দেশভাগ কতরকমের সংকট যে সৃষ্টি করেছে তার লেখাজোখা নেই। গত শতকের ছেচল্লিশে সেই যে সারা উপমহাদেশ জুড়ে রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা শুরু হয়েছিল তার আঁচ এসে লেগেছিল বিহারেও। হাজার হাজার নিরীহ মানুষ তখন খুন হয়ে যায়। সাতচল্লিশে দেশভাগের পর কয়েক লাখ বিহারির সঙ্গে কলিমুদ্দিনরা চলে যায় পূর্ব বাংলায়। ব্রিটিশ রাজত্বে তারা ছিল ভারতীয়, তারপর পাকিস্তানি, তারও পর ‘বাংলাদেশি'। বাংলাদেশে তারা অবজ্ঞা ও ঘৃণার পাত্র!... নিরুপায় কলিমুদ্দিনরা সর্বস্ব বেচে ফের ফিরে আসতে থাকে তাদের পুরোনো জন্মভূমি ভারতে। কিন্তু এখন তারা ঘুসপেঠিয়া বা অনুপ্রবেশকারী। দেশহীন, রাষ্ট্রহীন, পরিচয়হীন একদল মানুষ।... কীভাবে, কোন মূল্যে কলিমুদ্দিনরা নিজস্ব একটি ভূখণ্ড পেল?... পত্রিকায় অসমাপ্ত উপন্যাসটির বেশিরভাগ অংশ সংযোজিত হয়েছে সরাসরি পাণ্ডুলিপি থেকে। ‘একটা দেশ চাই' শুধু মর্মস্পর্শী উপন্যাস নয়; দুরন্ত গতিময় এই উপন্যাসের পাতায়-পাতায় বিধৃত হয়েছে মানবসমাজের এক অনাবিষ্কৃত যন্ত্রণা ও আতঙ্ক।
Prafulla Roy was a Bengali author, lived in West Bengal, India. He received Bankim Puraskar and Sahitya Akademi Award for his literary contribution in Bengali.
সত্তরোর্ধ বৃদ্ধ কলিমুদ্দিনের সারা জীবনের শুধু একটাই চাওয়া- ধন নয়, মান নয়, শুধুই একটা দেশ চাই তার। চাই একটা দেশের বৈধ নাগরিকত্ব। সেই নাগরিকত্বের খোঁজেই সারাজীবন ধরে বার বার ছিন্নমূল হয়েছেন মানুষটি। ভারত স্বাধীন হবার পর সংখ্যালঘু হয়ে পূর্ব পাকিস্তান, আবার স্বাধীন বাংলাদেশ থেকে সংখ্যালঘু মুসলিম বিহারী হয়ে প্রাণের দায়ে অনুপ্রবেশকারী রূপে কাঁটাতার পেরিয়ে ভাসতে ভাসতে শেষ পর্যন্ত আরব সাগরের তীরে। এরপর চাই ভারতীয় নাগরিকত্বের প্রমাণ। ভোটার কার্ড , রেশন কার্ড যোগাড় করার যমযন্ত্রণা একদা সম্ভ্রান্ত পরিবারগুলিকে টেনে নামিয়ে আনে নরকসম 'ঝোপড়ি'তে। বুকচাপা ব্যথার মর্মস্পর্শী কাহিনীর শেষ হয় ভয়ানক এক ট্রাজেডির সাথে। প্রছন্ন এক ব্যঙ্গও যেন লুকিয়ে থাকে শেষ পরতে। এই উপন্যাস ভাবতে বাধ্য করে সেই সমস্ত মানুষদের কথা যারা সারাজীবন পায়ের নীচে একটুকরো জমি খুঁজে চলেছে। কাঁটাতারের কৃত্রিমতা যে যুগ যুগ ধরে কত গ্যালন রক্ত ঝরিয়েছে তার হিসাব কেই বা রাখে! !