ওকি গাড়িয়াল ভাই,
কত রব আমি পন্থের দিকে চাইয়া রে?
কিংবা
ও আমার দরদী,
আগে জানলে, আগে জানলে তোর ভাঙা নৌকায় চড়তাম না-
এইসব গান কখনো শোনে নি, এমন বাঙালী খুঁজে পাওয়া আমার মনে হয় কঠিনই৷
সেইসব প্রবাদ প্রতিম গানের গায়ক আব্বাসউদ্দীন লিখিত এই বইটিকে ঠিক একটা ক্যাটাগরিতে ফেলা যায় না।
এটি একই সাথে আত্মজীবনী, ভ্রমণকাহিনী, স্মৃতিকথা এবং দিনলিপি। কুচবিহারে বেড়ে ওঠা আব্বাসউদ্দিনের শৈশব-কৈশোরের মায়াময় কাহিনী দিয়ে শুরু হওয়া বইটি শেষ হয়েছে অসুস্থ থাকাকালীন দিনলিপি রচনার মাধ্যমে। আর এর মধ্যেই উঠে এসেছে একজন শিল্পীর জীবনকথা।
তৎকালীন কুচবিহারে শিয়া-সুন্নির ভীষণ দ্বন্দ্ব ছিল। তাই সুন্নী মুসলিম, এই ধারণাটি পাকাপোক্ত করার জন্য নাম থেকে প্রথমেই ছাঁটাই হল সেখ, নাম দাঁড়াল শ্রী আব্বাসউদ্দীন আহমদ এ। দীর্ঘকাল পরে, হিন্দু-মুসলমান পার্থক্যে শ্রীও নাম থেকে বাদ গিয়ে নাম দাঁড়াল কেবল আব্বাসউদ্দীন আহমদ এ। এই নামেই তিনি সুপরিচিত ছিলেন তৎকালীন বাংলা তথা সমগ্র ভারতে,আর এখনও তাঁর অনেক কালজয়ী গান আমরা শুনতে পাই এই নামেই।
শৈশব থেকেই তাঁর পড়া এবং গান দুটোতেই সমান পারদর্শিতা ছিল। স্কুলের ফলাফল ভালো হওয়ায়, অভিভাবক মহলে তাঁর জনপ্রিয়তা ছিল। অনেক ছেলেমেয়ের বাবা-মায়েরাই চাইতেন সুদর্শন এবং চৌকস আব্বাসউদ্দীনকে তাঁদের ছেলেমেয়েদের শিক্ষক হিসেবে।
তখনকার সময়ে হিন্দু-মুসলিম উভয় ধর্মের মানুষই নিজস্ব ধর্ম বজায় রাখার পাশাপাশি অসাম্প্রদায়িকতার চর্চাও বজায় রাখতেন। তেমনই ভাবধারার এক ব্রাহ্মণ পরিবার, আব্বাসউদ্দীনকে এতই পছন্দ করে ফেলেন, যে প্রায় তাঁকেই পালকই নিয়ে নেন। সেই পরিবারের দুই ছেলের সাথে আব্বাসউদ্দীন এর ছিল ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব, তাঁদের মাকে মা বলে সম্বোধন করতেন। আব্বাসউদ্দীন এর পিতা এই ঘটনা জেনে খুশি হয়েছিলেন এবং পরিবারটি সত্যিকার অর্থেই তাঁদের শুভাকাঙ্ক্ষী ছিল।
কৈশোরে প্রেমে পড়েন, বিয়েও ঠিক হয়ে যায়, কিন্তু প্রেয়সীকে গিন্নীরূপে স্বপ্নের রাজসিংহাসন থেকে ধূলোকাদামাখা পৃথিবীতে সহ্য করতে পারবেন না বলে নিজেই বিয়ে ভেঙে দেন৷
ভালো ছাত্র হওয়া সত্ত্বেও তিনি বিএ পাশ করতে পারেন নি। এর পেছনে রয়েছে এক অত্যাশ্চর্য কাহিনী। একবার আব্বাসউদ্দীন এর পিতা অত্যন্ত অসুস্থ হয়ে পড়েন, বাঁচার আশা প্রায় ছিল না। তেমন সময় নামাজ পড়ে নিজের জীবনের সবচেয়ে আকাঙ্ক্ষিত ডিগ্রী বিসর্জনের বিনিময়ে খোদাতালার কাছে আব্বার প্রাণ ভিক্ষা চান তিনি। আশ্চর্যজনকভাবে মঞ্জুর হয় তা এবং উপরওয়ালার উপর তাঁর বিশ্বাস হয় আরো গভীর। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সেই বিশ্বাস লালন করে গেছেন তিনি।
কলকাতাতে গিয়ে রেকর্ডিং এর মাধ্যমে হয়েছেন প্রতিষ্ঠিত। কাজী নজরুল ইসলামকে ইসলামি ভাবধারার সঙ্গীত রচনায় উদ্বুদ্ধ করে তোলেন লেখকই। তাঁর কণ্ঠে ও মোর রমজানের ওই রোজার শেষে তখন এবং এখনো একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় গান।
কাজী নজরুল ইসলাম সম্পর্কিত যেকারো স্মৃতি এক আশ্চর্য অভিজ্ঞতার জন্ম দেয়। প্রায় সবার বয়ানেই কাজীর একটি শিশুর মতো উচ্ছল রূপ খুঁজে পাওয়া যায়, পাওয়া যায় একটি উদার রূপ খুঁজে যা সত্যিই বড্ড পবিত্র এক অনুভূতির জন্ম দেয়।
শিশির ভাদুড়ি, কৃষ্ণচন্দ্র দে, জসীমউদ্দিন প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ সহ আরো অনেক বিখ্যাত ব্যক্তির সাথে স্মৃতিচারণ রয়েছে বইটিতে৷
ফিলিপাইন, জার্মানি, সুইজারল্যান্ড ইত্যাদি নানান দেশে সঙ্গীত পরিবেশনের ডাক পেয়েছেন তিনি, বাংলা গান এবং ভাওয়াইয়া পল্লীগীতিকে করে তুলেছেন সারা বিশ্বে সম্মানিত।
ধর্মের প্রতি অগাধ আস্থা থাকলেও ব্যক্তিগত জীবনে একদমই সাম্প্রদায়িক ছিলেন না। বরং ছিলেন নিজস্ব ঐতিহ্য এবং কৃষ্টির প্রতি শ্রদ্ধাশীল।
তাঁর পারিবারিক জীবন সম্পর্কে তেমন তথ্য দেন নি তিনি, স্ত্রীর কথাও লেখেন নি, বড় ছেলে মোস্তফা কামালের কথা অবশ্য এসেছে। আরেকটু বেশি পারিবারিক ছবি পাওয়া গেলে ভালো লাগত।
আমি অনেক বড় বড় মানুষের স্মৃতিতেই তাঁদের সঙ্গিনীকে অবহেলিত হতে দেখেছি, কেন এমনটা করতেন তাঁরা কে জানে।
একটা যুগ, একজন শিল্পীর বেড়ে ওঠা, প্রতিষ্ঠিত হওয়া, তাঁর ব্যক্তিগত পাওয়া-না পাওয়া সব মিলিয়ে সুলিখিত একটি আত্মকাহিনী এটি। একটা সার্থক সাহিত্যসৃষ্টি।