আসলে এ বই নিটোল নির্ভেজাল এক আড্ডা। সে আড্ডায় কখনো পরিহাসের মধুর তুফান, কখনো দীর্ঘশ্বাসের বিদুর মূর্চ্ছনা। একটি পেরেকের কাহিনী বা সম্পাদকের বৈঠকে যাদের পড়া, তারা অবশ্য জানেন যে সাগরময় ঘোষের কলমে সহজ মজলিশি আড্ডার টানটা কি দূর্বার, অপ্রতিরোধ্য। হীরের নাকছাবি বস্তুত সম্পাদকের বেঠকেরই একটি খন্ড। এ গ্রন্থে শুধু সাহিত্য ও সাহিত্যিকদের নিয়েই খোশগল্প জমাননি তিনি, আরও শুনিয়েছেন বহু সঙ্গ ও প্রসঙ্গের মনোমুগ্ধকর আলাপচারিতা। এর মধ্যে রয়েছে এক জাতমাতালের কৌতুকোচ্ছল নানান কাহিনী, বিদেশ ভ্রমনের মজার ঘটনা,থার্ডমাস্টারের অজানা কাহিনী, তারাশঙ্কর বিভূতিভূষনের অজানা দ্বৈরথ,কবিযশপ্রার্থী দাশরথির করুন জীবনী।
সাগরময় ঘোষ (২২ জুন, ১৯১২ - ১৯ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৯) একজন স্বনামখ্যাত ভারতীয় বাঙালি সাহিত্যিক যিনি কলকাতা থেকে প্রকাশিত দেশ পত্রিকার সম্পাদকীয় দায়িত্ব পালন করে জীবন্ত কিংবদন্তীতে পরিণত হয়েছিলেন। ১৯৯৯ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর মৃত্যুতে লন্ডনের দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকায় প্রকাশিত শোকসংবাদে তাঁকে বাংলার ‘সাহিত্য ব্যাঘ্র’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছিল। মৃত্যুর কিছু পূর্বে ১৯৯৭ খ্রিষ্টাব্দে তিনি বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে দীর্ঘজীবী বাংলা সাপ্তাহিক দেশ পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন।
তাঁর জন্ম ব্রিটিশ ভারতের পূর্ব বঙ্গে, বর্তমান বাংলাদেশের চাঁদপুরে, ১৯১২ খ্রিষ্টাব্দের ২২শে জুন তারিখে। চাঁদপুরেই ছিল তাদের পৈতৃক ভিটা। কালক্রমে নদী ভাঙনে হারিয়ে গেছে সেই পৈতৃক ভিটা। তাঁর পিতা কালিমোহন ঘোষ ছিলেন রবীন্দ্রনাথের সাক্ষাৎ সহচর। মায়ের নাম মনোরমা দেবী। জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা শান্তিদেব ঘোষ ছিলেন রবীন্দ্র সঙ্গীতের বিশিষ্ট সাধক এবং ভারতের জাতীয় পণ্ডিত হিসেবে স্বীকৃত। সাগরময় ঘোষ শান্তিনিকেতনে পড়াশোনা করেন, তিনি রবীন্দ্রনাথের সরাসরি ছাত্র ছিলেন। শান্তিনিকেতনে অধ্যয়নকালে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের প্রভাবে সাহিত্য ও সঙ্গীত, সর্বোপরি শিল্পের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ জন্মে যা প্রয়াণাবধি তাঁর মানসপ্রতিভাকে নিয়ন্ত্রণ করেছে।
১৯৯৯ খৃষ্টাব্দের ১৯ ফেব্রুয়ারি ৮৬ বছর বয়সে সাগরময় ঘোষ মারা যান। তাঁর মৃত্যুতে বাংলা সাহিত্য হারায় এক অসামান্য সম্পাদককে।
বিভূতিভূষণ আর তারাশঙ্করের অংশটা পড়ে চমকে উঠেছি। তারাশঙ্করের কথা শুনে দু:খ পেয়ে খোদা না করুক বিভূতিবাবু যদি সেদিন তার বন্ধু-সাহিত্য সমালোচক কালিদাস রায়ের কাছে না যেতেন! আর উনি যদি বিভূতিভূষণকে মোটিভেট করতে না পারতেন! ভাবতেই পারি না, হয়তো লেখক অভিমানে লেখাই ছেড়ে দিতেন 🐸
আবার দু:খ লেগেছে কবির এককালের সহপাঠী দাশরথের পাঁচালী পড়ে। আহারে! বেচারা। তবে একটা ব্যাপার যেটা দারুণ লাগলো... কর্মজীবনে যেমন সফলভাবে সম্পাদকের দপ্তর সামলেছেন, ছাত্রজীবনে শখের সম্পাদনা করবার সময়ও দায়িত্বে ঢিল দেননি মোটেও। কর্মের পরিমন্ডল যা-ই হোক, মাণ রক্ষার্থে আপোষহীন ছিলেন সবসময়ই।
দারুণ! একটা বই। আড্ডার ছলে সাগরময় ঘোষ গল্প শুনিয়েছেন অনেক। কেবল অন্যের লেখার উপর ছুরি-কাঁচি না চালিয়ে নিজে লিখলে বোধকরি বাংলা সাহিত্যে আরও কিছু অমূল্য সম্পদের সংযোজন হতো।
যেমনটা বইয়ের Description বক্সে বলা হয়েছে, আসলেই এই বইটি নিটোল নির্ভেজাল এক আড্ডা। নিজের খণ্ড খণ্ড অভিজ্ঞতা,কখনো অন্যের মুখে শোনা বিভিন্ন গল্প মজলিশি ঢংয়ে শুনিয়েছেন সাগরময় ঘোষ। কোনো গল্প যেমন হাসিয়েছে,কোনোটা আবার মন খারাপ করিয়ে দেয়। এই যেমন,লেখকের 'দাশরথির পাঁচালি' নামক অভিজ্ঞতাটা পড়তে গিয়ে ভীষণ মন খারাপ হয়েছিল। আবার বিভূতিভূষণ আর তারাশঙ্করের গল্পটা পড়ে চমকে উঠেছিলাম।
এছাড়া বাকিগল্পগুলো রসে ভেজানো রসগোল্লার মতোই সরেস। পুরো বইটাই ভীষণ ভীষণ উপভোগ করেছি আমি।
আবারও চমৎকার! শুরুর ওয়ান-থার্ড একটু একঘেয়ে লাগছিল, তারপর থেকেই সগরময় ফুল ফর্মে। এ-বইয়ে সাগরময় নিজের কথা একটু বলেছেন, সম্পাদনা সংক্রান্ত অভিজ্ঞতা কিঞ্চিৎ কম। তবুও বইয়ের রসগুণ তেমন একটা ক্ষুণ্ণ হয়নি।
আড্ডা মানেই তা নিছক কথা নয়, কথার ফাঁকে ফাঁকে জমে ওঠে সময়, মানুষ আর সাহিত্য।
সেই আড্ডারই সঞ্চিত রেশ ‘হীরের নাকছাবি’। শুরুটা হালকা, খানিক রম্য—যেন চায়ের কাপের ধোঁয়ার সঙ্গে হাসির রোল উঠছে। কিন্তু পড়তে পড়তে টের পাওয়া যায়, এই হালকাতেই লুকিয়ে আছে গভীরতা। শেষদিকে এসে এক হৃদয়স্পর্শী কাহিনি নিঃশব্দে হাত ধরে বসিয়ে দেয়, চমৎকার এক পরিণতি। বিভিন্ন সাহিত্যিকের জীবনের ছোট ছোট মুহূর্ত, দৈনন্দিনতার টুকরো ঘটনা সবই কলমের কোমল স্পর্শে উঠে আসে। কোথাও বাড়তি ভার নেই, কোথাও উপদেশের বোঝা নয়, আছে শুধু মানুষ আর তাদের কথা। ভাষার সহজবোধ্যতা এমন যে বইটা নামিয়ে রাখতে ইচ্ছে করে না, একটানে পড়ে ফেলার তাগিদ তৈরি হয়। সব মিলিয়ে, সাহিত্যিকদের ঘিরে এক সহজ, রম্য, অথচ মনে দাগ কাটে—এই তো সাগরময় ঘোষের পাঠ্য।
প্রথমদিকে ভোতামুড়ি, পরে একবারে আব্দুল মজিদের ছোলা ঝাল মুড়ি! দশরথির পাঁচালী অংশটা পড়ে মন খারাপ হলো। আর তারাশঙ্করবাবুর কথা না শুনেই বোধহয় বিভূতিবাবু এতটা সৃষ্টিশীল হতে পেরেছেন। ধন্য হে কালিদাস। যাক গে, কলেজ স্ট্রীটের ব্যস্ত সাহিত্যিকদের অজানা গপ্পো জানতে নির্দ্বিধায় পড়তে পারে। তবে "সম্পাদকের বৈঠক" এর মত আসরটা এইবার অতটা জমলো না এই আর কি!
দেশ পত্রিকার সম্পাদক সাগরময় ঘোষের এই বইটিকে ঠিক কোন জনারায় ফেলব নিশ্চিত নই। গুলবাজ মদ্যপিয়াসু ভোম্বলদা এবং ভোজনরসিক ব্রাহ্মণদের কাহিনিগুলো রম্যসাহিত্য। বড়ই সুস্বাদু। পড়তে বেশ লাগে।
আবার এই বইয়েই সম্পাদক হিসেবে সাগরময় ঘোষের অনবদ্য স্মৃতিকথা তো কোনো পাঠকের পক্ষেই ভুলবার নয়। 'লৌহকপাট'এর লেখক জরাসন্ধকে আবিষ্কারের ঘটনা তো রীতিমতো ক্লাসিক। বিভূতিভূষণ এবং তারাশঙ্করের অলিখিত দ্বৈরথ নিয়ে লেখাটিও পড়বার মতো। শান্তিনিকেতনের ছাত্র সাগরময়ের শান্তিনিকেতন এবং গুরুদেবকে নিয়ে স্মৃতিচারণ এই বইয়ের সবচেয়ে চৌম্বকীয় অংশ।
প্রথম অংশ বেশ গতিহীন। তারপর হঠাৎ লেখার বান ধেয়ে এল। দেখি বই শেষ!
অদ্ভুত এক অ্যাখ্যান শেষ হলো, এবং আচম্বিতেই যেন তা শেষ হলো। বইটা শুরু হলো সাগর বাবুর লেখক হবার গল্প দিয়ে। এবং তার সম্পাদক জীবনে ঘটে যাওয়া অনেক ঘটনার কিছুটা দিয়ে এই বই রচিত। তিনি তার দীর্ঘ সম্পাদক জীবনে অনেক ধরনের মানুষের সাথে চলা ফেরা উঠা বসা করেছে। সেসব থেকেই স্মৃতিচারণ করে গেলেন এই বইতে।
আমি যত পড়ে গেছি ততই হতবাক হয়েছি, হীরের নাকছাবি প্রবন্ধে লেখক বিভূতিভূষণ আর তারাশঙ্করের একটি ঘটনা তুলে ধরেছেন। তারাশঙ্কর বাবুর ঐ উপদেশটি যদি বিভূতিভূষণ তখন শুনতেন, হয়তো আমরা আজ আমাদের চিরচেনা প্রকৃতির লেখককে পেতাম না। একমাত্র বিভূতিভূষণের গুরু কালিদাসের পরামর্শে তিনি শান্ত হয়েছিলেন সেদিন। অদ্ভুত সেই ঘটনা। এবং ভয়ংকর।
জরাসন্ধের লেখা বিখ্যাত বই লৌহকপাট আজ আমরা হয় তো পড়তে পারতাম না যদি না সাগর বাবুর বন্ধুটি দ্বিতীয়বার যোগাযোগ করে তাড়া না দিতেন। জরাসন্ধ আবিষ্কার করার এটিও এক চকপ্রদ গল্প।
সবচেয়ে বেশি আবেগতাড়িত হয়েছি থার্ড মাস্টার নামক গল্পটিতে। বনফুল মানে বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়ে জীবনের একটি ঘটনা এটি। খুবই সংবেদনশীল ছিলো। গুরু ছাত্রের সম্পর্ক আসলে কেমন হতে হয় তার কঠিন এক দৃষ্টান্ত ছিল এটি। একটি ছাত্রের স্বপ্নের নায়ক যে তার শিক্ষক এটা যেনো আমাদের বর্তমান শিক্ষকরা বুঝতেই চান না।
প্রাণ খুখে হেসেছি লেখকের ভোম্বল দা সম্পর্কিত অধ্যায়টি পড়ে। প্রচুর রম্যে ঠাসা অধ্যায়টি।
সবচেয়ে বেশি পুলক অনুভব করেছি লেখকের ছাত্র জীবনের স্মৃতিচারণ পড়ে, তার সেই স্মৃতিকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে বেশকিছুটা বলা হয় যা বইয়ে খুবই চৌম্বকিয় অংশ, তার ছেলে বেলায় তিনি রবীন্দ্রনাথের সাথে সাথে সৈয়দ মুজতবা আলী সহ আরো না না গুনীজনের সান্নিধ্য লাভ করেন। এছাড়াও তিনি তার জীবনে বড় বড় মাপের সাহিত্যিক বোদ্ধাদের সান্নিধ্যে লাভ করেন।
বইটি যেনো ক্ষনকালিন সময়ের জন্য আমাকে অন্য এক ভূবণ ঘুরিয়ে আনলো।
ভোম্বলদার মাতলামির অংশগুলো নিখাদ বিনোদন; এর বাইরে থার্ডমাস্টারের হাতে বনফুলের সাহিত্যিক হিসেবে বেড়ে ওঠার বুনিয়াদ, ব্যর্থ কবি দাশরথির কাহিনি, তারাশঙ্কর আর বিভূতিভূষণের কথা, জরাসন্ধের লৌহকপাট প্রকাশের অংশগুলো ভালো লেগেছে।
সাগরময় ঘোষের "হীরের নাকছবি" ১৭৩ পৃষ্ঠার বই। সবচেয়ে বড় আফসোসটা এখানেই। ১৭৩ সংখ্যার "১" টা যদি শেষে অথবা নিদেনপক্ষে শেষের "৩" টা যদি সর্বপ্রথমে থাকতো - তাতেও ঘোর কমতো না। সাগরময় ঘোষের বলার ভঙ্গি আমাদের কম্ফোর্ট-জোনের আড্ডার কথাগুলোর মতোই। বাক্যের স্বচ্ছলতা মুগ্ধ করে রেখে পাঠককে এমন জায়গায় দাঁড় করায় যেখানে পাঠক মাত্রেই স্বীকার করে নিবেন যে এর মধ্যে কোন দেখানোপানা নেই। ঠিক এই কারনেই "প্রিয় লেখকদের" লিষ্ট অগনিত হলেও, সাগরময় ঘোষ যেন আলাদ হয়ে থাকে। তার লেখা বা বই পড়ে মনেই হয় না পড়ছি বরং হুট করে নিজেকে আবিস্কার করি কোন আড্ডার মাঝে। বাক্যোর পর বাক্য বলে যাচ্ছেন আড্ডার প্রধান ব্যক্তি এবং আমরা আঁটো হয়ে বসে শুনছি। "হীরের নাকছবি" অথবা "সম্পাদকের বৈঠকে" - দুয়ের বেলাই সম-অনুভূতিতে সিক্ত।
ক্ষিতীশ সরকার সম্পদিত "জলসা" পত্রিকায় "সম্পাদকের বৈঠকে" প্রকাশিত হয়েছে ৩ বছর ধরে। পরে আনন্দ পাবলিসার্স থেকে বই আকারে প্রকাশ হয়। এর পরে সমগোত্রীয় লেখা থেকে দীর্ঘ বিরতি। তবে পাঠকের প্রবল আগ্রহের কারনেই ১৯৬১ থেকে ১৯৭৬ পর্যন্ত জলসা, আনন্দবাজার, কৃত্তিবাস, সাঝঘর পত্রিকা থেকে সংগ্রহ করে এই বই তৈরী করা হয়। তবে উল্লেখ্য যে, এই লেখাগুলো লেখক নিজে খারিজ করে দিয়েছিলেন। ধন্যবাদ উদ্যোক্তাদের খারিজ করে দেয়া লেখাগুলো একমলাটে উপহার দেবার জন্যে।
"সম্পাদকের বৈঠকের" মতোই এই বইয়ে উঠে এসেছে নানা সাহিত্যেকের অজানা এবং মনোমুগ্ধকর ঘটনা। বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে প্যারিসের গৌরবের কারনে একটা কথা প্রচলিত ছিল, "See Paris and Die"। একালে সে প্রবাদ দাঁড়িয়েছে "Must see New York before you die"। অসম্ভব এবং প্রিয় লেখক বলে সাগরময় ঘোসের বেলা "রিড সাগরময় ঘোষ বিফোর ইউ ডাই" বললে বাড়াবাড়ি হবে কি? হলেও, প্রিয় কিছু নিয়ে কিছুটা বাড়াবাড়ি নমনীয় চোখে দেখার আশা রাখি।
কমেডি আর ট্রাজেডির টানাপোড়েনে বোনা আামাদের জীবন যেন নকশি-কাঁথার এক একটি বিচিত্র ডিজাইন। "হীরের নাকছবি" এর সবটাই রিপ্রেজেন্ট করে। কমেডি যেমন আছে, তেমানি "দশরথীর পাঁচালী" পাঠককে দাঁড় করাবে ট্রাজেডির সামনেও। দশরথীর প্রতি কিছুটা অবিচার এবং তার প্রতিকার করার সুযোগ না পাওয়ার দুঃখ যেমন ঘুচবে না লেখক সাগরময় ঘোষের, তেমনি পাঠকও এখানে এসে সেই দুঃখে সমভাবে ব্যথিত হবেন। এই দুঃখবোধের সাথে সাথে হয়ত উজ্জ্বল হয়ে থাকবে দশরথীকে দেয়া বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিরকুট-টুকু -
"কবিতা দুই শ্রেণির, ভালো অথবা মন্দ। এর মাঝারি নেই। তোমার কবিতা ভালো শ্রেণির। অভিজ্ঞতার সঙ্গে তোমার কবিতা লেখার শক্তি বাড়বে বলেই আশা করি।"
অভিজ্ঞতা এবং সেই শক্তির শাণিত-রূপ প্রবল কৌতুহুল হয়েই রয়ে যাবে।
কবিতা প্রসঙ্গ এলোই যখন সেই নোটেই লেখা শেষ করি। আধুনিক কবিতার দুর্বোধ্যতা সর্ব-স্বীকৃত। কিন্তু ততোধিক দুর্বোধ্য সেইসব কবিতার লেখকরা। একজন ত্রিশোর্ধ্ব কবি। বিদেশি কম্পানির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। তার হতাশার নিঃশ্বাসের সাথে চাকরি ছেড়ে দেবার সিদ্ধান্ত। সগরময় ঘোষ অবাক হয়ে কারন জিজ্ঞেস করায় তিনি বললেন, কবির সবচেয়ে বড় শক্র চাকরি। আবার সেই চাকরি যদি কোট-প্যান্ট পড়া চাকরি হয়। নিজেদের একটা ত্রৈমাসিক পত্রিকার কাজ আরও সময় নিয়ে করার জন্যে ছেড়ে দিলেন সেই চাকরি।
সেই কবির সমবয়সী আর একজন কবি - সামান্য একটা চাকরির খোঁজে। যে কোন চাকরি পেলেই বর্তে যায়। আড়াইশো টাকা বেতনে সাহিত্য একাদমিতে সামান্য সেলসম্যান পদে ইন্টারভিউ দিয়েও চাকরি হলো না। তরুন কবিদের মধ্যে তিনি অগ্রগন্য, ইউরোপ-আমেরিকা ফেরত। তাই তাকে বলা হলো,"ইউ আর টু গুড ফর দিস জব"।
পরবর্তীতে ভালো চাকরি নিয়ে আমেরিকায় গিয়েছিলেন। নয় মাস ছিলেন সেখানে। ভালো চাকরি কিন্তু "দু-ত্তেরি চাকরি" বলে সব ছেড়ে দিয়ে ফিরে এলেন দেশে। দেশে এসে সাহিত্য নিয়ে একটা তুলকালাম কান্ড না করলে শান্তি নেই - এই প্রবোধে নিশ্চিন্ত জীবন ফেলে দিয়ে চলে এলেন দেশে। দেশে ফিরে সেই সামান্য বেতনের চাকরি খোঁজা আবারও মাসের পর মাস।
প্রথম কবির নাম শরৎ মুখোপাধ্যায়। দ্বিতীয় কবির নাম সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়।
সাঘরময় ঘোসের "হীরের নাকছবি" আনন্দ পাবলিশার্স (ভারত) থেকে প্রকাশিত। প্রচ্ছদ করেছেন অমিয় ভট্টাচার্য।
সোশ্যাল মিডিয়ায় দুই বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে একটা পোস্ট দেখে "হীরের নাকছাবি"-র সন্ধান পাই। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় আর বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়। বিভূতিভূষণ আমার একজন প্রিয় লেখক, তার নাম আর ঐ পোস্টে উল্লেখিত অংশের ঘটনাটা (ঘটনাটা আমার চোখে গুরুত্ববহ, সে আলাপ অন্য কোনোদিন করবো বলে ভেবেছি) আমার মধ্যে বেশ আগ্রহ জাগালো। তড়িঘড়ি করে অন্তর্জালে খুঁজে সংগ্রহ করে ফেললাম বইটার পিডিএফ।
আমি যে অংশ পড়ে বইটার সন্ধান পাই, সেটা এ বইয়ের নামরচনা। সেটা ছাড়াও বিশেষভাবে ভালো লেগেছে "থার্ড মাস্টার" অংশটি। "দাশরথির পাঁচালী" অংশ পড়ে মন খারাপ হয়ে গেছে, দাশরথির জন্য কষ্ট হয়েছে খুব। আবার, ভোম্বলদার বা লম্বোদর আর তার ত্রিপুত্রের কীর্তি পড়ে না হেসে থাকতে পারিনি- এটাও বলতে হবে!
সম্পাদক-সাংবাদিক সাগরময় ঘোষ লেখক হতে না চেয়েও যা লিখেছেন, তার বিচারের ভার আমি নিতে স্পর্ধা করি না। সাগরময়ের "সম্পাদকের বৈঠকে"-র উল্লেখ এ বইয়ে পেয়েছি বেশ ক'বার, সেটাও পড়ে ফেলবো সুযোগ পেলেই!
স্মৃতিকথা পড়তে আমার বরাবরই ভালো লাগে। আর সেই স্মৃতিকথা যদি হয় ‘দেশ’ পত্রিকার স্বনামধন্য সম্পাদক সাগরময় ঘোষের, তাহলে তো কথাই নেই।
তবে কিনা বইটা পড়ে একটা বই পড়া হলো এমন পূর্ণ অনুভূতি আসলোনা, কেমন অপূর্ণ অপূর্ণ মনে হলো। সম্ভবত, এই বইতেই, একই লেখকের ‘সম্পাদকের বৈ���ক’ বইয়ের উল্লেখ থাকায় বারবারই মনে হয়েছে ওই বইটা পড়ে ফেলতে হবে, এই ক্রমাগত তাগাদার কারণেই হয়তো এই বইটাকে অসম্পূর্ণ মনে হয়েছে।
তবে মানতেই হবে, পেশায় লেখক না হলে কী হবে, সাগরময় বাবুর লেখার হাত আছে। খুবই বৈঠকী, মৃদু চালে লেখা, পড়তে ভীষণ আরাম। এত চমৎকার লেখার বিষয়বস্তু যদি হয় বাংলা সাহিত্যের দিকপালদের নানা কাহিনী তাহলে তো সোনায় সোহাগা।
সম্পাদকের বৈঠকে যেমন উপভোগ্য ছিল, ঠিক তেমনি এই বইটিও। এত স্বাদু গদ্য, মনে হয় লেখক সামনে বসেই আড্ডা দিচ্ছেন। 'দেশ' পত্রিকার সুযোগ্য সম্পাদকের লেখা প্রতিটি কাহিনীই অত্যন্ত সরস৷ যেমন ভাষারীতি,তেমনি বর্ণনাভঙ্গি। খুব সুন্দর, আনন্দময় কিছু সময় কাটল বইটি পড়ে। এমন বই একটা পড়লে দীর্ঘদিন মন কানায় কানায় ভরে থাকে।
ভোম্বলদার অসাধারণ গুল ছাড়াও বইটিতে উঠে এসেছে চাঁদপুরের ব্রাহ্মণের গল্প, লেখক জরাসন্ধকে (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী) আবিষ্কারের গল্প। জেলজীবন নিয়ে লেখা ওই রচনাগুলো আমরা ’লৌহকপাট’ নামে চিনি। গভীর অন্তর্দৃষ্টি, কয়েদীদের কাছ থেকে শোনা কাহিনী, আর সহকর্মীদের কাছ থেকে শুনে সুনিপুণভাবে লেখা হয়েছিল বইটি। যা পরে চার খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছিল। সাগরময় ঘোষ তা না পড়েই চার-পাঁচ মাস ফেলে রেখেছিলেন।
এছাড়াও শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে কাটানো স্মৃতি ও তাঁর রসবোধের কিছু নমুনাও আছে বইটিতে। যারা এখনও পড়েন নি, তারা পড়ে দেখতে পারেন হীরের নাকছাবি। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে উৎসর্গ করা এই বইটি পড়তে পড়তেই বোঝা যাবে সম্পাদক সাগরময় ঘোষ লেখক হিসেবে কেমন ছিলেন।