বইয়ের নামঃ দারবিশ
বইয়ের ধরণঃ উপন্যাস
বইয়ের লেখকঃ লতিফুল ইসলাম শিবলী
প্রচ্ছদঃ সোহেল আনাম
প্রকাশকালঃ অমর একুশে বইমেলা ২০১৭
প্রকাশনীঃ নালন্দা
পৃষ্ঠাঃ ১১০
মূদ্রিত মূল্যঃ ৩০০ টাকা
সার-সংক্ষেপঃ বইয়ের ফ্ল্যাপে লেখা আছে অনেক কিছু। রিভিউ লেখার সময় সার-সংক্ষেপ হিসেবে সাধারণত আমি সেগুলোকেই তুলে ধরি। তবে এবার সেই নিয়মের ব্যতিক্রম করছি।
আলোচ্য উপন্যাসটি শুরু হয় রোদেলা কে নিয়ে। রোদেলা সাধারণ মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়ে। বিনয়ী, সুন্দরী, বুদ্ধিমতি ও স্বাধীনচেতা। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের পাট চুকিয়েই সন্ধান শুরু করে চাকরীর। পেয়েও যায়। একজন পারসোনাল সেক্রেটারির কাজ। সেই সেক্রেটারি হতে হবে একজন ৭০ বছর বয়সী বৃদ্ধের। নাম মোহাম্মদ জামশেদ। তবে এই বৃদ্ধ যেন তেন লোক নন। বরং অসম্ভব বিচক্ষণ, অমায়িক ও প্রচুর জীবনীশক্তি সম্পন্ন মানুষ তিনি। রহস্যময় তাঁর চলাফেরা, বাচনভঙ্গি। তাই প্রথম প্রথম কিছুটা অদ্ভুতই লাগে তাকে রোদেলার। আর সেই ব্যাপারটি আরো ঘনীভূত হয় চাকরীর প্রথম ইন্টারভিউয়ের দিনেই। কিছু অদ্ভুত অদ্ভুত প্রশ্নের উত্তর দিয়েই রোদেলা পেয়ে যায় ৫০ হাজার টাকা বেতনের চাকরিটি। তারপর একদিন রোদেলাকে খুলে বলেন তাঁর জীবনের কিছু সময়ের কথা। এমন কথা যা শুনে যেকোন মানুষই চমকে উঠবে। কি সেই কথা? জানতে হলে পড়তে হবে পুরো বইটি!
পাঠ-প্রতিক্রিয়াঃ
“এইখানে এই তরুর তলে
তোমার আমার কৌতুহলে
যেক’টি দিন কাটিয়ে যাব প্রিয়ে
সঙ্গে রবে শূরার পাত্র
অল্পকিছু আহার মাত্র
আরেকখানি ছন্দ-মধুর কাব্য হাতে নিয়ে...”
মির্জা গালিবের এই কবিতাটি আমার খুব পছন্দের। পড়লেই জীবনটাকে খুব সহজ বলে মনে হয়। মনে হয়, জীবনযাপন করতে আসলেই বোধহয় কিছুই লাগে না।
প্রিয় পাঠক, আপনি কি দারবিশ বা সেইন্ট শব্দের মানে জানেন? কি হয় মানে? সাধু, তাই না? আচ্ছা এবার বলুন তো, সাধু মানে কি? জানি, অনেকেই হয়ত বলবেন যে জীবনে কোন খারাপ কাজ করেনি, সেই সাধু। হ্যাঁ। কথাটা এক অর্থে ঠিক। তবে আসল সাধু কারা জানেন? যারা জীবনের আসল অর্থ বোঝার চেষ্টা করেন। জীবনটিকে তারা অন্যদের থেকে ভিন্ন ও ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখেন। যার কাছে জীবন মানেই ভালোবাসা, প্রেম। হিংসা, বিদ্বেষ তারা এড়িয়ে চলেন।
এবার আসি আলোচ্য উপন্যাসে। “দারবিশ” উপন্যাস নিয়ে এই রিভিউটি লেখার আগে আমি অনেকক্ষণ চুপ করে বসেছিলাম। কেন? কারণ আমি বুঝতে পারছিলাম না যে এটিকে আমি কোনধরণের উপন্যাস বলবো। প্রেমের উপন্যাস? নাকি ঐতিহাসিক উপন্যাস? নাকি এডভেঞ্চার উপন্যাস? নাকি অন্যকিছু?
আসলে উপন্যাস হিসেবে “দারবিশ”এ আছে অনেক কিছু। আছে ইতিহাস, আছে সমাজ, আছে রাজনীতি, আছে এডভেঞ্চার, আছে প্রেম। আবার এই সবকিছু ছাপিয়ে আছে এক গভীর জীবনবোধ।
লেখক লতিফুল ইসলাম শিবলী ভাইয়ের প্রথম মৌলিক উপন্যাস এই “দারবিশ”। এর আগে তাঁর বেশ কিছু কবিতা ও গবেষণামূলক বই প্রকাশ হয়েছে। তবে শিবলী ভাইকে এদেশের মানুষ সাহিত্যিক হিসেবে কম, বরং গীতিকার হিসেবেই বেশি চেনে। ব্যান্ড দল এলআরবি’র “আমি কষ্ট পেতে ভালোবাসি”, জেমস’এর “জেল থেকে বলছি”, বিখ্যাত গান “তুমি আমার প্রথম সকাল”সহ অনেক জনপ্রিয় গানের গীতিকার তিনি।
আলোচ্য দারবিশ উপন্যাসটি লেখকের প্রথম উপন্যাস হলেও, তিনি বেশ ভালোই কাজ দেখিয়েছেন। গল্পের কনসেপ্টটা অতটাও আলাদা না হলেও, লেখনীর ধরণটা অন্যদের থেকে বেশ আলাদা। তাছাড়া বেশ ম্যাচুরড লেখনী। কাঁচা হাতের কাজ বলে মনে হয়নি তেমন। বইটির আরো একটি মজার দিক হলো, লেখক যেহেতু ব্যান্ড সংগীতের সাথে জড়িত তাই গল্পেও বারবার তুলে এনেছেন মিউজিকের কথা। রক এন্ড রোলের কথা। তৎকালীন আমেরিকা’র জীবন ও হিপ্পিদের কথা। এছাড়া লেখক বইটিতে খুব সুন্দর সুন্দর কিছু উপমা এনেছেন। যেমন ঢাকা শহরকে তিনি বলেছেন, “সিটি অফ মিউজিক”! গল্প বলার সময় এনেছেন কিছু কাব্যিক ভঙ্গিও যা পাঠককে দিবে এক অন্য রকমের প্রশান্তির অনুভূতি।
তবে কোন বইই নিখুঁত হয়না। তাই বইটি পড়ার সময় কিছু সূক্ষ্ণ ভুল চোখে পড়েছে। যেমন, বিরামচিহ্নের ব্যাবহার। বইটিকে উক্তি (“”) চিহ্নের ব্যাবহারে সমস্যা ছিল। লেখক লেখাগুলো বেশ ঢালাওভাবে লিখেছেন। তাই কাহিনীর বর্ণনা ও চরিত্রের সংলাপ আলাদা করতে বেশ কস্ট হয়। এছাড়া অনেক সংলাপের প্রথমে শুরুর উক্তি চিহ্ন ছিল। কিন্তু শেষে ছিল না।
এছাড়া গল্পের দৃশ্যপট বর্ণনায় একটু সমস্যা ছিল। এত দ্রুত ঘটনা প্রবাহ হয়েছে যে পাঠক হিসেবে একটু সমস্যা হয়েছে সেগুলো পর্যায়ক্রমে সাজাতে।
তবে এই দুটি সমস্যা ছাড়া আর কোন সমস্যা তেমন চোখে পড়েনি। বইয়ের বাঁধাই, কাগজের মান ও ছাপা ছিল দেখার মত। মোটা অফসেট পেপারে লেখাগুলো যেন ঝকঝক করছিল।
বইয়ের প্রচ্ছদটিও অনেক সুন্দর ও ভিন্ন��� দেখতে খুব আকর্ষনীয়। প্রচ্ছদশিল্পীকে ধন্যবাদ জানাই এত চমৎকার একটি প্রচ্ছদ বানানোর জন্য।
সবশেষে বলতে চাই, যদিও আলোচ্য উপন্যাসে উঠে এসেছে ৬০, ৭০ দশকের আমেরিকা’র সমাজ, রাজনীতি, হিপ্পি ও তাদের গানবাজনার কথা। কিন্তু সেগুলোকে ছাপিয়ে উঠে এসেছে অনেককিছু। প্রেম, ভালোবাসা, জীবন, সংগ্রাম, ভাগ্য এবং সফলতার গল্প। এখানের উল্লেখিত স্থান সত্য, ইতিহাস সত্য, কাল্পনিক শুধু এর চরিত্রগুলো। তাই সুপ্রিয় পাঠক, বইটি পড়ে দেখুন। কথা দিচ্ছি, ভালো লাগবে।
ধন্যবাদ!
হ্যাপি রিডিং!
রেটিংঃ ৪.৫/৫