তর সইছিল না অনেকের। সেদিন সভাশেষে গুঞ্জন ওঠে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দেরি না করে বক্তার এই কথা আরো মানুষের কাছে পৌঁছনো দরকার। ভাষণ শোনার পর মুগ্ধতায় অনেকেই তাঁদের খুশির কথা জানাতে ছুটেও আসেন বক্তার কাছে। তাঁকে ঘিরে কেউ কেউ বলতেও থাকেন: ভাষণটি এখনই প্রকাশ করা চাই, আমরা সবরকম সাহায্য করার জন্য প্রস্তুত। তখনই আবার ভেবেছি, কিছু সময় পেরিয়ে গেলে হয়তো শ্রোতাদের মুগ্ধতার এই ঘোর কেটে যাবে। কিন্তু না, উৎসাহ বেড়ে গেল আরো। টেলিফোনে আরো অনেকেরই অনুরোধ পেতে থাকলাম আমরা। যাঁরা সেদিন (৩ এপ্রিল ২০০৭) কলকাতার শিশিরমঞ্চে ষষ্ঠ প্রণবেশ সেন স্মারক বক্তৃতার অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পারেননি, বন্ধু ও প্রিয়জনদের কাছে শঙ্খ ঘোষের ভাষণের মর্মার্থ শুনে তাঁরাও আর্জি জানালেন, এই ভাষণ পুস্তিকার আকারে অবিলম্বে প্রকাশ করার। একই অনুরোধ আসতে থাকল বক্তার কাছেও।
Shankha Ghosh (Bengali: শঙ্খ ঘোষ; b. 1932) is a Bengali Indian poet and critic. Ghosh was born on February 6, 1932 at Chandpur of what is now Bangladesh. Shankha Ghosh is regarded one of the most prolific writers in Bengali. He got his undergraduate degree in Arts in Bengali language from the Presidency College, Kolkata in 1951 and subsequently his Master's degree from the University of Calcutta. He taught at many educational institutes, including Bangabasi College, City College (all affiliated to the University of Calcutta) and at Jadavpur University, all in Kolkata. He retired from Jadavpur University in 1992. He joined the Iowa Writer's Workshop, USA in 1960's. He has also taught Delhi University, the Indian Institute of Advanced Studies at Shimla, and at the Visva-Bharati University. Awards: Narsingh Das Puraskar (1977, for Muurkha baro, saamaajik nay) Sahitya Akademi Award (1977, for Baabarer praarthanaa) Rabindra-Puraskar (1989, for Dhum legechhe hrit kamale) Saraswati Samman for his anthology Gandharba Kabitaguccha[1] Sahitya Akademi Award for translation (1999, for translation of raktakalyaan) Desikottam by Visva-Bharati (1999) Padma Bhushan by the Government of India (2011)
গত শতাব্দীর ষাটের দশকে আকাশবাণীতে সাহিত্য বিষয়ক একটা অনুষ্ঠান করতেন অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত আর শঙ্খ ঘোষ। দুজনই ভালো অনুষ্ঠান করতেন বলে আত্মশ্লাঘায় ভুগতেন। কিন্তু সে ধারণায় ছেদ পড়লো অলোকরঞ্জনের মায়ের এক কথাতেই। তিনি শঙ্খ ঘোষকে দুঃখ করে বললেন, "অলোক বলে শক্ত শক্ত শব্দ আর তুমি সহজ সহজ। কিন্তু তোমাদের কারো কথাই যে বুঝতে পারে না কেউ।" যেসব শব্দ তার নিজের কাছে স্বাভাবিক তা যে সাধারণ শ্রোতার কাছে দুর্বোধ্য এবং এ কারণে যে তার বক্তব্য কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারে না অনেক সময়, এটা বুঝতে পেরে লেখকের নতুন বোধোদয় হোলো। তিনি বুঝতে পারলেন নিজের অনেক কিছু পরিবর্তন করতে হবে। আবার তিনি এ ব্যাপারেও সচেতন যে, অন্যের না বুঝতে পারায় এক ধরনের প্রচ্ছন্ন গৌরব আছে। নিজের প্রজ্ঞা ও শিক্ষা অন্যের ওপর প্রভাব বিস্তারে সহায়ক। নোয়াম চমস্কির ভাষায়, "and then that becomes the basis for your privilege and your power." আমিত্বের অহং শিল্পীকে করে তুলতে পারে ফ্যাসিবাদী। এও এক ধরনের স্বরচিত ফাঁদ। এ থেকে বের হওয়াও এক ধরনের সংগ্রাম। শিল্পী মানুষের কাছে যেতে চান, নিজের কথা তুলে ধরতে চান, আবার নিজের স্বকীয়তাও রক্ষা করতে চান।
একবার মঞ্চনাটক "রক্তকরবী"র প্রদর্শনী করেছিলেন দৃষ্টিশক্তিহীন একদল মানুষ। নাটক শেষে অন্ধ অভিনেতারা সবাই সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ালেন; তাদের সবার দু'হাত প্রসারিত। অভিনেতাদের একজন দর্শকদের বললেন তাদের হাত স্পর্শ করতে। দর্শকদের ভালো লাগাটা তারা যেন হাতের স্পর্শে টের পান। শঙ্খ ঘোষ ঠিক তেমন লেখা লিখতে চান, তেমন কথা বলতে চান। তাঁর নিজের ভাষায়,
"আমরা যখন সত্যিকারের সংযোগ চাই, আমরা যখন কথা বলি, আমরা ঠিক এমনই কিছু শব্দ খুঁজে নিতে চাই, এমনই কিছু কথা, যা অন্ধের স্পর্শের মতো একেবারে বুকের ভিতরে গিয়ে পৌঁছয়।"
শঙ্খ ঘোষের এই চমৎকার লেখাটি আসলে একটি বক্তৃতার লিখিত রূপ। বক্তৃতার বিষয়বম্তু আমাদের যোগাযোগ কিংবা সংযোগের আলেখ্য। সরাসরি রচনা থেকেই উদ্ধৃতি দিচ্ছি - "কারো সঙ্গে যখন আমরা কথা বলি, আমরা চাই যে সেই কথাটা সে বুঝুক; আমার ভাবনাটা বা দৃষ্টিভঙ্গিটা তার কাছে গিয়ে পৌঁছক। এইরকমই হবার কথা। কিন্তু সবসময়ই কি সেরকম চাই আমরা? বা, প্রশ্নটাকে অন্যভাবেও সাজানো যায়: জ্ঞাতসারে তেমনটা চাইলেও, অজ্ঞাতেও কি সেরকমই চাই সবসময়? সে বুঝুক, জ্ঞাতে-অজ্ঞাতে এটা অবশ্য চাই। কিন্তু কী বুঝুক? আমার কথাটা? ভাবনাটা? না কি অনেক সময়ে এটাই: আমি-যে ভাবতে পারি, সেই ক্ষমতাটা? কিংবা অনেকসময়ে, তারও চেয়ে একটু এগিয়ে, ভাবতে পারি বা না পারি, আমি যে আমি, সেই অবস্থানটা?"
এইসব প্রশ্ন আর সম্ভব্য উত্তর নিয়ে শঙ্খ ঘোষের এই গভীর কাব্যিক বক্তৃতা অথবা অপরের সাথে চিন্তা-ভাবনা-অনুভূতি সংযোগের প্রচেষ্টা দারুণ লেগেছে। ভাবিয়েছে ভাষার সীমাবদ্ধতা আর যোগাযোগহীনতার নৈঃশব্দ্য নিয়ে।
লেখক প্রণবেশ সেন এর স্মরণসভায় শঙখ ঘোষ একটি বক্তৃতা দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে তা "অন্ধের স্পর্শের মত" নামক পুস্তিকা রুপে প্রকাশ পায়। বক্তৃতার বিষয়বস্তু ছিল "সংযোগের ভাষা"। আজকাল তথাকথিত সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার(!)দের লেখা "কমিউনিকেশন হ্যাকস" নামে বাজারে যেসব বই পাওয়া যায় এটি অনেকটা সে গোঁছেরই, কিন্তু তা থেকে অনেকটাই আধুনিক, অনেকটাই গঠনমূলক আর অনেকটাই বস্তুনিষ্ঠ। জ্বি, ঠিকই শুনেছেন "আধুনিক"। এ লেখা আরো ২০ বছর পর পড়লেও 'সমসাময়িক' ই মনে হবে। শঙখ ঘোষের লেখা বরাবরই সুখপাঠ্য। পুরো লেখা জুরে তাঁর "আমি" থেকে "আমরা" হওয়ার যে ব্যাখা রয়েছে তা অসাধারণ লেগেছে। এর মধ্যে রবীন্দ্রনাথের "ঘরে বাইরে" উপন্যাসের চরিত্রগুলোর একটা মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ রয়েছে। এই অংশটুকু পড়ার পর আপনি পরবর্তী যে উপন্যাসই পড়বেন, তার (পঠিত উপন্যাসটির) গ্রহণযোগ্যতা যাচাই এর একটা নতুন দিক খুঁজে পেতে পারেন। অন্তত ৪ তারা এটা ডিজার্ভ করেই।
"অন্ধের স্পর্শের মতো"। শঙ্খ ঘোষের প্রনবেশ সেন স্মারক বক্তৃতা ২০০৭। পড়েছি এমদাদ রহমান এর পাঠ প্রতিক্রিয়ায় উদ্বুদ্ধ হয়ে এবং উনার কাছ থেকেই ইমেইলে পেয়ে। আবার সফট কপির মূল কৃতিত্ব রাহুল বিদ এর। আমি আহমদ শরীফ স্যারের প্রবন্ধের ভক্ত। পড়লাম এক কবির প্রবন্ধ। কবিদের প্রবন্ধে কবিতার আমেজ পাওয়া যায়। পেয়েছিও। পাঠক ও শ্রোতা এক নয় তা বিবেচনা করে লেখার শুরু। সরলতা তরলতা নয়---- কি গভীর পর্যবেক্ষণ! আপাত শক্তি আর নিহিত শক্তি। আমি ও আমরা। আমি লিখছি--- আমরা লিখছি। সাথে আছে তাঁহারা। এসব নিয়ে চমৎকার বিশ্লেষণ। পরে শঙ্খ ঘোষকে রবীন্দ্রনাথে পেয়ে বসেছিল। আজ কাল সকলেই সকল বিষয়েই চেঁচিয়ে কয়। অথবা গলা খাটো না হইলেই হইল ইত্যাদি উদ্ধৃতিসহ রবীন্দ্রনাথের উপন্যাসের চরিত্রের আলোচনা। এ আলোচনায় অবশ্য গৃহনৈতিক নামে একটি নতুন শব্দ শিখেছি। সামান্য প্রাপ্তিতেও ধন্যবাদ না বলাটা অপরাধ বলে লেখক এর মন্তব্যে দ্বিমত। অন্যায়ের পর্যায়ে বললেও বেশি বলা হবে।এটা অসৌজন্যতা। যাহোক, পড়তে ভালো লেগেছে । মনের উর্বরতা শক্তি বৃদ্ধিতে সারের মত কাজ করেছে।