বাংলাতে কবিতার স্থান একটু আলাদা, একটু উঁচু। কাব্যলক্ষী বাংলাতে ভালোভাবেই বসত গেড়েছেন সেই সুপ্রাচীন কাল থেকে। আবহমানকাল ধরে বাংলায় রচিত হয়েছে নানা রকম গাঁথা, লোককাহিনী, ছড়া, কবিতা, গান, এর সবই কাব্যের বৃহৎ অরণ্যের এক একটি শক্তপোক্ত বৃক্ষ। গদ্যের বিকাশ তো হল এই সেদিন, তার আগে প্রাচীন এবং মধ্যযুগে কাব্যের মাধ্যমেই প্রকাশিত হত মনের কথা, ইতিহাসের কথা, ঐতিহ্যের কথা। কেবল প্রেম-ভালোবাসা-ফ্যান্টাসি ছাড়াও কবিতায় প্রভাব পড়েছে পুরো বাংলার শুরু থেকে সকল তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনাবলি, এককথায় সমগ্র ইতিহাস। সেই ইতিহাসের নানান কালিক রূপান্তর, পট পরিবর্তন এর সাথে সাথে কাব্যের বদল এবং এর সাথে অন্যান্য শিল্পের সামঞ্জস্য এবং বৈসাদৃশ্য নিয়ে এমন স্বতঃস্ফূর্ত, মনোজ্ঞ বিশ্লেষণ বাংলা সাহিত্যে আর আছে কিনা আমার জানা নেই। কাব্যপ্রেমী, ইতিহাসপ্রেমী কিংবা প্রবন্ধসাহিত্য প্রেমী, সকলের জন্য এই বইটি একটা রত্নখনি বিশেষ। লেখকের সাহিত্যিক জীবনে রাজনীতি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত ছিল। অন্নদাশংকর রায়মহাশয়ের মতে, তাঁর রাজনীতি তাঁর সাহিত্যে প্রভাব ফেলেছে নেতিবাচকভাবে, কিন্তু মুখবন্ধতে আব্দুল মান্নান সৈয়দ সাহেব সে কথাটিকে যুক্তিপূর্ণভাবে নাকচ করেছেন। লেখকের জীবনচর্চা, কর্মধারা, সাহিত্যচর্চা সবই নানান বৈচিত্র্যে পরিপূর্ণ। কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ লিখেছেন, পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন, তাঁর বেশিরভাগ লেখাই ইংরেজিতে৷ তাঁর বিচিত্র অভিজ্ঞতা এবং নানা দিকে আগ্রহের ফল এই চমৎকার ছোট্ট গ্রন্থটি, যেটি মাত্র ৬৪ পৃষ্ঠার একটি বই হয়েও এর বিষয়বস্তুর গুণে হাজার পাতার সমান। বইটির বিষয় সম্পর্কে তাঁর নিজের ভাষায়, ' শঙ্কর বেদান্তের ওপর ইসলামের প্রভাবকে স্বীকার করে নিয়ে তার মধ্যে সে-যুগের কাব্যবিকাশের অন্যতম কারণ খুঁজেছি।' এই কথাটা বইটির মূল সুর আরো ভালো করে উন্মোচন করে। সামাজিক পটভূমিকার আলোকে কাব্যের বিকাশ সংক্রান্ত এই গ্রন্থটি একটি ক্লাসিক, এবং দুর্ভাগ্যজনক ভাবে অনালোচিত। আলোকিত এই গ্রন্থটি পড়ার জন্য আমি সত্যিকারের পাঠকদের আমন্ত্রণ জানাই।
কেন বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের হাতেই প্রথম সংস্কৃতের বন্ধনমুক্ত দেশি প্রাকৃত ভাষায় কাব্য/চর্যা রচনা সম্ভব হয়েছিলো, কিভাবে পশ্চিমের শান্ত সমাহিত ভূগোল সৃষ্টি করেছিলো চরম আধ্যাত্মিক বৈষ্ণব পদাবলি, আবার কিভাবেই বা জীবনঘনিষ্ঠ পূর্বের ভূভাগে সম্ভব হয়েছিলো লৌকিক মংগলকাব্যের উন্মেষ, সর্বোপরি কোন প্রক্রিয়ায় হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম-ইউরোপীয় এইসব আপাত বিরোধী বিশ্বাস এবং আদর্শ পারস্পরিক অভিঘাতের মাধ্যমে বিভিন্ন যুগে বাংলার কাব্যকে করেছে বিশিষ্ট এবং অভিনব- তার গভীর কিন্তু সংক্ষিপ্ত এরূপ বিশ্লেষণ আর হয়েছে কী না জানা নেই। এই বই পড়ে শেষ করার তাৎক্ষণিকতায় মাথায় দুইটি চিন্তা খেলা করলোঃ এক, আমাদের সমালোচনা সাহিত্যে এই ধরণের বইয়ের প্রচার ও প্রসার এখনও অত্যল্প হওয়ার কারণ কি আমাদের অসম্পূর্ণ বৌদ্ধিক বিকাশ? দুই, কালগতভাবে রবীন্দ্রনাথ এই বইয়ের শেষ ঘটনা। আমার ব্যক্তিগত ধারণায় রবীন্দ্র পরবর্তী বাংলা কাব্যে অন্তত আরেকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে গেছে- তিরিশের পাঁচের পৌরহিত্যে আধুনিক কবিতার উন্মেষ, বিকাশ ও পরিণতি। এছাড়া এই সর্বশেষ কাব্যিক স্ফূরণের পরবর্তী দীর্ঘকালীন অনুর্বরতাও আপাত বিস্ময়কর। এইসবের রাজনৈতিক সামাজিক আর বৈশ্বিক পটভূমি জানা কম আগ্রহোদ্দীপক হবে না নিশ্চয়ই। কিন্তু, বর্তমানের তীব্র জীবনবিচ্ছিন্ন সাহিত্যিক আবহে আরেকজন হুমায়ুন কবিরের আবির্ভাব কি একেবারেই অসংগত নয়? অথচ আমরা তাও সাহিত্য আর সাহিত্যিকের দিকেই তাকিয়ে থাকি; প্রাচীন বিশ্বাস, এহেন ঘোর দুর্বিপাকের সময়ে অতীতের ঐতিহ্যের উপাদান, বর্তমানের জড়তার উৎস, আর ভবিষ্যতের দিকনির্দেশ- এইসবের সন্ধান পাওয়া যাতে পারে একমাত্র একজন দ্রষ্টা লেখকের নিউরনকোষে, যার একমাত্র এবং মহৎ দায়িত্ব- তার নিউরনের অনুভবকে মনুষ্যভাষায় অনুবাদ করা।