আভার। একটি ভাষার নাম। রাশিয়ার দাগেস্তানের মানুষ কথা বলে এই আভার ভাষায়। দাগেস্তান রাশিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত পাহাড় আর পাথুরে নদীতে ঘেরা এক প্রজাতন্ত্র। এর এক পাশে কাস্পিয়ান সাগর আর অন্যদিকে ককেকাস পর্বতমালা। পাহাড়-সমুদ্রে ঘেরা আর পাথুরে সব নদী জড়ানো দাগেস্তানের জনসংখ্যা মোটে কয়েক লক্ষ। তাদেরই একজন কবি রসুল গামজাতভ । আভার ভাষায় কবিতা লিখলেও পুরো রাশিয়াজুড়ে রুশ ভাষাভাষিদের কাছে অন্যতম জনপ্রিয় কবি তিনি।
সারাজীবন জুড়ে কেবল কবিতাই লিখে গেছেন রসুল। এবং লিখেছেন শুধু মাতৃভাষা আভারে। আভার থেকে রুশে অনুবাদ হয়ে তা থেকে ইংরেজি হয়ে রাশিয়াসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের নানা ভাষার পাঠকের কাছে পৌছেছে রসুলের কবিতা। বেশ সমাদৃত কবি রসুল বিশ্বের সত্যিকার কবিতাপ্রেমিদের কাছে পরিচিত এক নাম। ইংরেজি ভাষার বড় বড় কবিদের পাশাপাশি পৃথিবীজোড়া যেসব পাঠক রবীন্দ্রনাথ, নেরুদা, লোরকা, মাহমুদ দারবিশ, হাফিজ, গালিব, রুমি, হিকমতদের কবিতা ভালোবাসে, তারা কোনো না কোনো ভাবে আভার ভাষার কবি রসুল গামজাতভের সাথেও পরিচিত। আমার যেহেতু রসুলের সাথে পরিচয় ছিল না তাই এটা অবশ্যই সত্য যে কবিতার সত্যিকার রস আস্বাদন বা কবিতার পৃথিবী থেকে আমার অবস্থান এখনো অনেক অনেক অনেক দূরে।
কিন্তু আমার এই আলাপ কবিতা নিয়ে নয়। রসুলের একমাত্র গদ্যের বই নিয়ে। ৫০টিরও বেশি কবিতার বইয়ের রচয়িতা রসুল কতবারই তো কাব্যের নীলাকাশ থেকে গদ্যের উপত্যাকার দিকে তাকানোর চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু অবতরণের সঠিক ঘাটটির খোঁজ পাননি। এমনকি নিজের কাব্যজগত নিয়েও তো রসুলের ঘোর তৃপ্তি কিন্তু আসেনি কোনোদিন। নাজিম হিকমত যেমন লিখেছিলেন– যে সমুদ্র সব থেকে সুন্দর তা আজো আমরা দেখিনি, সব থেকে সুন্দর শিশু আজো বেড়ে ওঠেনি, আমাদের সবথেকে সুন্দর সময় আজো আমরা পাইনি– তেমন করেই যেন রসুল বলেছিল, যত বই লিখেছি তদাপেক্ষা অধিকতর মূল্যবান যা তা এখনো আমার কলম দিয়ে নি:সৃত হয়নি।
এমন সময়ে হঠাৎ একদিন রসুলের কাছে একটি চিঠি আসে। চিঠিটা আসে স্থানীয় এক স্বনামধন্য পত্রিকার সম্পাদকের নিকট হতে। পাহাড়ে মহিষের চামড়া শুকোবার পর ভাজ করে কুটিরের মধ্যে নিয়ে যাওয়ার সময় সেটা যেমন চড়চড় করে , চিঠির কাগজও ঠিক সেরকম চড়চড় করছিল যেন! সেই চিঠিতে সম্পাদক সাহেব কবি রসুলের কাছে দাগেস্তানের বর্তমান আর ভবিষ্যত নিয়ে ধারাবাহিক লেখা প্রার্থনা করেন। এর জন্য সময় দেন এক মাস। পত্রটি পেয়ে রসুল এতটাই অসন্তুষ্ট হন যে তিনি চিঠিটির কোনো উত্তরই দেননি। তিনি ভাবেন, জন্মভূমি দাগেস্তান নিয়ে এত কম সময়ে কী লেখা সম্ভব! সারা জীবনজুড়ে বন্দনাবাণী লিখলেও তো ফুরাবে দাগেস্তান নিয়ে হৃদয়ের গহীন ভিতরে জমে থাকা কথামালা। লেখার জন্য তো অবসর চাই নাকি!
এমনই এক সময়ে এক মাসের ছুটি নিয়ে রসুল চলে যান তার নিজ গ্রাম ত্সা্দায়।
ত্সা্দা মানে সত্তরটি চুল্লি যেখানে। সত্তরটি চিমনি থেকে নীল ধোঁয়া উড়ছে স্বচ্ছ পার্বত্য আকাশের দিকে। কৃষ্ণ মৃত্তিকার উপর সাদা বাড়িগুলি। সমতল সবুজ মাঠ, গ্রাম আর কুটিরগুলির মুখোমুখি রয়েছে। গ্রামের পরেই পর্বতের সারি। ধূসর পাহাড়গুলি আমাদের গ্রামের উপর যেন ঝুলে আছে– এভাবেই নিজের গ্রামে প্রত্যাবর্তনের বর্ণনা দিয়েছেন রসুল। দাগেস্তান নিয়ে লেখার সূত্রপাতও হয় সেখান থেকেই। আভার ভাষায় ‘ডাইর দাগিস্তান’, রুশে ‘ময় দাগিস্তান’, ইংরেজিতে ‘মাই দাগেস্তান’ হয়ে বাংলায় ‘আমার দাগেস্তানের’ সাথে রসুলের সঙ্গী হয়ে শুরু হয় আমার যাত্রা।
আমি দেখি, রসুল তার কাব্যকল্পনার মত মাতৃভূমির স্বরূপ উপস্থাপন করেছেন মধুর সব শব্দগাথায়! পৃথিবীর বহু দেশের রং ���ূপ রস আহোরণ করা কবি রসুলের সামনে সত্যিকার দু দন্ড শান্তি নিয়ে নাটোরের বনলতা সেনের মত হাজির হয় দাগেস্তান। তিনি যেন কেবল বলছেন— জানি না তোর ধন রতন , আছে কিনা রাণীর মতন, শুধু জানি আমার অঙ্গ জুড়ায় তোমার ছায়ায় এসে। পৃথিবীর সুন্দর থেকে সুন্দরতর স্থান দেখার পর হৃদয়ে যে চঞ্চলতার সৃষ্টি হয়েছিল, তার চেয়ে বহুগুন বেশী আলোড়ন তোলে ত্সা্দার সত্তরটি কুটির। একি অপরূপ রূপে মা তোমায় হেরিনু পল্লী জননীর মত বারবার দাগেস্তান চোখজুড়ানো, হৃদয় নিংড়ানো বর্ণনায় হাজির হয় আমার সামনে।
এর আগে আমি রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবুর্গের অলি গলিতে ছুটে বেড়িয়েছিলাম রাসকলনিকভের পিছু পিছু। এবারও যেন রাশিয়ার পানেই ছুটছি আমি। আমায় টানছে দাগেস্তান । আমার মনে হচ্ছে ছুটে যাই দাগেস্তান। ছুটে যাই পাহাড় আর পাথুরে নদী ঘেরা ত্সা্দায়।
পরক্ষণেই আমার মনে পড়ল আমি কি আসলেই দাগেস্তানে যেতে চাচ্ছি? ত্সা্দাই কি টানছে আমায়?
উত্তর যদি হয় হ্যাঁ, তাহলে আমার সেই দাগেস্তান তো সাত সমুদ্র তেরো নদীর ওপাড়ের কোনো দেশ না। আমার দাগেস্তান তো আমার জন্মভূমি, আমার গ্রাম। যদিও আমি পৃথিবীর কিছুই দেখিনি এখনো- তারপরও চোখ বন্ধ করে পৃথিবীর সুন্দর কোন প্রান্তর কল্পনা করলে আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে আমাদের বাড়ির পূর্বপাশ। ছয় ঋতুতে ছয় রূপে হাজির হয় সেই প্রান্তর। আরো বহু প্রান্তর আমি দেখেছি। হয়তো ভৌগলিকভাবে আরো সুন্দর সেগুলো। কিন্তু আমি চোখ বুজলে অমার চোখে ধরা দেয় যে কেবল বাড়ির পূর্বপাশ। ভরা বর্ষায় রূপোর জল থৈ থৈ করে। শরতে বিস্তৃত সবুজ গালিচা, হেমন্তে সোনালি ধানের মাঠ, শীতে বিস্তীর্ণ বিরান ভূমি আর গ্রীস্মে লাঙল নিড়ানো ধুধু মাঠ, দূর্বাদলে ঢাকা নরম আলপথ।
যুগ যুগ ধরে পৃথিবীর মহৎ সব কবি সাহিত্যিকই আসলে সৃষ্টিকর্মে স্বদেশ আর মাতৃভূমির বর্ণনাই করে গেছেন। শেষ পর্যন্ত ফিরে যেতে চেয়েছেন স্বদেশভূমিতে। ফিরতে না পারলেও ফেরার পিপাসা বার বার এসেছে তাঁদের লেখায়। হুমায়ুন আজাদের ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না’র কথাও নিশ্চয়ই আমরা ভুলতে পারবো না, জন্মভূমি রাঢ়িখালকে বলছেন–
আমি কত ডাক পারি। তুমি হুমইর দ্যাওনা ক্যান? তোমারে ভুলুম ক্যামনে? তুমি ভুইল্লা যাইতে পারো, আমি তা পারুম না কোনো কাল। আমি আছিলাম পোনরো বচ্ছর ছয় মাস তোমার ভিতরে, থাকুম পোনরো শো বচ্ছর। আমার যে মন পোড়ে…”
রসুলও তার ব্যতিক্রম না। রসুল যেন আরো কয়েক কাঠি সরেস। সারা পৃথিবীর রূপসুধাকে অবলোকনের সময় জন্মভূমি দাগেস্তানকেই কল্পনা করেন তিনি। যদিও কবিরা পৃথিবী নামক ছোট্ট গ্রহটিকে পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি বলে মনে করেন। আমার মনে হয় সকলেই তাই ভাবে। পুরো পৃথিবীটাকেই নিজের ভাবলে দোষ কি? একই চাঁদ-সূর্য হোক আর ভিন্ন সাগর পাহাড় হোক – ওরা সবাই তো আমার, আমাদের। কিন্তু তারপরও কথা থেকে যায়। ঐ যে চোখ বন্ধ করলে যার ছবি ভেসে ওঠে সেই কথা। একদিন সত্যিই যখন চিরদিনের জন্য চোখ বন্ধ করতে হবে, সত্যি সত্যি অন্তিম যাত্রার দিন আসবে যখন, তখনকার কথা ভাবলে নিজেকে কে কোথায় কল্পনা করেন? অপর কোনো দেশে? অন্য কোনো মহাদেশে?
আমার অন্তিম যাত্রার কথা বা প্রাণহীন দেহটার স্থান কোথা হবে এই চিন্তা করলেই তো আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে আমার গ্রাম। আমাদের বাড়ির পশ্চিম পাশে বাঁশঝাড়ে ঢাকা কবরস্থান। তারও পশ্চিমে ছোট্ট মসজিদ। তারও পশ্চিমে বুড়ি তিস্তা নদী। ওখানেই তো চিরনিদ্রায় আমার পূর্বসুরীরা। যেখানে মসজিদ থেকে প্রতিদিন নিয়ম করে আজানের সুর ভেসে আসে। ওখানে ছাড়া চিরনিদ্রায় নিজেকে তো আর কোথাও কল্পনা করতে পারি না তো। কেন পারি না? এই কি মাতৃভূমির টান? জন্মভূমির প্রেম? ছোটবেলায় স্কুলের বইয়ে দেশপ্রেম, জন্মভূমি নিয়ে কত কথা-কাব্য পড়েছি। জননী জন্মভূমি স্বর্গদপী গরিয়সী– কত আওড়েছি, কিন্তু মোক্ষম অর্থটা বুঝতে পারিনি। রসুলের দাগেস্তান পড়তে বসে যেন নতুন করে সেই অর্থ খুঁজে পেলাম।
তেমনইভাবে মনে পড়ে গেল, ছোটবেলায় ভাব সম্প্রসারণ করেছি– ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুরই অন্তরে। আসলে কেবল পিতা বা মাতা নয়, আজীবন একজন মানুষের অন্তরে ঘুমিয়ে থাকে তার স্বদেশভূমি, জন্মভূমি। সে যেন জীবনানন্দের সেই ছোট মেয়ের মত– আমারই নিজের শিশু হয়ে সারাদিন নিজ মনে কথা কয় যেন। অন্তরের ভিতরে সারাদিন নিজ মনে কথা যে বলে সে-ই তো স্বদেশভূমি, জন্মভূমি। সেই তো দাগেস্তান। রসুলের ত্সা্দা, রবীন্দ্রনাথের সোনার বাংলা, জীবনানন্দের রূপসী বাংলা। সেই তো সকল দেশের রানী আমার বসুন্ধরা (সকলের কাছে নিজের দেশ, মাতৃভূমিই সকল দেশের সেরা)।
আসলে রসুল গামজাতভ কেবল দাগেস্তানের প্রতি নিজের প্রেমের বর্ণনাই দেননি বইয়ে, বইটিতে একই সাথে স্থান পেয়েছে আরো অনেক কিছু। আছে কবিতার কথা, দর্শনের কথা, শিল্পের কথা, প্রবাদ, প্রবচন , লোকগাঁথা আর প্রেমের কথা। এবং আরো অনেক কথা। ১৯৬৭ সালে বইটি প্রথম প্রকাশিত হওয়ার পর রুশদেশে রীতিমতো তোলপার সৃষ্টি করে। এরপর বহুভাষায় ভাষান্তরিত হয়েছে বইটি। বাংলা ভাষায় বইটি প্রকাশিত হয় ১৯৭৮ সালে। বইটির অসাধারণ অনুবাদ করেছেন আকবর উদ্দীন ও কবি আবুল হোসেন। সম্পর্কে ওনারা জামাই শ্বশুর। বইটি প্রকাশের আগেই আকবর উদ্দীন পরলোকগমন করলে বইটির বাকি থাকা কবিতার অংশগুলো অনুবাদ করে পুস্তক আকারে প্রকাশ করেন আবুল হোসেন।
বইটি যখন পড়া শুরু করলাম, মনে হচ্ছিল মোটিভেশনাল কিছু একটা। আর মোটিভেশনাল লেখাজোখাতে আমার একদমই পোষায় না। ভূমিকার অংশটাও কেমন খটখটে লাগছিল! মনে হচ্ছিল পারবো না হয়তো পড়তে! কিন্তু, দাগেস্তান পার্ট শুরু হওয়ার পর থেকে আর অনুবাদ নিয়ে দ্বিতীয়বার ভাবতে হয়নি। তবে, বইটিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে যে অল্প স্বল্প কবিতার অংশ আছে, চাইলেই সেগুলোর আরেকটু কাব্যময় অনুবাদ করা যেত।
যাই হোক, সে-ই ক-ত ব-ছ-র আগে, সত্তরের দশকে বাংলা ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে এই দুর্দান্ত বইটি। আর আমি তার নাম শুনলাম কিনা এই বছর এসে! এভাবেই কত যে মানিক রতন অজানায় পড়ে থাকে টেরও পাই না আমরা।