এ বইয়ে রয়েছে যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তানের কাবুল ও কান্দাহার অঞ্চলের নানা বৃত্তান্ত। এখানে ভাঙা উড়োজাহাজে বাস করে পথশিশুরা। পাগমানের স্থানীয় মানুষজন পাহাড় খুঁড়ে সংগ্রহ করে চুনি-পান্না। আফগান মহিলা কবিরা কবিতার মাইফেল বসান কবি নাদিয়া আনজুমের ইয়াদগারিতে, কবিতায় ভালোবাসার কথা লেখার কারণে যিনি খুন হয়েছেন স্বামীর দৈহিক জুলুমে। ব্রেস্ট ক্যানসারে আক্রান্ত পাসতুন নারী রাহেলা কায়মারের গল্প আপনাকে অভিভূত করবে। অবশেষে পাঠক দেখবেন কী করে গড়ে তুলতে হয় ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে নতুন জীবনের ফল্গুধারা। পাঠক, এই বই আপনাকেও নিয়ে যাবে কান্দাহারের পথে।
মঈনুস সুলতানের জন্ম ১৯৫৬ সালে, সিলেট জেলার ফুলবাড়ী গ্রামে। তাঁর পৈতৃক নিবাস মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলায়। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস থেকে আন্তর্জাতিক শিক্ষা বিষয়ে পিএইচডি। খণ্ডকালীন অধ্যাপক ছিলেন ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস এবং স্কুল অব হিউম্যান সার্ভিসেসের। ছিলেন ইউনিভার্সিটি অব সাউথ আফ্রিকার ভিজিটিং স্কলার। শিক্ষকতা, গবেষণা ও কনসালট্যান্সির কাজে বহু দেশ ভ্রমণ করেছেন। তাঁর ‘জিম্বাবুয়ে : বোবা পাথর সালানিনি’ গ্রন্থটি প্রথম আলো বর্ষসেরা বই হিসেবে পুরস্কৃত হয়। ২০১৪ সালে ভ্রমণসাহিত্যে সামগ্রিক অবদানের জন্য পান বাংলা একাডেমি পুরস্কার। প্রাচীন মুদ্রা, সূচিশিল্প, পাণ্ডুলিপি, ফসিল ও পুরোনো মানচিত্র সংগ্রহের নেশা আছে মঈনুস সুলতানের।
"রোড টু কান্দাহার " পড়ে সবার আগে মনে পড়লো ইমতিয়াজ মাহমুদের কবিতা -
"মৃত্যু এলো মহানন্দার তীরে আমি তাকে চিনতে পারিনি, আহা, অনেক মৃত্যুর ভিড়ে।"
আফগানিস্তান এর গল্প অথচ সেখানে মৃত্যু থাকবে না, এ যেন হয় না। শুধু মৃত্যু আর মৃত্যু চারিদিকে। শরীরের মৃত্যু, মানবিকতার মৃত্যু, তিলে তিলে ক্ষয়ে ক্ষয়ে মৃত্যু। এ বই ভ্রমণকাহিনি, আবার এক বেদনাবিধুর গল্পও। ক্যান্সার আক্রান্ত রাহেলা কায়মারের চিঠি নিয়ে যাচ্ছেন লেখক। প্রেমিকের হাত ধরে পালিয়ে যাওয়ায় যার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে তার পরিবার। লেখক মঈনুস সুলতান কান্দাহার যাত্রায় প্রত্যক্ষ করেন তালেবান শাসনের পর যুদ্ধবিধবস্ত আফগানিস্তান এর ভয়ঙ্কর রূপ। বাবাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে তালেবানরা, তাকে বাঁচাতে চেয়েছিলো ছেলে। ছেলের হাতে চাবুক মারে তালেবরা। পড়ে গিয়ে মাথায় আঘাত পাওয়া ছেলেটাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিলো। সেখানে বিনা চিকিৎসায় ১২ দিন বেঁচে ছিলো সে।তারপর... সে থাক। ইন্টেলিজেন্স সংস্থার লোক মনে করে লোকজনকে পাথরচাপা দিয়ে মেরে ফেলাও মামুলি ঘটনা।জেনানাদের অন্তর্বাস আছে সন্দেহে পুড়িয়ে ফেলা হয় আড়ত। মেয়েদের ছবি আঁকার সামাজিক বিপত্তি নিয়ে টেলিভিশনে কথা বলায় আরিয়া মুফরাদজাদাকে খুন হয়ে যেতে হয় এখানে। আরেক তরুণী ফিরিশতার গল্প লেখকের কাছ থেকে শোনা যাক-
"তালেবানি আমলে বলখের কাছাকাছি একটি ছোট্ট শহরে সে (ফিরিশতা) বাচ্চাদের স্কুলে শিক্ষকতার কাজ করত। স্কুল ইন্সপেকশনে আসে ‘আমরুল মারুফ' নামের সমাজে নৈতিকতা রক্ষাকারী পুলিশি সংস্থার দুই তালেব। ফিরিশতা যখন বাচ্চাদের সামলাচ্ছিল, তখন তারা তাকে দেখতে পায়, সে ওড়না দিয়ে পেঁচিয়ে রেখেছে মাথা ও মুখ, কিন্তু অসাবধানতাবশত তার গ্রীবা ও কণ্ঠার চারপাশ হয়ে আছে অনাচ্ছাদিত। তাকে তৎক্ষণাৎ নিয়ে যাওয়া হয় 'জিন্দানে জেনানা' বা মহিলাদের কারাগারে। পরদিন বাদ-জুমা বিচারের বৈঠক বসে মসজিদের প্রাঙ্গণে। তার গলা থেকে রুপালি ধাতুর হার খুলে নিয়ে তা পুড়িয়ে লাল করা হয়। সাজা হিসেবে এক তালেব চিমটায় করে লোহিত বর্ণের হারটি নিয়ে আসে তার কাছে। অন্য তালেব বিচারের রায় পড়ে শোনায়, 'উত্তপ্ত লোহিত হার দিয়ে নাফরমানির জন্য তার গলার অনাচ্ছাদিত অংশে দাগ দেওয়া হবে।' তালেব জ্বলন্ত হারটি তার দিকে এগিয়ে আনলে বিচারের কাজি তাকে থামতে আদেশ দিয়ে বিকল্প প্রস্তাব দেন—তার সাজা মওকুফ করা হবে,সে যদি তওবা করে পর্দানশিন হালতে তালেবদের মুরব্বি বৃদ্ধ এক মোল্লার শাদির পয়গামে রাজি হয়। ফিরিশতাকে বছর দুয়েকের ওপর কাটাতে হয় বৃদ্ধ মোল্লার ‘চারম' বিবি হিসেবে। সে কীভাবে মোল্লার হাত থেকে নিষ্কৃতি পায়—এ তথ্য আজও আমার অজানা। এক আন্তর্জাতিক এনজিওচালিত সাইকিয়াট্রিক সেন্টারে সে কিছুদিন চিকিৎসাধীনও ছিল।"
অথচ এই মহাধার্মিকদের একজনের কাছেই মেকআপ করা এক বালককে দেখে চমকে যান লেখক। জানতে পারেন, বালকটি "বাচ্চা বিরেশ বা বয় ব্রাইড।" পিতৃমাতৃহীন বালকটিকে জোর করে মেকআপ পরিয়ে মেয়েদের মতো সাজিয়ে রাখা হয়, করা হয় পাশবিক অত্যাচার। লেখক ভাবেন, তার নিজের ছেলে থাকলে সে এই বয়সীই হোতো। এই দেশটিতে আবার আবির্ভাব ঘটেছে তালেবানদের, আবার এ দেশের মানুষ বিশেষত নারীরা শিকার হচ্ছে বর্বরতম দৈহিক ও মানসিক অত্যাচারের। নাদিয়া আনজুমের লেখা কবিতাই যেন তাদের নিয়তি -
"ঘুঘুর গাঢ় ডানার মতো আমার চারপাশে ঘোরে শূন্যতা ভাঙা ডানা আমি ক্রন্দনই আমার একমাত্র অর্ঘ্য।"
বেশির দরকার নেই, তালেবানি হুকুমতের সময় আফগানদের জিল্লতির তিনটি উদাহরণ :
১. ‘‘তালেবানি আমলে বলখের কাছাকাছি একটি ছোট্ট শহরে সে বাচ্চাদের স্কুলে শিক্ষকতার কাজ করত। স্কুল ইন্সপেকশনে আসে ‘আমরুল মারুফ’ নামের সমাজে নৈতিকতা রক্ষাকারী পুলিশি সংস্থার দুই তালেব। ফিরিশতা যখন বাচ্চাদের সামলাচ্ছিল, তখন তারা তাকে দেখতে পায়, সে ওড়না দিয়ে পেঁচিয়ে রেখেছে মাথা ও মুখ, কিন্তু অসাবধানতাবশত তার গ্রীবা ও কণ্ঠার চারপাশ হয়ে আছে অনাচ্ছাদিত। তাকে তৎক্ষনাৎ নিয়ে যাওয়া হয় ‘জিন্দানে জেনানা’ বা মহিলাদের কারাগারে। পরদিন বাদ-জুমা বিচারের বৈঠক বসে মসজিদের প্রাঙ্গণে। তার গলা থেকে রুপালি ধাতুর হার খুলে নিয়ে তা পুড়িয়ে লাল করা হয়। সাজা হিসেবে এক তালেব চিমটায় করে লোহিত বর্ণের হারটি নিয়ে আসে তার কাছে। অন্য তালেব বিচারের রায় পড়ে শোনায়, ‘উত্তপ্ত লোহিত হার দিয়ে নাফরমানির জন্য তার গলার অনাচ্ছাদিত অংশে দাগ দেওয়া হবে।’ তালেব জ্বলন্ত হারটি তার দিকে এগিয়ে আনলে বিচারের কাজি তাকে থামতে আদেশ দিয়ে বিকল্প প্রস্তাব দেয়—তার সাজা মওকুফ করা হবে, যদি সে তওবা করে পর্দানশিন হালতে তালেবদের মুরব্বি বৃদ্ধ এক মোল্লার শাদির পয়গামে রাজি হয়।’’
২. ‘‘কান্দাহারে তালেবদের তমতমি কায়েম হওয়ার আগে তিনি এখানকার একটি স্কুলে আদবিয়াতে আংরেজির তালিম দিতেন। শিক্ষকতা ছাড়া অবসর সময়ে তিনি ছিলেন একটি ফুটবল ক্লাবের কোচ। শহরে তালেবানদের হুকুমত চালু হলে বালকদের হাফপ্যান্ট পরিয়ে গতর সম্পূর্ণ অনাবৃত রেখে খেলার মাঠে ইবলিস খন্নাসের আন্ডার মতো দেখতে গোলমোল বলের পেছনে বেফায়দা ছোটাছুটি করানোর অপরাধে তাঁর সাজা হয়। যে পা দুটি দিয়ে তারুণ্যে ওস্তাদ বলের ড্রিবলিংয়ে দর্শকদের তাক লাগিয়ে দিতেন, তালেবরা তা তাঁর ঊরুদেশ থেকে কেটে বাদ দিয়ে তাঁকে পৌঁছে দেয় হাসপাতালে।’’
৩. ‘‘কয়েক মাস আগেও এখানে ছিল তাঁর রেডিমেড কাপড়ের আড়ত। গুজব রটে যে আড়তে গাট্টি বন্দী করে রাখা আছে জেনানাদের অন্তর্বাস। এত ক্ষিপ্ত হয়ে তালেবরা তাঁর আড়তটি স্রেফ পুড়িয়ে দেয়।’’
ভ্রমণবৃত্তান্তের সন-তারিখ দেওয়া নেই, তবে ধারণা করছি তালেবানদের হটিয়ে আমেরিকা আফগানিস্তানের দখল নেওয়ার পরপরই কাবুল ও কান্দাহারে যান মঈনুস সুলতান। আর এ কারণেই বোধহয় আমেরিকার আগ্রাসনের চিত্র ততটা আসেনি, যতটা ব্যাপকভাবে এসেছিল তাঁর ‘কাবুলের ক্যারাভান সরাই’ বইয়ে।
জনাব সুলতানের স্বভাব সুলভ বয়ানে আফগানিস্তান আরও ঠিক করে বলতে গেলে কাবুল এবং খানিকটা কান্দাহার হয়ে আফগানি মানুষের জীবনের যে ছবি ফুটে ওঠে তাতে তালেবানি পাশবিকতার জ্বলজ্বলে তাপের বিপরীতে দখলদার পশ্চিমাবাহিনীর বোমাবর্ষণ আর এর প্রভাবে আফগানী জনগণের জীবনের ঘাত-প্রতিঘাতের ছবি ততটাই শীতল। কিন্তু এতে নিশ্চয়ই তালেবানি পাশবিকতার সাক্ষী হয়ে কোন পাঠকের হৃদয় কম রক্তাক্ত হবে না বা তালেবানই জুলুমনামা অস্বীকার করার পাঁয়তারা করছি না। কাবুলের ক্যারাভান সরাই বা রোড টু কান্দাহার নিঃসন্দেহেই তালেবানি জুলুমনামা। লেখক নিজে পশ্চিমা উন্নয়ন সংস্থার বড় বাবু। তাই চোখের সামনে পশ্চিমা আলোকায়নের পরিপন্থী আচরণ নিঃসন্দেহে পরিষ্কার চোখে পড়ে- যা কিনা তালেবানিরা হরদরেই করে থাকে। শিল্পকলা-সংস্কৃতি-শিক্ষা-নারী মুক্তি বলতে গেলে যে মাপকাঠি দিয়ে পশ্চিমের আলোক ব্যাপারীরা সভ্যতাকে যাচাই করে, প্রিয় লেখক সুলতান তারই পরিপ্রেক্ষিতে দেখেছেন কাবুল-কান্দাহারের অলিগলি। আবার বলে রাখি, এখানে দগদগে পশ্চিমা অপরায়নের কোন ছবি তো নেই-ই বরং লেখকের নিজস্ব-একান্ত দৃষ্টি-ভাষাভঙ্গিতে আফগান জীবনের দারুণ ছবি ফুটে ওঠে এবং তা উদারনৈতিক চোখেই। তবে খেয়াল না করে পারা যায় না যে, তালেবানি পাশবিকতা এবং মার্কিনী দখলদার আগ্রাসনের মাঝখানে পড়া আফগানী জনগণের জীবনের ছবিতে তালেবানি ক্ষতের ছবিটা যত পরিষ্কার, মার্কিনী আগ্রাসনের প্রভাবে বদলে যাওয়া জীবনের উপরি-উপরি বয়ানের বাইরে যাওয়া আর যায় না। পড়তে পড়তে বার বার কেঁপে উঠেছি। ভয়াবহতায়। মানুষের জীবনের অবমাননায়। এর দায় শুধু এক গোষ্ঠীকে দেয়ার মতো বেওকুফি আমরা নিশ্চয়ই করতে পারি না। এই পড়তে গিয়ে হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়, এর মাঝে যে আমার নিজেরও রোমান্টিকতা কাজ করে না- তা অস্বীকার করতে পারব না। তবে তারপরও বইয়ের একটা ছোট্ট ঘটনা উল্লেখ না করে পারছি না। তালেবানি শাসনের তামাদি হলে কাসেম ওয়ালিদজাদা ফিরে আসেন কাবুলে। এখানে তিনি বার তিনেক একজিবিশনও করেন। তাঁর নাম-যশের কারণে বিদেশী মিডিয়া তাঁকে ইন্টারভিউ করে। তখন তিনি তালেবানরা যেসব চিত্র ধ্বংস করেছে, তার প্রতিবাদ জানান-এমনকি পারস্য ও তুর্কিস্তানে পুরনো সব ছবি আঁকার ঘরানার উদাহরণ দিয়ে ইসলামের সঙ্গে আঁকাজোকার যে বিরোধ নেই, এ মন্তব্যও করেন। তাঁর মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় কাবুলের মসজিদ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিল্পকলা বিভাগের দেয়ালে শাবনামা বা নাইটলেটারে ইশতেহার সাঁটা হয়। তাতে তাঁকে মুরতাদ ও কাফের ফতোয়া দেওয়া হয়। 'শহরে মাস তিনেক আন্ডারগ্রাউন্ড থাকার পর সহসা অসাবধানতার জন্য তিনি কিডন্যাপড হন। তাঁর লাশ পাওয়া যায় খ্রিষ্ট-ফুরুশি বা ইটের বাজারে ফেলে রাখা ইস্পাতের একটি কনটেইনারের ভেতর। তালেবরা তাঁর হাতের শিরা কেটে কনটেইনারের দরজা বন্ধ করে দেয়। ব্যক্তিগত জীবনে কাসেম ওয়ালিদজাদা ছিলেন অত্যন্ত পরহেজগার মানুষ। মউতের নিকটবর্তী হতে হতে তিনি তাঁর রক্ত দিয়ে কনটেইনারের দেয়ালে ক্যালিগ্রাফ করে লিখে যান পবিত্র লবজ আল্লাহু আকবর।'