উনবিংশ শতাব্দী এক নবজাগরণের সময় , ঐতিহাসিক লুণ্ঠনের জন্যও কুখ্যাত সে সময়, দলে দলে ইউরোপের বিভিন্ন জাতির ঘাটি তখন ভারতবর্ষ, এদের মধ্যে কেউ কেউ অতি উত্সাহী হয়ে উঠলেন তন্ত্র শাস্ত্রের প্রতি, দুর্মূল্য সেই তন্ত্রের পুঁথির খোঁজে বৈধ বা অবৈধ এই দুটো পথে সমান ভাবে চেষ্টার কার্পন্য করেন নি তারা, এই উপন্যাস নাগার্জুন এর প্রাচীন পুথিঁর খোঁজের এক রোমহর্ষক আধিভৌতিক বিবরণ, প্রতি পরতে পরতে রহস্য....
লোকমুখে একটি কাহিনি প্রচলিত আছে। একবার দুর্ভিক্ষপীড়িত প্রজারা মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের কাছে পৌঁছে বিস্তর হাংগামা করছিলেন। কৃষ্ণচন্দ্র তখন গোপালভাঁড়কে জিজ্ঞেস করেন, এই প্রজারা কী বলছে? গোপাল স্বতঃসিদ্ধ দ্ব্যর্থক ভঙ্গিতে বলেছিলেন, "মহারাজ, উহাদের শব্দ আছে বিস্তর। কিন্তু অর্থ নাই।" এই বইটারও একই দশা হয়েছে। লেখক সমকাল থেকে প্রায় একশো তিরিশ বছর আগের ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতবর্ষ, এক রহস্যময় চরিত্র থেকে অন্য এক চরিত্র, বিদেশি গুপ্তচর থেকে স্বদেশি সন্ন্যাসী - এদের নিয়ে এক সুবিশাল গপ্পো ফেঁদেছেন। কিন্তু... তাতে কিস্যু লাভ হয়নি। বইটা তন্ত্র বা তার আচার নিয়ে নয়। এতে দর্শন নেই, ইতিহাস নেই, শক্তিসাধনার স্বরূপ নেই। যা আছে সেই 'তুম সের তো ম্যায় সওয়া সের' বলার জন্য বইটির বর্তমান আয়তনের এক চতুর্থাংশ বরাদ্দ করলেই উচিত হত। ফেনানোর ব্যাপারে এমন অকুতোভয় মানসিকতা আর হিউমের মতো এক স্বল্পালোচিত চরিত্রকে ফোকাসে আনার জন্য বইটিকে দুটি তারা দেওয়া গেল। ব্যস!
তন্ত্র সাধনার ওপর আধারিত বেশ কয়েকটা বই আছে যেগুলো পাঠক মহলে যথেষ্ট সাড়া ফেলেছে। যেমন ঈশ্বর যখন বন্দী, হেরুক, জীবন্ত উপবীত, এবং ইনকুইজিশানের মত বেশ কিছু বই এছাড়া তারানাথ তান্ত্রিক ও আলাতচক্র তো আছেই। তান্ত্রিকের গোপন পুঁথি বইটা এই এলিট লিস্টে নতুন সংযোজন হল।
উপন্যাসের শুরু হয় এক অমাবস্যার মধ্যরাতে। রুপনারায়ন নদীর ধারে এক ভেঙে পড়া কালী মন্দিরের সন্নিষ্ঠ এক শ্মশানে। প্রখ্যাত প্রত্নতাত্ত্ববিদ অমিতাভ আর একজন তান্ত্রিক সাধু সেই অন্ধকার পরিবেশের মধ্যে অগ্নিকুন্ডের ধারে বসে আছে। তান্ত্রিক অমিতাভ কে নির্দেশ দেন একটা প্রাচীন পুঁথি ধ্বংস করে ফেলতে। কি আছে সেই পুঁথিতে? কেন তা অন্যের হাতে পড়লে বিপদের সম্ভাবনা?
সে কথা জানতে আমাদের প্রায় পঞ্চাশ বছর পিছিয়ে যেতে হবে। চুঁচুড়া তে অমিতাভের পিতামহ চুঁচুড়া কোর্টের নাজির মনমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় একজন কালী সাধক সৎ ও ধার্মিক মানুষ। তখন ইংরেজ আমল। ইংরেজ জেলাশাসক যথেষ্ট নির্ভরশীল ছিলেন নাজিরের পরামর্শের ওপর।
মোটামুটি শান্ত নিরুপদ্রবেই দিন কাটছিল। হঠাৎ একদিন বড়লাট ডাফরিনের কাছ থেকে নির্দেশ আসে, যে শ্রীপতি তন্ত্রাচার্য ওরফে যোগীবাবা কে খুঁজে বের করার। তাঁর সঙ্গে দেখা করার জন্য লন্ডন মিউজিয়ম থেকে এসেছেন রিচার্ড ম্যাক ও প্রখ্যাত আই সি এস অ্যালান অক্টোভিয়ান হিউম। তাদের উদ্দেশ্য ভারতীয় তন্ত্রের ওপর এক বহু প্রাচীন পুঁথি সংগ্রহ করা।
ভারতীয় তন্ত্রের প্রবাদ পুরুষ সিদ্ধ তান্ত্রিক নাগার্জুনের লেখা তন্ত্রের ওপর লেখা সেই পুঁথি পড়লে এক বিশেষ ক্ষমতা অর্জন করা যায়। সেই কারনেই বিভিন্ন দেশের নজর পড়ে এই পুঁথি ওপর । কিন্তু সেই পুঁথি যক্ষিনী মন্ত্র দ্বারা সুরক্ষিত। অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে সেই পুঁথি যে স্পর্শ করবে তার পরিনাম হবে মারাত্মক। এরপর কি হল জানতে হলে পড়তে হবে বইটি।
তন্ত্রের বিভিন্ন সাধন প্রনালী নিয়ে এখানে লেখক তেমন কোন আলোচনা করেন নি। বরং তার এই উপন্যাসের জন্য উনি বেছে নিয়েছেন এক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, ভারতের স্বাধীনতা পূর্বের সময় কাল। পুরো উপন্যাস টা জুড়ে আছে একটা খোঁজ। লেখকের লেখার হাত বেশ ভাল। পড়তে বিন্দুমাত্র ক্লান্তি আসে নি। এবং প্রতি মুহুর্তে এরপরে কি হবে এই উত্তেজনা পাঠকের মধ্যেও চারিয়ে যায়।
বর্তমানে পাতার সংখ্যার ওপর বইয়ের দাম রাখার একটা প্রবনতা দেখা যাচ্ছে প্রায় সব প্রকাশকদের মধ্যে। সেদিক থেকে দেখতে গেলে সাহিত্যেমের বইগুলো যথেষ্ট কম। সাড়ে তিনশো পাতার এই বইটির দাম মাত্র দেড়শো টাকা। ছাপাই ও বাঁধাই বেশ ভালোই।