কাজী আনোয়ার হোসেন ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দের ১৯ জুলাই ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পুরো নাম কাজী শামসুদ্দিন আনোয়ার হোসেন। ডাক নাম 'নবাব'। তাঁর পিতা প্রখ্যাত বিজ্ঞানী, গণিতবিদ ও সাহিত্যিক কাজী মোতাহার হোসেন, মাতা সাজেদা খাতুন। কাজী আনোয়ার হোসেন সেবা প্রকাশনীর কর্ণধার হিসাবে ষাটের দশকের মধ্যভাগে মাসুদ রানা নামক গুপ্তচর চরিত্রকে সৃষ্টি করেন। এর কিছু আগে কুয়াশা নামক আরেকটি জনপ্রিয় চরিত্র তার হাতেই জন্ম নিয়েছিলো। কাজী আনোয়ার হোসেন ছদ্মনাম হিসেবে বিদ্যুৎ মিত্র নাম ব্যবহার করে থাকেন।
বইয়ের সবচেয়ে সুন্দর গল্প হচ্ছে 'অন্য কোনখানে'। এবং আমার সবচেয়ে প্রিয় গল্প 'অন্য কোনখানে'।আরাফাত করিমের আঁকায় অনেক সুন্দরভাবে গল্পটাকে প্রেজেন্ট করা হয়েছে।একটা ডিস্টোপিয়ান, হতাশাগ্রস্থ আবহ চিত্রে অনেক সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। গল্পটাই ছিলো একজন হতাশাগ্রস্থ ব্যক্তিকে নিয়ে।
এরপর 'ঝামেলা'। এইটাও ভালো ছিল।এইটার আর্টওয়ার্ক থেকেও গল্পটা বেশি ভালো লাগছে। আরেকটা অনেক ভালো গল্প হচ্ছে 'ওস্তাদ'। 'ক্যান্সার' মোটামুটি ভালো লাগছে।
আর বেস্ট আর্টওয়ার্ক ছিল সম্পদ ভাইয়ার 'পরকীয়া'।এই গল্পে সত্তুরের দশকের ল্যান্ডফোনের কথোপকথন দৃশ্য অনেক সুন্দরভাবে আঁকা হয়েছে।তবে পরকীয়া গল্পটা আমার বেশি ভালো লাগে নাই।
পঞ্চরোমাঞ্চ কমিক্সটা পড়ার পরে আমি সেবা প্রকাশনীর কাজিদার লেখা বইটা পড়া শুরু করি শুধুমাত্র দুটোর তুলনা করার জন্য। কাজীদার অনুবাদ, ঘটনার চিত্রপট এবং কাহিনী বর্ণনার ক্ষমতা রীতিমত অসাধারণ! তাই তার করা কাজ নিয়ে একটা গ্রাফিক নভেল কিসিমের বই বের করে ফেলা অসম্ভব রকম সাহসের ব্যাপার। কারন গল্পে অনেক কিছু বলে ফেলা যায়, অনেক সুক্ষ সব বর্ননাও দেয়া যায়, কিন্তু গ্রাফিক নভেল বা কমিক্সে এত কিছু ভাষায় বলবার সুযোগ নেই। বরং ছবির মধ্য দিয়ে আবহটা তৈরি করতে হয়। এবং পাঠকের কল্পনা জগতের পুরো সুবিধাটা লেখক পান যেটা আঁকিয়ে পাননা বরং তাকে পাঠকের জন্য তৈরি করে দিতে হয়। সেদিক থেকে বলতে গেলে এই কমিক্স সংকলন বেশ একটা সাহসী পদক্ষেপ এবং বলা যায় পুরোপুরি সফল। প্রায় প্রতিটা গল্পই কমিক্সের মধ্য দিয়ে বেশ সুন্দরভাবে চিত্রায়িত হয়েছে। এবং প্রত্যেকের আঁকার মান,ক্যামেরা এ্যাঙ্গেল, লেখার ফন্ট, ফ্রেম ঠিক করা সবকিছুই মোটামুটি বেশ ভালো। এবার গল্প ধরে ধরে আগানো যাক!
প্রথম গল্প 'অন্য কোনখানে'। পুরো বইয়ে সবচেয়ে ভালো কাহিনী এটা। এবং সৌভাগ্যবশত সবচে সুন্দর এবং অন্যরকম আঁকাও এটা। কোন রঙ ছাড়াই স্কেচি লাইন, হ্যাচ লাইন দিয়ে পুরোটা জুরে একটা রাফ চেহারা রাখা হয়েছে এবং চরিত্রগুলার চিত্রায়ণও বলা যায় নিখুত। শুধু গল্পটা পরে চিন্তা করতে গেলেও মাথায় প্রায় কাছাকাছি ধরনের চেহারা চরিত্র মাথায় ঘোরে।
দ্বিতীয় তৃতীয় গল্প নিয়ে আলাদা করে বলার কিছু নেই। ওগুলো ভালো তবে তেমন কোন আলাদা বৈশিষ্ট ধারণ করে না। না গল্পে, না আঁকায়।
চতুর্থ গল্পের নাম 'ওস্তাদ'। গল্পটা সাদামাটা। কৌতুকি ঘরানার গোয়েন্দা গল্প। মজার। তেমনি গল্পের চিত্রায়নটাও মজার হয়েছে। খুব হিবিজিবি কিসিমের ভাঙা ভাঙা লাইন দিয়ে কোন আলো ছায়ার কাজ ছাড়া, রঙ ছাড়া মজা করে চরিত্রগুলাকে চিত্রায়ন করা হয়েছে। দেখতে বেশ ভালোই লাগে!
পঞ্চম ও শেষ গল্প 'পরকীয়া'। গল্প ভালো। আঁকা নিয়ে যেটা বলবার সেটা হচ্ছে এই আঁকিয়ের দুর্জয় সিরিজের কয়েকটা বইও আমি পড়েছি। ইনার আকার ধরনের সাথে কেমন জানি একটা হিন্দি সিরিয়াল গোছের স্টাইলের মিল পাওয়া যায়! ভারতীয় কিছু কমিক্সের স্টাইলের সাথে বেশখানিকটা মিলে যায়! তবে এই গল্পের জন্য এই আঁকিয়েই হয়তো সবচে ভালো অপশন।
এত কিছু লেখার পরেও সব মিলায়ে চার তারা দেয়ার বড় কারন হচ্ছে আমাদের কমিক আঁকিয়েরা এখনো নাড়ির টানটা ধরতে পারেন নাই। মানে তাদের আঁকায় দেশীয় স্টাইলটা ধরতে পারা যায় না এখনো। চরিত্র রূপায়ণ থেকে ক্যামেরা এ্যাঙ্গেল সব কিছুতেই আমেরিকান কমিক্সের (DC/Marvel) ভালো রকমের প্রভাব ধরতে পারা যায়। হয়তো এর পিছনে নানা কারন আছে। কিন্তু ক্যারেক্টার ডিজাইনে বা কার্টুন, ক্যারিকেচার বা কমিক আঁকায় আমাদের মোটামুটি একটা ভালো রকমের ভিত্তি আছে। যদিও সেটা হারায়ে গিয়েছিল বা যাচ্ছিল। তবে আশা রাখা যায় যে নতুন প্রজন্মের আঁকিয়েরা ঠিকই নিজেদের জায়গাটা বের করে নিবে। এত কিছুর পরে আবার চার তারার কমও দিতে ইচ্ছে হয় না কারন সব মিলিয়ে আসলেও একটা অসাধারণ কাজ হয়েছে এই কমিক্সটা!
প্রথম কয়েকদিন শুধুই নেড়েছি-চেড়েছি, ভুলেও ভেতরে চোখ দেইনি। কভার, ব্যাক কভার, ফ্ল্যাপ, ভূমিকা, উপসংহার মায় শেষ পৃষ্ঠার বিজ্ঞাপন পর্যন্ত সবই খুঁটিয়ে পড়েছি, কিন্তু মূল বইতে হাত দিইনি-দিলেই তো পড়া শেষ!
আফসোস! আজ হাত দিলাম, আজই শেষ!
রূপান্তরটা মূল বইয়ের তুলনায় কেমন, তাতে মূল রস কতটুকু ধরা-গেলো, ছাড়া-হলো, সে বিতর্কে (পড়ুন প্রশংসায়) যাবো না। শুধু বলবো, বইটার প্রতিটি পাতায় আমি যত্ন করে হাত বুলিয়েছি, নিজে তাদের সাথে না থেকেও অনুভব করেছি কমিকস টিমের অপরিসীম নিষ্ঠা আর মমতাকে।
বাংলাদেশে কমিকসের বাজার কাটতির দিক থেকে উল্লেখযোগ্য তেমন কিছু নয়। এটাকে গতি দেবার জন্য কাজীদার বইয়ের গ্রাফিক নভেলের চেয়ে ভালো শুরু আর হয় না। এই শুরুটা যেন 'একমাত্র' না হয়, মাসে মাসে হাতে আসুক দুর্দান্ত সব গ্রাফিক নভেল। বাঙালী আবহে তৈরি হোক কিছু সুপারহিরো। ধুন্ধুমার অ্যাকশন থাকুক, কিন্তু মনকে ভাবিয়ে তোলার মতো, চিন্তার খোরাক যোগানোর মতো 'সচিত্র উপন্যাস'ও (ইয়ে, গ্রাফিক নভেল) নিয়মিত প্রকাশিত হোক। আমাদের অনেক স্বল্পস্থায়ী ভালো উদ্যোগগুলোর মতো এটাও 'এলাম-দেখালাম-হারিয়ে গেলাম' ফরম্যাটে না পড়ুক।
চিত্রায়নে বাঙালীয়ানার অভাবটা চোখে পড়েছে। তবে আমাদের আঁকিয়েরা যে পরিমাণে ডেডিকেটেড, এটা কাটিয়ে ওঠা সময়ের ব্যাপার মাত্র।
কমিকসগুলো আরো বেশি বাঙ্গালী হোক, বাঙালীরা আরো বেশি কমিকসপ্রিয় হোক
কাজী আনোয়ার হোসেন এর সাথে পরিচয় সম্ভবত রহস্যপত্রিকা দিয়ে, কারণ মাসুদ রানা প্রথম হাতে নেই ক্লাস ফাইভে মনে হয়, আর রহস্যপত্রিকা ক্লাস থ্রিতে।
এক পরিচিত আপুর বাসায় গুদামের মত করে রাখা ছিল গাদা গাদা রহস্য পত্রিকা, আমি গিয়ে সারাদিন সেখানে পরে থাকতাম সময় পেলেই। এক সময় সে দেখল যে এই ছেলে তো তার বাসায় খুঁটি গেড়ে বসছে, আর বেশিদিন হলে নড়ানো যাবে না, তখন থেকে সে পত্রিকা বাসায় নিয়ে যেতে দেয়া শুরু করল।
পঞ্চ রোমাঞ্চ আসলে বিদেশী গল্পের ছায়া অবলম্বনে রহস্যপত্রিকার জন্য লেখা পাঁচটি রোমাঞ্চ-গল্প, এগুলো বিভিন্ন সময় রহস্যপত্রিকায় বের হয়েছে। আমার যেহেতু রোজ দুটা করে রহস্য পত্রিকা খাবার অভ্যাস হয়ে গেল একটা সময়, তাই এই সবগুলো গল্পই পড়ে নিতে বেশি সময় লাগেনি।
ক্লাস থ্রি এর মানুষ, সব হয়ত বুঝি নি, তবে পড়ে মজাটুকু পেতে মনে হয় বয়স জিনিসটা অত বড় ফ্যাক্ট না। এরপরে ক্লাস এইটে আবার গল্পগুলোর দেখা পাই, এক মলাটে। পঞ্চ-রোমাঞ্চ নামে। আমি তখন ক্লাস ফাকি দিয়ে রোজ রোজ এক বই এর দোকানে অনারারী দোকানদার হিসেবে কাজ করছি, দোকানে ��সে মাছি তাড়ানো আর দোকানের সব বই পড়ে ফেলাই ছিল আমার কাজ।
সেই একই পঞ্চ রোমাঞ্চ আবার ফিরে এলো আমার জীবনে, এই বই মেলায়। রুমী ভাই বেশ অনেক দিন থেকেই বলছিলেন যে গ্রাফিক নভেল নিয়ে বাংলাদেশে ইতিহাস ঘটিয়ে দেয়ার মত কিছু একটা করবেন, অপেক্ষায় থাকতে থাকতে বুড়োই হয়ে যাব কি না ভাবতে ভাবতেই দেখি ফেসবুকে বিজ্ঞাপন চলে এসেছে ঢাকা কমিক্স এর তরফ থেকে।
কিভাবে কিভাবে যেন একটা বই বিশেষ আকর্ষণসহ আমার হাতেও চলে এলো, আর আমিও আবার ফিরে গেলাম আমার সেই রহস্যপত্রিকা আর অনারারী দোকানদারীর দিনগুলোতে!
হাতে পাবার পরে এক বসায় বইটি শেষ করিনি। উহু! এক দিনে একটা করে গল্প, ধীরে ধীরে রয়ে সয়ে পড়েছি। সব শেষ করে আজ তাই সেটা নিয়ে লিখতে বসলাম, শুনলাম ঢাকা কমিক্স নাকি রিভিউ লিখলে পরের কমিক্সগুলো দেবে বিশাল কপাল-ওয়ালা মানুষদের! নিজের কপালের আকার ছোট, তাও ভাবলাম একটা চেষ্টা নেয়া যাক।
একটা গ্রাফিক নভেল এর প্রথম এবং প্রধান সক্ষমতা হল এটা এক টানে গল্পের ভেতরে নিয়ে যেতে পারে, যদি সেটা সঠিকভাবে আকা হয়। এই কাজটি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে করেছেন বইটির সাথে জড়িত শিল্পীগন এ কথা আমি বুক ঠুকে বলতে পারি। একটা গল্পকে কমিকে রূপান্তর আর সেটাকে মুভিতে রূপান্তরের বেসিক প্রসেসটা মোটামুটি একই। আর তাই সেটার ক্ষেত্রে ব্যর্থতার সম্ভাবনাটুকুও ঠিক একই রকম।
বিখ্যাত অনেক উপন্যাস/গল্প যেমন এই ব্যর্থতার কারণে অখাদ্যে পরিণত হয়েছে, সেই ভয় নিয়েই বইটা প্রথম খুলি আমি। কিন্তু না, তারা এখানেও খুব ভালভাবে সফল। রূপান্তরের প্রয়োজনে বিভিন্ন সময় গল্প থেকে খানিক সরে আসতে হয়েছে, সেই বিষয়টাও ঠিকঠাক ভাবে হয়েছে, অন্তত স্মৃতি তাই বলে। পড়তে গিয়ে কোথাও খাপছাড়া লাগেনি।
তবে আরও যে জিনিসটা নজরে এসেছে, অন্তত তিন চার জায়গায় বানান ভুল হয়েছে, এক দু জায়গায় শব্দই গায়েব হয়ে গেছে। একটা গ্রাফিক নভেল এর পেছনে অনেক মানুষের শত শত ঘণ্টা পরিশ্রম থাকে, সেটাকে আর কিছু ঘণ্টা সময় দিয়ে বানান এবং অন্যান্য বিষয় গুলো নিখুঁত করার চেষ্টা নেয়া যেতেই পারত। আশা করা যায় পরের মুদ্রণ গুলোতে এই সমস্যা থাকবে না।
কাজী আনোয়ার হোসেন নিজেও এক সময় এটা নিয়ে গ্রাফিক নভেল করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেই সত্তরের দশকে হাতে আঁকার যে জটিলতা ছিল, সেটা যে পরিমাণে সময়-সাধ্য ছিল, সেটা চিন্তা করে তিনি শেষে পিছিয়ে আসেন। সাম্প্রতিক সময়ে ডিজিটাল গ্রাফিক ডিজাইন এবং ডিজিটাল আঁকিয়ে যন্ত্রের উদ্ভব অনেক কিছুই অনেক সহজ করে দিয়েছে। তাই হয়ত তিনি এবারে রাজি হলেন তার এই গল্পগুলোকে মেহেদী হক এর তত্বাবধায়নে, রুমী ভাই এর নেতৃত্বে কমিক রূপ দিতে।
বাংলাদেশে এক সময় প্রচুর কমিক চলত, কিন্তু দুঃখের বিষয় ছিল সেটা ছিল ভারতীয় কমিক, বাংলাদেশের নিজস্ব কমিক ট্রেন্ড কেবল আহসান হাবীব এবং আরও দু একজনের হাত ধরে কোনমতে লাইফ সাপোর্ট এ টিকে ছিল।
সেখান থেকে সবকিছু যে কতখানি উন্নত হয়েছে, তা আসলেই আশার বাইরে ছিল। চিন্তাও করিনি কোনদিন, একটা প্রকাশনী বাংলাদেশে কেবল কমিক্স নিয়েই কাজ করবে, কমিক্স এবং গ্রাফিক নভেল প্রকাশ করে টিকে যাবে। সেটাই হয়েছে, আমরা আশা করতেই পারি শুধু ঢাকা কমিক্স নয়, আরও কয়েকটি কমিক্স ও গ্রাফিক নভেল প্রকাশনী তৈরি হবে, সেখানে মার্ভেল আর ডিসি কমিক্স এর মত ফাইট হবে, আর সেই প্রকাশনা প্রতিযোগিতা থেকে আমরা পেতে থাকব একের পর এক অসাধারণ সব কমিক্স।
সব দেশের সুপারহিরোরা কিন্তু এসেছে কমিক্স থেকেই। বাংলাদেশের সুপার হিরো ছিল না এই দুখে আমার মত যাদের সময় কাটছিল, তারা হয়ত এখন আমার মতই আশাবাদী হতে পারবেন...
জমি প্রস্তুত। ফসল বোনা হয়ে গেছে। বাংলাদেশের সুপার হিরোরা আসলো বলে!
কাজী আনোয়ার হোসেনের " পঞ্চ রোমাঞ্চ " বইটি বের হয়েছিলো সেই ১৯৭৫ সালে। অসাধারণ কয়েকটি গল্পে ঠাসা ছিলো বইটি। সেই যুগে সেবা থেকে দুর্দান্ত কিছু ছোট গল্প সংকলন বের হয়েছিলো। "ছয় রোমাঞ্চ" , "তিন রোমাঞ্চ", "কালো বিড়াল", "জামশেদ মুস্তফির হাড়" ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। সেই অসাধারণ গল্প সংকলন এর মধ্যে থেকে "পঞ্চ রোমাঞ্চ"কে বেছে নেওয়া হল কমিক্স করার জন্য। ফলশ্রুতিতে গত বই মেলায় বের হল "পঞ্চ রোমাঞ্চ" এর কমিক্স ভার্সন। দুদার্ন্ত প্রচ্ছদই যথেষ্ট বইটি পড়ার জন্য । যদিও "পঞ্চ রোমাঞ্চ" বইটি পড়া ছিলো কিন্তু কমিক্স ভার্সন দেখে কেনার লভ সামলাতে পারলাম না । বইটি পড়ার পর শুধু একটা কথাই বলতে চাই "মার্ভেলাস" । এত সুন্দর আঁকা আর চোখ জুড়ানো কমিক্স দেখে মনটাই শান্তি হয়ে যায়। তবে আফসোস কমিক্সটা রঙ্গিন হলে আরো সুন্দর দেখাতো। যারা কমিক্স লাভার তারা তো পড়বেনই যারা বই লাভার্স তারাও বইটি পছন্দ করবে। আর হার্ড কভার এদিশনটা খুবই মজবুত :D । হাতে নিলেও শান্তি লাগে :) মোট পাঁচটি গল্প হয়েছে বইটিতে বইয়ের সবচেয়ে সুন্দর আঁকা ছিল তৌহিদুল ইসলাম সম্পদের পরকীয়া । এমনিতে গল্পটা অন্যান্য গল্পের তুলনায় একটু দুর্বল হলেও দুর্দান্ত আঁকায় এই গল্পটিই হয়ে উঠেছে বইয়ের সেরা গল্প। মাত্র দুজন মানুৎষের ফোন কথোপকথনের মাধ্যমে পুরো গল্পটি এগিয়েছে । তাই একই দৃশের চিত্রায়ন করা হয়েছে বিভিন্ন এঙ্গেলে। খুবই কঠিন কাজটা খুব সুন্দর করে এঁকেছেন আঁকিয়ে । দ্বিতীয় সেরা আঁকা ছিলো ক্যান্সার গল্পটি। সংকলনের সেরা গল্প ছিলো এটি। আঁকাও হয়েছে দুর্দান্ত । অন্য কোনখানে আর ঝামেলা গল্প দুইটির আঁকাও দেখতে দারুণ ছিলো ।কিন্তু সবেচেয়ে বাজে আঁকা ছিলো "ওস্তাদ" । তবে আঁকিয়ে এক কঠিন সময়ে কাজটি করেছেন বলে হয়তো কাজটাআ এতটা বাজে হয়েছে ।আশা করি সামনে উনার বেস্ট কাজ আমরা দেখতে পারবো । সবশেষে বলতে চাই সেবার যে আরো গল্প সংকলন আছে সেগুলো ও যদি এই রকম কমিক্স রূপান্তর হত তাহলে কিন্তু দারুণ হত । আর যদি সম্ভব হয় সাদা কালোর পরিবর্তে রঙ্গিন হলে দারুণ হয়।
সবকটা গল্পই ভালো। শেষে ছোট ছোট টুইস্ট। গল্পগুলোও বৈচিত্রময়। একটা অপরটা থেকে ভিন্ন। তবে বেশি ভালো লেগেছে ওস্তাদ, ক্যান্সার ও পরকীয়া। আঁকাও দারুণ। গল্পকে কমিক্সে রূপান্তর করা মূলত কঠিন। সেটা বেশ সফলভাবেই করেছে।
আমার একটা বদ অভ্যাস আছে, বই কেনার পর বা কেউ গিফট দিলে সেই বইটা/বইগুলো এমনি হাতে ধরে না রেখে দুই হাতে জাপটে ধরে বসে থাকি৷
বইটা গিফট পেয়েছিলাম। পড়ব কি! প্রচ্ছদ আর ভিতরের মাখোমাখো পেজগুলো দেখে আমার আর কোল থেকে নামাতেই ইচ্ছা করছিল না -_- কতোগুলো দিন এভাবেই গেছে। পড়তে ইচ্ছা করলে নেড়েচেড়ে রেখে দিয়েছি এরপর যখন পড়া শুরু করি, একটু একটু করে... শেষ হয়ে যাবে যে!
একেকটা গল্প একেক রকমের সুন্দর৷ আঁকার কথা না-ই বা বললাম। অসম্ভব রকমের ভালো লেগেছে। অন্য কোনখানে পড়ে বেশ খানিকক্ষণ হতবাক হয়ে ছিলাম যে এই স্টাইলেও সাই-ফাই লিখে ফেলা যায়! এতো সহজ-সুন্দর কন্সেপ্ট! আর বইয়ের লাস্ট গল্পটা পরকীয়া পড়ে আবারও থ! বাপরে বাপ! গল্পটা চলে টাইপ কিন্তু আঁকা! গল্পটার অধিকাংশ অংশ ফোনালাপ নিয়ে৷ এরকম একঘেয়ে টপিকটা এতো সুন্দরভাবে এতো আ্যঙ্গেলে এভাবেও আঁকা যায়? হ্যাটস অফ! বাকিগল্পগুলোও বেশ ভালো লেগেছে। বইটা অল্প অল্প করে পড়লেও খুব বেশিদিন সময় লাগেনি শেষ করে ফেলতে.. তারপরেও প্রায়ই পড়ি। কোন কিছু ভালো না লাগলে ছবিগুলো দেখি বসে বসে। জাপটে ধরে কিছুক্ষণ বসে থাকি বইটা।
কাজী আনোয়ার হোসেন। নিছক কোন নাম নয় এটি। এই নামের পিছনের ব্যক্তি যেন নিজেই একটি প্রতিষ্ঠান। স্বাধিনতার আগে এবং পরে লোভনীয় ক্যারিয়ার গঠনের দিকে না গিয়ে প্রকাশনা শিল্পের দিকে পা বাড়িয়েছিলেন তিনি। বিদেশী ধ্রুপদী সাহিত্যের অনুবাদ, হরর, ফ্যান্টাসি, থ্রিলার, রোমান্টিক, সায়েন্স ফিকশনের মত জঁরাকে ঘরে ঘরে পাঠিয়ে দেয়ার পিছনে মূল অনুঘটকের কাজ করেছেন আমাদের কাজীদা। তাঁর প্রকাশনার সাথে কাজ করেছেন অনেকে যারা পরবর্তীতে বিখ্যাত এবং খ্যাতিমানে পরিণত হন। প্রকাশনা ব্যবসায়ে তৎকালীন সফলতার কারণে আমার মতে তাকে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম উদ্দ্যোক্তা বলা যায়।
পঞ্চরোমাঞ্চ। সত্তুরের দশকে সাড়া ফেলে দেয়া কাজী আনোয়ার হোসেনের লিখা পাঁচটি গল্প। অবশ্য এই সকল গল্প বিদেশি আখ্যানের ছায়ায় লেখা হয়েছিল। ১৯৭৫ সনে ঐ বইয়ে সেবা প্রকাশনীর 'ঋণ স্বীকার' থেকে তা জানা যায়।
পঞ্চরোমাঞ্চ অবলম্বনে কমিক্স সংকলন করার চিন্তা কাজী আনোয়ার হোসেনের ছিল। তিনি শিল্পী হাশেম খানের সাথে এই বিষয়ে আলাপও করেছিলেন। তবে সম্পাদক সাহেবের যে নিজেরও শিল্পী হওয়া দরকার এরকম সংকলনকে কমিক বুকের রূপ দিতে তা বুঝতে পেরে কাজীদা আর এগিয়ে যান নি। সেবার একসময়ের কোলাজ প্রচ্ছদ করা হাসান খুরশীদ রুমী সমন্বয়কের এবং ঢাকা কমিক্সের সম্পাদক ও প্রকাশক মেহেদী হকের প্রাথমিক উদ্যোগে কাজীদার অনুমতি এবং সন্তুষ্টি সাপেক্ষে এই কমিক্স সংকলনের কাজ শুরু হয়ে যায়।
পঞ্চরোমাঞ্চ। পাঁচটি গল্প। পাঁচজন ভিন্ন কমিক্স শিল্পী। যে দুর্দান্ত কাজ এই শিল্পীরা করেছেন, সেই সময়ে এই কাজ করার জন্য তাদের মার্ভেল কমিক্সের অনুকরণে "দ্য ফ্যান্টাস্টিক ফাইভ" বলা যায়। এই সংকলনে এক্সেলেন্স দেখাতে না পারলে সব আর্টিস্টদের জন্য বিব্রতকর এবং ক্যারিয়ারের জন্য ক্ষতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হত। অত্যন্ত আনন্দের বিষয় হল আঁকিয়েরা হতাশ তো করেন নি বরঞ্চ সূচনা করেছেন আধুনিক বাংলা কমিক্সের এক উজ্জল ইতিহাস।
১) অন্য কোনখানে - শিল্পী : আরাফাত করিম
পুনরাবৃত্তিতে ভর্তি, উৎকন্ঠা, ভয়, অবসাদ এবং বিষন্নতায় ভুগা এক যুবক সবকিছু ছেড়েছুড়ে কোথাও চলে যেতে চায়। চায়ের দোকানে এক আধমাতালের কাছে শুনা গল্পের উপর ভিত্তি করে মুক্তির উদ্দেশ্যে সে হাজির হয় 'ড্রিম ট্র্যাভেল এজেন্সি' এর দরজায়। অনেক কৌশল এবং লুকোছাপা করে এগুতে হবে তাকে। তবে সে যেতে পারবে 'অন্য কোনখানে', এক ইউটোপিয়ান বিশ্বে। গল্পের সাথে সমান্তরালে এত যথাযথ অঙ্কন আসলে কমই দেখা যায়। পুরো স্টোরিতে আছে বিষন্নতার সাথে সাথে এক চাপা উত্তেজনার মিথস্ক্রিয়া।
২) ঝামেলা - শিল্পী : আসিফুর রহমান
বাংলাদেশে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হওয়াল প্রাক্কালে এক পরিবার দেশ ছেড়ে আরেক দেশে আশ্রয় নেয়। স্বৈরাচার শাসিত সেই দেশের একনায়কের কাছে সন্দেহের পাত্র হয়ে কারাগারে চলে যান প্রায় সবাই। তবে রাতারাতি ইউরেনিয়ামের খাম্বা কিভাবে তৈরি হল? ঐ পরিবারের কি এমন কোন বিশেষত্ব আছে যা চোখে পড়ার মত। আঁকাআঁকির মাধ্যমে কোন গল্পের অনেক চরিত্র এবং তাদের মধ্যকার কোন রহস্য লুকোনো সহজ বিষয় নয়। পরিশ্রমী শিল্পী তা-ই করেছেন চমৎকার অঙ্কনের মাধ্যমে।
৩) ক্যান্সার - শিল্পী : মেহেদী হক
ক্যান্সার আক্রান্ত ইমরানের হাতে আছে আর মাত্র সাতদিন। নিজের প্রায় ওষ্ঠাগত জীবনের ঝুঁকি নিয়ে একজনের প্রাণ রক্ষা করেন ইমরান। এরপর তাঁর জীবন পাল্টাতে থাকে। এমনভাবে এইসব পরিবর্তন আসে যা তাঁর যুক্তি এবং কল্পনাকেও হার মানিয়ে দেয়। এই আখ্যানেও রহস্য আছে। আছে কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় গুপ্ত করার ব্যাপার। গতিময় এই গল্পে সুন্দর অঙ্কনের মাধ্যমে শিল্পী সেই দারুন কাজটি-ই করেছেন।
৪) ওস্তাদ - শিল্পী : সাদী ইমদাদ
সবাইকে ঘোল খাইয়ে দেয়া ধুরন্ধর অপরাধী রুস্তম শেখের সাথে বাংলাদেশের সেরা গোয়েন্দা আব্বাস বা বাঘা মির্জার দ্বৈরথের গল্প অঙ্কন করেছেন সাদী ইমদাদ। গতানুগতিক স্টাইলের বাইরে অন্যরকমের শিল্পী সাদীর বিগ ফ্যান আমি। কারণ কমিক্সে মানুষের ইম্পারফ্যাকশান গুলো সাদী কেমন অদ্ভুতভাবে ফুটিয়ে তুলেন। রুস্তম শেখকে কি ধরতে পারবে আব্বাস মির্জা? গল্পে দারুন এক চমক আছে অবশ্য। দেখা যাক কে হয় কার ওস্তাদ।
৫) পরকীয়া - শিল্পী : তৌহিদুল ইকবাল সম্পদ
'দুর্জয়' এবং 'মারুফ' এর মত কাজের কারণে বাংলাদেশের কমিক্স প্রেমিদের জন্য এক হাইজহোল্ড নেইম তৌহিদুল ইসলাম সম্পদ। মুভিস্টার সাজ্জাদ এবং গৃহবধু নায়লার পরকীয়ার গল্পটির আর্টওয়ার্ক বেশ কঠিন ছিল যা পাঠক কমিক্সটি দেখলে বুঝতে পারবেন। নায়লার মাতাল স্বামী অজ্ঞান। সাজ্জাদ চট্টগ্রামে বসে প্ল্যান সাজায় মামুনকে হত্যা করার, চট্টগ্রামে বসেই। তাঁর দরকার নায়লার সাহায্য। দারুন প্রফেশলানিজমের সাথে আঁকিয়ের কাজ করেছেন সম্পদ।
এই বই বাংলা কমিক্সের জগতে একটি ঐতিহাসিক কাজ হয়েছে। কে, কার চেয়ে ভালো অঙ্কন করেছেন বলা খুবই কঠিন। প্রত্যেকের শিল্পীর কাজই ব্রিলিয়ান্ট হয়েছে। তবে পক্ষপাত তো খানিকটা কাজ করে। 'অন্য কোনখানে' এর কমিক্স রূপান্তর করেছেন আরাফাত করিম। আমার কাছে তাঁর আর্টওয়ার্ক সবচেয়ে ভালো লেগেছে। আরেকটি বিষয় খুব ভালো লেগেছে সেটি হল সুন্দর হাতের লিখার মত ফন্ট। প্রত্যেক গল্পের শুরুতে এক বা দুই লাইনে সেই গল্পের কোন বার্তা বা অংশ চিত্রন দারুন হয়েছে। ঢাকা কমিক্সের প্রতি অনুরোধ রইল আরো কৃতি ব্যক্তিদের কাজ নিয়ে সম্ভব হলে কমিক্স সংকলন করার।
কাজী আনোয়ার হোসেন আমাদের জীবনে অনেক বড় ভূমিকা রেখেছেন, রেখে আসছেন এবং মনে হয় আসবেন। আজ যে অনেক খ্যাতিমান এবং বিখ্যাত সমসাময়িকদের লেখালেখি এবং আর্ট, থ্রিলার এবং কমিক্সের যে অগ্রযাত্রা এমনকি এই যে আমার নিজের প্রোফাইল বা যেকোন গ্রুপে বুক রিভিউ লিখা তার পিছনে কাজীদার অবদান অস্বীকার করা যায় না। ঢাকা কমিক্স তাঁর গ্রন্থের সার্থক কমিক্স রূপান্তর করেছে।
কাজীদার কারণে অনেক রোমাঞ্চ ঘরে ঘরে প্রবেশ করেছে। এই কমিক্স রূপান্তরের মাধ্যমে গল্প এবং অঙ্কনের কমিক বুক ফরম্যাটে সমান্তরালে হাজির হয়েছে পঞ্চরোমাঞ্চ।
বুক রিভিউ
পঞ্চরোমাঞ্চ
লেখক : কাজী আনোয়ার হোসেন
সম্পাদক ও প্রকাশক : মেহেদী হক
সার্বিক তত্ত্বাবধান : হাসান খুরশীদ রুমী
কমিক্স রূপান্তর :
আরাফাত করিম আসিফুর রহমান তৌহিদুল ইসলাম সম্পদ মেহেদী হক শেখ সাদী
২০১৭ বইমেলার সবচেয়ে আলোচিত বইগুলোর একটি। ১৯৭৫ সালে কাজী আনোয়ার হোসেন একই শিরোনামে বই বের করেছিলেন। তারই কমিক্স (গ্রাফিক নভেল) রূপ এটি।
অন্য কোনখানে, ঝামেলা, ক্যান্সার, ওস্তাদ, পরকীয়া গল্প ৫টিকে কমিক্সের রূপ দিয়েছেন যথাক্রমে আরাফাত করিম, আসিফুর রহমান, মেহেদী হক, সাদী ইমদাদ এবং তৌহিদুল ইকবাল সম্পদ।
গল্প হিসেবে “অন্য কোনখানে” আর কমিক্স হিসেবে “পরকীয়া” আমার পছন্দের শীর্ষে।
সাই-ফাই ব্যাপারগুলো আমাদের জল হাওয়া থেকে উদ্ভূত না হলেও যে খুব করে আমাদের মত করে হতে পারে, সেটা দেখিয়েছেন হুমায়ূন আহমেদ, তারপর মুহাম্মদ জাফর ইকবাল। কাজী আনোয়ার হোসেনের নামও এই লিস্টে রাখতে পারছি বলে, আনন্দ হচ্ছে ভীষণ। “অন্য কোনখানে” ভীষণ বাঙালি সাই-ফাই।
“ক্যান্সার” গল্পটি খুব গভীরে আসলে পার্সপেক্টিভের গল্প। জেসি’র পার্সপেক্টিভ। জেসির মানবিকতা আপনার মনে কোমল কোণ তৈরি করে যাবে সারাক্ষণ কিন্তু শেষে এসে পার্সপেক্টিভ বদলে গেলে পরে আগের সেই অনুভূতি কি ধরে রাখতে পারে পাঠক, জেসির জন্যে? পারবে না ই বা কেন? অন্যায় তো কিছু করছেনা জেসি, কেবল তার পার্সপেক্টিভ মিলছেনা বলে তার ব্যাপারে আপনার ধারণা পাল্টে যেতে পারে? দৃষ্টিভঙ্গি না মেলার যৌক্তিক কারণও তো আছে তার।... দোষ হয়তো অভ্যস্ততার। পাঠকের দেখার অভ্যাসের। সেজন্যে ক্যান্সার গল্পটা পার্সপেক্টিভের। জেসির পার্সপেক্টিভের, আপনারও।
“ওস্তাদ” গল্পটা সংকলনে সবচেয়ে মজার। তবে কি, এর আর্ট ফর্মটা নিতে পারিনি। ভাল্লাগেনি কেমন যেন। একদম সিনেম্যাটিক শট ডিভিশান ছিল “পরকীয়া” তে। গল্প হিসেবে, সংকলনের আর সব গল্পের চেয়ে খানিকটা পিছিয়ে পড়লেও, “পরকীয়া”র আঁকা হয়েছে সবচাইতে ভাল। সিনেমা দেখছিলাম যেন। আলো-ছায়ার প্রয়োগ ভীষণ নান্দনিক এখানে।
সংগ্রহে রাখার মত সংকলন “পঞ্চ রোমাঞ্চ”। ঢাকা কমিক্সের এমন উদ্যোগ কে সাধুবাদ জানাই। সাথে এও চাই, ঠিক এ বইটার একটা রঙীন ভার্সন বেরোক। দাম বেড়ে যাবে, তবে ঠিক জানি রঙীন হলে বইটার এসথেটিক্স ভ্যালু দামও ছাপিয়ে যাবে।
প্রাপ্তবয়স্ক পাঠকের জন্য গ্রাফিক নভেল নির্মাণ, সেও আবার কাজী আনোয়ার হোসেন-এর ভাবানুবাদে প্রায় প্রবাদপ্রতিম হয়ে ওঠা পাঁচটি কাহিনির ভিত্তিতে, যে কী দুরূহ কাজ, তা কিছুটা হলেও আন্দাজ করতে পারি। মূলত সেই জন্যই, সম্ভাব্য আশাভঙ্গ আর শুরু-করলেই-শেষ হওয়ার আশঙ্কার মধ্যে ভারসাম্য রাখতে গিয়ে আমি বইটা নাগালের মধ্যে নিয়েও পড়তে পারছিলাম না। শেষ অবধি বইটার আকর্ষণ উপেক্ষা করা অসম্ভব হয়ে উঠল। আমিও রোববারের দুপুরটা ঢাকা কমিক্স ও কাজী সাহেবের চরণে অর্পণ করে ফেললাম। তারপর...
কাজী আনোয়ার হোসেন-এর 'দুটি কথা', হাসান খুরশীদ রুমী-র সংক্ষিপ্ত প্রাককথন, এবং শেষে মেহেদী হক-এর 'শেষ কথা' বাদে এই বইয়ে রয়েছে পাঁচটি চিত্রকাহিনি। (১) তৌহিদুল ইকবাল সম্পদ-এর আঁকায় দারুণভাবে প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে "পরকীয়া"। সাদা-কালো দিয়ে গড়া আলো-ছায়ার ব্যবহারে নারায়ণ দেবনাথের টপ ফর্ম দেখতে পাওয়ার মতো করে এতে ফুটে উঠেছে লালসা, ক্রোধ, কুটিলতা, ও দুর্বলতা। এই কাহিনির অন্যতম আকর্ষণ হল নায়িকার শরীরী সৌন্দর্যের প্রকাশ। সর্বত্র সুষম নয় সেই চিত্রায়ন, কিন্তু সেটুকুও বাংলায় এতই ব্যতিক্রমী যে তারিফ করতেই হয়। (২) সাদী ইমদাদ-এর কার্টুন ধরনের আঁকাতে চেস্টারটনের ফাদার ব্রাউন উপাখ্যান "ওস্তাদ" নামে আমাদের কাছে আসে। সচরাচর এই বিশেষ চিত্রশৈলী আমার ভালো লাগে না, কিন্তু এই কাহিনির জন্য সেড়া অত্যন্ত সুপ্রযুক্ত হয়েছে। মন ভালো হয়ে যায় এটি পড়ে। (৩) মেহেদী হক-এর দারুণ আঁকাও কার্যত বরবাদ হয়েছে এই বইয়ের দুর্বলতম কাহিনি "ক্যান্সার" ফোটাতে গিয়ে। (৪) আসিফুর রহমান-এর ফাটাফাটি আঁকা, আর হেনরি কুটনার-এর গল্পের দুর্দান্ত রূপান্তর "ঝামেলা" নামে এই বইয়ের সবচেয়ে বড়ো ফিল-গুড কাহিনি হয়ে উঠেছে। (৫) এই কাহিনিটি, যা বইয়ের প্রথমেই রয়েছে, আমার মতে সবচেয়ে শেষে পড়ার মতো। জ্যাক ফিনে'র লেখা "অফ মিসিং পার্সনস" নামের কাহিনিটি আমি যখন ইংরেজিতে পড়েছিলাম, আমার সেটা নিতান্তই ঢ্যাবঢেবে এবং বোরিং লেগেছিল। কিন্তু "অন্য কোনোখানে" নামে সেটির এই শ্বাসরোধী, ব্যাখ্যাতীত সুন্দর বঙ্গীয় রূপটি আরাফাত করিম-এর অবিশ্বাস্য চিত্ররূপে পড়তে গিয়ে আমি মুগ্ধ হলাম। এটিই এই বইয়ের শ্রেষ্ঠ চিত্রকাহিনি।
ঝামেলা গল্পটা মোটামুটি লেগেছে, বাকি সবগুলোই খুব ভাল ছিল। ঢাকা কমিক্সের বই বহুবার হাতে নিলেও কেন যেন কখনো কেনা হয়নি বা পড়া হয়নি। কিন্ত পঞ্চ রোমাঞ্চ পড়ে মনে হল, বড়দের কমিক্স বিষয়টি খারাপ না।
অরিজিনালটা আগে পড়া ছিলনা। গল্পগুলো তেমন আকর্ষণীয় লাগেনি যদিও, গ্রাফিক নভেল হিসেবে বইটা সার্থকই বলা চলে। আশা করি ভবিষ্যতে এমন ক্লাসিক বইয়ের রূপান্তর আরো দেখতে পাবো। Appreciate the effort...
আমি মূল বইটা পড়িনি। মানে সেই সত্তরের দশকের পাঁচ গল্প নিয়ে বের হওয়া একই নামের বই।
তবে কমিকটা পড়ে পুরো গল্পগুলো বুঝতে একটুও কষ্ট হয়নি, তবে মূল বইয়ের গল্পগুলো পড়তে ইচ্ছে হয়েছে সেটাও স্বীকার করছি।
এক কথায় অসাধারণ হয়েছে পুরো বই। আমরা যারা টুকটাক এমন কমিক পড়ি তারা জানি বাংলায় এমন একটা দেড়শ পেইজের কমিক বই পাওয়া আসলে কত্ত বড় ব্যাপার। এমন একটা বই হাতে পেলে ভালো লাগার সাথে একটা গর্বও হয়!
কমিকের মান বিচারে আরাফাত করিমের আঁকা "অন্য কোনখানে" সর্বোচ্চ নম্বর পাবে! অসাধারণ গল্পের অসাধারণ উপস্থাপন! এইটা মাস্টারপিস হয়েছে!
এর মানে বাকিগুলো খারাপ তা মোটেই না! হয়ত এই গল্পটা অনেক বেশি ভালো হয়েছে বলে তুলনামূলক বিচারে এমন হয়ে যাচ্ছে!
আসিফুর রহমানের "ঝামেলা" আঁকা খুবই সুন্দর কিন্তু চরিত্রগুলো চট করে বুঝতে সময় লেগেছে; ওগুলো যে আসলে মানুষ না! তখনকার সময়ের সায়েন্স ফিকশন গল্প; চমৎকার!
মেহেদী হকের "ক্যান্সার" গল্প নিয়ে বলার কিছু নাই! চমৎকার!
তৌহিদুল ইকবাল সম্পদ-এর "পরকীয়া", খুবই উচুদরের হয়েছে! এই গল্পটা হয়ত পরিণত পাঠকদের এমন কমিকের আগ্রহ আরো বাড়িয়ে দেবে।
সাদী ইমদাদ এর "ওস্তাদ" গল্পটাতে একটু কম যত্ন হয়েছে বলে মনে হয়েছে এই যা! আর আকার এই ধরনটা আমার নিজের ঠিক ভালো লাগেনা।
এক কথায় অসাধারণ গ্রাফিক নভেল! কাজীদার লেখা পঞ্চ রোমাঞ্চের আদলে এটি। প্রতিটি গল্পের আকাঁ তার নিজ নিজ জয়গা থেকে প্রশংসার দাবি রাখে। তবে ব্যক্তিগত ভাবে অন্য কোনখানের আঁকিয়ে আরাফাত করিম ভাইয়ের টা সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছে। বাংলা ভাষায় এরকম আরো অনেক অনেক বেশি কাজ হোক সেই প্রত্যাশায়🖤👊 জয়তু ঢাকা কমিক্স🖤
১. তৌহিদুল ইকবাল সম্পদ এর 'দুর্জয়' দু একটা পড়েছিলাম। দারুণ আঁকেন উনি। এই বইতেও হতাশ করেননি। ২. "অন্য কোনোখানে" এই সংকলনের সবচে প্রিয় গল্প আমার। এই গল্পের আকাও দারুণ হয়েছে। ৩. মেহেদী হকের আঁকা ভালো লাগে কিন্তু গল্পটা আমার বিশেষ ভালো লাগেনি। ৪. সাদী ইমদাদ এঁকেছেন "ওস্তাদ"। এই গল্পটা প্রমাণ করে কাজী আনোয়ার হোসেন কি দারুণ একজন অনুবাদক। খুব প্রিয় গল্প। কিন্তু আঁকা বিশেষ ভালো লাগেনি। ৫. "ঝামেলা"র আঁকা এবং গল্প দুটোই ভালো লেগেছে
Ah... this is gold! কাজীদা'র পাঁচটা গল্প তো এক রকম দারুণ, কিন্তু পাঁচ আর্টিস্ট সেগুলোকে যেভাবে কমিকে রূপ দিয়েছেন তা অনবদ্য ছিল। কয়েকজনের কাজের ধাঁচ আমার পছন্দের, ৩জনকে নতুন করে চিনলাম। পাঁচ রকম ধাঁচের আঁকা, পাঁচ স্বাদের পাঁচটা গল্প। দেশের সাহিত্য অঙ্গনের জন্য একটা দুর্দান্ত উপহার এই 'পঞ্চ রোমাঞ্চ'-এর কমিক এডাপ্টেশন।
স্টোরিলাইন ততটা ভালো না লাগলেও আর্টওয়ার্ক ছিলো অসাধারন। বিশেষ করে Tauhidul Iqbal Sampad এর করা "পরকীয়া"র আর্টওয়ার্ক।একটি টেলিফোন কনভার্সেশন কিভাবে যেভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তা দারুন ছিলো।