আচ্ছা, কালোজিরে, বড়ি, আর কাঁচালঙ্কা দিয়ে রান্না করা মাছের ঝোল, সঙ্গে গরম ভাত আর শেষে একটু টক— এর রিভিউ হয়? জানি-জানি। ফুড ব্লগাররা পারলে অমন অমৃতেরও রিভিউ করবেন। সে করুন। কিন্তু আমার মায়ের হাতের রান্নার বিশ্লেষণ করে কেউ যদি কোথাও কিছু লিখেছে, তাহলে বব বিশ্বাসকে ফোন করব। আলোচ্য বইটি ঠিক এমনই জিনিস। এর রিভিউ হয় না, হতে পারে না। উৎকৃষ্ট বিরিয়ানির গন্ধ নাকে এলে যেমন পাগল হওয়ার অবস্থা হয়, তেমনই এই বই একবার পড়তে শুরু করলে আর থামার উপায় থাকে না। শেষ পাতাটুকুও উলটে আঙুল চেটে বলতে হয়, "আর নেই?" কত সহজ, সুরম্য ভাষায় যে কত কিছু বলা যায়, তার একটি কেস-স্টাডি এই বই। এতে বাঙালির একেবারে অন্তরের অন্তঃস্থলের তিনটি বিষয় নিয়ে রচিত তিনটি সরস প্রবন্ধ স্থান পেয়েছে। সেই লেখাগুলো হল~ ১) মাছ আর বাঙালি; ২) বাঙালির শীতের বিলাস; ৩) ভারতে আসবের ত্রি-ধারা। এমনিতে লেখাগুলো তো গান, কবিতা, রসিকতা আর খোশগল্পে একেবারে টাপুর-টুপুর হয়েই আছে। তাদেরই সঙ্গে এখানে স্থান পেয়েছে অজস্র ছবি ও স্কেচ। সব মিলিয়ে ব্যাপারটা যা দাঁড়িয়েছে সে প্রায় প্রথমবার জামাইষষ্ঠীতে আপ্যায়িত হওয়ার অনুভূতির সমতুল্য— সেও দ্বিতীয় কি তৃতীয় পাঠেও। এমন দেবগভোগ্য লেখা এককালে 'দেশ'-এ প্রকাশিত হত। আর আজ সেখানে... যাকগে! ইতিমধ্যে, বইটা যেখান থেকে পান, জোগাড় করে পড়ে ফেলুন। বিস্কুটের বিজ্ঞাপনে বলা কথাটা এর জন্য একেবারে সত্যি~ "অল্পেতে সাধ মেটে না, এ-স্বাদের ভাগ হবে না!"
কত ভালো ভালো বই যে ছড়িয়ে আছে বাংলা সাহিত্যে, তার খোঁজ জানিনা। তবুও নিজেকে সৌভাগ্যের অধিকারীই বলব যে আমি বইয়ের হাট গ্রুপে ছিলাম। সে কারণে অনেক অজানা বইয়ের সন্ধান পাচ্ছি। শ্রী রাধাপ্রসাদ গুপ্ত প্রণীত মাছ আর বাঙালি ঠিক সেরকমই একটি বই, অন্তত আমার কাছে। তিনটি প্রবন্ধ নিয়ে রচিত এই মিষ্টি বইটি। বিষয় হিসেবে এসেছে খুব সাধারণ কিছু বিষয়, যা বাঙালির জীবনের সাথে ওতোপ্রোতভাবে জড়িত৷ প্রথম প্রবন্ধটিতে মাছ আর বাঙালির সম্পর্কই আলোচিত হয়েছে, তবে গল্প বলার ধরনটা দারুণ মজলিশি। বাঙালির জীবনে মাছ নিয়ে বেশ একটা বড়োসড়ো জায়গা রয়েছে, বলা হয় মাছে ভাতে বাঙালি। তবে মাছ খাওয়ার ক্ষেত্রে বাঙালিদের চাইতে অন্যান্য জাতিও পিছিয়ে নেই। তবে রন্ধনের কৌশলে বাঙালিদের আশেপাশে আসা দায়। মাছ নিয়ে শ্লোক, কবিতারও কমতি নেই। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত প্রণীত তপসে মাছের কথা কে ই বা না জানে। এছাড়াও ইলিশ মাছের যে অসাধারণ বর্ণনা 'পদ্মা নদীর মাঝি'তে দিয়ে গেছেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, তার তুলনা হয় না। এভাবেই মাছ জড়িয়ে আছে রসনা থেকে সাহিত্যে, গাল-গল্পে, কবিতায়। রুই মাছ, পার্শে মাছ, খলসে মাছ, কই মাছ, মৌরলা মাছ সবই এসেছে তাদের নিজ গুণে আমাদের গল্পে। বুদ্ধদেব বসু ইলিশকে অভিহিত করেছিলেন জলের সোনালি শস্য নামে। আর ইতিহাসের পরিবর্তন এর সাথেও এই মাছ এর একটা যোগাযোগ রয়েছে। এসবই অত্যন্ত মনোগ্রাহী করে উপস্থাপন করেছেন লেখক। পরবর্তী রচনাটা আমার সবচেয়ে প্রিয় ঋতু শীত নিয়ে। এদিকে শীত সত্যি সত্যিই প্রকৃতিতে উঁকিঝুঁকি মারছে বলে এই প্রবন্ধটা সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে আমার। উষ্ণ আবরণের ভেতর আয়েশ করে বসে বসে পড়তে পারলে আরো ভালো লাগত! প্রথমেই লেখক শীতের বাহারি পোশাক আর বাহারি সবজির বর্ণনা দিয়েছেন। খেজুরের রস, হরেক রকম পিঠা, মেলা, ফুলকপি, ওলকপি, বাঁধাকপি, শিম এসব নিয়ে শীতের মতো জমজমাট ঋতু কম আছে। সাথে ঠাকুমা-দিদিমার পাশে লেপের ভেতর শুয়ে ভূতের গল্প শুনতে শুনতে ভয়ে এবং শীতে কাঁপতে কাঁপতে আরামে ঘুমিয়ে পড়ার অভিজ্ঞতারও কোন তুলনা হয় না। শেষ প্রবন্ধটা হচ্ছে আসব নিয়ে, মানে নানা রকমের সুরা নিয়ে। দ্রাক্ষারসের গল্প অনেক পুরনো। সেই পুরাণ থেকে এই আজ অব্দি এর মোহ মানুষ বা দেবতা সকলের পক্ষেই এড়িয়ে যাওয়া মুশকিল হয়েছে। লেখক খুব চিত্তাকর্ষকভাবে এই আসবের ইতিহাস আর আমাদের উপমহাদেশের ইতিহাসকে মিলিয়ে মিলিয়ে সামনে এগিয়েছেন৷ তিনটা প্রবন্ধটা বিষয় এবং লেখনশৈলীর গূণে হয়েছে অনবদ্য। তাঁর অন্যান্য বই পড়ার আগ্রহও জন্মে গেছে এই ছোট্ট বইটি পড়ে।
'কাল ১৮৯৭ (?) (আসলে১৮৯৮-এর ২২শে জানুয়ারি, সেদিন দুপুরে পূর্ণ সূর্যগ্রহণ হয়।) স্বামী বিবেকানন্দ ক'দিন ধরে বাগবাজারে বলরাম বসুর বাড়িতে একা আছেন, দেখবার লোকের মধ্যে খালি শ্রীরামকৃষ্ণ-গত-প্রাণা যোগীন মা। সেদিন সর্বগ্রাসী সূর্যগ্রহণ। ধার্মিকরা দূর দূর থেকে গ্রহণ দেখে চান করে পুণ্যার্জন করার জন্যে সাতসকাল থেকে কাতারে কাতারে গঙ্গার ধারে ভিড় করেছেন। স্বামীজীর সেদিকে কোন উৎসাহ নেই। তিনি তার আগের দিন তাঁর বাঙাল দেশের শিষ্য শরচ্চন্দ্র চক্রবর্তীকে তাঁকে রেঁধে খাওয়াতে বলেছেন। গ্রহণের দিন ভোর আটটায় শরচ্চন্দ্র মাছ, তরকারি আর রাঁধবার অন্যান্য জিনিষ নিয়ে হাজির। স্বামীজী তাঁর বাঙাল শিষ্যকে বললেন, 'তোদের দেশের মতন রান্না করতে হবে আর গ্রহণের পূর্বেই খাওয়া-দাওয়া শেষ হওয়া চাই।'
রান্না সুরু হল। স্বামীজী মাঝে মাঝে এসে ঠাট্টা করছিলেন: 'দেখিস মাছের 'জুল' বাঙালদিশি ধরনে হয়।' ভাত, মুগের ডাল, কৈ মাছের ঝোল, মাছের টক, মাছের শুকুনি রান্না প্রায় শেষ। স্বামীজী চান করে নিজেই পাত পেতে বসে পড়লেন। এখনও রান্নার কিছু বাকি আছে বলাতে আবদেরে ছোট ছেলের মতন বললেন, 'যা হয়েছে নিয়ে আয়, আমি আর বসতে পাচ্ছিনে, ক্ষিদেয় পেট জ্বলে যাচ্ছে।' অতএব তাঁকে তাড়াতাড়ি ভাত আর মাছের শুকুনি দেওয়া হল। তারপর যে মাছের শুকুনি নিয়ে কলকাতার লোকেরা খুব ঠাট্টা-তামাশা করত তা খেয়ে বললেন: 'এমন কখনও খাই নাই।' তারপর বললেন, 'কিন্তু মাছের 'জুলটা' এমন ঝাল হয়েছে, এমন আর কোনটাই হয় নাই।' তারপর মাছের টক খেয়ে বললেন 'এটা ঠিক বর্ধমানী ধরনের হয়েছে।' এরপর দই সন্দেশ খেয়ে, হাতমুখ ধুয়ে, খাটে বসে, তামাক টানতে টানতে সেই বিখ্যাত উক্তি করলেন: 'যে ভাল রাঁধতে পারে না, সে ভাল সাধু হতে পারে না-মন শুদ্ধ না হলে ভাল সুস্বাদু রান্না হয় না।' এই বলার পর ঘণ্টা বেজে ওঠাতে 'ওরে গেরণ লেগেছে-আমি ঘুমুই' বলে স্বামীজী শুয়ে পড়লেন।
'পেটুক' স্বামী বিবেকানন্দর কথাটি কত খাঁটি তা এই প্রবাদটি প্রমাণ করে:
'কে রাঁধে গো? কয়লা, কড়াই, খুন্তি? না, রাঁধে তোমার মনটি।'
'মাছ নিয়ে নানা জাতের নানান প্রবাদ আছে। কিন্তু বাঙালিরাই বলতে পারে যে 'মাছের নামে গাছও হাঁ করে।'আমি অন্তত অবাক হতাম না যদি ভারতচন্দ্রের ঈশ্বরী পাটনী (কে তিনি ছিলেন নারী না পুরুষ?) অন্নদার কাছে বর চাইতেন যে 'দুধে ভাতে' নয় 'আমার সন্তান যেন থাকে মাছে ভাতে'। এই কথা শুনে অনেকে হয়ত হাঁ হাঁ করে উঠে বলবেন: 'আরে এ আবার কী কথা?' ঈশ্বরী পাটনী 'দুধে ভাতে' বলেছিলেন কারণ তা প্রাচুর্য, শ্রী আর শান্তির প্রতীক। এর জবাবে আমি বলবো মাছে ভাত এ সব ছাড়াও বাঙালি জীবনেরও প্রতীক। আরও একটা কথা। সন্তান বলতে কন্যাও বোঝায়। তাই 'মাছে ভাতে' বললে মেয়ে বৈধব্য যাতে না হয় তারও কামনা থেকে যায়।'সে যাই হোক, গুপ্তকবি তারপর বিভুপদে প্রণাম জানিয়ে বলেছেন:
'ভাত মাছ খেয়ে বাঁচে বাঙালী সকল। ধানভরা ভ��মি তাই মাছভরা জল ॥'
রাধাপ্রসাদ গুপ্তের 'মাছ আর বাঙালি' বইটি একদিকে যেমন বাঙালির খাদ্যাভ্যাসের এক অপূর্ব দলিল, তেমনি এটি বাঙালির সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক জীবনধারার একটি গভীর পর্যালোচনা। বইটি পড়তে গিয়ে মনে হবে, মাছ যেন বাঙালির আত্মার অংশ। লেখক অত্যন্ত সাবলীলভাবে দেখিয়েছেন, কীভাবে মাছ কেবল খাদ্য নয়, বরং এটি বাঙালির সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।
বইয়ের শুরুতেই লেখক মাছের ঐতিহাসিক গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করেছেন। প্রাচীনকাল থেকে শুরু করে আধুনিক সময় পর্যন্ত বাঙালির মাছের প্রতি ভালোবাসা এবং এর গুরুত্ব কীভাবে বাঙালির জীবনযাত্রায় ছাপ ফেলেছে, তা চমৎকারভাবে উপস্থাপিত। বিশেষ করে, ইলিশ নিয়ে লেখকের আলোচনা পাঠকের মন ছুঁয়ে যায়। তিনি দেখিয়েছেন, পদ্মার ইলিশ শুধু স্বাদের জন্য বিখ্যাত নয়; এটি বাঙালির গর্বের প্রতীক।এছাড়াও বিভিন্ন শিল্পীর আঁকা নান্দনিক ছবি,কালীঘাটের পটের অপূর্ব সমাবেশ রয়েছে, সাথে রয়েছে চর্যাপদ,মসনামঙ্গল কিংবা চণ্ডীমঙ্গলের মাছ সম্পর্কে বিভিন্ন শ্লোক ও গল্প।
'মাছ আর বাঙালি' কেবল একটি বই নয়, এটি বাঙালির শিকড়ের প্রতি এক অসাধারণ শ্রদ্ধার্ঘ্য। যারা বাঙালির সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস, এবং ঐতিহ্যকে গভীরভাবে জানতে চান, তাদের জন্য এই বইটি একটি অবশ্যপাঠ্য।
ভালো কিছু বই হুটহাট চোখের সামনে চলে আসে,সময় নিয়ে আর বেশ তৃপ্তি নিয়েই শেষ করি সেগুলো। এই বইটি সেই তালিকায় থাকবে। লেখকের লেখার ধরন একদমই গল্প বলার ঢঙে, মনে হয় কেউ আসর বসিয়ে পুরানো সেসব দিনের ঝুলি খুলেছে। তিনটি ভিন্ন বিষয়ের সাথে বাঙালির সম্পর্ক বেশ কিছু রেফারেন্স দিয়েই লেখক তুলে ধরেছেন। প্রথম অংশ,মাছ আর বাঙালি। বহু বছর আগের রেশ টেনে লেখকের বর্তমান পর্যন্ত কলকাতা থেকে শুরু করে আরও বেশ কিছু অঞ্চলের মাছের ইতিহাস, নানান রকম পদের মাছ, একেক সাহিত্যিকের মাছ নিয়ে লেখা গল্প,কবিতার কোনো কিছুই যেন বাদ যায়নি এই অংশ থেকে। তারপরের অংশ বাঙালির শীত উদযাপন নিয়ে। শ্রেণিভেদে আর সময়ভেদে শীতের পোশাকের বিশাল পরিবর্তন এসেছে। ইংরেজ শাসন আমলেও কীভাবে ইংরেজদের দেখাদেখি কলকাতার সাহেবরাও কোট স্যুট পরার চলন ধরলেন, তাও উঠে এসেছে এখানে। শেষে বিরাট অংশ জুড়ে আলোচনা হলো আসব(নানা রকম সুরা) আর বাঙালির সম্পর্ক নিয়ে। সেই পুরাণ থেকে এখন পর্যন্ত মানুষের আগ্রহ এই বিষয়ে যেন বিন্দুমাত্র কমেনি। লেখক হাস্যরসের মিলনে বেশ কয়েকটা টাইমলাইনের ঘটনা বলে গেছেন বাঙালির আসবপ্রীতি নিয়ে।
রাধাপ্রসাদ গুপ্ত লিখিত মাছ আর বাঙালী বইটি পড়তে পড়তে আমি ক্রমাাগত চোখের জলে, নাকের জলে এবং জিভের জলে নাস্তানাবুদ হয়েছি।এবং আমার বিশ্বাস যেকোনো বাঙালীরই ঐ একই অবস্থা হবে।
এই বইতে তিনটি বিষয়ের উপর লেখা :
১) মাছ আর বাঙালি ২) বাঙালির শীতের বিলাস ৩) ভারতে আসবের ত্রি-ধারা
বহু তথ্য সমৃদ্ধ আড্ডার মেজাজে লেখা একটি উপভোগ্য বই। আর তার সঙ্গে আছে অজস্র প্রচলিত এবং দুষ্প্রাপ্য ছবি যা বইটির আকর্ষণ বৃদ্ধি করেছে। শীতের আমেজ পেতে এবং মাছ ও আসবের স্বাদ উপভোগ করতে বইটি পড়ে দেখতে হবে।