পরিমল ভট্টাচার্য বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই লেখেন। স্মৃতিকথা, ভ্রমণ আখ্যান, ইতিহাস ও অন্যান্য রচনাশৈলী থেকে উপাদান নিয়ে তিনি গড়ে তুলেছেন এক নতুন বিশিষ্ট গদ্যধারা, নিয়মগিরির সংগ্রামী জনজাতি থেকে তারকোভস্কির স্বপ্ন পর্যন্ত যার বিষয়-বিস্তার। ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক। কলকাতায় থাকেন।
প্রতিটি জাতির বোধহয় নিজেদের উৎপত্তি নিয়ে থাকে ভিন্ন ভিন্ন লোকগাথা। যদিও মূল সুর একই। আদম-হাওয়া, মনু-শতরূপা কিংবা আদিবাসীদের নানা গল্পগাছার মূলে সেই মানবজীবনের উৎপত্তিবিন্দুর কথাই আসে ঘুরেফিরে। কোল, মুন্ডা, শবর প্রমুখরাই যে আদিবাসী, আমরা তো তা মনে রাখি না। বরং ভাব ধরি, এরা কোন অদ্ভুত জীব। আর আমরাই সেরা, আমরাই সভ্য৷ উন্নত জীবনযাপনের লক্ষ্যে আবিষ্কৃত হচ্ছে নানা কিছু, বিদ্যুৎ, ধাতু, গ্যাস, খনিজ! কিন্তু সেইসব কাজ করতে গিয়ে পরিবেশ আর সেই এলাকার মানুষের কী অবস্থা সেটুকু ভাবার অবকাশ রয়েছে কতটুকু এক হিসেবে সত্যি রূপকথা সেই প্রশ্নই তোলে। ওড়িশার নিয়মগিরি পাহাড়ের বর্ণময় আদিম উপজাতিদের বাসস্থান আর চিরচেনা প্রকৃতি উচ্ছেদ করে যখন বক্সাইটের খনি খোঁজার কাজ চলতে শুরু করার প্রস্তাব এল, সেই উপজাতি মানুষেরা বাধা দিল, বাঁধল লড়াই। এ লড়াই টিকে থাকার এবং জীববৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখার। এই অদ্ভুত অসম লড়াই এর সুলুকসন্ধানে নেমেছেন লেখক। পথপরিক্রমায় আবিষ্কার করেছেন আরো অনেক অজানা-জানা কথা। ব্যক্ত করেছেন তাঁর সেই ঝিম ধরানো, ঘোর লাগানো শব্দবন্ধে। খুঁজতে গিয়েছেন সেই রূপকথা যার শেষ লেখা হয়নি আজও। নিয়মগিরির পথে পথে তাই ছড়িয়ে থাকে আশ্চর্য সব পরিকথা, সারল্য আর বঞ্চনার গল্প, কুমটি মাঝিদের আত্মত্যাগ আর লড়াইয়ের কথা, বিদেশী কোম্পানি বেদান্তের আগ্রাসনের কথা, হার না মানা এক জনপদের কথা আর অপার্থিব সমস্ত সৌন্দর্যের কথা। শিশুর সারল্যমাখা আদিবাসীদেরও রয়েছে একান্ত নিজস্ব দর্শন৷ সভ্য সমাজে সেগুলো অদ্ভুত লাগলেও এর গূঢ় অর্থ ভাবায় আধুনিকতার শেষ মানুষটিকেও। কেবল দর্শনই নয়, আশ্চর্য সরল জীবনযাপন, যা আমাদের থেকে অনেকটাই আলাদা, সেই জীবনের মধ্যে অল্প কিছুক্ষণ যাপন করেছেন লেখক আর তারই অনুপম এক ছবিও এঁকেছেন। মকাইভাজা আর জাফরান সূর্যালোক মাখা নধর পেঁপে দিয়ে খাওয়া সকালের জলখাবার এর কথা পড়ে ইচ্ছে করে নিয়মগিরির কোন তাঁবুতে বা আদিবাসিদের দরজা ছাড়া ঘরে গিয়ে আমিও সেঁধোই। নিয়মগিরি আর গন্ধমার্দনের কথা বাদেও ফাঁকে ফাঁকে প্রাসঙ্গিকভাবেই চলে এসেছে নানা মিথ এবং পুরাণকথা, জটায়ু আর সম্পাতির কথা, অরণ্য-পাহাড়ের প্রাচীন আর বর্তমান পরিবেশ ও মানুষের কথা। সবটা মিলিয়েই রূপকথা সত্যি হয়ে ওঠে।
সত্যি রূপকথা সভ্যতা, উন্নয়ন ও ওড়িশার এক উপজাতির জীবনসংগ্রাম পরিমল ভট্টাচার্য কিছু বই পড়তে পড়তেই অন্যকে পড়াতে ইচ্ছে করে। অন্তত বইটার কথা জানাতে ইচ্ছে করে। মনে হয়, না-জানানোটা অনুচিত। 'সত্যি রূপকথা' বইটা তেমন। এ রূপকথা অনন্য কোনো রূপকথা নয়। এ রূপকথা আমাদের চেনা। পৃথিবীর প্রান্তে প্রান্তে পাত্র-পাত্রী বদলে, শিকরিদল বদলে এ রূপকথা কথা হয়ে ওঠে। বেহাত হয় অরণ্য, পাহাড়, জীবন, ভাষা, সবুজ। বেহাত হয়ে হারিয়ে যায়। পরিমল ভট্টাচার্য সভ্যতার আলোর মুখোমুখি দাঁড়ানো, শিকারিচোখের সামনে দাঁড়ানো জনপদের কথা বলেছেন। তাঁর কলম অসীম মমতাধর। তাই তাঁর লেখা হয়ে ওঠে হৃদয় ভেদ করে যাওয়া। তিনি যখন বলেন,'সব বিপন্নতার গল্পগুলো কেন যে এভাবে টানে।' তখন সেটা পাঠককেও বিক্ষত করে। যখন বলেন, ‘এইসব মানুষের সঙ্গে বিদায়ের মুহূর্তগুলো ভারি অদ্ভুত। জানি না কোনোদিন দেখা হবে কিনা, এঁরা মরে গেলে সে খবর জানতেও পাব না, কোনো কাগজে মিডিয়ায় লেখা হবে না এঁদের নিয়ে, কোনোদিন ছাপার অক্ষরে দেখতে পাব না এই নামগুলো। হয়তো পরে আবার কখনো গন্ধমার্দনে আসব, কিন্তু লোডমলে ডায়মন্ড আর ধর্ম মালিকের সঙ্গে দেখা করা হয়ে উঠবে কি?’ তখন সে অসহায় বেদনা আমাদের নাড়িয়ে দেয়। বর্ণনা আচ্ছন্ন করে, একইসঙ্গে ক্ষরণ ঘটায়। কেননা যে প্রকৃতিকে আঁকতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘সকালের আলোয় ঝিকমিক করে গায়ে গায়ে সবুজ পাহাড়, হাওয়ার বনে শোঁ শোঁ শব্দ হয়। একটি দুর্গা টুনটুনি টুইইই টুইইই করে ছোট্ট শরীর নিংড়ে ডাকে। প্রতিটি ডাকে মুঠিভর হাড়-মাস-পালক যেন শব্দতরঙ্গ হয়ে গলে যায়। শ-তিনেক ফুট নীচে বইছে বংশধারা। কান পাতলে জলের শব্দ অসংখ্য পাথরে গাছে পাতায় প্রতিধ্বনিত হয়ে সিম্ফনি অর্কেস্ট্রার মতো শোনা যায়। তার ওপরে ভেসে থাকে দুর্গা টুনটুনির ডাক- যেন কনড্রাক্টরের ছড়ির ইশারা। ধ্বনির এই ক্যাথিড্রালের ভেতর হাঁটু মুড়ে বসতে হয়, গভীর শ্বাস টেনে রক্তকণায় ভরে নিতে হয় ঘাসপাতা মাটির গন্ধ। ‘- সেই প্রকৃতিকেই গ্রাস করার জন্য ওৎ পেতে আছে শিকারিথাবা। কেননা, 'অরণ্য আর নগর- শিকার আর শিকারি যেন থমকে গিয়ে পরস্পরের দিকে চেয়ে আছে একটি পলকা মুহূর্তের জন্য, এখনই শুরু হবে দৌড় দৌড় দৌড়, ধুলোর ঘূর্ণি, গুলির শব্দ, আকাশে রক্তের ফুটন্ত ফিনকি…’ এমন ভাবতে পারার অভিজ্ঞতা আমাদের নেই যে, অক্ষত থাকবে অরণ্য-আরণ্যক। তাই আর কিছু না হোক 'সত্যি রূপকথা' যে অসহায় বেদনা আর অক্ষম আক্রোশে এ-ফোঁড় ও-ফোঁড় করে সেটুকু জ্বলন্ত থাকুক। বরং ‘আসুন, আমরা বরং একটি সমাজের কল্পনা করি। একটি সমাজ: যেখানে জ্ঞানের কোনো ব্যক্তিগত মালিকানা নেই, কেনাবেচা করাও যায় না। শিশুকাল থেকে প্রতিটি মানুষ জ্ঞান আহরণ করে- পোকামাকড় গাছগাছড়া কন্দ ছত্রাক মাটির ধরন মেঘের গড়ন বিষয়ে। ঋতু আসে ঋতু যায়, মনের ওপর জ্ঞানের পরত জমে পলির মতো। কৌম উঠোনে শিকারে রাতপাহারায় মাচায় সেই জ্ঞান ক্রমাগত সঞ্চারিত হয়ে চলে যায় গল্প কথা ছড়া গানে। একটি সমাজ: যেখানে জ্ঞান বিশেষায়িত নয়, ধাতু গলানো কিংবা প্রেতলোকের সঙ্গে সংলাপের মতো দুয়েকটি বিষয় ছাড়া সবাই বেঁচে থাকার জন্য যা কিছু সব জানে, পারে। নিজের খাবার জোগাড় করতে জানে, বনের বাঁশ কেটে এনে ঘর ছাইতে, ঝুড়ি বুনতে, পশুর চামড়া দিয়ে মাদল বাঁধতে পারে যে-কেউ। প্রতিটি মানুষের ভেতর ধরা থাকে একটি অখণ্ড জিয়নক্ষম জ্ঞানবিশ্ব। ব্যক্তিমানুষের মৃত্যুতে সেটা তাই হারিয়ে বা ফুরিয়ে যায় না। এমনকি ব্যক্তিমানুষটিও মৃত্যুর পরে স্মৃতির ছায়ার মতো ঘরের খুঁটির ভেতরে থেকে যায়। এভাবেই অতীত বাঁচে। মানুষ বাঁচে কোনো ইতিহাসের কালে নয়, এক দিব্য বর্তমানে। এছাড়া গাছ পাথর জলের ভেতরে থাকে ঐশী শক্তি। প্রকৃতি এখানে সপ্রাণ, নিষ্ক্রিয় পদার্থ নয়। মানুষের প্রতিদ্বন্দ্বীয়ও নয়। প্রকৃতি এখানে গর্ভধারিনীর উপনাম।’