জীবনানন্দ কে নিয়ে একদম শুরুর দিকে লেখা সমালোচনা গ্রন্থ। সঞ্জয় ভট্টাচার্য 'পূর্বাশা'র সম্পাদক ছিলেন। জীবনানন্দের অনেক কবিতা পূর্বাশায় বেড়িয়েছিলো। সঞ্জয় ভট্টাচার্য জীবনানন্দ দাশের কবিতার মূল্যায়ণ করার চেষ্টা করেছেন; তাঁর কাব্যভাষা, আধুনিক কবিতার নিরিখে তাঁর অবস্থান, রবীন্দ্রনাথের কবিতার সাথে সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য ইত্যাদি। কেনো সমসাময়িক অনেক বড় কবি জীবনানন্দকে হ্নদয়াঙ্গম করতে পারেননি বইটি পড়লে তা বোঝা যাবে। সময়ের নিরিখে জীবনানন্দ তাঁর কাল থেকে এগিয়ে ছিলেন। সর্বোপরি সাহিত্য সমালোচনা যারা পছন্দ করেন তাদের বইটি পড়তে ভালো লাগবে।
" মানুষের মৃত্যু হলে তবুও মানব বেঁচে থাকে"-- কবি জীবনানন্দ দাশ হয়তো তবুও বেঁচে আছেন বাংলার বুকে, কবিতার লাইনে। লেখক সঞ্জয় ভট্টাচার্য অনেক দিনের প্রস্তুতি নিয়েই লিখলেন " কবি জীবনানন্দ দাশ "।
বইটাতে মূলত জীবনানন্দ দাশের কবিতার আলোচনা ও বিশ্লেষণ করেছেন লেখক। কাব্য গ্রন্থ বা সমগ্র কবিতার আলোকে নয়। বিশেষ কিছু কবিতা, তার বিষয়বস্তু। কবিতার আঙ্গিক, সময় ও অন্তর্নিহিত ভাবটা এখানে মূখ্য হয়ে উঠেছে। গোটা কবিতা বা বিক্ষিপ্ত কিছু লাইনের গভীরতা তুলে ধরেছেন।
রবীন্দ্র পরবর্তী প্রথম সারির একজন কবির কবিতার মনন ও প্রকৃতি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কিছু কবিতাও নিয়ে এসেছেন তাঁর লেখাতে। যার ফলে দুই যুগের দুটি ধারার কবিতার প্রকৃতি ও মননটা পাঠক কাছাকাছি থেকে দেখতে পারবেন। লেখক এখানে হয়তো তুলনা করতে রবীন্দ্রনাথের কবিতা টেনে আনেন নাই তিনি রবীন্দ্র পরবর্তী এক কবির কবিতার আবহটা তুলে ধরতেই এই কাজ করেছেন।
ব্যক্তি জীবনানন্দ দাশ নয় কবি জীবনানন্দ দাশ ও নয়। কবি জীবনানন্দ দাশের কবিতার সময়, কবিতার আবহ ও প্রকৃতি, কবিতার সাথে মিশে থাকা মননটাই বিশ্লেষণের আলোকে এই বই।
জীবনানন্দ দাশ নামটা শুনলেই প্রথমে আমার মনে পরে, "আবার আসিব ফিরে কিংবা নাটরের বনলতা সেন"। কেন তা জানি না। তবে মনে হয় শুধু আবার আসিব ফিরে এর কারণেই বেশি মনে পরে। তিনি তো ফিরে আসতে চেয়েছেন। হয়ত এসেছেন। নয়ত নয়। তবুও জীবনানন্দ দাশ আমাদের সবার মাঝেই বিচরণ করে যাচ্ছেন। . কবি, কবিতা ও কবিতার ছন্দ সব কিছুই এক সুত্রে গাথা। কেউ কেউ আছেন নিজস্ব কাব্য ধারায় কবিতা রচনা করেন। আবার কেউ কারো থেকে অনুপ্রেরণা পেয়ে, আবার কেউ আছেন যারা তার চারপাশ কে নিজের জগৎ বানিয়ে নেন। জীবনানন্দ দাশ কবিতা রচনার ক্ষেত্রে তার চারপাশ কেই বেশি বেছে নিয়েছিলেন। . কবিতা রচনায় যিনি স্বতন্ত্র ভাবে উজ্জল হয়ে ছিলেন, তিনি জীবনানন্দ। কারণ কল্লোল যুগের আর সব কবিদের চেয়ে তিনি ছিলেন ব্যতিক্রম। তার লেখা, ছন্দ উপমা সব কিছুই যেন হয়ে উঠেছিল তার দর্শন আর আবেগ। . লেখক সম্পাদক সঞ্জয় ভট্টাচার্য তার "কবি জীবনানন্দ দাশ" বইয়ের সুন্দর ভাবে জীবনানন্দ দাশের কবিতার অর্থ তুলে ধরেছেন। তার স্বকীয়তা ও কবিতার বর্নণা নিয়ে আলোচনা করেছেন। তুলে এনেছেন সেই সব কথা যা জীবনানন্দের কবিতার সাথে জড়িত। . জীবনানন্দ বেচে থাকতে যে সম্মান পাননি আর তার মৃত্যুর পর তাকে শ্রদ্ধা সম্মান জানানোর আরম্বড় দেখে সঞ্জয় ভট্টাচার্য মনে মনে অনেক ক্ষোভ প্রকাশ করেন। কবির দুর্দশার কথা সবাই জানার পরও সেটা নিয়ে কেউ মাথা ঘামায়নি। সেটাও তিনি উল্লেখ করেছেন ছোট করে। . তবুও জীবনানন্দের খেদ নেই, কারণ তিনি আসবেন শঙ্খচিল হয়ে ধানসিড়িটির তীরে, এই বাংলায়।
সঞ্জয় ভট্টাচার্য রচিত কবি জীবনানন্দ দাশ একটি মৌলিক সমালোচনা গ্রন্থ যা বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি জীবনানন্দ দাশের সৃজনজগতকে নিবিড়ভাবে অনুধাবনের চেষ্টা করেছে। এই বইটি কেবল একটি জীবনী নয়, বরং একটি সাহিত্যিক রচনা যেখানে কবির মননশীলতা, কাব্যভাষার বৈশিষ্ট্য এবং তাঁর যুগের প্রেক্ষাপটে অবস্থান নিয়ে গভীর আলোচনা উপস্থাপিত হয়েছে। বইটির প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো লেখকের নিজস্ব অভিজ্ঞতার প্রতিফলন। সঞ্জয় ভট্টাচার্য পূর্বাশা পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে জীবনানন্দ দাশের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ পেয়েছিলেন। এই নিকটতার অভিজ্ঞতা থেকে তিনি কবিকে নতুনভাবে দেখার চেষ্টা করেছেন। তিনি লক্ষ্য করেছেন যে সমসাময়িক অনেক বড় কবি জীবনানন্দকে হৃদয়ঙ্গম করতে পারেননি। এর কারণ হিসেবে তিনি দেখিয়েছেন যে জীবনানন্দ তাঁর যুগ থেকে অনেক এগিয়ে ছিলেন। তাঁর কবিতায় যে আধুনিক চেতনার স্ফুরণ ঘটেছিল তা সে সময়ের পাঠকদের কাছে সহজে বোধগম্য ছিল না। বইয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে জীবনানন্দের তুলনামূলক আলোচনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। লেখক দেখিয়েছেন কীভাবে রবীন্দ্র পরবর্তী যুগে জীবনানন্দ নিজস্ব কাব্যধারা তৈরি করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের প্রভাব থেকে মুক্তি নিয়ে তিনি নিজের একটি ভিন্ন জগৎ সৃষ্টি করেছিলেন যেখানে শহরের অন্ধকার, নিস্তব্ধতা, একাকিত্ব এবং প্রকৃতির বিষাদময় রূপ নতুন করে ধরা দিয়েছে। এই আলোচনায় টি এস এলিয়টের প্রসঙ্গও এসেছে যা জীবনানন্দের আধুনিকতার দিকটি বোঝাতে সাহায্য করেছে। বিশেষ কবিতাগুলোর বিশ্লেষণে লেখক ধূসর পাণ্ডুলিপি এবং মহাপৃথিবীর দিকে বেশি মনোযোগ দিয়েছেন। এই কাব্যগ্রন্থগুলোতে জীবনানন্দের মননের গভীরতা এবং ভাষার সৌকর্য্য সবচেয়ে বেশি প্রকাশিত হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। কবিতার ভেতর দিয়ে জীবনের অবসাদ, প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক এবং অস্তিত্বের জটিল প্রশ্নগুলো কীভাবে ফুটে উঠেছে তা তিনি সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। বইটিতে কবির ব্যক্তিজীবনের দিকটিও উঠে এসেছে। জীবনানন্দের দারিদ্র্য, অবহেলা এবং সামাজিক অবজ্ঞার কথা সঞ্জয় ভট্টাচার্য মর্মস্পর্শীভাবে লিখেছেন। তিনি লিখেছেন কীভাবে কবি বেঁচে থাকতে সম্মান পাননি কিন্তু মৃত্যুর পর তাঁকে নিয়ে অতিরিক্ত শ্রদ্ধা প্রদর্শন শুরু হলো। এই দ্বৈত দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি লেখকের ক্ষোভ এবং বেদনা বইটিতে স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়েছে। তবে বইটি শুধু দুঃখের গল্প নয়। এটি একটি আশার বার্তাও বহন করে। লেখক বিশ্বাস করেন যে জীবনানন্দের কবিতা চিরকালীন এবং তিনি শঙ্খচিল হয়ে বাংলার ধানসিঁড়ির তীরে ফিরে আসবেন। এই বিশ্বাস থেকেই বোধ হয় তিনি এই গ্রন্থ রচনার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। সাহিত্য সমালোচনার দিক থেকে এই বইটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। এটি জীবনানন্দ দাশ সম্পর্কে রচিত প্রারম্ভিক সমালোচনাগুলোর মধ্যে অন্যতম। যে পাঠকরা জীবনানন্দের কবিতা পড়তে চান কিন্তু তাঁর কাব্যজগতের গভীরে প্রবেশ করতে চান, তাদের জন্য এই বই একটি উত্তম পথপ্রদর্শক হতে পারে। সঞ্জয় ভট্টাচার্যের ভাষা সরল কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ এবং তাঁর বিশ্লেষণে গভীর অনুভূতির ছোঁয়া রয়েছে যা পাঠককে কবির প্রতি আরও বেশি আকৃষ্ট করে।
সঞ্জয় ভট্টাচার্য ছিলেন একজন খ্যাতিমান সম্পাদক ও লেখক, যিনি ১৯৩০–৪০ দশকে ‘পূর্ব্বাশা’র সম্পাদক হিসেবেও সুপরিচিত । জীবনের নানা সময় তিনি জীবনানন্দ দাশের সৃজন ও ব্যক্তিজীবন সম্পর্কে নিকট থেকে অবগত ছিলেন—এই অভিজ্ঞতা বইটির ঘনিষ্ঠতা ও তথ্যবহুল বর্ণনাকে সমৃদ্ধ করেছে।
বইটি জীবনানন্দ দাশের জীবন, সাহিত্যকর্ম এবং মানবিক দিকগুলোকে সহজ ও সংক্ষিপ্ত আকারে তুলে ধরে। এতে কবির পারিবারিক পটভূমি, লেখালেখি, প্রকাশনা, ও ব্যক্তিজীবনের নানা ঘটনা বাস্তবধর্মীভাবে ফুটে উঠেছে। লেখক মূলত আলোচ্য দু’টি দিকেই মনোনিবেশ করেছেন—(১) কবির জীবন ও মানসিক অবস্থা, এবং (২) কবিতায় তার অবিস্মরণীয় প্রতিভা ও ধারাবাহিকতা।
সঞ্জয় ভট্টাচার্য ‘পূর্ব্বাশা’ পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে জীবনানন্দের প্রতি প্রদর্শিত আন্তরিকতা ও সহযোগিতার স্মৃতিকথা দেন, যেখানে কবিকে সাহিত্যে স্থিতিশীলতা দিতে তার ভূমিকার উল্লেখ পাওয়া যায়।
কবির কাব্য, বিশেষ করে ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’ ও ‘মহাপৃথিবী’–এ জীবনের অবসাদ ও প্রকৃতির সহযোগিতা কেমন প্রতিফলিত হয়েছে—অন্তর্দৃষ্টিপূর্ণ বিশ্লেষণ আছে।
এছাড়াও সঞ্জয় ভট্টাচার্য জীবনানন্দ দাশের কবিতার সাথে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও টি. এস এলিয়ট ও বিভিন্ন সময়ের কবিতার প্রসঙ্গ তুলে জীবনানন্দের স্বতন্ত্রতা বিশ্লেষণ করেছেন।যা মূলত বইয়ের প্রাণ।