনি বিয়ে বা সামাজিক স্বীকৃতি ছাড়াই, মাধবীলতার এই আত্মত্যাগ ও ভালোবাসাই অনিমেষের বেঁচে থাকার নতুন অবলম্বন হয়ে ওঠে।




অনিমেষ মিত্র উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র বা নায়ক। উত্তরবঙ্গ থেকে আসা এক সরল, আবেগপ্রবণ যুবক, যে কলকাতার স্রোতে এসে এক আদর্শবাদী বিপ্লবী হয়ে ওঠে। সে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার, কিন্তু রাজনীতির কূটকৌশল ও নিষ্ঠুরতা বোঝার মতো পরিপক্বতা তার ছিল না। আন্দোলনের ব্যর্থতা এবং দীর্ঘ জেল-জীবন তাকে শারীরিকভাবে পঙ্গু ও মানসিকভাবে নিঃস্ব করে দেয়। সে একাধারে এক ট্রাজিক হিরো এবং সত্তরের দশকের দিকভ্রান্ত যুবসমাজের প্রতীক। যে যৌবন হতে পারত সৃষ্টির, ভালোবাসার, আগামীর—তা আজ লালবাজারের লক-আপের দেওয়ালে দেওয়ালে রক্তের দাগ হয়ে মিশে গেছে। তার স্বাস্থ্য ভাঙা, চোখের কোটরে এক পৃথিবী ক্লান্তি, আর মনের ভেতর এক চরম শূন্যতা। সে আজ নিজের শহরেই এক উদ্বাস্তু।
​রাজনীতির মহাকাব্যে অনিমেষ ফুটনোট ছাড়া আর কিছুই নয়। তার হারানো যৌবনের, তার পঙ্গুত্বের কোনো হিসেব কোনো কমরেডের খাতায় লেখা নেই। এই চরম অন্ধকারের মাঝে তার একমাত্র বাতিঘর হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে মাধবীলতা—যে তার ভাঙা মেরুদণ্ড, তার হারিয়ে যাওয়া যৌবনের ছাইয়ের ওপর হাত রেখে আজও বলতে পারে, "আমি আছি।" অনিমেষের অন্ধকার যৌবনের শেষ সম্বল ওই একটুকরো নিঃশর্ত ভালোবাসাই, যা তাকে বেঁচে থাকার এক অদ্ভুত, করুণ শক্তি জোগায়।

মাধবীলতা বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও শক্তিশালী নারী চরিত্র। মাধবীলতা কোনো অন্ধ বিপ্লবী নয়, কিন্তু সে অনিমেষের আদর্শ ও ভালোবাসার প্রতি চরম সৎ। চরম প্রতিকূলতার মুখেও সে যেভাবে একাকী সন্তান জন্ম দিয়ে সমাজের বুকে মাথা উঁচু করে লড়াই করেছে, তা তাকে উপন্যাসের আসল চালিকাশক্তিতে পরিণত করে। তার ভালোবাসা কেবল রোমান্টিকতা নয়, তা এক চরম আশ্রয় ও শক্তির উৎস। একটি মেয়ের জীবনে যৌবনের যে সময়টা পাওয়ার, সাজার আর সংসার পাতার—মাধবীলতা সেই শ্রেষ্ঠ সময়টা উৎসর্গ করেছিল এক চরম শূন্যতার উদ্দেশ্যে। সে জানত না অনিমেষ বেঁচে আছে কিনা, জানত না কোনোদিন তাদের আর দেখা হবে কিনা। তবু এক চিলতে ঘরে, যৎসামান্য উপার্জনে সে পরম যত্নে বড় করে তুলেছে তাদের সন্তান অর্ককে। এই দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা একাকীত্বই ছিল তার জীবনের সবচেয়ে বড় ত্যাগ।
​মাধবীলতা অনিমেষের বিপ্লবে সরাসরি বন্দুক হাতে নামেনি ঠিকই, কিন্তু প্রতিদিনের কঠিন বাস্তবতার সাথে লড়াই করে সে যে জীবন-যুদ্ধ লড়েছে, তা কোনো সশস্ত্র বিপ্লবের চেয়ে কম ছিল না। পুরুষরা যখন রাজনীতির নামে সমাজ ভাঙা-গড়ায় ব্যস্ত, মাধবীলতা তখন নীরবে ভালোবাসার এক নতুন সমাজ সৃষ্টি করছিল।

অর্ক অনিমেষ ও মাধবীলতার সন্তান। সে পরাধীন বা ভেঙে পড়া পরিবেশের মধ্যে বড় হলেও, তার মধ্যে মায়ের দৃঢ়তা ও বাবার ভেতরের আদর্শবাদের একটা মিশ্রণ দেখা যায়। সে ট্রিলজির পরবর্তী অংশ ‘কালপুরুষ’-এর মূল ভিত্তি।

সুভাষ অনিমেষের রাজনৈতিক গুরু বা কমরেড। যে অনিমেষকে নকশাল আন্দোলনের তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক দিকে টেনে আনে। সুভাষ চরিত্রটির মাধ্যমে আদর্শবাদের কঠোরতা এবং রাজনীতির নিষ্ঠুর বাস্তবতাকে দেখানো হয়েছে।

অনিমেষের ঠাকুরদা উত্তরবঙ্গের জলপাইগুড়ির এক রক্ষণশীল কিন্তু স্নেহপ্রবণ মানুষ। তিনি অনিমেষের মূল শিকড়। অনিমেষের কলকাতার রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়া এবং নিখোঁজ হওয়া তাঁর জীবনে এক গভীর ট্র্যাজেডি নিয়ে আসে।





তৎকালীন সমাজের সাথে উপন্যাসের সম্পর্ক
‘কালবেলা’ কোনো কাল্পনিক পটভূমিতে লেখা গল্প নয়; এটি ১৯৭০-এর দশকের পশ্চিমবঙ্গের সমাজ, রাজনীতি ও অর্থনীতির এক জীবন্ত দলিল। তৎকালীন সমাজের সাথে এই উপন্যাসের সম্পর্ক নিচে বিশ্লেষণ করা হলো:

ক) নকশালবাড়ি আন্দোলন ও যুবমানসের মোহভঙ্গ
১৯৬৭ সালে উত্তরবঙ্গের নকশালবাড়ি থেকে যে কৃষক আন্দোলন শুরু হয়েছিল, সত্তরের দশকের শুরুতে তা কলকাতার ছাত্র ও যুবসমাজের মধ্যে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। মেধাবী ছাত্ররা "চীন দেশের চেয়ারম্যান আমাদের চেয়ারম্যান" স্লোগান দিয়ে পড়াশোনা ছেড়ে সশস্ত্র বিপ্লবে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। ‘কালবেলা’ অত্যন্ত নিখুঁতভাবে দেখিয়েছে কীভাবে একটি প্রজন্ম সমাজ পরিবর্তনের এক রোমান্টিক স্বপ্নে উদ্বুদ্ধ হয়ে নিজেদের ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছিল এবং পরবর্তীতে কীভাবে ফ্রন্টলাইনের যুবকদের বলি দিয়ে শীর্ষ নেতারা নিরাপদে সরে গিয়েছিলেন। এটি তৎকালীন যুবসমাজের স্বপ্নভঙ্গ বা ‘মোহভঙ্গ’ (Disillusionment)-এর বাস্তব চিত্র।

খ) রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ও পুলিশি নির্যাতন
তৎকালীন সমাজে কংগ্রেস সরকারের আমলে সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের জমানায় নকশাল দমনের নামে যে ভয়ানক রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস (State Terrorism) চলেছিল, তার হুবহু রূপায়ণ এই উপন্যাসে রয়েছে। লালবাজারের লক-আপে বন্দীদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন, ভুয়া এনকাউন্টারে যুবকদের হত্যা এবং ‘আধা-ফ্যাসিস্ট’ দমনপীড়নের যে নগ্ন রূপ কলকাতা প্রত্যক্ষ করেছিল, অনিমেষের যন্ত্রণাক্লিষ্ট বন্দিজীবনের মাধ্যমে লেখক তা ফুটিয়ে তুলেছেন।

গ) সামাজিক অবক্ষয় ও মূল্যবোধের পরিবর্তন
সত্তরের দশকের অস্থিরতা বাংলার মধ্যবিত্ত সমাজের চেনা মূল্যবোধগুলোকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। একদিকে ছিল বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক মন্দা, অন্যদিকে ছিল রাজনৈতিক হানাহানি। পাড়ায় পাড়ায় যুবকদের গুপ্তহত্যা, বোমাবাজি এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাহীনতা তৎকালীন সমাজকে গ্রাস করেছিল। উপন্যাসে কলকাতার মেস-জীবন এবং সাধারণ মানুষের ভেতরের এই আতঙ্ক ও অসহায়তা স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।

ঘ) নারীর সামাজিক সংগ্রাম ও একলা চলা
তৎকালীন সমাজ ছিল অত্যন্ত পুরুষতান্ত্রিক এবং রক্ষণশীল। সেই সমাজে একজন অবিবাহিত মায়ের সন্তান জন্ম দেওয়া এবং তাকে একা বড় করে তোলা ছিল এক অকল্পনীয় বৈপ্লবিক পদক্ষেপ। মাধবীলতার চরিত্রের মাধ্যমে লেখক দেখিয়েছেন যে, পুরুষরা যখন রাজনীতির নামে সমাজ ধ্বংস বা সৃষ্টিতে ব্যস্ত, নারীরা তখন নীরবে প্রতিদিনের জীবনসংগ্রামের মধ্য দিয়ে সমাজকে টিকিয়ে রাখছে। মাধবীলতার লড়াই তৎকালীন রক্ষণশীল হিন্দু সমাজের মুখে একটি বড় চড় ছিল।

ঙ) বামফ্রন্টের উত্থান ও রাজনীতির পালাবদল
উপন্যাসের শেষের অংশে ১৯৭৭ সালের রাজনৈতিক পট পরিবর্তন ধরা পড়েছে। জরুরি অবস্থা (Emergency) উঠে যাওয়ার পর রাজ্যে বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় আসে এবং রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি দেওয়া হয়। লেখক দেখিয়েছেন, ক্ষমতার অলিন্দে থাকা মানুষেরা কীভাবে বদলে যায়—যে কমরেডরা একসময় সাথে লড়েছিল, তারা এখন গদিতে বসে অতীতকে ভুলে গেছে, আর অনিমেষদের মতো মাঠপর্যায়ের কর্মীরা পঙ্গু হয়ে সমাজের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে।



সংক্ষেপে: সমরেশ মজুমদারের ‘কালবেলা’ কেবল একটি কালখণ্ডের গল্প নয়, এটি একটি সময়ের রক্তক্ষরণ। তৎকালীন বাংলার সমাজ ও রাজনীতি যেভাবে তরুণ প্রজন্মকে ব্যবহার করে নিঃশেষ করে দিয়েছিল, তার এক অমোঘ এবং চিরন্তন খতিয়ান এই উপন্যাস।
Profile Image for Mohana.
100 reviews22 followers
September 7, 2020
উত্তরাধিকার শুরু করারও আগে থেকে আমাকে আমার বন্ধুরা কালবেলা নিয়েই একরকম পাগল করে মেরেছিল। পরে খোঁজ নিয়ে জেনেছিলাম কালবেলা আসলে সিরিজের দ্বিতীয় বই। মাঝখান থেকে শুরু করার কোনোরকম ইচ্ছা ছিল না, তাই উত্তরাধিকার দিয়েই শুরু করি এই সিরিজ পড়া। উত্তরাধিকার শেষের পর, একরকম পাগল হয়ে উঠেছিলাম কালবেলা পড়ার জন্য আসলে শেষটা এমন যে কৌতূহল দমন করে রাখা বেশ কষ্টের ব্যাপার। অবশেষে কালবেলা শেষ করলাম কিছুদিন আগে। বেশ সময় নিয়েই পড়লাম। মোহে আচ্ছন্ন হয়ে সময় কাটিয়ে দিতে মন্দ লাগে না।

যাঁরা পড়েছেন তাঁরা জানেন। তবু যারা এখনও পড়েননি, তাদের জন্য সংক্ষেপে বলি। 'উত্তরাধিকার' এর জলপাইগুড়ি ও স্বর্গছেড়ায় বড় হয়ে ওঠা কিশোর অনিমেষ 'কালবেলা'য় কলকাতার আদর্শ প্রাপ্তবয়স্ক নিবাসী হয়ে ওঠে। কারফিউ এর দিন কলকাতা পৌঁছে, পুলিশের গুলিতে জখম হয়ে তার পড়াশোনার একটা সম্পূর্ণ বছর নষ্ট হয়ে যায়। দুর্দান্ত সেই ক্ষতের চিহ্ন বয়ে নিয়ে বেড়াতে বেড়াতে সে ক্রমে এগিয়ে যেতে থাকে রাজনীতির অগ্ন্যুৎপাতের দিকে। কম্যুনিজম তাকে আকৃষ্ট করে। ক্রমে এই অগ্ন্যুৎপাতকেই নিজের জীবন করে তোলে অনিমেষ, যে জীবনেই শীতল বারিধারা হয়ে নেমে আসে মাধবীলতা। শীতলতা দরকার হলে সে যেমন ভিজিয়ে দিতে পারে অনিমেষকে তেমনই প্রয়োজনে প্রচন্ড তেজে হাজার গুণ বাড়িয়ে দিতে পারে অগ্ন্যুৎপাত। রাজনীতির উত্তপ্ত দাবদাহ, কম্যুনিস্ট পার্টির ভাগ, স্বার্থান্বেষী মানুষের লোভ, নকশাল আন্দোলনের জোয়ার, পুলিশের নির্মমতার মধ্যে ডুবে থাকতে থাকতে যেটা অনিমেষ কোনোদিন আবিষ্কার করতে পারেনি, তা ক্রমে পঙ্গুত্বের মাধ্যমে সে পরিষ্কার দেখতে পায়, যে বিপ্লব সে চিরকাল বাইরে খুঁজেছে, সেই "বিপ্লবেরই অপর নাম মাধবীলতা"। যে মেয়ে রাজনীতি না করেও অনিমেষের রাজনৈতিক সত্তার বাধা হয়ে দাঁড়ায় না, নিজের জন্য কিচ্ছুই আশা করে না, অনায়াসে নিজের সুখ আহ্লাদ সব ছেড়ে আসে, শুধু ভালোবাসে, সবটুকু দিয়ে ভালোবাসে। খরতপ্ত মধ্যাহ্নে যে শুধুই এক গ্লাস জল ছাড়া আর কিছুই হতে চায় না, সে মাধবীলতা। অনিমেষ বুঝতে পারে, যে দেশ গড়ার বিপ্লবে সে নেমেছিল তা বিফল হয়েছে কিন্তু তাকে জড়িয়ে ধরে যে লতা ডালপালা মেলেছিল, যে মাধবীলতা নিঃশব্দে বিপ্লব শুরু করেছিল তা প্রতি ক্ষেত্রে সফল।

কালবেলা সাহিত্য আকাদেমী পুরস্কারপ্রাপ্ত একটি বই। প্রথমে এটি ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হয় দেশ পত্রিকায়। রাজনৈতিক কার্যকলাপের পাশাপাশি একটি মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবন লেখক বর্ণনা করেছেন অত্যন্ত নিপুণভাবে এবং যথেষ্ট যত্ন নিয়ে। মাধবীলতা ও অনিমেষ এই দুটি চরিত্রের জন্যই বেশিরভাগ বাঙালী এই সিরিজ মনে রেখেছেন, অথবা রাখবেন। তবে কেবল মাধবীলতার জন্যই 'কালবেলা' কে ভালোবেসেছেন অগুন্তি মানুষজন। মাধবীলতার মতো চরিত্রকে শ্রদ্ধা করেন, এমন মানুষের সংখ্যাটা নেহাত কম নয়।

যদিও আমি ব্যক্তিগতভাবে 'কালবেলা' মনে রাখবো, নীলা, শীলা সেন, অনিমেষের ছোট মা, একরাতের জন্য বস্তির ঘরে ঠাঁই দেওয়া মাতাল ছেলের মা, সুবাস সেন, সিরিল, মহাদেবদা এবং দীপকের জন্য। মাধবীলতার মতো চরিত্র হয় না, একথা আমিও মানি, কিন্তু এই হয় না বলেই মাধবীলতার মতো চরিত্র অবাস্তবিক। অন্তত 2020 সালে দাঁড়িয়ে মাধবীলতার মতো আত্মত্যাগী, নিঃস্বার্থ ভালোবাসার প্রতীক চরিত্রের যে কোনোরকম কোনো বাস্তবতা নেই তা আমি নির্ভয়ে হাজারবার চেঁচিয়ে বলতে রাজি আছি। কারণ এটা সত্যি। আজকের যুগে একটা মাধবীলতা খুঁজতে যাওয়া বোকামির থেকেও বেশি বোকামি। হয়তো এজন্যই মাধবীলতার আদর্শ, নিষ্ঠা ও ত্যাগকে জাপটে ধরে ভালোবেসেছেন এত মানুষ কারণ বাস্তবে এমনটা হয় না।

তুলনামূলক ভাবে শীলা সেন বা নীলা বা বস্তির মাতাল ছেলের মা এই চরিত্রগুলি যুগের সাথে পাল্লা দিয়ে আজও একইভাবে ভীষণ বাস্তব। এরকম কতো শীলা সেনকে অ্যাসিড ঢেলে শেষ করে দিয়েছে তাদের স্বামী আমরা খবর রাখিনা। যদিও অ্যাসিড আক্রমণের বিরুদ্ধে আজকাল অনেক কিছু হচ্ছে, কতটুকু কি হচ্ছে তা তো ভীষণই স্পষ্ট। একইভাবে এরকম কত নীলা আজও স্পষ্ট কথা বলতে ভয় পায় না, আবার ভালোবাসার স্বার্থে নিজের সুখসমৃদ্ধ বৈভবে পরিপূর্ণ বাড়ি ছেড়ে আসতেও ভয় পায় না কিন্তু আদৌ সুখী হয় কিনা আমরা খবর নিই না। আবার এরকম কত বস্তির মা জানেন না এখনও যে আজ রাতে তার নিজের ছেলে বাড়ি ফিরবে কিনা কিন্তু জায়গা দিয়ে আগলে রাখছেন অন্য কারুর ছেলেকে পরম যত্নে।

কালবেলা নিয়ে আরেকটা জিনিস আমায় ভাবিয়েছে, তা হল, এর শেষ দৃশ্য। এই শেষটা পড়ার পর কালপুরুষ পড়ার কোনো খিদে আসে না। অন্তত আমার আসেনি। উত্তরাধিকার শেষ করার পর যে খিদের চোটে পাগল হয়ে যাচ্ছিলাম কালবেলা পড়ার জন্য সেটা কালবেলা শেষের পর আর অনুভব করলাম না। শেষটা একটা অধ্যায় শেষ হওয়ার মতোই। সুন্দর, আদর্শ, এবং মন ছুঁয়ে যাওয়া শেষ যার পরের অধ্যায় না বলা থেকে গেলেও কারুর কোনো ক্ষোভ থাকে না। অবশ্যই কালপুরুষ পড়ব কারণ সিরিজটা শেষ করবো, এমন একটা প্রতিশ্রুতি নিজের কাছেই নিজে নিয়েছি, তবে পাগলামোটা নেই পড়ার।

অবশেষে বলি, নকশাল আন্দোলন নিয়ে এটাই আমার প্রথম বই। আন্দোলনের প্রত্যেকটি মুহূর্তের বর্ণনা, কার্যকলাপ, রীতিমতো গায়ে কাঁটা দিয়ে গেছে। মাও সে তুং এর নেতৃত্বে চীনের মুক্তি আন্দোলনের একটি বর্ণনা আছে এই বইতে যেটা আমি অনবরত কয়েকবার পড়েছি, যতবার পড়েছি ততবার শিহরিত হয়েছি। আবেগ, মানুষকে কি পরিমাণ শক্তিশালী ও অপরাজেয় করে তুলতে পারে তা সেই ঘটনা থেকেই পরিষ্কার হয়েছিল সমগ্র বিশ্বের সামনে। নকশাল আন্দোলন কেন্দ্রিক বই আরো পড়ার ইচ্ছে রইল ভবিষ্যতে।
Profile Image for Samirah Anwar.
5 reviews1 follower
March 8, 2019
শুধু একটা লাইনেই পুরো বই এর সারাংশ তুলে ধরা যায়ঃ মাধবীলতায়ে পূর্ণতা পেল অনিমেষ।

সমগ্র বই জুড়ে রাজনীতি (পড়ুন অপ-রাজনীতি) ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। এক্টুকরো স্বস্তির মত মাধবীলতা আর অনিমেষ এর প্রেম পাঠক হৃদয়ে প্রশান্তি বয়ে আনে। উত্তরাধিকার আর কালপুরুষ আগেই পড়ে ফেলেছিলাম তাই অনিমেষ এর প্রতি দূর্বলতা সেভাবে গড়ে ওঠে নি। উত্তরাধিকার এর কিশোর অনিমেষ মনে স্নেহের দাগ কাটলেও নায়ক হিসেবে অর্ক অনেক এগিয়ে থাকবে। কিন্তু কালবেলা পড়ে মনে হল মাধবীলতা এক অন্য আবেগের নাম। দেশ-মাতৃকার জন্য বিপ্লব করেছে অনিমেষ; কিন্তু নিজের সমস্ত সত্ত্বার সাথে প্রতিনিয়ত বিপ্লব করেছে মাধবীলতা- তাও কিচ্ছু না পাওয়ার শতাধিক নিশ্চয়তায়ে।

ছোটবেলায়ে সাতকাহন পড়ে দীপাবলী হতে চাওয়া সেই মেয়েটি আজ মাধবীলতা হবার আকাঙ্ক্ষা এ মত্ত। যুগে যুগে কালে কালে অনিমেষ দের ছাপিয়ে যেনো মাধবীলতা রা বিপ্লবের সমার্থক শব্দ হিসেবে সমাদৃত হয়।
Profile Image for Dhiman.
217 reviews19 followers
Read
May 7, 2025
আমার মতে ক্লাসিককে কখনো রেটিং দিয়ে বিচার করতে হয় না। এগুলো সবার পড়া উচিত। পড়ে এক্সপেরিয়েন্স নেওয়া উচিত। তারপর সেটা নিয়ে নিজের মত চিন্তাভাবনা করা উচিত।

আমার স্যাটা ভাঙা বিপ্লবী অনিমেষ। যে বিপ্লবে চুরি ডাকাতি করতে হয়, মানুষ মারতে হয়, মানুষ সাপোর্ট দেয়ার বদলে বিপ্লবীদের ভয় পায় সে বিপ্লবকে স্যাটা ভাঙ্গা বিপ্লব-ই বলব আমি। মানুষকে যদি এক করতে না পার, মানুষের মনে যদি তোমাদের পন্থা ভয়ের উদ্রেক ঘটায় তাহলে সে বিপ্লবে দেশের কতদিন পরিবর্তন হবে না। যদিও শেষ দিকে এসব বিষয় অনিমেষ ভাল করে বুঝতে পারে সেটা একটা ভালো বিষয়। অনিমেষের কাউকে ডিসার্ব করে না। না তার দাদুকে, না বাবাকে, না তার ছোট মাকে৷ আর মাধবীলতাকে তো নয়-ই। মাধবীলতা হচ্ছে একজন পুরুষের স্বপ্নের নারী। প্রত্যেকটা পুরুষ তার জীবন সঙ্গী হিসেবে প্রেমিকা হিসেবে স্ত্রী হিসেবে গার্লফ্রেন্ড হিসেবে এরকম নারীকেই চায়। কিন্তু তা হবার নয়। বাস্তবে কোন নারীই এরকম নয়। সম্ভবই নয়। সেজন্যই মাধবীলতা স্বপ্নের নারী যে শুধু স্বপ্ন কল্পনায় থাকে।
Profile Image for Moumita Islam.
33 reviews27 followers
February 22, 2021
সাতকাহন পড়ার পরে এই বই পড়ে মনে হচ্ছিল যে আমি নিজেই জল্পাইগুরি,শিলিগুরি,কফি হাউজ,স্কটিশ চার্চ ,প্রেসিডেন্সি ,সোনাগাছি,বসন্ত কেবিন সব ঘুরে এসেছি । এর কৃতিত্ব অবশ্যই লেখকের জীবন্ত বর্ণনার ।The story has a good pace which I usually prefer. অনিমেষ সিরিজের এই বইটি ই আমার সবচেয়ে বেশি ভাল লেগেছে।
Profile Image for অর্ক.
4 reviews1 follower
June 25, 2021
ভীষন পছন্দের একটা বই, দারুন লেখ।একটা সময়কাল...তখনকার রাজনীতি,সাথে কলেজ জীবনের একটা প্রেম মিলেমিশে উপন্যাসটার প্রতি একটা অদ্ভুত ভালোবাসা তৈরী হয় বইটা পড়ে।তবে শেষমেশ সব ভালোবাসাকে ছাপিয়ে যায় সেই একটাই নাম মাধবীলতা।❤️
Profile Image for Maliha Tabassum Arna.
190 reviews57 followers
June 15, 2021
বইয়ের দুই তৃতীয়াংশ আজাইরা রাজনৈতিক আলোচনার পরও ভালো লাগার মতো কিছু পড়ে ভীষণ ভালো লাগছে।
Profile Image for Rajin.
36 reviews3 followers
November 7, 2024
জুলাই বিপ্লবের পর এমন একটা বই পড়া আকস্মিক ধাক্কা খাওয়ার মতোই। আমরা যদি স্বৈরাচারের পতন না ঘটাতে পারতাম নিসন্দেহে অনিমেষের মত অন্ধকার কুঠরিতে দিনের পর দিন কাটাতে হতো। আমাদের হাজারখানেক ভাইয়েরা পঙ্গুত্ব বরণ করেও যে বিজয়ের হাসি হাসছে তা শতযুগ ম্লান হয়ে যেতো।
1 review2 followers
February 27, 2017
উত্তরাধিকার এর পরে কালবেলা একটি অনবদ্য সৃষ্টি বলতেই হয়। সমরেশ বাবু বেশ ভালোই তদানীন্তকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরতে পেরেছেন এই উপন্যাসে। অনিমেষ,মাধবীলতা,মহীতোষ,সরিৎশেখর,ত্রিদিব,থম্বোটো,সুদীপ,মহাদেবদা,বারীণ,বিমান,নীলা,দেবব্রতবাবু,সিরিল,শীলা,পরমহংস কিংবা ত্রিলোক সিং চরিত্রগুলো অন্য লেভেলের ছিলো। গল্পের শুরুতেই অনিমেষের গুলি খাওয়াকে কেন্দ্র করে বিমান কিংবা সুবাসদা সেটির উত্তম ব্যবহার করে ছাত্ররাজনীতির অপব্যাখ্যা দিয়েছেন।
অনেকদিন যাবত সময় নিয়ে পড়ে বুঝতে পারলাম মাধবীলতা মেয়েটা অসাধারণ। যে মেয়েটা অনেক জেদী ছিলো, কিন্তু ভালোবাসার জন্যে সে বস্তিতে থাকতেও দ্বিধা করেনি।
"নেতা বিপ্লব তৈরি করে না, বিপ্লবই নেতার জন্ম দেয়" অনিমেষের এই চিন্তাটাই সময়ের সাথে সত্যি হয়। দমদম স্টেশানে পোস্টারিং করতে গিয়ে পুলিশ থেকে ধাওয়া খেয়ে শীলা সেনের বাসায় টেলিফোন অপারেটর সেজে প্রবেশ করা; কিংবা শীলার উপরে মিঃ সেন এর এ্যাসিড নিক্ষিপ্ত করা; মাধবীলতাকে বিবস্ত্রীকরণের মুহূর্তে অনিমেষকে মুখ খুলতে না বলা, কিংবা অনিমেষের ডাকে দীপকের সাড়া দেয়া; প্রতি অাধা ঘন্টা পরে যে মেয়েটা চায়ের কাপে চুমুক দিতো অাজ সেই মেয়েটি পুরোটা দিন মিলিয়ে সবেমাত্র এক কাপ চায়ে চুমুক দেয়; কিংবা সফলতা ভিক্ষা না করে অাদায় করতে পেরেছে বিধায় লতা তার নামের পাশে মিত্র লাগাতে পারে এসব মিলিয়ে উপন্যাসটা অসাধারণ ছিলো।
উপন্যাসটি অামাদের সমসাময়িক রাজনীতির দর্পণ কিংবা অায়না বলা যেতে পারে। কাউকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ যে ফায়দা লুটছে তার জন্যে ব্যবহৃত মানুষগুলোর পরিণতি হুবহু অনিমেষের মতনই বটে।

১৭ টা দিন সময় নিয়েছি বইটি পড়তে। অবশেষে সমাপ্ত করে পাঁচ তারা প্রদান করিলাম পক্ষ হইতে।
Profile Image for Samidhya Sarker Torsho.
36 reviews17 followers
July 19, 2015
সমরেশের অনিমেষ সিরিজের বাকি দুটা বই আমি পড়ি নি। এটা পড়লাম।

বইটার প্রেক্ষাপট স্বাধীনতাপরবর্তী ভারতবর্ষ। প্রথমদিকে ছাত্ররাজনীতিতে অন্ধভাবে লেজুড়বৃত্তি করার কুফল লেখক যেভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তা একেবারে বাস্তব। আর পরে নকশাল আন্দোলন যেভাবে পশ্চিমবঙ্গকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে তাও লেখক খুব ভালভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। আদর্শের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে কত ছেলের জীবন নষ্ট হয়েছে সেটার একটা নকশা হচ্ছে এই বইটা।

খুবই ভাল একটা বই।
5 reviews2 followers
June 27, 2017
অতিকথন মনে হলেও মাধবীলতা চরিত্রটির মত এত শক্তিশালী নারী চরিত্রের সন্ধান আদৌ পাওয়া যাবে বলে মনে হয়না। নকশালবাড়ি আন্দোলন নিয়ে আগ্রহের কারণে বইটা ধরা। অনিমেষদের হঠকারিতা কিংবা তার করুণ পরিণতিকেও মাধবীলতা গৌণ করে তার চারিত্রিক দৃঢ়তায়। বিশাল ভালোলাগা আর সম্মান মাধবীলতাদের জন্য ...
Profile Image for Damini.
130 reviews87 followers
November 6, 2020
স্কুলজীবনের মাঝামাঝি সময়ে কৈশোরে যখন সদ্য পা দিয়েছি তখন বই পড়ার নেশাটা প্রথম মাথাচাড়া দেয়, বই কেনার কথা তখন প্রশ্নাতীত তাই লাইব্রেরির দ্বারস্থ হয়েই পড়েছি একের পর এক কালজয়ী বাংলা গল্প উপন্যাস। 'কালবেলা'ও পড়েছিলাম সেই সময়েই এবং এতদিন মনে করেছিলাম সে পড়া অর্থাৎ কাহিনী এবং তার চরিত্রদের জানা বুঝি সমাপ্ত। নতুন করে এ বই উপহার না পেলে হয়তো দ্বিতীয় বার পড়ার কথা ভাবতাম না। তবে দীর্ঘ সময় ধরে পড়ে বইখানা শেষ করার পর কেবলই মনে হচ্ছে ভাগ্যিস পড়া হলো আর এমন আরও অনেক বইই হয়তো পুনর্বার পড়া উচিত।

কৈশোরে রাজনৈতিক সচেতনতা ছিল নিতান্তই অপ্রতুল। এমন পরিবেশে বেড়ে ওঠা যেখানে রাজনীতি দৈনন্দিন আলোচনা বা সমালোচনার বিষয় হিসাবে থাকলেও তার সাথে সরাসরি সংযোগের কথা কখনও ভাবার অবকাশ হয়নি। বাড়ির বড়দের রাজনৈতিক মতাদর্শকে বরাবর যুক্তির থেকে বেশি আবেগ আর পরম্পরা দ্বারা চালিত হতেই দেখেছি তাই উপন্যাসের প্রথম ভাগে অনিমেষের দ্বিধা উৎকণ্ঠা খুব প্রত্যক্ষ ভাবে স্পর্শ করেছে বারবার। আগাগোড়া রাজনৈতিক একটি উপন্যাস যেখানে অনিমেষের জীবনের শত অস্থিরতা আর অনিশ্চয়তার মাঝে একমাত্র স্বস্তির আশ্রয় হয়ে রয়ে যায় মাধবীলতা চরিত্রটি, হয়তো বা পাঠকের কাছেও। উপন্যাসের পটভূমি নিয়ে নতুন করে কিছু বলার অবকাশ নেই, ষাট -সত্তরের দশকের রাজনীতির জ্বলন্ত প্রতিচ্ছবি সমরেশ মজুমদারের 'কালবেলা' কিন্তু সব কিছু ছাপিয়ে মাধবীলতার ভালোবাসা, অনিমেষের জন্য তার আত্মত্যাগ এবং তাদের সম্পর্ক উপন্যাসের একটি অন্যতম সেরা আঙ্গিক বইকি। সিরিজের পরের দুটো বই খুব শীঘ্রই পড়ে ফেলব আশা রাখি।
7 reviews
September 11, 2025
এ গল্প অন্য এক বিপ্লবের, আমাদের আজকের এই সময়ের ধরাছোঁয়ার বাইরের এক বিপ্লব। কালজয়ী এই উপন্যাস শুধুই রাজনৈতিক মতাদর্শের, কিছু মানুষের ভাবনার, স্বপ্নের, কিংবা একটা সময়ের দলিল নয়। এই উপন্যাস, অনেক পাঠকের মধ্যে সাতষট্টির একটা সুস্পষ্ট ধারণা যেমন গড়ে তোলে, তেমনই প্রতি পরতে পরতে পাঠক অনায়াসেই বুঝে নিতে পারে, এই বিপ্লবের আড়ালে যে বিপ্লব, যা এই বিপ্লবের সমস্ত শক্তির মূল আধার, তা হলো ভালবাসা। ভালবাসার এই বিপ্লব ম্লান করে দেয় সমস্ত যন্ত্রণাকে। পূর্ণতা পাইয়ে দেয়, অসম্পূর্ণ ভঙ্গুর একটা জীবনের হেরে যাওয়াকে। এই বিপ্লব স্বপ্ন দেখতে শেখায়, মাথা তুলে সোজা হয়ে দাঁড়াতে শেখায়।

এক নিঃশ্বাসে শেষ করে ফেলার মত একটি উপন্যাস। যারা এতটুকুও প্রশ্ন করেন, প্রশ্ন করার মত শক্তি বাঁচিয়ে রেখেছেন এই সময়ে দাঁড়িয়ে, তাদের কাছে এই উপন্যাস বিকল্পহীন।
Profile Image for Fahad Amin.
358 reviews16 followers
April 10, 2026
সমরেশ মজুমদারের আরেকটা মাস্টারপিস কালবেলা। উত্তরাধিকারের পরে অনিমেষের জীবনের পরবর্তী খন্ড এ কালবেলা।

অনিমেষ যখন কলকাতায় পা রাখে, তখন নগরীটা রীতিমতো জ্বলছিল। সে সময়টাতে জটিল রাজনৈতিক ঘূর্ণাবর্তের মাঝেই অনিমেষ স্কটিশ চার্চে ভর্তি হয়। ধীরে ধীরে বামধারার রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে অনিমেষ।

একটা সময় বামধারার রাজনীতির মধ্যে আদর্শগত ফাটল ধরে। অনিমেষদেরও কাজের ধরনে পরিবর্তন আসে। দলকে সংগঠিত করে আরও বৃহত্তর বিপ্লবের স্বপ্নে বিভোর অনিমেষের মতো যুবারা। শুরু হয় নকশালপন্থী আন্দোলন। পশ্চিম বঙ্গ তথা ভারতের আনাচকানাচে ছড়িয়ে পড়ে বিপ্লবের আগুন।

অনিমেষের দৃষ্টিতে যেন নকশাবাড়ি আন্দোলন গড়ে উঠা, বিস্তার থেকে শুরু করে থিতিয়ে আসার বিষয়গুলো উঠে এসেছে। বিপ্লবের স্বপ্নে মশগুল হয়ে কতগুলো তাজা প্রাণ ঝরে গিয়েছে সেটা ভেবেই মনটা কেমন যেন ভারি হয়ে উঠলো।
Profile Image for Shadin Pranto.
1,526 reviews579 followers
June 22, 2026
শাব্দিক অর্থে 'কালবেলা' মানে অসময়, দুর্দিন কিংবা দুঃসময়। তবে সমরেশ মজুমদারের 'কালবেলা' দুঃসময়ের চাইতে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির এক বাঁক বদলের সময় বললেই তুলনামূলক সঠিক শোনাবে। আর, এই বাঁক বদলে অনিমেষের সাথে যুক্ত হয়েছে মাধুরী।

বইটা নিয়ে সম্ভবত অনেক শব্দ ও বাক্য লেখা যেত। কিন্তু কোনো এক বিচিত্র কারণে ইচ্ছে করছে না।

যারা 'কালবেলা' পড়ে ফেলেছেন, তারা তো পড়েছেনই। যারা এখনো 'কালবেলা' পড়েননি, তারা নিশ্চয়ই পিছিয়ে আছেন। বইটা সুন্দর তবে সবার যত ভালো লেগেছে আমার তত লাগেনি এবং কারণ জানতে চাইলে বলতে পারব না।
Profile Image for Imam Abu Hanifa.
115 reviews15 followers
May 18, 2017
সারাংশঃ
মফস্বলের ছেলে অনিমেষ মিত্র। জলপাইগুড়ি থেকে কলকাতা আসে উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য। কলকাতায় পা রাখতেই পরে বিপদের মুখে। কলকাতায় তখন কারফিউ চলে। পুলিশ তাকে সন্দেহ করে গুলি ছোড়ে। থাইয়ের নিচে হাটুর উপরের অংশে গুলি লেগে হাসপাতালে পড়ে থাকে তিনমাস। সুস্থ হতে হতে একটা শিক্ষাবছর নষ্ট হয়ে যায় অনিমেষের। রাজনীতি সম্পর্কে বুঝ হবার পর থেকেই সে বামপন্থী মনোভাব ধারন করে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গিয়ে জড়িয়ে পরে বামপন্থী কমিউনিস্ট পার্টির সাথে। পুলিশের গুলিতে হওয়া ক্ষতচিহ্নটাকে 'সাধারন মানুষের উপর পুলিশি নির্যাতনের' প্রকৃত হিসেবে ব্যবহার করে ছাত্র ইউনিয়নে বিপুল ভোটে জয়লাভ করে। কিন্তু সে যেই আদর্শ নিয়ে বামপন্থী কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেয় কিছুদিন পরে বুঝতে পারে সবই ফাকি। সবাই ক্ষমতার গদিটাকে পাওয়ার জন্য বিভিন্ন আদর্শের দোহাই দেয়। ধীরেধীরে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে তার সহপাঠিনী মাধবিলতার সাথে। মাধবিলতার ভাষ্য মতে লতার মতই অনিমেষের জীবনে জড়িয়ে পড়ে মাধবিলতা। অনিমেষ চায় সমাজ ব্যাবস্থার পরিবর্তন। কিন্তু এই পরিবর্তন কিভাবে আসবে! রাজনীতি করে পরিবর্তন আনা সম্ভব নয় সেটা খুব ভালভাবে বুঝতে পেরেছিলো অনিমেষ। যার হাত ধরে বামপন্থী কমিউনিস্ট পার্টিতে এসেছিলো; সেই সুভাসদাকে যখন পার্টি থেকে বের করে দেওয়া হলো তখন সুভাসদার পথ অনুসরণ করে বিপ্লবী হলো অনিমেষ।
আর মাধবিলতা??
জানতে হলে যারা পড়েন নাই তারা ঝটপট পড়ে ফেলুন।

পাঠপ্রতিক্রিয়াঃ
সমরেশ মজুমদারের পড়ে দ্বিতীয় বই এটা। প্রথম বই 'আট কুঠুরি নয় দরজা' পড়ার সময়ও যেমন হয়েছে; শুরুতে বিরক্ত লাগছিলো। শেষে এসে খুব ভাল লাগলো। বিরক্ত লাগার কারন ছিলো স্বয়ং অনিমেষ। রাজনীতি সম্পর্কে তার ভ্রান্ত ধারনা দেখে বিরক্ত হইছি। সে যখন কলকাতায় আসে সে ছিলো মানসিক দিক থেকে একটি শিশু। গল্পের মধ্যেই ধীরেধীরে তার মানসিকতা সাবালক হলো। সেখান থেকে রাজনীতির বাস্তবতা বুঝতে শিখলো। পুরো গল্প জুড়ে রাজনীতি ও বিপ্লব থাকলেও পাঠকের মনে অনেক বড় জায়গা জুড়ে থাকবে মাধবিলতা। গল্পের শেষে সবাই যখন হারিয়ে গেলো, মাধবিলতায় পূর্ণতা পেলো অনিমেষ। ভালবাসার জন্য মাধবিলতার ত্যাগ বাকি সবকিছুকে ম্লান করে দেয়। পুরো গল্পটা এক নিঃশ্বাসে শেষ করেছি। ফেসবুকেও খুব কম ছিলাম। সবশেষে মনে হলো "যাহ! বইটা শেষ হয়ে গেলো!!"
Profile Image for Abhishek Saha Joy.
191 reviews57 followers
March 1, 2022
উত্তরাধিকার' বইটা এমন জায়গায় শেষ হয়েছিলো যে পরবর্তীতে কি ঘটে তা জানার আগ্রহ স্বাভাবিকভাবেই দ্বিগুণ হয়ে গিয়েছিলো।সে অনুপাতে সিরিজের দ্বিতীয় বই 'কালবেলা' বেশ সাদামাটা।

অনিমেষ সিরিজ নকশালবাড়ি আন্দোলন এবং তৎকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে লিখা তা আমাদের সবার জানা।কিন্তু 'কালবেলা'য় সমরেশ বিপ্লব বলতে যা দেখিয়েছেন তাকে অতিনাটকীয় বিপ্লব বললেও ভুল হবে না।'উত্তরাধিকার' এর অনিমেষ এখানে যেন এক দিকভ্রান্ত পথিক।যার না আছে স্পেসিফিক রাজনৈতিক আইডিওলজি না আছে স্পেসিফিক কোন আদর্শ।

মাধবীলতাকে নিয়ে বাংলা সাহিত্যপ্রেমিকদের মনে অনেক ফ্যাসিনেশন কাজ করে।মাধবীলতা চরিত্রের শুরুর অংশটুকু দারুণ।মাঝখানে গল্পের মূল চরিত্র অনিমেষকে বড় করে দেখাতে গিয়ে মাধবীলতার মাধুর্য কেড়ে নেয়াতে মাধবীলতা ম্লান হয়ে যান।তবুও বেশ মনে রাখার মতো একটা চরিত্র মাধবীলতা।

'উত্তরাধিকার' উপন্যাসের স্বার্থকতা ছিলো এই যে পাঠক মাঝখানে হারিয়ে যায়নি,আগ্রহটা ধরে রাখতে পেরেছে পুরোটা সময় জুড়ে।'কালবেলা' এখানে চরমভাবে ব্যর্থ।তাই শেষ করার পরে কি হবে তা নিয়ে আর আগ্রহ বজায় থাকেনা।
Profile Image for Saheli Roy.
65 reviews
November 24, 2024
আজ কাল কি হয় যারা ইতিহাস ভিত্তিক বই লেখেন তারা তাদের গল্প ও ইতিহাস র মধ্যে ঠিক খেই রেখে চলতে পারেন না এবং গল্পের উপর ইতিহাস চেপে বসে মনে হয়। কিন্তু এই উপন্যাস পড়ে সেই কথা মনে হয়নি ইতিহাস গল্প শেষ পর্যন্ত এক অন্য তাল এ নিজেদের মহান অবস্থান টিকিয়ে রেখেছে। নকশাল ভিত্তিক গল্প ছোটো কিছু পড়েছি কিন্তু উপন্যাস বলতে পূর্ব পশ্চিম অবধি আমার দৌড়। আর এইটা পড়লাম। অত্যন্ত সুন্দর,গল্পের ছক,গল্পের ভাষা খুবই সুন্দর। লেখার মধ্যে কোনো জড়তা বা হঠকারিতা আমার চোখে পড়েনি। এবং অতিরিক্ত emotion দিয়েও লেখক ভরিয়ে তোলার চেষ্টা করেননি। সুন্দর ভাবে এগিয়ে নিয়ে গেছেন গল্পের তালে গল্পকে। অবশ্যই পড়ুন বাংলা সাহিত্যের যেই অসম্ভব মাধুর্য সেটা হারিয়ে না যায় এই ইচ্ছেই রাখি।

পুনশ্চ : পূর্ব পশ্চিম আর কালবেলা র মূল চরিত্র পুরুষ হলেও গল্প র শেষে কিন্তু জয়ী হয়ে ওঠেন দুই মহিলা ই। এখানেই লেখক র ও জিতে যাওয়া।
Profile Image for Shotabdi.
853 reviews231 followers
August 24, 2020
অনেক দিন পর একটা মেয়ে চরিত্রকে বেশ ভালো লাগলো। মাধবীলতা।
ব্যক্তিত্বসম্পন্না, সাহসী, সমাজকে বুড়ো আঙুল দেখানো কিন্তু গভীর ভালোবাসায় পূর্ণ এক নারী।
সম্ভবত এই উপন্যাসটিই সমরেশের সেরা কাজ হয়ে থাকবে আমার কাছে।
Displaying 1 - 30 of 190 reviews